হাওড়া জেলার কবি ও কবিতাচর্চা

স্বপন নন্দী

 

বসন্ত রায়

হাওডা সংলগ্ন ভূরসুটের উল্লেখযােগ্য এক কবি বসন্ত রায়। তিনি বিদ্যাপতি উপাধি। অর্জন করেন। তাঁর কাব্যের নাম জানা যায়নি। বিচ্ছিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তার কবিতার দুটি পঙতি

“মন্দ মলয়জ পবন বহ মৃদু ও সুখ কোরুক অন্ত ।

সরবস ধন, দোহার উঁহু জনে কহয়ে রায় বসন্ত।”

সামান্য পঙক্তি দুটি থেকেই বসন্ত রায়ের শব্দ কুশলতা, ছন্দনৈপুণ্য এবং রােমান্টিক। কবিমানসের পরিচয় লক্ষনীয়।

রামদাস আদক

সপ্তদশ শতাব্দীর ধর্মমঙ্গলের একজন উল্লেখযােগ্য কবি রামদাস আদক। ১৩১১ সালের। ‘সাহিত্য সংহতি’-তে মধুসূদন অধিকারী ‘অনাদিমঙ্গলের কবি’ শীর্ষক প্রবন্ধে সর্বপ্রথম রামদাস আদকের পরিচয় উন্মােচন করেন। ১৩৪৫ সনে বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘রামদাসের অনাদিমঙ্গল কাব্য সম্পাদনা করেন।

এই কাব্যের আত্মপরিচয়সূচক অংশে কবির জীবনকথা এবং ধর্মের অনুগ্রহ লাভের সংবাদ বর্ণিত হয়েছে। মঙ্গলকাব্যের রীতি অনুযায়ী। সেই সূত্রে আমরা জানতে পারি ভূরসুট পরগণার রাজা প্রতাপনারায়ণের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত আরামবাগের নিকটবর্তী হায়াৎপুর গ্রামে কবির জন্ম হয়।

হায়াৎপুর বর্তমানে হাওড়া জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে হুগলি জেলার অন্তর্ভুক্ত। হায়াৎপুর হাওড়া-হুগলির সংলগ্নতায় এতটাই নিবিড় যে তাঁকে হাওড়ার কবি বলতে তেমন। দ্বিধা জাগে না। অনাদিমঙ্গল’ থেকে তার পরিচয়ের উদ্ভাস :

“ভূরসুটে রাজা প্রতাপ নারায়ণ।

দানদাতা কল্পতরু কর্ণের সমান।

তাহার রাজত্বে বাস বহুদিন হতে।

পুরুষে পুরুষে চাষ চষি বিধি মতে ৷

যাত্রা সিদ্ধি বন্দিলাম রায় হায়াৎপুরে।

প্রথম প্রচার গীত যাঁহার দুয়ারে।

তিন বান বসু বেদ শাক সুপ্রচার।

ভাদ্র আদ্য কৃষ্ণপক্ষে অষ্ট দিবস তাহার ৷”

এই পরিচয়জ্ঞাপন শ্লোক থেকেই জানা যায় ১৫৮৪ শকে (১৮৬২ খ্রিঃ) ভাদ্রমাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীর দিন এই কাব্য সমাপ্ত হয়। আত্মপরিচয়সূচক পয়ারে কবির জীবনকথা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। জানতে পারি— কবিরা জাতিতে চাষি, কৈবৰ্ত্ত।

চাষবাসই তাদের বৃত্তি ছিল। অল্প বয়সে পিতৃবিয়ােগ। তাই বাল্যে তিনি বিশেষ লেখাপড়া করার সুযােগ পাননি। চৈতন্য সামন্ত নামে এক রাজকর্মচারীর দ্বারা পীড়িত হয়ে কবি কিছুকাল কাছারি ঘরে আটক হয়েছিলেন। পরে তিনি কোনও প্রকারে মুক্তি লাভ করে মাতুলালয়ে পলায়ন

করেন। পথে যেতে এক সিপাই ভয় দেখিয়ে তার মাথায় একটা গুরুভার মােট চাপিয়ে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেল। কবি ভীষণ কষ্ট পেলেন। তাকে দুঃখিত দেখে স্বয়ং ধর্মদেবতা ব্রাহ্মণের বেশে কবিকে কৃপা করলেন; বললেন—“ধৰ্ম্মের সঙ্গীত গাও শুনি কিছু আমি।”

ধর্মদেবতা কালু রায়ের আশীর্বাদে মূখ রামদাসও কবিত্বশক্তি লাভ করলেন। ধর্মঠাকুর দ্বাদশ। অক্ষর মহামন্ত্র কবির দক্ষিণ করতলে লিখে দিলেন। তারপর কবি দেবতার কৃপায় কাব্য। রচনা করে রাজারাম ও অভিরাম নামক দু’জন দোহারের সাহায্যে আসরে দাঁড়িয়ে গান। গেয়ে খ্যাতি অর্জন করলেন।

অনাদিমঙ্গলের আলােকে রামদাস আদকের কাব্যমূল্যায়নে বলা যায়, কাহিনি ও চরিত্রসৃষ্টিতে সংহত রচনা কৌশল, পরিচ্ছন্ন প্রবাহ, ক্লাসিক গঠন এবং স্নিগ্ধ পদলালিত্য এই কাব্যে নিতান্ত দুর্লভ নয়। কাব্যটির ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গিমায় বিন্দুমাত্র প্রাচীনত্বের চিহ্ন নেই।

বরং রচনা প্রকরণে, মার্জিত বুদ্ধি ও সংস্কৃত অলংকারের যেরূপ গাঢ় প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তাতে ভাষা এবং ভাষার প্রামাণিকতা সম্বন্ধে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। | কবি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

সেই পরিবেশে লালিত পালিত হয়ে এরূপ একখানি মার্জিত রুচি ও রীতির কাব্যরচনায় সাফল্য লাভ করেছিলেন। একজন প্রথম শ্রেণির ব্রাহ্মণ কবির মতাে সংস্কৃত ভাষা, পুরাণ ও সাহিত্যে তার যােগ্য অধিকার ছিল। আর ছিল কবির অসাম্প্রদায়িক উদার মনােভাব, ছিল রুচির শুচিতা।

শাহ্ সৈয়দ গরীবুল্লাহ

 

আনুমানিক ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে সমকালীন হুগলি জেলার বালিয়া পরগণার অন্তর্ভুক্ত বর্তমান হাওড়া জেলার হাফেজপুর গ্রামে শাহ সৈয়দ গরীবুল্লাহ-র জন্ম হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন তার জন্ম ১৬৯০ থেকে ১৬৯৫-এর মধ্যে। হাফেজপুর গ্রামটি বর্তমান জগৎবল্লভপুর থানার পাতিহাল গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত।

৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুলতান বিজয়ের পর যেসব আরব মুসলিমরা এদেশে আসেন তাদের মধ্যে অনেকে স্থায়ীভাবে বসবাসও শুরু করেন।

ওই সময় থেকে ভারতীয় ভাবধারার সঙ্গে আরবীয় চিন্তাধারার মেলবন্ধন ঘটে। সেসময় যাঁরা ভারতবর্ষে এসেছিলেন তাঁদের একদল ছিলেন সুফী সম্প্রদায়ের মানুষ। গরীবুল্লাহ জন্মসূত্রে এই সুফী ভাবাদর্শের উত্তরাধিকার ছিলেন।

তার পিতা শাহ্ সৈয়দ আজমােতুল্লাহ ছিলেন একজন উঁচু মাপের সুফী সাধক। আজমমাতুল্লাহের জন্ম এবং বাল্যশিক্ষা বাগদাদ শহরে। এই সুফী সাধক দেশবিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে শেষে হাওড়া জেলার হাফেজপুরে আসেন।

এলাকার মানুষের কাছে তিনি ফুলওয়ারী শাহ ওরফে শাহ দুন্দি নামে পরিচিত হন। হাফেজপুরের আর এক সুফী সাধক মােল্লা মখদুম সাহেবের কন্যার সঙ্গে শাহ দুন্দির বিয়ে হয়। সেই সময় থেকে শাহ দুন্দি হাফেজপুরে। স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

শাহ দুন্দির চারপুত্র এবং এক কন্যা- পাঁচ সন্তানের জ্যেষ্ঠ পুত্র। শাহ সৈয়দ গরীবুল্লাহ। কন্যাটির আসল নাম জানা যায়নি। তবে জনশ্রুতি কন্যাটি এতটাই। অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন যে মাত্র সাত বছর বয়সেই কোরাণ শরীফ কণ্ঠস্থ করে

তিনি হাফেজা হয়েছিলেন। সাত বছর বয়সেই তার মৃত্যু হয়। হাফেজা’ নাম থেকে আলােচিত গ্রামের নাম ‘হাফেজপুর’ হয়েছে বলে অনুমান করা হয়।

পিতার তত্ত্বাবধানে গরীবুল্লাহের বাল্যশিক্ষা হয়। পিতা তাকে পুঁথি সাহিত্য রচনার না অনুপ্রাণিত করেন। পিতার প্রেরণাতেই শাহ গরীবুল্লাহ পুথি রচনায় মনােনিবেশ করে আমীর হামজা (প্রথম খণ্ড) রচনা করেন।

এই পুথিটির ভাষা বাংলা, কিন্তু লিপি ফার্সি। সমসাময়িক সময়ের সাধারণ মানুষ ফার্সি লিপিতে বাংলা লেখা পছন্দ করতেন। সুতরাং। পুথিটি জনসমাদৃত হয়েছিল। আমীর হামজা’ পুথিতে কবির আত্মপরিচয় হামজার কলমে

“আমি অতি মূখমতি কিছু নাহি জানি

পারিনু এড়াইতে লােকের নেহের

পীর শাহা গরিবুল্লা কবিতার গুরু

আমার শায়েরি নয় কেতাব সমান,

বালিয়া হাফেজপুর যাহার মােকাম।”

গরীবুল্লাহ কয়টি কাব্য রচনা করেন সে সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে। ড. মুহম্মদ এনামুল হক মনে করেন যে তিনি তিনটি কাব্য রচনা করেন ইউছুপ জোলায়খা, সত্যপীর ও জঙ্গনামা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র মতে, গরীবুল্লাহ-র পাঁচখানি কাব্যগ্রন্থ;

এগুলি হল— ইউছুপ জোলায়খা, জঙ্গনামা, সােনাভান, সত্যপীরের পুঁথি ও আমীর হামজা।  ইউছুপ জোয়ালখা’র উচ্চারণগত কারণে সহজ পরিচিতি ইউসুফ জোলেখা। এই কাব্যের অন্য একটি নাম মােহাব্বত নামা’।

পঞ্চদশ শতকে শাহ মুহম্মদ সগীর লেখেন ইউসুফ জোলেখা’। জোলেখা বৃত্তান্তের উৎস বাইবেল, কোরাণ এবং ফিরদৌসীর রচনা। সম্ভবত গরীবুল্লাহ উক্ত উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

জোলেখা কীভাবে নিজের স্বামীকে অস্বীকার করে ইউসুফের কাছে আত্মনিবেদন করেছিল তারই পরিচয় হল এই কাব্যের মূল কথাবস্তু। কাহিনির বক্তা পীরবদর ও শ্রোতা বড়খা গাজী।

এই কাব্যরচনায় কবির নিজস্বতা প্রতিফলিত হয়েছে সমকালের সামাজিক অবক্ষয়, নরনারীর সম্পর্ক, আর্থনীতিক পরিস্থিতি এবং ঈশ্বর চেতনায়। তবে মহম্মদ সগীরের মতাে ততটা উৎকর্ষের দাবিদার নন গরীবুল্লাহ। আলােচ্য কাব্য থেকে কয়েকটি পঙক্তি :

“বদর বলেন শুন বরখা মেরা ভাই।

আমার সালাম মর্দ তােমাকে জানাই।

ফকিরী আজব চীজ সমঝাই তােমারে।।

মরিয়া না মরে ফকির দুনিয়া ভিতরে।”

দক্ষিণ রাঢ়ের মঙ্গলকাব্যের প্রথামতাে তিনি দৈব আদেশে কাব্যরচনায় প্রবৃত্ত হন।

“আল্লার দরগায় বদন নােঙাইয়া মাথা

কহিতে লাগিল ইউসুফ-জোলেখা কথা।

মরমিয়া সুফী সাধকের কবিচিত্তে এক ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তন। তিনি লেখেন—

“আসরে বসিয়া যত হিন্দু মুসলমান।

সবাকার তরে আল্লা হও মেঘবান।”

সম্প্রীতির পত্রপুটে এ এক অসামান্য আবেদন।

‘জঙ্গনামা’ কাব্যের উৎস হজরত মহম্মদের কাল্পনিক যুদ্ধাভিযান। কাব্যটির নামান্তর হােসেনমঙ্গল। ফতেমার পুত্র হাসান-হােসেনের কারবালার যুদ্ধ নিয়ে এই কাব্য রচিত।

‘হােসেনমঙ্গল’ নামকরণের মধ্যে হিন্দুধর্মের ভাবনাটি কাজ করেছে ‘মঙ্গল’ শব্দের প্রয়ােগে। কারবালা যুদ্ধ প্রধান প্রসঙ্গ হলেও যুদ্ধের ঘনঘটা নয়, বরং মানবিক চরিত্রের মাহাত্ম্য এখানে। বেশি করে উচ্চারিত।| ‘সােনাভান’ একটি যুদ্ধসম্পর্কিত কাব্য।

সােনাভান এক নারীর নাম। হজরত আলির পুত্র মহাবীর হানিফের সঙ্গে সােনাভানের যুদ্ধ কাহিনি এই কাব্যের মুখ্য উপজীব্য। ধর্মপ্রতিষ্ঠার জন্য এই যুদ্ধ কিন্তু পরবর্তীকালে উভয়ের মধ্যে ভালােবাসার সম্পর্ক ঘটে।

হানিফের তিন পত্নী জৈগুন, মল্লিকা, অমর্তবানকে নিয়ে উপকাহিনি তৈরি হয়েছে। বিশুদ্ধ প্রেমকে প্রতিষ্ঠিত করা তাঁর কাব্যের মুখ্য উদ্দেশ্য মনে হলেও দেহবর্ণনার স্কুল ছবির বহুল ব্যবহার হয়েছে। কাব্যভাষা কখনাে চলিতরীতি আশ্রিত, কখনাে হিন্দি।

মিশ্রভাষারীতির প্রয়ােগ এই কাব্যের বিশেষ বৈভব, যা পরবর্তীকালে ভারতচন্দ্রে লক্ষ করা যায়। ব্যক্তিগত জীবনে সুফী সাধক হয়েও পালনীয় ধর্ম ইসলাম হলেও কবিদের সহজাত বােধ থেকে তিনি ধর্ম নিরপেক্ষ।

ইহাকে মারিতে পারে কে আছে দুনিয়ায়।” গরীবুল্লাহ-র ‘সত্যপীরের পাঁচালী’ মদনকামদেব পালা নামেও পরিচিত।

হিন্দুদের দেবতা যিনি সত্যের প্রতীক বলে চিহ্নিত সেই নারায়ণ এবং ইসলামী সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে পীর—এই দুই বিপরীত ধর্মীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন থেকে ‘সত্যপীর’। সত্যপীরকে সমন্বিত করে মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্য লেখা হয়েছে একাধিক।

ভারতচন্দ্রও লিখেছেন সত্যপীরের পাঁচালী (১৭৩৮ খ্রিঃ)। উপকাহিনি ও খণ্ডচিত্রে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রভাব লক্ষ করা যায় । অলৌকিক বিষয়ের বাহুল্য কাব্যের শিল্পরসকে লঙ্ঘিত করেছে বলে মনে হয়।

আমীর হামজা (প্রথম খণ্ড) শৌর্য-বীর্যসূচক এক কাব্য। দেবতা ও দানবের যুদ্ধ বর্ণনায়। অস্বাভাবিকত্ব, অতিলৌকিকতা মুখ্যতা লাভ করায় চরিত্রগুলি বাস্তবের আনুগত্য হারিয়েছে।

বীরত্বের ঘটনা প্রকাশ নিয়ে তিনি সময় বাস্তবিকতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন। কাব্যটিতে প্রেমের কথা আছে, বীরত্বের কথা আছে, কিন্তু প্রকাশ-পরিবেশনে তিনি সংযমের সীমা থেকে স্খলিত হয়ে পড়েছেন। তবে এই ত্রুটি সেকালের পক্ষে অমার্জনীয় নয়।

 

কবি , গবেষক স্বপন নন্দী   // যোগাযোগ : 7699249928

Print Friendly, PDF & Email

One Reply to “হাওড়া জেলার কবি ও কবিতাচর্চা”

  1. কবি শ্যামল মান্না হাওড়া জেলার একজন কবি প্রকাশিত কবিতা বই -হৃদয় পাখির গান ( 1996),শতাব্দী শেষের কবিতা (2000)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *