আবৃত্তি : কিছু ভাবনা বিজয়লক্ষ্মী বর্মণ

 

রসাত্মক বাক্যই কাব্য, এমন কথাই বলেন শাস্ত্রকাররা। আর আমাদের অভিজ্ঞতা, জীবনের রসটুকু হেঁকে নিয়ে অনুভূতির যে সংহত প্রকাশ সেই গভীরতম উচ্চারণের নাম কবিতা। সেই কবিতার উচ্চারণই আবৃত্তি। ফলে, যখন কবিতা আবৃত্তি করি আমরা, তখন যেন সেই অনুভূতির কাছে কবির বােধের কাছে নত হতে শিখি আমরা।

আমার মাপে কবিতাগুলাে লেখা হয়নি, সে কথা মনে রেখে কবিতাটার নির্যাসটুকু যেন অন্তরে গ্রহণ করি এবং সেটা প্রকাশ করার চেষ্টা করি। | জীবনে সবকিছুরই এপিঠ-ওপিঠ দুই-ই আছে। যেমন এই যেখানে এসে আমরা ঠেকলাম। কেননা, প্রশ্ন উঠতেই পারে সেক্ষেত্রে যে, যিনি কবিতা আবৃত্তি করছেন তিনি কি কেবল কবির অনুভূতি অনুবাদক মাত্র, নিজে শিল্পী নন? ঠিক তাে, আবৃত্তি করছেন যিনি তিনি ততা নিজে একজন শিল্পী।

তাঁর বােধের গভীরতা দিয়েই তােতিনি কবির অন্তরের অনুভূতিটুকু ছুঁতে চাইছেন, এবং নিজের শিল্পীসত্তার মাধুরী মিশিয়ে আবৃত্তি করছেন। মজার ব্যাপার, এ নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক আছে। কবিরাও অনেকে ভিন্নমত পােষণ করে। ধরা যাক, একটা লিখিত নাটক বা গল্প বা উপন্যাস থেকে নাট্য প্রযােজনা বা ফিল্ম হল, সেখানে কিন্তু পরিচালক অনেকটাই। স্বাধীনতা নিচ্ছেন তার মতন করে লেখাটুকুকে সাজিয়ে নেবার। তাহলে কবিতার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন হবে কেন?

যাঁরা আবৃত্তিরনবীন শিক্ষার্থী,তাঁদের অনুশীলনের ধারাটা কেমন হবে? নিজের কণ্ঠস্বরের চর্চা, উচ্চারণের চর্চা,ছন্দজ্ঞান নিয়ে চর্চা তাদের করতেই হবে। কারণ, আবৃত্তির মূল বাহন কণ্ঠ এবং সহযােগী উচ্চারণ। তাহলে কণ্ঠকে এমনভাবেই তৈরী করতে হবে যেন সে সবরকম ভাবকে ধারণ এবং প্রকাশ করতে পারে।

ছন্দের কাঠামাের মধ্যে থেকেও স্বরক্ষেপণের বৈচিত্র্য একটা ছবি তৈরী করে দিতে পারে। আর সঠিকভাবে ভাবপ্রকাশের জন্য শব্দের এই চিত্ররূপ তৈর করাটা প্রয়ােজন তােবটেই।সবাই গলাই কিন্তু জলদগম্ভীর নয়, হওয়ার কথাও নয়, প্রয়ােজনও নেই।

তেমনি স্বরক্ষেপণেরও সবাই নিশ্চয়ই তিনটে সপ্তক ছুঁয়ে আসতে পারবেন না। কিন্তু প্রত্যেক শিক্ষার্থী নিজের গলার বহন ক্ষমতা range এবং যদি বুঝে নিতে পারেন তাহলে কত ভালােভাবে তাকে ব্যবহার করতে পারবেন তারও একটা আন্দাজ পাবেন। সেইসঙ্গে উচ্চারণও চাই স্পষ্ট এবং শুদ্ধ। নাহলে তাে কথাগুলাে শ্রোতার কানে ঠিকমতাে পৌঁছাবে না। আর একটা কথা বলাই হয়নি। স্মৃতি।

কবিতাকে স্মৃতিধার্য না করলে কিন্তু যথার্থ আবৃত্তি হয় না। অনেকেই প্রশ্ন তােলেন, পাঠ এবং আবৃত্তির মধ্যে ফারাকটা কী। দেখে পড়া এবং না দেখে বলা—এমনটা সহজেই বলা যেতে পারে। কিন্তু ফারাকটা কেবল ঐটুকু নয়। একটা কবিতা যখন আমি সম্পূর্ণ আত্মস্থ করতে পারি, তখনই তার যথার্থ আবৃত্তি সম্ভব। আর আত্মস্থ করতে গেলে সেই কবিতাটা   স্মৃতিতেমুদ্রিত তাে থাকতেই হবে।

আবৃত্তির নাটকীয়তা নিয়েও বিস্তর আলােচনা হয়েছে। আমার বিশ্বাস। শব্দটা হওয়া উচিত ‘অতিনাটকীয়তা’, যেটা শুধু আবৃত্তি কেন, জীবনের যেকোন ক্ষেত্রেই বর্জনীয়।

কিন্তু নাটক আছে আমাদের জীবনের পরতে পরতে—সব কবিতায়, সব কথায়, সব কলা শিল্পের প্রকাশে এবং আমাদের জীবনের সর্বোত্তম মুহূর্তগুলিতে। সেই বিশুদ্ধ নাটক কখনাে অতিকৃত নয়, বরঞ্চ তা গভীরতার আস্বাদ দেয়।যিনি কোন ফলিত কলার শিল্পী, সেই মানুষটি তার নিজের বিশ্বাস নিয়ে, মনন নিয়ে, আবেগ নিয়ে, তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে, মাটিতে পা পুঁতে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে যা প্রকাশ করতে চান তার প্রতি পরতেই আছে বিশুদ্ধ নাটক। সুযােগ বেশী থাকবেই।

কারণ, ভাল আবৃত্তি করতে হলে—ভাষা, উচ্চারণ, কণ্ঠ, স্বর-বিন্যাস এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে শুরু থেকেই যত্নশীল এবং অনুশীলন একান্ত প্রয়ােজন। অথচ এইসব আমাদের স্কুল-কলেজের পঠন-পাঠনে এখনও তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

কোলকাতা এবং অন্যান্য শহরে হয়তাে এ বিষয়ে ছবিটা তেমন হতাশাজনক নয় কিন্তু গ্রামাঞ্চলে ভাষা নিয়ে বিশেষ করে উচ্চারণে দুর্বলতা নানা পেশাগত কর্মে তােবটেই অনুষ্ঠানে পরিবেশনার প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও, উচ্চারণে ত্রুটির জন্য সুযােগ পাওয়া থেকেও অনেকে বঞ্চিত হন।

সুতরাং আজ গ্রামাঞ্চলে আবৃত্তি শিক্ষা ও প্রসারে সকল অভিভাবকদেরই এগিয়ে আসা উচিৎ। আর এদিকে লক্ষ্য রেখেই শম্পা’তাদের গর্বের ‘আবৃত্তি উৎসব’নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

গ্রামাঞ্চলে আবৃত্তি শিল্পের প্রসারের জন্য শুরু থেকেই তারা স্থানীয় নবীন প্রতিভার সঙ্গে মঞ্চে কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় আবৃত্তিকারদের উপস্থিত করে চলছেন। প্রতিষ্ঠিত ও নবীন এবং শহর ও পল্লী— এই দুই-এর মেলবন্ধনে আমাদের এই আবৃত্তি উৎসব আগামী প্রজন্মের অনিশ্চয়তায় ভরা অন্ধকার পথে—আলাের দিশারী হয়ে থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

( প্রবন্ধটি   শম্পা  সাহিত্য পত্রিকা  থেকে সংগৃহীত )

সম্পাদক : স্বপন নন্দী