সাইকেলচোর

শুভদীপ  ব্যানার্জী

দেওয়ালির আগের দিন , ছুটি পড়বে কাল থেকে। থানার বড়বাবু সুশোভন বাবু জেলের আসামিদের সুবিধা অসুবিধা জানতে সংশোধনাগারে গেছে উপরমহলের নির্দেশমতো। কালকে থেকে টানা ছুটি আটদিন। স্ত্রী কে নিয়ে দেশেরবাড়ি যাবার নির্ঘন্ট আগেই প্রস্তুত। বোনাসের কড়কড়ে দশটি হাজার টাকা আজ সকালে একাউন্ট এ ঢুকেছে বলে ম্যাসেজে এসেছে ফোনে খানিক আগেই। খোশমেজাজে ঠিক করেছেন ফেরার পথে তার স্ত্রীর অনেকদিনের শখের নেকলেশ টা আজই তার হাতে তুলে দেবে ফেরার পথে কিনে। দিপা খুব খুশি হবে ।

একটা গান ধরে ফেললেন সুশোভন বাবু।

তারপর আনমনে সিগারেটের প্যাকেট টা বের করে এগিয়ে গেলেন অফিসে।

একজন গার্ড ছুটে এসে স্যালুট মেরে বসতে বললেন অফিসে। হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন সুশোভন বাবু কাজের আগে অফিসে বসে আরাম করা যে একদম ই তার পছন্দ নয় সেটা।

এরপর এক এক করে রুমে গিয়ে জানতে লাগলেন তাদের চাহিদার কথা। আশ্বস্ত করলেন তাদের।

রুম নাম্বার 113 র লোকটা নাকি আজ তিনদিন খায়নি।

রীতিমতো বিরক্ত হয়ে লাঠি দিয়ে রুমের দরজা র বাইরে থেকে বন্ধ লোহায় মারলো দু ঘা। তাতেও কয়েদি ঢাকা খুলে আর উঠে বসেনা।

এই এক জ্বালা , এইসব সাইকো মার্কা ক্রিমিনাল গুলোর জন্য দেশটার বারোটা বাজছে।

“এই হারামজাদা” এদিকে তাকিয়ে দেখ সঙ্গে থাকা গার্ড টা চেঁচিয়ে উঠলো।

“আহঃ , আমাকে হ্যান্ডল করতে দাও, তুমি বলো এ কি করেছে।

খুন নাকি?”

“না স্যার না ওতো উঁচু পোস্টে আর উঠলো কই, এ শালা একটা চোর , তাও কি চুরি করেছে না সাইকেল”

মনে মনে হাসলেন সুশোভন বাবু , অনেক দেখেছেন , অপরাধী, খুনি এদের নিয়েই কেমন যেন একটা পরিবার। কত কত লোক এতসব কিছু ঘৃণ্যতম কাজ করার পরও ঘুরছে সমাজের চোখে বুক ফুলিয়ে। আর সামান্য একটা সাইকেল চোর সে পচে মরছে জেলে।

“এর জামানত হয়নি?” জিজ্ঞাসা করলেন সুশোভনবাবু।

“দশ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আট মাসের জেল ,শালার পকেটে পাঁচ টাকা নেই আবার দশ হাজার টাকা? কি যে বলেন স্যার। দুমাস হয়েছে এখনো ছটা মাস বাকি” কথাটা বলে বিশ্রী ভাবে কালো হয়ে যাওয়া দাঁত বের করে হাসল গার্ডটি।

বিরক্ত লাগলো সুশোভনবাবুর। চাবিটা চেয়ে চলে যেতে বললেন গার্ড টাকে।

গার্ডটা চলে গেলে দরজাটা খুললেন তারপর ভিতরে ঢুকে আস্তে আস্তে আসামির কাছে গেলেন তিনি। কম্বলটা গা থেকে টানতেই উঠে বসে গেল লোকটা ,

“আমাকে ছেড়ে দেন বাবু ,বাবুগো দয়া করেন আমাকে ,আমি চলে যাবো বাবু বিশ্বাস করেন আমি চুরি করতে চাইনি বাবু। আমার বউ বিটি আজ দুইটা মাস না খেয়ে কি করছে কে জানে।”

সুশোভন বাবু ওকে থামিয়ে চুরি করার কারণ জিজ্ঞাসা করলো লোকটিকে।

“বিশ্বাস করেন আমি জানতাম না ওরা আমাকে দিয়ে চুরি করাচ্ছে , বিশ্বাস করেন বাবু আমার বউ বলেছিল শহরে আসতে বলেছিল বাবুদের শহরে নাকি অনেক পয়সা , আজ দুটো মাস ওদের কোনো খোঁজ নেই বাবু ওদের যে শিয়াল কুকুরে টেনে খাবে গো , বাবু আমায় ছেড়ে দেন আর নাতো ওদের এখানে নিয়ে আসেন বাবু ওরা যে খেতে পাচ্ছে না। আমি সব কাজ করে দেব আপনাদের জল আনা ,চা করা বাগান পরিষ্কার আমি সব পারি বাবু শুধু চুরি করতে পারিনা গো। বাবু আমাকে দয়া করেন ওদের যে আমি ছাড়া কেউ নেই”

সুশোভন বাবু বেরিয়ে এলেন ওখান থেকে। কান্না এখনো থামেনি লোকটার।

অফিসে বসে ফাইল টা চাইলেন।

আসামি রবি সরেন , বাসা পুরুলিয়া।

আর কিছু বুঝতে বাকি রইলনা সুশোভনবাবুর।

তিনি খুব ভালো করেই জানেন গ্রাম থেকে শহরে আসা নিষ্পাপ লোকগুলোর কিভাবে সুযোগ নেয় এখানে অপরাধের দলের লোকজন। মনে হচ্ছিল ছুটে যায় রবির কাছে গিয়ে কাঁধটা ঝাঁকিয়ে তাকে বলে রবি এখানে টাকা আছে অসৎ উপায়ে এখানে সব আছে সব। উঁচু বাড়ি রেস্তোরাঁ গাড়ি সব আছে। নেই শুধু মানুষ। হাঁ মানুষ।তোর মত নিষ্পাপ খেটে খাওয়া মানুষ যারা বোঝেনা স্বার্থ। বোঝেনা বিলাসিতা। সারাদিন হাড়ভাঙা খেটে পরিবারকে দু মুঠো খাওয়াতে পারবে এটা তাদের স্বপ্ন ইচ্ছা , বাস্তবতা।

হয়তো পনেরো বছরের কর্মজীবনকে অপমানিত করে রুমাল দিয়ে চোখ টা মুছে নিলেন সুশোভনবাবু।

পরদিন দীপাবলি। উপরমহল থেকে গার্ডসাহেবের কাছে ফোন এলো। জরিমানার টাকা কোনো অজ্ঞাতপরিচয় ব্যাক্তি দিয়ে দিয়েছে। রবি সরেন আসামি নাম্বার তিনশ এগারো কে ছাড়ার হুকুম।

এখনো জানা যায়নি কে টাকাটা দিয়েছে। সুশোভনবাবু অবাক হলেন সবার কাছে লোক দেখানি , যদিও তার স্ত্রীর নেকলেশের স্বাদ এখনো পূরণ হয়নি।

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *