সম্পর্কের বেড়াজালে

পীযূষকান্তি সরকার

ভবতােষ রায়ের বয়স সাতাত্তর প্লাস। দুটো হাটুই জখম – অপারেশনে সাময়িক চলনক্ষম। তবু ঘরে বসে থাকা তার ধাতে সয় না। তাই ইদানীং ছাতার বাঁটের মতাে আঁকানাে লাঠিটা নিয়ে কাল-বিকাল ঘুরতে যান গলির মুখে।

টুকটাক বাজার করা কিংবা সডি-বিস্কটের প্যাকেট কিনে বাড়ি ফিরতে কখনও কখনও বেলা বারােটা বেজে যায়। বিকালে বের হলে ঘড়ির কাঁটা পার হয়ে যায় রাত আটটার ঘর।

বয়স বাড়লে মানুষ কেমন যেন মিইয়ে যায়, দীর্ঘসূত্রতার নাগপাশ যেন অষ্টপৃষ্ঠে চেপে ধরে করছি করব’করতে করতেই কখন সে সময় পার হয়ে যায় খেয়ালই থাকে না। অথচ পঞ্চাশ বছর আগে যখন ভাের সাড়ে-পাঁচটায় মার্টিন রেলের কামরায় চেপে সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে ওয়ার্কশপে এসে কাজে যােগ দিতেন, ভবতােষ তখন তার এই শরীরটাই কেমন চমকরে উঠত।

– বয়সের নিয়মেই ভবতােষের চোখে ছানি পড়েছে। আজ নয় কাল, কালনয় এই করতে করতেই পাঁচ-ছ’বছর কেটে গেল, অপারেশন করা আর হয়ে ওঠেনি। তবু দৈনিক সংবাদপত্র পাঠকরতে অসুবিধা হয় না তেমন, বিশেষ করে দিনের আলােয়। সেই সূত্রেই তিনি জেনেছেন দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরে গিয়েছিলেন জনগণকে কয়েকগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

ভারত-জাপান যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববাজারে দেশীয় শিল্পীর চাহিদা সৃষ্টিকরার পরিকল্পনা তাঁর আছে। অথচ গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে এমনই যৌথ উদ্যোগের ফসলরূপে গড়ে ওঠা তাদের যে বিশাল সম্ভাবনাময় কারখানা,

এখন সেটি শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতি বহন করে চলেছে। বন্ধ হয়ে গেছে অনেকগুলি ডিপার্টমেন্ট আরদু’চারটেচলছেটিমটিকরে। শুধু সরকারি আওতাযুক্ত বলে প্রােমােটারের বা এড়িয়ে অস্তিত্ব বজায় রাখার সুযােগ পেয়েছে মাত্র।

সেদিন তখন সবেমাত্র সন্ধে হয়েছে, রেডিয়াম লাগানাে পুরানাে হাতঘড়িতে ভবতােষ এখলেন ছ’টা বাজে। গলির মুখে এসে দাঁড়ালেন তিনি। সাইকেল-বাইক-বাস-মােটর “ম খুটে চলেছে অবিরাম গতিতে।

অথচ পঞ্চাশ বছর আগে এই অঞ্চলই ছিল সুনশান “ওহ গলির মুখেই ছিল মার্টিন-বার্ন কোম্পানির তৈরি বালটিকুরি স্টেশন। আধঘন্টা * প্রন চলত এই পথে। রাতের নিস্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে কু-ঝিক-ঝিক আওয়াজ ‘মরাগুলিকে নিয়ে ছুটত বাষ্পীয় ইঞ্জিন। যে গলির মুখ তখন একশাে ওয়াটের

লােতেই ঝম করত, সেই জায়গায় এসেছে ভেপার ল্যাম্পের পােষ্ট তাও তার অন্তর অন্তর। দিনের আলাের মতােই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে রাত। ভেপার সং আলােয় সাইকেল আরােহীকে চিনতে পেরেছিলেন ভবতােষ, বলেছিলেন

ল্যাম্পের আলােতেই ঝলমরত, আবার বিশ মিটার অন্তর অন্তর। দিনেঃ ল্যাম্পের সেই আলােয় সাইকেলআং – আরে, সুবীর না! পুহব্যবসায়ী মানুষ, গােটা কয়েক মেশিন নিয়ে গড়ে ওঠা তার ছােট্ট কারখানার  শেভখানি।

ভবতােরে দেশ আমতার ওপর দিয়েই যেতে হয় তার গ্রামে স্কুল-ইন পাশ করার পর মেশিনে কাজ শিখে কারখানা বানিয়েছিল সে। ভালােই চলত তর, কিন্তু প্রতারণার মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের পথে হাঁটতে গিয়ে ক্রমাগত হে পিছিয়ে পড়তে লাগল।

পাড়ার কমল মান্না বাড়ি-জমির দালালি করত। তার কাছেই বছর দশেক আগে নিজের বাড়ি বিক্রির প্রস্তাবটা রেখেছিলেন ভবতােষ। প্রস্তাবটা সেলুফে নিয়ে বলেছিল – জেঠু বাড়ি আর তিনকাঠা জমি আপনার, আমি এক কথায় পাঁচ লাখে তুলে দেন। দেখবেন, কেমন কড়কড়ে নােটগুলাে পেয়ে যাবেন!

– তােমায় কত দিতে হবে, সেটা তাে বলাে? ভবতােষ ধীরে সুস্থে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

– আমায় তিরিশ হাজার দিয়ে দেবেন ‘খন, আপনার কাছে আর কী-ই বা চাই!

– সে কী হে! জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে ভবতােষ বলেছিলেন – পাঁচ লাখ টাকার টু পার্সেন্ট তিরিশ হাজার হয় নাকি?

-কী যে বলেন জেঠু! হেঁ হেঁ… আসলে বুঝলেন কিনা, তিন লাখ টাকার জমি-বাড়ি পাঁচ লাখে তুলছি –এক্সট্রা তত দিতেই হবে নাকি! পার্সেন্টেজ কলে চলবে?

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন ভবতােষ। বিষয়-আশয় নিয়ে তিনি তেমনভাবে ভাবেননি কখনও। ভ্যালুয়েশন কষা তার ধাতে সয় না। একসময় আমতা কোর্টে মুহরির কাছে কাজ শিখেছিলেন। বেশ কিছু অর্থও আয় হত সেই সূত্রে।

কিন্তু টাকা-কড়ি আর আইনের মারপ্যাচ মাথায় ঢােকেনি তার। তাই তাে ট্রেনি হিসেবে ওয়ালপেচান্স পেতেই তার বাবার বন্ধু বলাইকাকু সৎ পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন – দ্যাখাে বাবা ভবতােষ, এইসব কোর্টকাছারি তােমার জায়গা নয়।

এখানে হাজার বার ‘অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ’ বলতে হয়; শিখতে হয় অনেক কলাকৌশল। এসব তােমার কর্ম নয়। তুমি বরং হাতে-কলমে কাজ শিখে সরকারি চাকরি করাে। সেটিই তােমার পক্ষে স্যুটেবল হবে।

বলাইকাকুর কথা শুনেই ট্রেনিং শেষে চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। ভাই প্রাণতােষ তখনও স্কুলের ছাত্র। সেই বছরই হায়ার-সেকেণ্ডারি পাশ করে সে কলেজে ভর্তি হয়। ভাের চারটেয় উঠে পড়তেন তার মা। উনােনে আঁচ দিয়ে ভাত বসিয়ে, তরকারি বানিয়ে তাকে ডেকে তুলতেন।

স্নান সেরে গরম ভাত-তরকারি খেয়ে ভাের সাড়ে-পাঁচটার ট্রেন ধরতেন ভবতােষ। ফলে আটটা-দশ পনেরাে-র মধ্যে স্টেশনে নেমে পৌঁছে যেতেন ওয়ার্কশপ গেটে। এইভাবেই বছর দুয়েক চলার পর এই গলির মুখে পল্লেদের বাড়িতে এসে উঠলেন মা আর ভাইকে নিয়ে।

তিন-তিনটে ঘর, নিজস্ব বাথরুম, পাতকুয়াের সঙ্গে ছিল টিউবওয়েল – সব মিলিয়ে তৎকালীন ভাড়া ছিল কুড়ি টাকা। কাছাকাছি কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন ভাইকে। মাকে খুব ভালােবাসতেন তিনি, তাই মার কষ্ট লাঘব করার জন্যই তার এই বাড়িতে আসা।

প্রাণতােষ বি.এ. পাশ করার বছর দুয়েকের মধ্যেই চাকরি পেয়ে গেল। একদিন সে এসে মা’র সামনেই বলল – একটু ভিতর দিকে একটা মজা ডােবা আছে, খুব সস্তায় পাওয়া যাবে। দাদা, কিনবে ?

 

 

 

বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *