হাওড়া তীর্থে মনীষার দীপ্তি

স্বপন নন্দী

যে সময়ে কলকাতার জন্মের তিনশাে বছর মহাকলরবে পালিত হচ্ছিল, একেবারে সংলগ্ন হয়ে থাকা হাওড়া কোনাে এক অভিমানে যেন দুখিনী জননী। তখন একটি মাত্র মুখ্য অযােজন রবীন্দ্র সেতু দিয়ে কলকাতার সঙ্গে হাওড়ার সংযােগ-সম্পর্ক যেমন বেড়েছে, তেমনই হয়েছে কলকাতাকে আরাে চলমান করতে হাওড়ার উদ্যোগ।

হাওড়ার ইতিহাসবিদ গবেষকগণ তখনই আবিষ্কার করে বসেছেন যে, হাওড়ার বয়স পাঁচশাে বছর। হাওডার পাশে কলকাতাকে যখন রাখা হচ্ছে, কলকাতা ভেসে যাচ্ছে অধিকতর আলােক-অসামান্যতায়। আর হাওড়ার ভাগ্যে জুটেছে ‘কুলি টাউন’-এর ঔপনিবেশিক নিন্দা।

সে-নিন্দার কথা আমরা মেনে নেবাে না। সাহিত্যের ইতিহাস আমাদের একথাই জানিয়ে দেয়, হাওড়া তীর্থে এসে কতাে মনীষী তাদের কর্মজীবন ও সাহিত্যসংস্কৃতির জীবনকে ঋদ্ধ করেছেন। সান্নিধ্য বিনিময়ে পুষ্ট হয়েছে হাওড়ার সংস্কৃতি।

হাওড়া জেলার কবি ও কবিতাচর্চা নামাঙ্কিত এই গ্রন্থে কবিদের কালানুক্রমিক ভূমিকা থাকছে। কবিতা ছাড়া সংস্কৃতির অন্য অন্য দিকের যারা ব্যক্তিত্বময় তাদের নামটুকু মাত্র দুইয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে অনিবার্য প্রয়ােজনে যাঁরা এই হাওড়াতে এসেছেন, অস্থায়ীভাবে থেকেছেন, যাদের পবিত্র ভূমিকার স্পর্শে হাওড়াতীর্থ পুণ্যময় হয়ে উঠেছে, তাদের কথা।

 ‘তত্ত্ববােধিনী পত্রিকার সম্পাদক কবি অক্ষয়কুমার দত্ত হাওড়ার বালিতে একটি বাড়ি করেছিলেন। বাড়িটির নাম ‘শােভন। উদ্দেশ্য— এখানে এসে মাঝে মাঝে থাকবেন। অনেকটা অবসর বিনােদনের জন্য।

১৮৭০ তে এই বাড়িতে বসেই তিনি ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় এবং চারুপাঠ’ লেখেন। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুদিন হাওড়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।

অসুস্থ মধুসূদন সপরিবারে কিছুদিন বাস করেছিলেন উত্তরপাড়ার জমিদারদের লাইব্রেরিতে। শিয়াখালা থেকে পায়ে হেঁটে সালকিয়ার বাঁধাঘাটে এসে নৌকা করে গঙ্গা পার হয়ে বিদ্যাসাগর বড়বাজারে যেতেন। আচার্য কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য কালীবাবুর বাজারে বাস করতেন।

রেভারেণ্ড কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায় শিবপুর বিশপস্ কলেজে (বি.ই. কলেজ) কিছুকাল অধ্যাপনা করেছিলেন। এই কলেজের ছাত্র ছিলেন যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। অক্ষয় কুমার দত্তের পৌত্র সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের শ্বশুরবাড়ি ছিল সালকিয়ায়। তিনি বাঙালবাবুর (রামরতন বসুর) জামাই ছিলেন। মােহিতলাল মজুমদার ঢাকা থেকে কলকাতায় চলে আসার পর বাগনানে বসবাস শুরু করেন।

ডঃ কালিদাস নাগ বড়াে বােনের বাড়িতে থেকে শিবপুর দীনবন্ধু ইনস্টিটিউশন থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। কবি গিরিজাকুমার বসু, তমাললতা বসু, যামিনীকান্ত সােম প্রমুখ এ শহরে বাস করেছিলেন।

ভাষাতাত্ত্বিক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হাওড়া জিলা স্কুল থেকে পরীক্ষায় পাশ করে সংস্কৃতে বৃত্তিলাভ করেন। লােকসাহিত্যের প্রখ্যাত গবেষক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন হাওড়া জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।

কয়েকটি সূত্র থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ হাওড়ায় একাধিকার এসেছেন। ১৮৬৬তে সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের বিয়েতে রবীন্দ্রনাথ নিত-বর। বয়স ছয়। বিয়ে হচ্ছে বেতড়ের মহেশ ঘােষ লেনের হরদেব চাটুজ্জ্যের মেয়ে নৃপময়ীর সঙ্গে। সুতরাং বিয়ে উপলক্ষে নিতবর হয়ে বেতড়ে আসা। ১৮৬৮তে আরাে একবার সেই বেতড়-সাঁতরাগাছিতে আসা।

কবির ন’দাদা বীরেন্দ্রনাথের বিয়ে নৃপময়ীর বােন প্রফুল্লময়ীর সঙ্গে। নিত-বর সেই রবীন্দ্রনাথ। সুতরাং জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে বেডের হরদেববাবর আত্মীয়তা সম্পর্কের জেরে রবীন্দ্রনাথের বহুবার হাওড়ায় আসা। | ১৮৮২ সালে রবীন্দ্রনাথ হাওড়া এলেন বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে। হাওড়ার পঞ্চাননতলার।

বাসাবাড়িতে। আনন্দমঠ পড়ে অভিভূত রবীন্দ্রনাথের বঙ্কিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য আসা। ১৯২৬-এ একবার রবীন্দ্রনাথ শিবপুরে এসেছিলেন এক সংগীত সভায় প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করতে।

অনেকের অনুরােধে রবীন্দ্রনাথ সেই সভায় গানও গেয়েছিলেন। হাওড়া জেলার সঙ্গে ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের একটা সম্পর্ক রয়েছে। সুনীতিকুমার ‘জীবনকথা’ গ্রন্থে লিখেছেন ?

“আমার পিতামহ ভূমিষ্ঠ হন, সিংটি-শিবপুর-সােনাগাছি গাঁয়ে তাঁর মাতুলালয়ে উত্তরকালে ‘দেশ’ বলতে ছেলে বয়সে আমরা দামােদরতীরের এই শিবপুর সােনাগাছিকেই বুঝতাম।” জীবনকথায় আরাে উল্লেখ থাকে যে শিবপুর সােনাগাছি গ্রামেই বাবার মামার বাড়ির সূত্রে ধরেই তিনি সিংটি-শিবপুরে অবস্থিত মিডিল ইংলিশ স্কুলে (বর্তমানে সিংটি নিম্নবুনিয়াদী স্কুল) কিছুদিন পড়াশুনাও করেছেন।

আরেকটি সূত্রে তিনি শহর-হাওড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। হাওড়ার শিবপুরে মামাবাড়িতে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। | বঙ্কিমচন্দ্র ও শরৎচন্দ্রের জন্ম হাওড়ায় হয়নি। কেউই হাওড়ার লােক নন। কিন্তু হাওড়ার সঙ্গে তাদের যােগাযােগটা ছিল ঘনিষ্ঠ।

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র তিনবার হাওড়ায় বদলি হন ১৮৮১, ১৮৮৩ এবং ১৮৮৬-তে। দ্বিতীয় বদলির সময় পঞ্চাননতলার সেই বাসাবাড়িটায় থাকতেন যেখানে বর্তমানে বঙ্কিমউদ্যান রয়েছে এবং বঙ্কিমমেলা হয়।

তৃতীয়বার কলকাতার বৌবাজারে প্রতাপ চ্যাটার্জি লেনে নতুন বাড়িতে থাকতেন। সেইসময়ের লেখাগুলিতে হাওড়ার জনমানসের প্রতিফলন ঘটলেও ঘটতে পারে।

 হুগলির দেবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করা শরৎচন্দ্র ১৯১৪ সালের মাঝামাঝি একসময়ে বাজে শিবপুরে নীলকমল কুণ্ডু লেনে এলেন সস্ত্রীক। আত্মীয়তার সূত্রে এই আসা হলেও শেষ পর্যন্ত বাজেশিবপুরে একটি পুরােনাে বাড়িতে উঠে এলেন এবং এখানে প্রায় ন-বছর। থেকে গেলেন। তার কয়েকটা উপন্যাস লেখা হয়েছে এই অবস্থানে এবং সময়পর্বে।

এই সময়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। তিনি জেলা কংগ্রেসের সভাপতি এবং মিউনিসিপ্যাল বাের্ডের সভাপতি হন। হাওড়ার সান্নিধ্য শরৎচন্দ্রকে হয়তাে ঋদ্ধ  করেছিল আর সেই ঋদ্ধতার সূত্রে রূপনারায়ণের তীরে সামতাবেড় গ্রামে তিনি নিজ বসতবাড়ি তৈরি করেছিলেন। তার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য নিবর্তী পানিত্রাসে শরৎমেলা

করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম নদিয়ার শান্তিপুরে কিন্তু তার অনেকটা সময় কেটেছে হাওড়ায়। তিনি হাওড়া জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। হাওড়ার সারস্বত সমাজ তার নিকট হয়ে গেলেন। কবি জীবনানন্দ দাশ হাওড়া বিজয়কৃষ্ণঃ গার্লস কলেজে অধ্যাপনা করে গেছেন কিছুদিনের জন্য। সেটাও আমাদের পরম প্রাপ্তি।

 নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ি সাঁতরাগাছির মানুষ। এখানে তার পৈতৃক ভিটা। বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়ের কিংবদন্তী নায়িকা কাননদেবীও (১৯১৬-১৯৯২) জন্মগ্রহণ করেন হাওড়ায়। শিবপুরে জন্ম নারায়ণ দেবনাথের। নন্টে ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদা, বাটল দ্য গ্রেট-এর মহান স্রষ্টা তিনি।

 অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীরও (১৮৯৯-১৯৬১) কয়েকটা বছর কেটেছিল হাওড়ায়। তিনশাে-রও অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও তিনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি। ১৯২০-তে স্টার থিয়েটারে দুর্গেশনন্দিনী’ নাটকে তুলসী চক্রবর্তী প্রথম অভিনয় করার সুযােগ পান।

চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় ১৯৩২-এ ‘পুনর্জন্ম’ ছবিতে। তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয়ে অনুপ্রাণিত হাওড়ার গ্রুপ থিয়েটারগুলি। হাওড়ার রাজবল্লভ সাহা লেনের পাশের গলিতে অত্যন্ত দারিদ্রতার সঙ্গে নিজবাড়িতে থাকতেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

 আর এক চলচ্চিত্র অভিনেতা বিভু ভট্টাচার্য (প্রথমে মাস্টার বিভু) থাকতেন রামরাজাতলায়। সংগীতশিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও পান্নালাল ভট্টাচার্য জন্মস্থান বেতড়। তারা দু’জনে বালিতে বসবাস করতেন। সনৎ সিংহও থাকতেন বালিতে।

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় থাকতেন সালকিয়ায়। প্রখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হাওড়া জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। শম্পা আবৃত্তি উৎসবের এক সভায় তিনি হাওড়ার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে হাওড়ার প্রতি তার মুগ্ধতার কথা ব্যক্ত করেছেন।

হাওড়ার সারস্বতচর্চায় নিবিড় বুধমণ্ডলীর মধ্যে কথাশিল্পী শংকর, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, নিমাইসাধন বসু, সুভাষ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রণয়নে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং কিংবদন্তী। বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষকে বিস্তৃতভাবে তথ্যসম্ভারে তুলে ধরেছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু।

তাঁর প্রতিটি গদ্যও মনে হয় কবিতা। সমকালের ইতিহাস এবং বিবেকানন্দ চর্চায় মগ্ন ছিলেন নিমাইসাধন বসু। লােকসংস্কৃতির গবেষক সুভাষ বন্দ্যোপাধ্যায়। যেমন রত্নপ্রসবিনী হয়ে হাওড়া লালনে সৃজনে মাতৃত্বের শ্রেষ্ঠ গৌরব অর্জন করে নিচ্ছে, তেমনই তার বিস্তৃত অঙ্কে স্বাগত আশ্রয় মিলেছে কত না বরিষ্ঠ সারস্বতের।।

 

গবেষক ও কবি  স্বপন নন্দী //    যোগাযোগ :  7699249928

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *