সাক্ষাৎকার

সাহিত্য-শ্রুতি = লেখার জগতে কি ভাবে এলেন – প্রথম লেখাটির বিষয়ে কিছু বলুন ।
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া = খুব ছোট বেলায়,তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আমি ছিলাম ‘জুঁই’ খেলাঘর আসরের সদস্য। ‘খেলাঘর’ চট্টগ্রাম মহানগরের মাসিক সাহিত্য বাসরে নিয়মিত যেতাম। এভাবে যেতে যেতেই লেখালেখির জগতে প্রবেশ করি।  ঊনিশশো বিরাশি সালে নয় বছর বয়সে প্রথম ছড়া লিখা দিয়েই লেখালেখির জগতে প্রবেশ। তখন প্যারামাউন্টের মিষ্টি খুব বিখ্যাত ছিল।প্যারামাউন্টের মিষ্টির বিজ্ঞাপনের জন্যে কোন একটি সাপ্তাহিকে ছড়া আহ্বান করায় লিখেছিলাম:
বলে লোকে দেখলে চোখে
প্যারামাউন্টের মিষ্টি
সেদিক থেকে যায় না বেঁকে
দু’চোখেরই দৃষ্টি।
মিষ্টিগুলো দেখতে বড়
স্বাদ আছে তার ভারী
নতুন জামাই নেয় কিনে
গেলে শ্বশুর বাড়ি।
সাহিত্য-শ্রুতি = লেখা কি শিখে লেখা যায়  না কোনো অনুভবের প্রয়োজন  আছে ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া =  অনুভব বা উপলব্ধিবিহীন কেবল শিখে লেখা যায় না। উপলব্ধি বা অনুভূতি হতে লেখার জন্ম হয় আর সেই লেখাকে পরিশীলিত করতে চাই শিক্ষণ। লিখতে গেলে পড়তে হয়। এই পড়াটা ফরমায়েশি পড়া নয়। জানার জন্য পড়া। এই পড়াটা হতে হয় বিচিত্রমুখি। নিজের মনের মধ্যে বোধের উৎসারণ না ঘটলে যতই শেখা হোক, লেখা আসবে না।
সাহিত্য-শ্রুতি =বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কি ভাবে আরো উজ্জ্বল করা যায় ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া = সব কিছুর অবাধ বিশ্বায়নের কারণে বাংলা ভাষা যেমন কিছু সুফল পাচ্ছে তেমনি কিছুটা ঝুঁকিরও সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলা সাহিত্য আজকের এই প্রযুক্তি-প্রবণ বিশ্বে মান ধরে রাখতে হিমসিম খাচ্ছে একদিকে। আর অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যের বিস্তারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে হলে বাংলা ভাষার বইমেলাকে বিশ্বের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। বাংলাভাষায় রচিত সাহিত্যকে একই মলাটের মধ্যে ইংরেজি অনুবাদসহ প্রকাশ করা দরকার যাতে অন্যরা বাঙালি সাহিত্যিকদের বুঝতে পারেন। নতুনদের বইকে বা লেখাকে যেমন  প্রচার করতে হবে তেমনি অখ্যাত ভালো মানের সাহিত্যিককেও প্রচারের আলোয় আনতে হবে।
সাহিত্য-শ্রুতি = ইদানিং কোন কোন পত্রিকায় লিখছেন  ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া =  ইদানীং বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা যেমন জনকণ্ঠ, যায় যায় দিন,স্থানীয় দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ পত্রিকা, বিভিন্ন লিটল্ ম্যাগাজিন, অন লাইন পত্রিকা ইত্যাদিতে নিয়মিত লিখছি।
সাহিত্য-শ্রুতি =. ফেসবুক  কি  বাংলা সাহিত্যকে নতুন কোনো আশার আলো দেখাচ্ছে ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া = ফেসবুক বাংলা সাহিত্যকে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে বলা যায়। ফেসবুকে নতুন নতুন অনেক লেখক তৈরি হচ্ছে যদিও তাদের পরিশীলিত করার দায়িত্ব পাঠক এবং অগ্রজদের। অনেক নতুন নতুন লেখক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক কালজয়ী ও ভালো লেখার পুনর্পাঠ সম্ভব হচ্ছে। পাঠকের সাথে লেখকের সরাসরি ভাব বিনিময় সম্ভব হচ্ছে। ফলে লেখার পাঠ প্রতিক্রিয়া নগদে পাওয়া যাচ্ছে। ফেসবুক লেখক-পাঠকের চমৎকার সেতুবন্ধন রচনা করেছে। তবে, ফেসবুকে সাহিত্য মান নিশ্চিতকরণে কোন না কোন মানদণ্ড (লাইক নয়) স্থাপন করা বাঞ্ছনীয়।
সাহিত্য-শ্রুতি =ভালো লেখা  লিখতে গেলে কি  ধরণের বই পড়তে হবে  ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া = ভালো লেখা লিখতে হলে কালজয়ী এবং ধ্রুপদী বইগুলো পড়ায় মনোযোগ দেওয়া উচিৎ।ইতিহাস,পুরাণ,দর্শন এর বিষয়গুলো হওয়া উচিৎ অবশ্য-পাঠ্য। বিশ্ব সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখকের বই পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা উচিৎ। এর ফলে জানার পরিধি বাড়বে এবং বড় বড় লেখকের লেখনশৈলি জানা যাবে। নিজের চিন্তার স্তর অন্যদের তুলনায় কেমন তা পরিমাপ করা সহজ হয়ে যাবে। এতে ভালো লেখা জন্ম নিবে।
সাহিত্য-শ্রুতি = লেখকের  কোন    গুণ  থাকাটা  সবচেয়ে বেশী জরুরী ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া = লেখকের জীবনকে পড়া, জীবনের অনুভূতিতে সাড়া দিতে পারার গুণটা অতি জরুরি। একটি লেখা তখনই কালজয়ী হয় যখন তাতে জীবন বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। লেখকের অন্যের লেখা পড়ার মনোবৃত্তি ধারণ করাটাও জরুরি।
সাহিত্য-শ্রুতি =. বর্তমানে আপনি কি ধরনের লেখা বেশী  লিখছেন ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া = বর্তমানে আমার লেখায় শেকড়ের সন্ধানধর্মী ও সমকালীন বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। তার পাশাপাশি মূল্যায়নধর্মী লেখাও লিখতে হচ্ছে টুকটাক।
সাহিত্য-শ্রুতি =. আপনার কাছে ভালো লেখার সংজ্ঞা কি ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া = ভালো লেখা বলতে আমি বুঝি এমন সৃষ্টি যার মধ্যে আকন্ঠ ডুবে থাকা যায়,পাঠ শেষে মনে গেঁথে যায়, ফেলে রাখা যায় না,কখনোই পুরোনো হয়ে যায় না। ভালো লেখা চিন্তাশক্তিকে নাড়া দেয় এবং জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।
সাহিত্য-শ্রুতি = আপনার ভাবনায় পাঠকরা কি খুব উপকৃত হচ্ছেন  ফেসবুকে  প্রকাশিত লেখা  পড়ে ?
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া = ফেসবুকে প্রকাশিত লেখা পড়ে পাঠকরা যে সব সময় উপকৃত হচ্ছেন তা নয়। অনেকক্ষেত্রেই ফেসবুকে প্রকাশিত লেখাগুলো তাৎক্ষণিক আবেগের উথলে উঠা তরঙ্গবিশেষ। গভীরতা খুব কম, দূরদর্শিতাও কম। ফেসবুকে অধিকাংশ লেখাই দিবস কেন্দ্রিক। তাই সাহিত্যমানের চেয়ে কোনটা অধিক আবেগে ভারানত, কোনোটা ইতিহাস আশ্রয়ী তথ্য ব্যাংক এর মতো। ঠিক সাহিত্য বলতে যা বুঝায় তা সত্যিকার অর্থেই ফেসবুকে কম।
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
চাঁদপুর,বাংলাদেশ।
.

অতঃপর স্বপ্ন দেখি-২  //  যাকারিয়া আহমদ

অতদবিরের নিমিত্তে অতঃপর স্বপ্ন দেখি না,
স্বপ্ন দেখি সব তদবিরের পর;
তোমাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে তন্দ্রা আসে,
কিন্তু স্বপ্নরা তন্দ্রাকে ভেদ করে আবারো আসে! অতঃপর স্বপ্ন দেখি।

কাল ক্ষেপণের মানে কি এই, তুমি আমাকে ভুলে যাচ্ছ?
যাও, যেতে পারো;
সময়ের অবিরাম স্রোতে চলতে থাক!
কালবিৎ বুঝে চলো,
যদিও আমি হোঁচট খাচ্ছি–অতঃপর স্বপ্ন দেখি।

যেই জায়গাতে দাঁড়িয়ে বলেছিলে ‘আমার নখ কেটে দাও, মেন্দি দেব হাতে’ সেই মাটির গন্ধ এখনো আসে!
কথাগুলি আজো ভুলতে পারি না, অনেক কথা মনে পড়ে– অতঃপর স্বপ্ন দেখি।

প্রেমানলে পুড়ে পুড়ে আজ প্রায় ক্ষীণকায়,
তবু বলি যাক দিন,
দেখি কতোদিন যায়;
সংশয় ভাঙে আর খুঁজে যদি আমাকে পায়,
তবুও ভালো! এসব ভাবি, অতঃপর স্বপ্ন দেখি।

ভরা নদীর জলে,
দুঃখ বেদনা নেই বলে,
ধুয়ে মুছে এলুম সব ফেলে–তবে মুছি নি তব নাম,
আজো করি তব নামে প্রণাম,
সঙ্কার উপরে থাকি, অতঃপর স্বপ্ন দেখি।

সবকিছু ছুড়ে ফেলে,
কুঁড়েঘরে তুমি এলে–
নিদুখী হবো আমি;
নিত্যানন্দে থাকবো দ্বয়,
এসব আশা-নিরাশার ভেতরে বসবাস করি আমি, অতঃপর স্বপ্ন দেখি।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
হাটগ্রাম, গোয়াইনঘাট, সিলেট।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: