হাস্নোহানা  

নীলোৎপল মন্ডল

মেঘলা আকাশ, একটু আধটু বৃষ্টি হলো তাই ঠান্ডাটা বেশ আছে। এমনিতেই ছুটির দিন তারপর আবার এরকম ওয়েদার। সারাদিন একপ্রকার গৃহবন্দী থাকার পর বাইকটা নিয়ে বের হলো অনির্বাণ। কাজ কিছুই নেই তবুও পরিচিত চা দোকানের আড্ডায় পৌছালে মন ভালো হয়ে যায় তাই আরকি। বন্ধুদের সঙ্গে একটু আড্ডা, মোদি – মমতা থেকে ভারতের ম‍্যাচ আর সহযোগী গোল্ডফ্ল‍্যক ও চা নিজেকে সতেজ রাখার কয়েকটি উপকরণ।

আজ সকাল থেকেই তিয়াস কে খুব মনে পড়ছে অনির। কেন তা সে নিজেও জানে না। দৈনন্দিন জীবনের ট্রেন-স্কুল আর চেনা শহর এই গন্ডির বাইরে তো বের হওয়া হয়নি অনেকদিন তাই হয়তো। ছুটির দিন বলতে প্রিয় গানগুলো শোনা আর সুনিলবাবু উপন্যাসে ডুব দিয়ে থাকা আর মা’কে আবদার করা এটা বানাও সেটা বানাও।

ঠান্ডা আছে তাই স্নানের বালাই নেই একদম। মুখ হাত ধুয়ে নিজের প্রিয় আর্মানির গন্ধটা একটু মেখে নেওয়া ব‍্যাস তা হলেই হলো। এই গন্ধটা খুব প্রিয় অনির্বানের। কোনো এক জন্মদিনে তিয়াস ওকে গিফ্ট করেছিল তারপর থেকে এই পারফিউম টাই ব‍্যাবহার করে আসছে ও।

বেশিদিন তো আর হয়নি তিয়াসের সাথে ওর ব্রেকআপ বড়জোর বছর দেড়েক এর মধ্যেই কি সবকিছু ভুলে যাওয়া যায় ! না সম্ভব নয়। কারণ ওরা একসাথে কোথাও বের হলে তিয়াস বুঝতে পারতো আর খুব আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলতো আমার দেওয়া পারফিউম টা তাই না, আমার খুব ভালো লাগে এটা জানিস, কেমন একটা নেসা আছে এই গন্ধটায়, প্রাক ফাল্গুনে যখন আমার উঠোনে হাস্নোহানার গন্ধে মম করে চারদিক তখন তোর কথা মনে পড়ে , খুব মিস করি তোকে অনি, ইচ্ছে করে তোর কোলে মাথা রেখে আবৃত্তি শুনি।

দুপুরে খিঁচুড়ি আলুভাজা খেয়ে, নিজের টেবিলে বসে ফোন ঘাটতে গিয়ে গ‍্যালারিতে গিয়ে সেই সময়কার ছবিগুলোতে চোখ বোলাচ্ছিল অনি, একটা ছবি অনেক ক্ষন ধরে দেখছিল, মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই মুহূর্ত কি কি কথা হয়েছিল সেসময় সবকিছু। ফেসবুকের বন্ধুতালিকায় ও নেই এখন আর তাই মাঝে মাঝে ওর প্রোফাইলে ঢুকে অনেক ক্ষন সময় কাটায় ,

কি কি পোস্ট করেছে তাতে কে কী কমেন্ট করেছে, কতোগুলো ছেলে ওর প্রোফাইল পিকচারে লাভ রিএক্ট করেছে। এসব দেখতে একদম ইচ্ছে করে না আবার মাঝে মাঝেই এগুলো দেখে, কস্ট যে পায়না এমনটা নয় যথেষ্ট খারাপ লাগে ওর আবার ভালোও লাগে ওর দেওয়া কানের দুল , বড়ো লকেট দেওয়া নেকলেস এমনকি ওর জন্মদিনে দেওয়া ঘড়িটা ও এখোনো ব‍্যাবহার করে। এসব দেখে মনে মনে একটু খুশিও হয়।

আনমনেই পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে বাইক চালাচ্ছিল অনির্বাণ এমন সময় সজোরে ধাক্কা মারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ইলেকট্রনিক রিক্সাকে, পড়ে যায়।খুব একটা লাগেনি, নিজেই উঠে বলতে শুরু -সরি ভাই, একচুয়ালি..

পরিচিত রিকশা চালক সামনে এসে,

– কি দাদা এতো অন‍্যমনস্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন ? লাগেনি তো ?

– না, না আই এ্যম ফাইন।

– ঠিক আছে আস্তে আস্তে বাড়ি যান, বাইরে খুব ঠান্ডা আছে।

চায়ের দোকানে বসে সিগারেটটা ধরিয়ে আবার ফোন নিয়ে সেই পুরোনো ছবির গ‍্যালারিতে চোখ আটকে যায় অনির্বাণ এর। অনেক ক্ষন ধরেই ভেবে চলেছে ফোন করি। বারবার চেষ্টা করেও সফল হলনা, করে উঠতেই পারলোনা। দোটানায় অস্থির, করবো কি করবো না। অতঃপর ভাবলো না ফোন নয় একটা ম‍্যেসেজ করে জিঞ্জেস করা যাক ” কেমন আছো? ”

দু’ তিন বার লিখেও ব‍্যাকস্পেসে মুছে ফেলতে হলো সেন্ট করা হলো না।

কি ঠুনকো এই সম্পর্ক গুলো তাইনা, অভিমান আর ইগো এতো বেশি প্রায়োরিটি পায় যে একদিনের সেই প্রিয় মানুষটিকে একটা ফোন বা ম‍্যেসেজ করার মতো পরিস্থিতিও বেচে থাকে না।

তিন নম্বর সিগারেটটা জ্বালিয়ে নিজের বাইকটির ওপর বসেছে এমন সময় পাস দিয়ে একটা ই’রিকশা পার হয়ে গেল। আবার সেই চিরপরিচিত গন্ধ, সেই আর্মানির পারফিউম। এ সহরে এই পারফিউম এর গন্ধ খুব কম নাকে আসে। আর এতোদিন এখানে আড্ডা দেওয়া হয়েছে কোনোদিন এখানে হাস্নোহানার গন্ধও পাইনি। তাহলে কি তিয়াস !! মনটা এক অদ্ভুত খুশিতে ভরে উঠলো। সত্যি কি ও ? এমনটা ও কি সম্ভব? নানা রকম ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো।

সিগারেটটা জোরে একটান নিয়ে পাশের বন্ধুর হাতে দিয়ে অনি বললো, ভাই তুই টান আমি এক্ষুনি আসছি। স্টিট লাইটগুলোর আলোতে বোঝা যাচ্ছে না কতোগুলো সওয়ারি , বাইকটা ধাওয়া করলো অনির্বাণ। কিছুটা গিয়ে হেডলাইটটা ফ্রন্টে করতেই সোজা গিয়ে মেয়েটির মুখে। চিনতে ভুল হয়নি ওটা তিয়াস’ই । এক্সলেটার নিয়ে আরও সামনে গিয়ে, একটা ডাক, – তিয়াস তুই ?

চোখের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে আলো আঁধারিতে তিয়াস ঠিক চিনে নিল এটা অনির্বাণ এর গলা।

– অনি তুই এখানে ?

– হ‍্যাঁ আমিতো রোজই এই রাস্তা দিয়ে পার হই। তুই এদিকে হঠাৎ।

– একটা টিউসান পড়াতে যাই, কিছুদিন হলো শুরু করেছি।

টোটো থেকে নেমে তিয়াস নির্বাক- নিশ্চুপ।

অনির্বাণ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তিয়াসের চোখে। এ চোখেই তো ও আকাশ দেখতো, কল্পনায় ক‍্যানভাস রচনা করতো আর মনে হতো যেন হারিয়ে গেছি কোনো গহিন অরন্যে কিমবা কোনো নীল জলরাশিতে।

প্রায় একবছর পর দেখা ওদের। চোখের জল বাঁধ মানেনি দুজনেরই। অতঃপর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন।

আজও তিয়াস তার সেই চির পরিচিত ভঙ্গিতে জিঞ্জেস করলো,

– আমার প্রিয় গন্ধটা আজও মাখিস ?

– যেদিন থেকে তুই দিয়েছিল সেদিন থেকেই যে ওটা প্রিয় হয়ে গেছে রে, তাইতো গন্ধটার মতোই তোকেও ভুলতে পারিনি।

তুইও তো সেম পারফিউম, তবে তোর সেই চুলের গন্ধ , উফফ আই এ্যম গো’এ্যনা ম‍্যাড, ইউ আর জাস্ট ইনকম্পারেবল তিয়াস, ইউ আর জাস্ট বিয়ন্ড মাই ইমাজিনেসন।

আকাশ মেঘলা, ঠান্ডা হাওয়া বইছে, গতকাল শহরের এই পার্কের সামনে কতো লোকজন ছিল আজ কেমন সব ফাঁকা। পুস্প প্রদর্শনী ছিল এখানে, ফুলের টবগুলো সব নিয়ে যাওয়া হয়নি এখোনো। একমুঠো হাস্নোহানার গন্ধে চারপাশটা ম’ম করছে, অদ্ভুত এক নেশা আছে এই গন্ধে কেমন যেন পাগল করা এক গন্ধটা অনেকটা তিয়াসের পারফিউমের মতোই ।।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: