সাহিত্যের সার্থকতা, সাহিত্য পাঠের ওপর নির্ভরশীল

শ্রুতি-সাহিত্য  =  লেখার জগতে কি ভাবে এলেন – প্রথম লেখাটির বিষয়ে কিছু বলুন ।

সুবীর কুমার রায়  = ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর, ১৯৭৯ সালের আগস্ট মাসে আমি জীবনে প্রথম ট্রেক করে উত্তর ভারতের গাড়োয়াল হিমালয়ের অনেকগুলো জায়গায় যাই। সেখান থেকে অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এসে ডায়্যারির পাতায় প্রথম কলম  ধরা। প্রায় ষাট হাজার শব্দের “পাহাড়ের রোজনামচা”, সকলের কাছে সমাদৃত হয়। ভ্রমণ আমার নেশা, ফলে এরপর থেকে বিভিন্ন ভ্রমণের পরে পরপর অনেকগুলো ভ্রমণকাহিনী লিখি। পরবর্তীকালে ছোটগল্প, স্মৃতিকথা, ও বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে কাগজ ও ল্যাপটপে লেখা, ক্রমে নেশার আাকার নেয়।

শ্রুতি-সাহিত্য  = লেখা কি শিখে লেখা যায়  না কোনো অনুভবের প্রয়োজন  আছে ?

সুবীর কুমার রায়  = আমার তো মনে হয় লেখার জন্য পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা ও আগ্রহ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, জানবার ইচ্ছাই, প্রধান ভূমিকা পালন করে। লেখা শিখে লেখা যায় কী না, আমার সঠিক জানা নেই, তবে বিভিন্ন লেখা পাঠ করে, নিজের লেখার মান অবশ্যই বৃদ্ধি করা যায়। সেটাতো অবশ্যই একপ্রকার শেখা। তবে লেখার গুণগত মান অবশ্যই লেখার প্রতি ধৈর্য, যত্ন, চিন্তাশক্তি, ও ভালবাসার ওপর নির্ভর করে।

শ্রুতি-সাহিত্য  = বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কি ভাবে আরো উজ্জ্বল করা যায় ?

সুবীর কুমার রায়  = বাংলা সাহিত্য আজ বড় অবহেলিত ও উপেক্ষিত অবস্থার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। সাহিত্যের সার্থকতা, সাহিত্য পাঠের ওপর নির্ভরশীল। আজ বাংলা সাহিত্যে পাঠকের অভাব, চোখে পড়ার মতো জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। যাঁদের লেখা পড়ে আমাদের শৈশব কৈশোর যৌবন কেটেছে, সেই সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, আশাপূর্ণা দেবী, ইত্যাদি অসাধারণ সব লেখক লেখিকার লেখা আজ কতজন পড়েন, আমার জানা নেই। শুধুমাত্র ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার অজুহাতে, বর্তমানের শিশুরা সুকুমার রায়, লীলা মজুমদারের লেখা, পড়া তো দূরের কথা, নামও শোনেনি। বাবা-মা’রাও দেখি ব্যাপারটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করেন, কেউ কেউ গর্ববোধ করেন, অনেকে আত্মতুষ্টি অনুভব করেন। কিন্তু শৈশব থেকেই শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করানোটা বিশেষ প্রয়োজন, এতে শিশু ও সাহিত্য, দুটোরই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

শ্রুতি-সাহিত্য  = ইদানিং কোন কোন পত্রিকায় লিখছেন  ?

সুবীর কুমার রায়  = প্রায় চল্লিশ বছর আগে লেখালেখি শুরু করলেও, সেটা ছিল নিজের আনন্দে লেখা। কোনদিন কোন পত্রপত্রিকায় পাঠানোর কথা ভেবে দেখা হয়নি। অবসর নেওয়ার পর কিছু ম্যাগাজিন, ই-ম্যাগাজিন, এবং বহু গ্রূপের পাতায় লেখা পোস্ট করা শুরু করি, এবং এখনও তাঁদের অনুরোধে কাজটা নিয়মিতই করে থাকি।

শ্রুতি-সাহিত্য  = ফেসবুক  কি  বাংলা সাহিত্যকে নতুন কোনো আশার আলো দেখাচ্ছে ?

সুবীর কুমার রায়  = ফেসবুকের পাতায় কিন্তু অনেক ভালো লেখা দেখা যায়। নতুন বা অপরিচিত লেখক লেখিকাদের পক্ষে কিন্তু বই প্রকাশ করাটা খুবই অসুবিধাজনক, হয়তো স্বপ্নই থেকে যায়। ফেসবুকের পাতা, বা বিভিন্ন গ্রূপ, এইসব লেখক লেখিকাকে সাধারণ পাঠকের সাথে পরিচিতি করিয়ে দেওয়ার কাজটা করে থাকে। ফলে এইসব লেখক লিখিকার লেখা, বহু মানুষ পড়বার সুযোগ পান, লেখক লেখিকারাও নতুন নতুন লেখা লিখতে অবশ্যই উৎসাহ পান। এটা তো ফেসবুকের একটা বড় অবদান বলে স্বীকার করতেই হবে। একথা অস্বীকার করি কিভাবে, যে ফেসবুক নতুন নতুন প্রতিভাবান লেখক লেখিকাদের খুঁজে বার করার কাজটা সুচারুভাবে করে যাচ্ছে।

শ্রুতি-সাহিত্য  = ভালো লেখা  লিখতে গেলে কি  ধরণের বই পড়তে হবে  ?  আমরা কবিতার কথা বলছি  ………

সুবীর কুমার রায়  = আমি কবিতা লিখি না, লিখতেও পারি না। আধুনিক কবিতার মধ্যে ছন্দের অভাব থাকায়, বর্তমানের কবিতা পাঠে খুব একটা স্বচ্ছন্দ বোধ করি না। তবে সাহিত্যের যেকোন শাখার পথিকৃৎরাই কিন্তু আমাদের সাহিত্য সৃষ্টির শিক্ষাগুরু। কাজেই কবিতার সবরকম বই পড়ে, তার ভিতর থেকে স্বাস্থ্যকর অংশটুকু নিজের কাছে সঞ্চয় করে রাখাটাই বাঞ্ছনীয় বলে, আমার তো মনে হয়।

শ্রুতি-সাহিত্য  = লেখকের  কোন    গুণ  থাকাটা  সবচেয়ে বেশী জরুরী ?

সুবীর কুমার রায়  = রোজ আমাদের চারপাশে অনেক ঘটনা ঘটে, অনেক অদ্ভুত সব মানুষের সাথে পরিচয় হয়, যেগুলো একজন লেখকের পক্ষে যথেষ্ট রসদ হতে পারে। যাঁরা শুধুই দেখে চলে যান তাঁরা হয়তো পারেন না, কিন্তু যাঁদের সেই অন্তর্দৃষ্টি আছে, তাঁরা কিন্তু সেইসব ঘটনা বা মানুষদের নিয়ে সুন্দর সুন্দর লেখা পাঠকদের উপহার দিতে পারেন। কাজেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও চোখ কান খোলা রাখাটা, একজন লেখকের পক্ষে সবচেয়ে জরুরি বলে আমার মনে হয়। চারিপাশের এইসব কাঠামোতে দক্ষ হাতে মাটি ও রং করে, সুন্দর সুন্দর প্রতিমা তৈরি করার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

শ্রুতি-সাহিত্য  = বর্তমানে আপনি কি ধরনের লেখা বেশী  লিখছেন ?

সুবীর কুমার রায়  = আমি মূলতো ভ্রমণ কাহিনী লিখতে ভালবাসি।তবে ভ্রমণ না করে, আন্দাজে ভ্রমণ কাহিনী লেখার ক্ষমতা আমার নেই। রোজরোজ তো ভ্রমণের সুযোগ থাকে না, তাই ভ্রমণ কাহিনীর পাশাপাশি, ছোট গল্প, রম্যরচনা, স্মৃতিকথা, ইত্যাদি নিয়ে লেখায় অনেকটা সময় ব্যয় করে থাকি।

শ্রুতি-সাহিত্য  = আপনার কাছে ভালো লেখার সংজ্ঞা কি ?

সুবীর কুমার রায়  = পাঠক পাঠিকার ভালো লাগাই লেখার সার্থকতা। পাঠক পাঠিকা যখন আমার নতুন কোন লেখার জন্য অপেক্ষা করবেন, বিভিন্ন প্রকাশক বা গ্রূপ অ্যাডমিনরা যখন আপনাকে ব্যক্তিগত ভাবে নতুন লেখার জন্য অনুরোধ করবেন, তখন বুঝতে হবে আমার লেখার মান অবশ্যই ভালো। নিজের লেখা নিজে ভালো বলা নয়, পাঠকদের সেটা স্বতস্ফুর্ত ভাবে বলতে হবে, তবেই সেটা ভালো লেখা, আর তখনই লেখা সার্থক।

শ্রুতি-সাহিত্য = আপনার ভাবনায় পাঠকরা কি খুব উপকৃত হচ্ছেন  ফেসবুকে  প্রকাশিত লেখা পড়ে ?

সুবীর কুমার রায়  = ফেসবুকে ঠিক কতজন পাঠক একটা লেখা পড়ছেন, তাঁরা না জানালে বাস্তবে সেটা বোঝা আদৌ সম্ভব নয়। তবে আমি অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি, যাঁরা বই কেনেন, বুক ফেয়ারে গিয়ে ব্যাগ বোঝাই বই কিনে বাড়ি ফেরেন, তাঁরা বিশেষ বই পড়েন না, বরং দামি দামি বই দিয়ে দেওয়াল আলমারি সাজিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করেন। আর যাঁরা প্রকৃত বই পড়তে ভালবাসেন, অনেক ক্ষেত্রেই বই কিনে পড়া তাঁদের পক্ষে বিলাসিতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা তো মানতেই হবে, যে ফেসবুক আজ বিনা পয়সায় বহু লেখকের বহু লেখা পাঠকদের উপহার দেওয়ায়, পাঠকরা অবশ্যই উপকৃত হচ্ছেন। উপকৃত হচ্ছেন লেখক লেখিকারাও।

Print Friendly, PDF & Email

One Reply to “সাহিত্যের সার্থকতা, সাহিত্য পাঠের ওপর নির্ভরশীল”

  1. nice…renderation…of…a typical..subject…many things discussed..in a short but lucid style..thanks

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *