ঈশানপুরের অশরীরী // ৫  // সুব্রত মজুমদার

3123
.
.
.
বিক্রম সাধুবাবাকে জিজ্ঞাসা করে, “বাবা, আপনি যদি সবই জানেন তবে নিজেই রক্ষা করছেন না কেন ? আর এত হেঁয়ালি করে কি লাভ আপনাদের ? আমার বুদ্ধির পরীক্ষা করছেন !” 
সাধুবাবা কোনো উত্তর দিলেন না। আশীর্বাদের ভঙ্গি করে মন্দিরের পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। 
.
.
                  ” মহাদেবের মাথায় স্থান….. সে তো চন্দ্র। ”  দেবলীনা বলে ওঠে। বিক্রমের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে প্রায় লাফিয়ে ওঠে। ” ইউরেকা ! ইউরেকা ! আমি পেয়ে গেছি দেবলীনা। শশাঙ্ক…. শশাঙ্ক শেখর রায়। কিন্তু ওর ক্ষতি করবে কে ? যে কোনো উপায়ে শশাঙ্কবাবুকে বাঁচাতে হবে। “
” কিন্তু সাধুবাবা…. “
.
.
” ও ঝুঠা বাবা । তুমি ভালো করে লক্ষ্য করোনি, লক্ষ্য করলে দেখতে পেতে জটার ঠিকমতো সেটিং হয়নি। আর বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের নখের নেলপলিশটা দিন দুয়েক আগের লাগানো। ছেলেরা এভাবে নেলপলিশ লাগায়, তবে সাধুরা নয়। ” 
বিক্রমের কথায় অবাক হয় দেবলীনা। ” তোমার অবজারভেশন পাওয়ারকে স্যালুট করতে হয়। আমি তো সাধুবাবার অঙ্গভঙ্গি দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। “
.
.
বিক্রম ব্যাগ হতে জলের বোতল বের করে গলাটা ভিজিয়ে নেয়। ফাল্গুন মাসের শেষ। রোদের তীব্রতাও বেড়েছে। নিজে জল খেয়ে বোতলটা দেবলীনার দিকে বাড়িয়ে দেয়। 
” ম্যাডাম আমাদের কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি সর্বত্র। আমরা তার দর্শন পাই না এটা আমাদের মন্দভাগ্য। ”  বিক্রম কপালে হাত দেয়। 
.
.
        মন্দিরের দরজা ইতিমধ্যেই খুলে গেছে। পুরোহিত মশাই পেতলের কলসিতে করে জল নিয়ে মূল মন্দিরের গর্ভগৃহ পরিস্কার করছেন। একজন ভক্ত পাশের শক্তি বিগ্রহে প্রণাম করছেন। বিক্রমের কানে এল মন্ত্রের শেষ কথাগুলো। 
.
.
               ” …. ধর্মার্থ মোক্ষদা নিত্যং চতুর্বর্গ ফলপ্রদা ॥”  অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এই চতুর্বর্গ ফল তিনি প্রদান করেন। বিক্রমের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। সে দেবলীনাকে ডাকে। 
” দেবলীনা, মন্দির আসা আমাদের সার্থক হয়েছে। ধাঁধার আরো একটা  লাইন সলভড।” 
দেবলীনা ঘুরে তাকায়।” সত্যি ! “
.
.
” হ্যাঁ ।  ‘যাও সেখানে ফলের আশে’ – এই ফল কি ফল জানো ?” 
” আম জাম কলা কত ফল আছে। এদের মধ্যে ধাঁধার ফল বের করা আমার কর্ম নয়।” দেবলীনা জবাব দেয়। 
.
” আরে পাগলী, মাথাটা খাটাবার জন্য। এ ফল সে ফল নয়। এ হলো মানব জীবনের চারটি প্রধান কাম্য ফল। ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এখানে দ্বিতীয় ফল অর্থাৎ অর্থের কথা বলা হয়েছে। জপের মালাতে কয়টা গুটি অর্থাৎ beads থাকে জানো ? “
দেবলীনা মাথা নেড়ে বলে, “হ্যাঁ জানি। একশ আটটি। “
.
.
বিক্রম বলল,” ঠিক। এখানে শিব মন্দিরের সংখ্যা একশো আট। অর্থাৎ এখানেই কোন না কোনো মন্দিরের মধ্যে আছে গুপ্তধন। আর যেটা পেলেই রাজার হালে জীবন কাটানো যাবে। কিন্তু সেই গুপ্তধন বেরকরা আমাদের কাজ নয়। আমাদের কাজ ভূতের রহস্য ফাঁস করে শশাঙ্কবাবুর জীবন বাঁচানো। “
.
.
দেবলীনা বিক্রমের কথাতে সায় দেয়। ” তুমি ঠিকই বলেছ। আর কোনো দিকে লক্ষ্য দিলে হবে না।”
.
               বিক্রম আর দেবলীনা মন্দির হতে বেরিয়ে আসে। মন্দিরের সামনের বিশাল মাঠে হাল্কা হাওয়া ঘাসের মাথাগুলোকে দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা শালিখ নিজেদের মধ্যে ঝগড়ায় ব্যস্ত। মাঠের একপাশে বিশাল বটগাছ তার অসংখ্য ঝুরি নামিয়ে কায়েমি স্বত্ব লাভ করেছে। আর সেই বটের ছায়ায় বসে একটা রাখাল আড়বাঁশিতে সুর তুলেছে – – মন পাগল করা সুর। 
.
.

                                – – চার – – 

                         বিক্রম ও দেবলীনা যখন রায়ভিলাতে ফিরে এল তখন বেলা সাড়ে দশটা বাজে। দরজার সামনেই একটা টোয়েটা ফরচুনার দাঁড়িয়ে। তার মানে কেউ একজন এসেছে এ বাড়িতে। এ বাড়ির সব গাড়িই বাড়ির গ্যারেজে রাখা হয়। আরোহী গাড়ি নিয়ে সোজা মূল দরজা পেরিয়ে ঢুকে যায়। এ গাড়িটি বাইরেই আছে। 
.
         ঘরের ভেতর থেকে  চিৎকার চেঁচামেচি ভেঁসে আসছে। বিক্রম আরো এগিয়ে যায়। দেখে একজন বছর চল্লিশের ভদ্রলোকের সাথে রায়গিন্নীর তুমুল ঝগড়া চলছে।
” আমার ভাগের সব সম্পত্তি আত্মসাৎ করে এখন ভালোমানুষ সাজছ ? বাবা মরার সময় আমাকে তার কাছে যেতে দাওনি। কেন দাওনি তা আমি জানিনা ভেবেছ ? তুমি ধরা পড়ে গেছ মা। তোমার কোনো জারিজুরি আর খাটবে না।”   লোকটি রায়গিন্নীর দিকে তর্জনি তুলে অভিযোগ করে।
.
.
রায়গিন্নী স্বভাবসুলভ শান্ত গলাতেই উত্তর দেন। ” যে অজাত কুজাতের ঘরের মেয়েকে মা বাবার বিনা অনুমতিতে বিয়ে করে তার সঙ্গে আমার কোনোদিন সম্পর্ক ছিল না আর থাকবেও না। তুমি কি ভেবেছ ঐ বেহায়া মেয়েটাকে আমি ঘরে ঢোকাবো। তুমি আমার কাছে মৃত।”
” মা যখন চাননা তখন বারবার এ বাড়িতে এসে অশান্তি করেন কেন দাদা ! অশান্তি করাটা আপনার স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। ”  তিয়াশা এসে শাশুড়ির পক্ষাবলম্বন করে।
.
.
         বোঝা গেল এই আগন্তুকই হলেন শশাঙ্ক শেখর রায়, – – রায়ভিলার বড়বাবু। কিন্তু শশাঙ্কবাবুর এই সামান্য ভুলের জন্য রায়গিন্নী এতটা কঠোর হতে পারেন কিভাবে ?  নিজের আত্মজকে মৃত বলে ঘোষণা করাটা কোনো মায়ের পক্ষে খুব একটা সহজ কাজ নয়।   
         শশাঙ্ক তার মাকে পাশ কাটিয়ে ঘরের ভিতর দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক সেই সময় রায়গিন্নী জলদগম্ভীর সুরে হাঁক ছাড়েন, “যাচ্ছ কোথায় ?”
.
.
” ছোট মাকে দেখতে।” শশাঙ্ক উত্তর দিল।
“এতদিন কোথায় ছিলে তুমি ? তোমার লজ্জ্বা করে না ! অসুস্থ্য মানুষটার একটিবার খবর নেওয়ারও সময় হয়নি তোমার, আবার এসেছ কর্তব্য করতে !”
“ছোটমা যে কার জন্য অসুস্থ্য সেটা সকলেই জানে। স্লোপয়েজনিং করে তিলে তিলে মেরে ফেলছ ছোটমাকে। তোমার আর রথিনের তো জেলে থাকা দরকার। ” শশাঙ্ক প্রত্যুত্তর দেয়।
.
.
এবার রায়গিন্নী ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন ” মারতে হলে ওকে অনেকদিন আগেই মেরে ফেলতাম। মরার উপর খাঁড়ার ঘা দেওয়া আমার অভ্যেসে নেই। তোমার ডাক্তার বৌকে বলে  দিয়ো এক কানাকড়িও আমি বেঁচে থাকতে তোমরা পাবে না। তুমি ঘর দখল নিতে এসেছ। ঘরের দখল তখনি পাবে যখন এ বাড়ি হতে আমার মৃতদেহ বেরোবে। যাও ততদিনের অপেক্ষা কর। “.

…. চলবে