সাহিত্য খেলা – যাকারিয়া আহমদ

দক্ষ কাঠমিস্ত্রির হাতে যে কাঠই আসুক, সেটা সোজা হলে যেমন তা দিয়ে কোনো-না -কোনো বস্তু তৈরি হয়, তেমনি বাঁকা হলেও কাজ হয়। তার সহযোগীর হাতে এমন হয় না। এমন হয় না এর মানে এই নয় যে, কোনোকিছুই হয় না। অনেককিছুই হয়। সুন্দর আর অসুন্দর, ভালো আর মন্দ এইটুকুই যা ফারাক। বড় কাঠমিস্ত্রির হাতে যে কোনো কাঠ বশ মানে, এক করতে আর হয় না।

এই মিস্ত্রিও প্রথমে বড় ছিলেন না। সাধনা করে বা কাঠ কাটতে কাটতে যোগালি থেকে মিস্ত্রি হয়েছেন। কথাগুলো অন্যভাবে দেখি। ছোট-বড় সকলের খেলা করতে ইচ্ছা করে। আর না পারলে খেলা উপভোগ করে। খেলার মাঠের চারপাশে বসতে দাঁড়াতে কারো জন্যে মানা নেই। সকলে আসতে পারে, বসতে পারে। মাঠে খেলোয়াড়দের যেমন উদ্দেশ্য আনন্দ, তেমনি দর্শকের মনেও আনন্দ।

কাউকে সন্তুষ্টকরণ নয় এবং কোনোকিছুর উপার্জন নয়। আসলে উপার্জনের নিয়তে যারা খেলা করে তাদের খেলা খেলা নয়, জুয়াখেলা। যারা এ মাঠে উপার্জনের উদ্দেশ্যে খেলেছেন এরা কিছু টাকা পয়সা কামাই করে ঝরে পড়েছেন।

আবার যারা নিজে আনন্দ পেতে এবং অন্যদের আনন্দ দিতে নেমেছেন তারা অনেকে না খেয়েও মরেছেন। এ দুয়ের ভেতরে আকাশ-পাতাল ফারাক আছে, কিছু লেখক তা ভুলে গিয়েই নিজে খেলা না করে অন্যদের জন্য খেলনা তৈরি করতে বসেন।

এসব দিয়ে পাঠককে সন্তুষ্ট করা যায় কিন্তু লেখকের আত্মা তুষ্ট হয় না। কাউকে খুশি করতে গিয়ে যে সাহিত্য তৈরি হয় এই সাহিত্য স্বধর্ম হারায়। যারা মাঠে খেলে তারা সবাই কিন্তু গোল দেয় না, দেয় কোনো একজন বা দু’জন। এর মানে এই নয় যে, গোলকারী শুধু খেলবে অন্যরা নয়।

মাঠে খেলা করার অধিকার সকলের আছে। সাহিত্যও তেমন, এখানে সকলের খেলা করার অধিকার আছে। যেমন উচ্চ বংশের মানুষের তেমনি ইতর মানুষের। সাহিত্য কারো একার পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। এই খেলাতে কিন্তু কেউ কেউ ভয় পায়। এই ভয়টা সবাইকে খেলা থেকে দূরে রাখে।

আচ্ছা আপনি বেলুন উড়িয়েছেন। দেখেছেন, সামান্য বাতাস নিয়ে বেলুনটা কতোদূর যায়? যার থেকে বেলুন বাতাস পেল, আবার তার হাতে বাধা সুতায় বন্ধি তবু সে অনেকদূর গতায়াত করতে ইচ্ছুক। বাংলা সাহিত্যও তেমন, বাঙালির হাতে লালিত হয়ে পৃথিবীর দশদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ইংরেজী সাহিত্য ইউরোপে জন্ম নিয়ে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়েছে। সাধারণ থেকে সাধারণ শিক্ষিত লোক কিছু না কিছু জেনেছে।

সকলে সমান তালে সবমাঠে খেলতে পারে না। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সব মাঠে__তুলনায় কমবেশ হলেও খেলেছেন। তিনি কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে তিনি বেশ ভালো খেলা জমিয়ে ছিলেন কবিতার মাঠে। কবি নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের প্রায় শাখায় খেলা করেছেন, তবে মাঠ জমিয়ে ছিলেন সাম্যের গানে বা বিদ্রোহী কবিতায়।

যাকগে এসব কথা। সাহিত্য জন্মে আনন্দ ও বেদনা থেকে। আজকে আমাদের থেকে যারা বিদায় নিচ্ছে তাদের মধ্যে এবং আমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস কাজ করছে। বেদনা এবং আনন্দ।

বেদনা মানে তাদের জ্ঞান নিবাস ছেড়ে যাওয়ার বেদনা। আর আনন্দ বলতে শিল্পীর ভিন্ন রঙে, রূপে তৈরি শিল্পের কাজে পূর্ণতা লগ্নের আনন্দ। শিল্পমান ভালো হলে আনন্দের হার আরও আরও বাড়বে। মন্দ হলে শিল্পী বেদনাহত হবেন এই তো।

১১ এপ্রিল ১৮ ঈসায়ী।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *