সু বর্ণে তপ ন – দিগন্তে আলাের ঝলকানি

কাননবালা সরকার

তপন বাগচী গবেষক, লেখক, ছড়াকার, গীতিকার – নানা পরিচয় তাঁর। এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে। যত দূর মনে পড়ে কবিয়াল বিজয় সরকার স্মরণে আয়ােজিত একটি অনুষ্ঠানে আমি গান গাইতে গিয়েছিলাম আর তিনি ছিলেন সে অনুষ্ঠানের একজন আলােচক। তিনি আগ্রহভরে আমার গান শুনলেন সেদিন।

আমিও তার আলােচনা শুনলাম। পরিচয়টা হয় মূলত আমার নাতনি নতুন প্রজন্মের শিল্পী শান্তা সরকারের মাধ্যমে। তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে আমি মুগ্ধ হলাম, আমার প্রতি তার সৌজন্যবোেধ ও সম্মান-প্রদর্শন আমাকে অভিভূত করল। আমি লেখাপড়ার মানুষ নই, তাই তাঁর কাজের বিস্তৃতি সম্পর্কে আমার কোনও জানাশােনা ছিল না। কিন্তু প্রথম পরিচয়ে এটুকু বুঝে নিলাম তিনি বড় কাজের মানুষ।

এরপর দেখা হয় বাংলা একাডেমি আয়ােজিত ‘পিঠা উৎসব ১৪২৩’-এ। তখন বেশ আলাপচারিতা হয়। বাংলা একাডেমিতে তার অফিসকক্ষে ইতিউতি বই-পত্রিকা ছড়ানাে, টেবিলে খােলা-আধখােলা বই কোনটার পাতা ভাঁজ করা কোনটাতে বুক মার্কার দিয়ে মার্ক করে রাখা, টেবিলে সাদা কাগজে একটু আধটু নােট নেওয়া।

সুদীর্ঘ সংগীতজীবনে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী অনেক মানুষের সঙ্গেই আমার পরিচয় ঘটেছে, কিন্তু তপন বাগচীকে আমি একজন সত্যিকার গবেষক হিসাবে জেনেছি। বাংলা গান সম্পর্কে অর্জিত গভীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ এই ব্যক্তি কী সাধারণ জীবনযাপন করেন !

আমি জেনেছি, বাংলা গান, মহান কণ্ঠশিল্পী-গীতিকার-সুরকারগণের সম্পর্কে খোঁজ পেলেই তিনি সেই পুস্তকখানি সংগ্রহ করেন, তা সে দেশ-বিদেশ যেখান থেকেই হােক না কেন। ব্যক্তিগত ফোন নম্বর আদানপ্রদান হয় তার সঙ্গে। আমি ধীরে ধীরে হয়ে উঠি তপন বাগচী’র দিদি, কখনও গবেষণার প্রয়ােজনে কখনও শুধু সৌজন্য আলােচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে আমাদের সম্পর্ক।

এর মধ্যে একদিন ফোন করে আমার গুরু স্বর্গীয় কানাইলাল শীল সম্পর্কে কিছু কাজ করবেন বলে জানান। আমি আমার স্মরণে যা ছিল এবং যার কাছে নির্ভরযােগ্য যে তথ্য পেয়েছি চেষ্টা করেছি সংগ্রহ করে দেওয়ার। আমি দেখেছি আমার গুরুর অনেক কথা ও সুর সংগৃহীত বা অন্যদের নামে প্রচারিত হয়ে যাচ্ছে, অথচ এসব গানের সঙ্গে জড়িত মানুষেরা কেউ কোনও কথা বলছে না।

আবার কেউ কেউ অন্য’র কথা ও সুরকে কানাইলাল শীলের বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। দুটো কিন্তু একই ধরনের গর্হিত কাজ। এতে কোনভাবেই কানাইলাল শীলকে বড় করা হয় না; যা হয় তাকে ইতিহাস বিকৃতি বলা যায়।

মহান মানুষরা তাদের কর্মের মধ্য দিয়েই আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাই, তাদের নামের সঙ্গে অন্যের কাজ জুড়ে দিয়ে বড় করতে । চাওয়া কোনভাবেই কাম্য নয়। এ কথা অন্যান্য মহৎ শিল্পী সুরকারের বেলা, সুতরাং তপন বাগচী এ ধরনের একটি কাজে হাত দিয়ে গুরুর প্রতি আমার দা প্রকাশের কিছুটা হলেও সুযােগ করে দিয়েছেন।

এজন্য তিনি শুধু ধন্যবাদ নয়, আমার কৃতজ্ঞতাও পাবেন। শুধু তাই শীল নন তার গবেষণার বিষয় আব্বাসউদ্দীন, আব্দুল আলীম, জসীমউদ্দীন স… পণ্ডিত রামকানাই দাশ-সহ আরও কত কত মহান মানুষ। প্রায়শ আমি সংসাত সংগীত-বিষয়ক পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা দেখি। কোনও লেখায় তিনি কারাে দাবির পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। আবার কোনও লেখায় বাংলা গানের গতি-প্রকতি ইতিহাস সম্পর্কে বিশদ আলােচনা করেন। আমি পড়ি আর মুগ্ধ হই। |

হঠাৎ একদিন তার ফোন- দিদি, আমি তপন। এন.টি.ভি.’র ‘তারায় তারায় রচিত’ স্লটে কবিয়াল বিজয় সরকারকে নিয়ে একটা অনুষ্ঠান হবে। সেখানে আপনাকে ডাকবে, আসতে হবে কিন্তু। যথাসময়ে চ্যানেল থেকে প্রযােজনা-কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে ফোনে যােগাযােগ করে। নির্ধারিত দিনে উপস্থিত হই। মেক-আপ রুম থেকেই তার সঙ্গে আমার আলােচনা শুরু হয় বিজয় সরকারকে নিয়ে।

সেই আলােচনার ধারাবাহিকতাই যেন আমরা টেনে নিয়ে যাই স্টুডিও পর্যন্ত। কবিয়াল বিজয় সরকার সম্পর্কে তিনি অগাধ জ্ঞানের ধারক, তার কইলজে (কলিজা) কাটা বিচ্ছেদ সম্পর্কে তিনি আলােচনা করলেন। তার মূল্যায়ন ছিল যথাযথ, যুক্তিত, পরিমিত এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ। আমি শিল্পী মানুষ, একরকম তােতাপাখিই বলা যায়, গীতিকারের কথা আর সুরকারের সুর আমি গলায় আটকাতে পারি।

মূল্যায়ন করা বা ইতিহাস-সম্মত যুক্তিযুক্ত কথা আমার আর কতটুকু জানা! সেদিনের অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আমি কবিয়াল বিজয় সরকার সম্পর্কে নানা অজানা কথা তাঁর কাছ থেকে জানলাম। তার পাশে বসে গান শুনিয়ে, কথা শুনে আমি সমৃদ্ধ হলাম।

ফেসবুকে থেকে নিয়ে আমার নাতনি শান্তা সরকার মাঝে-মাঝে তপন বাগচীর লেখা গানের কথা আমাকে পড়ে শােনায়। তার গানের কথার অনেক ওজন, ভাবের গভীরতা অনেক, শব্দের মাধুর্য অলংকারের অধিক সাবলীল। তার গান ফকির আলমগীর, কিরণচন্দ্র রায়, চন্দনা মজুমদার, অণিমা মুক্তি গােমেজ, শ্যামলকুমার পাল-সহ আমার নাতনিও কয়েকটি গান বাংলাদেশ বেতারে পরিবেশন করেছে।

আমার অবশ্য এখনও সুযােগ হয়নি। আমার দুর্ভাগ্য আমি এতদিন সংগীতচর্চা করেও সুর করার জ্ঞান অর্জন করতে পারিনি। হয়তাে ভবিষ্যতে কোনও সুরকার তপন বাগচীর গান আমার গলায় তুলে দেবেন, সেই আশায় আছি।

তিনি গান লিখতে শুরু করেছেন খুব বেশি দিন নয়। আমি লেখাপড়ার মানুষ হলেও নানা গুণীর সাথে মিশে জেনেছি অতীতে অনেক গুণী মানুষ জীবনের বেশিরভাগ ’ সময় পার করে কলম ধরেছিলেন। তপন বাগচী কলম আগেই ধরেছেন তবে গানের কথা লেখায় হাত দিয়েছেন খুব সম্প্রতি।

আমি তপন বাগচীর লেখায় আলাের ঝলকানি দেখতে পাই। তিনি গানের কথা দিয়েই হয়তাে অনেক দূর যাবেন। এটুকুও মনে করি, এই ব্যক্তি এবং তার গান হয়তাে একদিন মানুষের গবেষণার বিষয় হবে।

আমি তপন বাগচীর মধ্যে দিগন্তে আলাের ঝলকানি আবিষ্কার করেছি, বয়সের পরিমাপে ভিন্ন হলেও গানের কথায় সে দিগন্ত পশ্চিমে হেলে পড়া আলাে নয়, পূর্বে উদীয়মান আলাে । বয়সে আমার অনেক ছােট হলেও আমি তাকে ‘দাদা’ বলেই সম্বােধন করি।

মানুষ হিসাবেও তিনি অসাধারণ। মানুষের মূল্যায়নে তিনি যার যতটুকু প্রাপ্য ততটুকু দিতে কুণ্ঠা বােধ করেন না। জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলেন সৌজন্যপূর্ণ ভাষায়। মহৎ মানুষদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অনুসরণীয়। পড়ার নেশা তাঁর মধ্যে প্রবল, প্রকৃত তথ্য জানার আগ্রহে যেন গােয়েন্দা।

মানুষকে সহযােগিতা করার এক অসাধারণ মন আছে তার, কেউ কোনও সহযােগিতা চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে সেই বিষয়ে তিনি মগ্ন হয়ে যান, যেন এ তার নিজের কাজ। অথচ সেই নেশাটাই প্রায়শ তাকে কষ্ট দেয়। বাঙালির জীবনী-সাহিত্য এবং গবেষণা পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, অতিকথন এবং কিংবদন্তীতে পূর্ণ হয়ে যায় কখনাে-সখনাে।

অথচ গবেষণা বিষয়ে তিনি শতভাগ উজাড় করে দেন নিজেকে, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতার মধ্য দিয়ে গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যান, এ গুণ তাকে অনন্য মানুষ হিসাবে ইতােমধ্যে প্রতিষ্ঠা দিয়ে ফেলেছে।

মানুষ দোষ-গুণের ঊর্ধ্বে নয়, তপন বাগচীও নন, কিন্তু সেই সীমাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে জীবন যাপন যিনি করতে পারেন তিনিই প্রকৃত মানুষ হিসাবে পরিগণিত হন। তপন বাগচী সেই সীমার পরিধি জানেন, সীমার মধ্যেই তিনি আছেন, এভাবেই তিনি জীবনের পঞ্চাশটি বছর অতিক্রম করেছেন। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হােক তার এই অভিযাত্রা।

তপন বাগচীর কিছু কিছু দেশাত্মবােধক, ঋতুসংক্রান্ত, বিচ্ছেদ গানের কথা আমি শুনেছি। অসাধারণ তার কথা, পরিণত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, বিস্তৃত তার কল্পনাশক্তি – | এসব কথায় সুর বসলে কি দারুণ গানেরই না সৃষ্টি হবে ! তার পঞ্চাশতম জন্মদিনে আশীর্বাদ করি দেশাত্মবােধক গানগুলাে গীত হােক বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির স্থায়িত্ব’র সমান্তরালে।

ঋতুর পরিচয়বাহী কবিগুরুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের পাশাপাশি শিল্পীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হােক, হাজারাে ব্যথিত হৃদয়ের প্রিয়-প্রেয়সীর আশ্রয় হােক তার বিচ্ছেদ | গান। আমি আশীর্বাদ করি তিনি অদূর ভবিষ্যতে ক্ষণজন্মা মানুষ হিসাবে বাঙালির হৃদয় | অধিকার করুন। তার পঞ্চাশতম জন্মদিনে আমার শুভেচ্ছা রইল।

 

( প্রবন্ধটি বাক্প্রতিমা  সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত )

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: