শেকড়ের স্মৃতি  //  ছোটবেলা //  বন্য মাধব

1231

৪৪

মামা ভাগিনার পাঠ চুকিয়ে সরবেড়িয়া হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। এখানেই প্রথম সাহেব দেখা। এক্কেবারে খাঁটি সাহেব। এয়া লম্বা। ফকিরতকিতে তাঁদের চার্চ, দাতব্য ডাক্তারখানা, দূরদুরান্ত থেকে গরীব মানুষ সেখানে যেত। বিনা পয়সায় ডাক্তার দেখানো, ওষুধপত্র, জামাকাপড়ও সেখানে পাওয়া যেত।

আর ছিল অনাথ ছেলেদের আবাসিক আশ্রম, তারা সেখানে সব পেত, শুধু পড়বার জন্যে আমাদের স্কুলে লাইন ধরে হেঁটে আসতো আর যেত।তাদের ফাদার স্কুলের এক অনুষ্ঠানে এলেন, ভাঙা ভাঙা বাংলাতে কি বলেছিলেন তা আজ আর মনে নেই। তিনি যে স্কুলের সঙ্গে আছেন এটাই মনে হয় বলেছিলেন। স্কুলকে কিছু সাহায্যও করেছিলেন।

এর কিছুদিনের মধ্যে স্কুলের কাছে একটা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাড়ি হলো। একদিন টিফিনের সময় আমরা চকচকে পাকা বাড়িটার ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেলাম। তারপর প্রতিদিন খোঁজ নেওয়া হাসপাতালটা চালু হল কিনা। যাদের বাড়িতে চাবি থাকতো সেইবাড়ির একটা ছেলে আমাদের ক্লাসে পড়তো। সেই সব খবরাখবর দিত। কিন্তু অপেক্ষা সফল হলো না। একে একে জানলা, দরজা চুরি হতে শুরু করলো, শেষকালে গরু ছাগলের বিশ্রামের জায়গা হলো।

স্কুলে আর একবার আওয়াজ উঠলো হস্টেল হবে। সব ছেলেদের কাছের জমিদার বাড়িতে থাকার খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। সামনে ইয়া বড় পুকুর। মহা ফূর্তিতে বেশ ক’দিন কাটলো। ইন্সপেকসন হয়েছিলো কিনা মনে নেই, তবে হস্টেলটা হয় নি।

৪৫

তখন মাধ্যমিক পরীক্ষা হতো এপ্রিল মাসে। সানোদা দেবে। ৪ এপ্রিল পরীক্ষা শুরু, ১৯৭৮ সাল। সরবেড়িয়া হাই স্কুলের সিট পড়তো আতাপুরে। ফলে ছাত্রছাত্রীদের ওখানে গিয়ে থাকতে হতো। দাদারও বেডিংপত্র সব রেডি। আর ২ তারিখ ভোররাত্তিরে শুরু হলো হঠাৎ করে বাবার বুকে যন্ত্রণা। কোনকিছুতে কিছু হয়নি। সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাকে বাবা মারা গেলো। সংসারটা সবে সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছিল। বড়দা ব্যাঙ্কে, মেজদা স্কুলে। অন্য দাদারাও নিশ্চিত করেছে, পড়াশোনা কাজে লাগিয়ে কিছু একটা করার। আমরাও এগোচ্ছি। ঠিক এসময়…..।

সানোদাকে আমরা কোনদিন কাঁদতে দেখিনি, বিছানায় শুতেও কম দেখেছি। চেয়ারে বসে বসে শুধু পড়া আর পড়া। মানুষ জন্মাবে, মারাও যাবে এটাই তো স্বাভাবিক, দাদা বলতো। এতো বড় শোকে দাদা অবিচল থেকে পরীক্ষা দিয়ে এল। এতো মনের জোর আমি খুব কম দেখেছি। বাবা মারা যাবার পরপরই প্রথমে সেজদা ব্যাঙ্কে চাকুরি পেল, কয়েক মাসের ব্যবধানে সরবেড়িয়া স্কুল ছেড়ে মেজদাও ব্যাঙ্কে ঢুকলো। বাবা চেয়েছিল তাঁর একটা ছেলে ডাক্তার হোক। সানোদা বাবার সেই ইচ্ছে পূরণ করলো বাবার মৃত্যুর দু’বছরের মাথায়, প্রথম সুযোগেই চিত্তরঞ্জনে ভর্তি হয়ে।

তখন আমাদের অশৌচ চলছে, হবিষ্যি খাওয়া, হাজার বিধি নিষেধ মানা, আর রাতে বিচুলির বিছানায় ঘুমানো। এমনই এক রাতে আমাদের ঠেলে তোলানো হলো। চিৎকার চেঁচামেচি। চোখ কচলে বোঝার চেষ্টা করলাম। টর্চের আলোয় একটা লম্বা কালো সাপ শিতন বরাবর বিচুলি ঘেঁষে শুয়ে আছে। চিকচিক করছে তার গা। না কাউকে কাটে নি বা কাটার সুযোগ পায় নি। তার ঠাণ্ডা গায়ের ছোঁয়ায় বড়দার ঘুম ভেঙে যায়।

ধীরে ধীরে সেই কালাচ সাপ বাইরে এল, তারপর চোখের আড়ালে চলে গেল। গুরুবলে যে আমরা রেহাই পেয়েছি সেটা সবাই বলাবলি করতে লাগলো।

 

৪৬ 

জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখে আসছি স্বামী, সন্তান, সংসারের মঙ্গল কামনায় মার মানত করার শেষ আর নেই। আর শেষ ছিল না নানান বার বা ব্রত করা। এর মধ্যে নির্জলা উপবাসে থেকে এত বড় একটা সংসারের দায়িত্ব পালন কি চাড্ডিখানি কথা! কিন্তু এ ব্যাপারে মা কারো কথা শুনতো না, ঠাকুর দেবতাদের প্রতি এতটাই অচলা ভক্তি ও বিশ্বাস ছিল তাঁর। মার মানতের সূত্র ধরেই আমার প্রথম ট্রেনে চড়া।

সেবার দক্ষিণেশ্বরে মার মানত ছিল। মেজদা চটের ব্যাগে দু’টো হাঁসা ভরে নিল। আমিও সঙ্গী। বাইরে বেরিয়ে সব কিছু হাঁ করে গিলছি। ট্রেন চাপবো, আনন্দে ভেতরে ভেতরে ছটপট করছি। ৪৮ নং আর ৯৭ নং বাস ছেড়ে চাম্পাটি স্টেশনে। আনন্দে তরতর করে ওভারব্রীজ পেরিয়ে শেয়ালদা যাবার ট্রেনে ওঠা। কত লোক, কত বড় গাড়ি, কী আওয়াজ! অভ্যাসবশে সব হাঁ করে দেখছি, গিলছি। গিলতে গিলতে দক্ষিণেশ্বর। পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হলো হাঁসা দু’টোকে, প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে তারা হাঁসের দলে মিশে গেল।

মাকে বলেবলে সবাই হতাশ। মার আরও একটা ব্যাপারে ছেলেরা হতাশ হয়েছিল, মাকে স্বাক্ষর করে তোলার কাজে। মাত্র এগারো বছর বয়সে মা আমাদের বাড়ি বউ হয়ে এসেছিল। তখন গ্রাম বাংলার মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার চল হয় নি। মারাও যায় নি। তাতে মার সুগৃহিনী হওয়া আটকায় নি। যাইহোক, মেধাবী, পরিশ্রমী বেঁচে থাকা ছয় ছেলে মাকে স্বাক্ষর করার কাজে লেগে পড়ল। আঙুল হাড়া হয়ে মার ডান তর্জনীর অর্ধেক কাটা পড়েছিল, ফলে কলম ধরতে অসুবিধা হতো। ধীরে ধীরে মা স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ শিখে ফেললো, নাম সইও। কিন্তু ঐ পর্যন্ত, আর এগোবে না। ছেলেদের সব উদ্যোম মাঠে মারা গেল।

৪৭ 

গুজবের তো মা বাবা নেই, তবে ডানা যে আছে, সেটা সবাই জানি আর মানিও। সেই ডানা মেলে গুজব ঝড়ের চেয়েও জোরে ওড়ে। উড়ে উড়ে সবখানে গিয়ে বলে, হায় রে, জিনিসটা এখনও চাক্ষুষ কর নি তোমরা, হায়, হায়! সুতরাং কৌতূহলী মেয়ে মদ্দ দে ছুট দে ছুট! হঠাৎ একদিন রটে গেল সরবেড়ের কাছে উড়োজাহাজ ভেঙে পড়েছে। পিলপিল করে মানুষ ছুটছে। যারা গুজবে কান দিয়ে আগে দৌড়েছিল এবং যথারীতি ঠকেছিল তারা ফেরার পথে আরো গুজব ছড়িয়েছে।সুতরাং…….। সেদিনটা ছিল রাশিয়ান স্ক্যাইল্যাবের পৃথিবীতে ফিরে আসার দিন। গুজব ছড়ানোর মোক্ষম দিন।

খোরোর সময় আরো একটা গুজব ছড়ানো হত। ছেলেধরার। সেটা অবশ্য গৃহস্থকে সজাগ রাখতো, ঐ সময়টা তারা বাচ্চাদের চোখে চোখে রাখতো।

হঠাৎ কোন পাগল বা দাঁড়িগোঁফভরা অচেনা ভিখিরি গ্রামে এলেও গুজব ছড়াতো। তাকে বলা হতো সি আই ডি। গুজব ছড়ানেওয়ালারা তার কাজকারবার নিয়ে নানা গুজব ছড়াতো। তাকে নাকি পুলিসের লোক এসে গভীররাতে খাইয়ে দিয়ে যায়, কার কার বাড়ির আনাচে কাচানে সে ঘুরঘুর করে ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার বলতো নারে ওটা ডাকাতের চর, সর্দারকে জানাবার জন্যে আঁটঘাট সব দেখে যাচ্ছে। সরল বিশ্বাসী আমরা খুব সহজে এ সব বিশ্বাস করতাম।

আর একটা পেশার লোকেরা গৃহস্থের কপালে ভাঁজ ফেলতো। এরা বর্ষাকালে রাতে টর্চ আর বস্তা নিয়ে কোলাব্যাঙ ধরতো। ওগুলো নাকি চিনেরা খায়। শুধু ধানক্ষেত নয়, গৃহস্থের বাড়ির আনাচে কানাচে, পুকুরপাড়ে তাদের আনাগোনা ছিল। চোখে পড়লে তারা গৃহস্থের তাড়া খেত।

৪৮

মামা ভাগিনার পাঠ শেষে আমি তখন সরবেড়িয়া হাইস্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হয়েছি।এখানে আমার মেজদা বায়ো সায়েন্সের শিক্ষক।আরেক দাদা মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।আমার পীঠোপীঠি আরেক দাদা সিক্সে পড়ে।পড়ে এক জ্যেঠতুতো দাদা এবং এক ভাইপো।

একদিন ভোরে হঠাৎ বাবার বুকে যন্ত্রণা শুরু হল।বড়রা গেল মুকুন্দ ডাক্তারকে ডাকতে। তখন রামপুরে দু’ভাই মুকুন্দ ও গণেশ ডাক্তারিতে এলাকায় বেশ নাম করেছেন। সেই ১৯৭৮ সালেও সুন্দরবনের এমন অজ পাড়া গাঁ এলাকায় না ছিল কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্র না কোন পাশকরা ডাক্তার।

বাবা বরাবর মুকুন্দ ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করান।আমার প্রায়ই জ্বরজাড়ি লেগেই থাকত।তাঁর দেওয়া দাগ কাটা লাল রঙের সিরাপ এখনও যেন জিভে লেগে আছে।আর পুরিয়াগুলো কি তেতো!! তবে এক সপ্তাহের মধ্যে খাড়া হয়ে যেতাম।

সকাল হবার সাথে সাথে বাবার বুকের যন্ত্রণা বাড়তে লাগল।আমার আর এক জ্যেঠতুতো দাদার দায়িত্ব পড়ল সরবেড়িয়া (সরবেড়ে) থেকে ডাব আনার।

ঘন্টাখানেকের মধ্যে ফিরে দেখি সব শেষ।সেদিন ডুকরে কেঁদেছিলাম আর আজ এত বছর পর লিখতে বসে চোখ বেয়ে গরম জলের ধারা নামছে।বাবাই আমার সব ছিল।জ্ঞান হওয়া থেকে তাকে জড়িয়ে ঘুমানো,যত আব্দার তাঁর কাছেই ছিল। সেদিন রাতেও বাবা যখন বল্ল – আমি যদি মরে যাই কি করবি?বাবাকে জড়িয়ে খুব কেঁদেছিলাম। বাবা বলেছিল – দূর পাগল! দাদারা দেখবে ।

চলবে

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *