লেপ

তরুণার্ক লাহা

– লেপ, লেপ, লেপ বানাবে? আসল শিমূল তুলাের লেপ। লে-প, লে…প, লে…প…। লেপওয়ালার এইনরম সুরেলা ডাকশীতের সকালে গ্রামের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ আগ্রহ দেখিয়ে তাকে ডাকে, দু’পাঁচটা কথা বলে, দাম-দর করে।

লেপওয়ালার মনে ক্ষীণ প্রত্যাশার সঞ্চার হয়। তারপর সেই ব্যক্তি যখন না’বলে দেয়, লেপওয়ালার মনের উৎসাহ’র ফুলকিটা দপ করে নিভে যায়। পুনরায় শুরু হয়ে লেপ বানানাের জন্য কাতর আহ্বান।

আজ সকাল থেকে একটা পয়সাও বউনি হয়নি। দিনটাই মাটি। চিৎকার করাই সার। আজকাল দোকানে রেডিমেড লেপ-কম্বল কিনতে পাওয়া যায়।

লেপ তৈরির ঝামেলায় গিয়ে মানুষ, তাই কিনে নিয়ে আসছে। কালাম আলির দীর্ঘশ্বাস তার মাথার উপর তুলাের বস্তাটাকে আরও ভারি করে তােলে।

মনে আশঙ্কার কালাে মেঘ উঁকি দেয়। যা দিনকাল পড়েছে, ভবিষ্যতে কেউ আর বােধহয় লেপ বানাবে না। তখন তার মতাে এই পেশায় যুক্ত লােকগুলাের কী হবে?

ছেলেবেলায় কালাম তার বাবাকে লেপ তৈরি করতে দেখত। বড় কাপড়ের খােলের মধ্যে পেঁজা তুলাে ঢুকিয়ে চলত সেলাই-এর কারসাজি। হাতের অসম্ভব দক্ষতায় তুলাের মধ্যে মােটা লম্বা সূঁচের লুকোচুরি খেলা, দেখতে বেশ লাগত।

লেপের উপর হরেক কিসিমের নক্সা বানাতে ওস্তাদ ছিল তার বাবা। লােকে এক ডাকে বসির আলিকে চিনত। আর একটা জিনিস ভালাে লাগত কালামের, যখন বসির ধুনুরিটা হাতে নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় তুলাে ধুনত। ঠিক যেন তানপুরা বাজাচ্ছে।

তাঁতের ধধশব্দে তুলাে চৌচির হয়ে যেত। তুলাের হালকা শরীর ছিন্ন ভিন্ন হয়ে উড়ে উড়ে পালাতে ব্যস্ত থাকত।

বেলা পড়ে আসছে। ডুবন্ত সূর্যর দিকে তাকিয়ে কালাম সময়টা অনুমান করার চেষ্টা করে। আজকের মতাে কাজ শেষ। এবার ফিরতে হবে। আস্তানায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। সেখানে ফিরে আবার খাবার তৈরি করতে হবে।

গ্রামের শেষ প্রান্তে এসে কামাল হঠাৎ শুনতে পায় কে যেন বলছে – লেপওয়ালা,ও লেপওয়ালা, একটা লেপ বানাই দিবে?

তুলাের বস্তাসমেত মাথাটা পিছনে ঘুরিয়ে কালাম দেখে একটি ছিপছিপে অল্পবয়সী বউ বাচ্চা ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কালামেরমুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

শেষবেলায় যদি একটা খদ্দের পাওয়া যায়, তা-ও আচ্ছা। মেয়েটি সামনে এলে,কালাম ব্যবসায়ী ঢঙে বলতে শুরু করে – ভাললা তুলাের লেপ হবে গাে।

এমন লেপ বানিয়ে দেব, ভাববে কালাম আলি কেমনতর ওস্তাদ। কোনদিকে বাড়ি তােমাদের, চল যাই।

মেয়েটি সামনের এক বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ায়। টালির ছাউনি দেওয়া দুটি ছােট ছােট ঘর। বাড়ির সামনে এক চিলতে উঠোন। নিকানাে উঠোনে কামাল তুলাের বস্তাটা

নামায়। ধুনুরিটা সযত্নে বস্তার পাশে রাখে। বাচ্চা ছেলেটি যন্ত্রটির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। তার মনে হরেক রকমের প্রশ্ন। কালাম তার চোখ দেখে বুঝতে পারে, ছেলেটি কিছু বলতে চায়। মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে – বাবু, কিছু বলবে মনে হচ্ছে?

ছেলেটা মনে সাহস পায়। জানতে চায় – তুমি এটা বাজাবে?

-না খােকন, এটা বাজনা নয়। এটা দিয়ে তুলাে ধুনতে হয়। দেখতে পাবে তুলােরা কেমন নাচ করবে?

তুলাের নাচ’কথাটা শুনে ছেলেটি বেশ আনন্দ পায়। যাক, লেপ বানানাের দৌলতে তুলাের নাচটা দেখা হয়ে যাবে।

কালাম এবার মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে – বলাে গাে বাছা, কেমন লেপ বানাবে?

-কত পড়বেক? মেয়েটির কণ্ঠস্বরে কালাম মুগ্ধ হয়। সুরেলা আওয়াজ। প্রথমবার সে খেয়াল করেনি। এবার মেয়েটির কণ্ঠস্বর কালামের মনে দাগ কাটে।

কামাল তুলাের বস্তার কাছে গামছাটা রেখে, দেওয়ালে হেলান দিয়ে আরাম করে বসে। খদ্দেরের মন রেখে বলে – বেশি নেব না গাে। ভাললা তুলাে, ভালাে কাপড় দেবাে। পাঁচশ’ টাকার মতাে পড়বে। এর চেয়ে সস্তা আর হবে না।

– অত টাকা আমার হাতে নাই। ইয়ার বাবা বাইরে কাজ করে। এক মাস পর এসে। টাকাটা নিয়ে যেও । কালাম চিন্তায় পড়ে। যাও বা একটা খদ্দের পাওয়া গেল, সে-ও কিনা ধারে মাল চায়। .. কপাল সত্যিই মন্দ তার।

 কালাম মাথা নেড়ে বলে – ধার দিই কী করে? লেপ বানিয়ে আর ক’টা টাকা লাভ হয়। বাপের কাছে এই কাজ শিখেছি, তাই এই ব্যবসাই করি। না করলে খাব কী? আমার ছেলে থাকলে, তাকে এ ব্যবসায় নামতে বারণ করতাম।

মেয়েটি কালামের চোখে চোখ রেখে বলে – আমরা তাে আর ঘর থিকে পালায় যাচ্ছি নাই। তুমার যদি ইচ্ছা থাকে দিবে …. কালাম মেয়েটিকে ভালাে করে দেখে। শান্ত ঢলঢলে চোখ-মুখ। দারিদ্রের ছাপ সর্বত্র। কিন্তু এই কমনীয় মুখে কীসের যেন হাতছানি আছে।

১ কালাম আলির মনে পড়ে যায় তার বিবির কথা। তার বিবিও একলা থাকে। আসার সময় হাতে সামান্য কিছু দিয়ে এসেছিল। বাড়ি ফেরার সময় একটা ভালাে শাড়ি আর সাজগােজের কিছু জিনিষ নিয়ে যেতে হবে। ফিরে গিয়ে যত ধার-বাকি আছে তা শােধ করতে হবে।

মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে বিবির কথা। একা মেয়েমানুষ, কেমন করে যে দিন গুজরান করছে !  কালাম আলি কিছু ভেবে বলে ওঠে – ঠিক আছে। আজ বউনি হয়নি। তােমাকে দিয়েই বউনিকরি। কিন্তু ঠিক এক মাস পর টাকাটা দিতে হবে। দাঁড়াও তােমার নাম লিখে নিই।

একটা ছােট্ট ডাইরি বের করে কালাম জানতে চায় —কী নাম তােমার? – আমিনা খাতুন। গ্রামের নাম সরাইবেড়িয়া। নাম-ধাম লিখে কালাম লেপ তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমিনা ভীষণ খুশি। বহুদিনের

শখ, একটা লেপ বানানাে। ছেলেট: ঠাণ্ডায় বড় কষ্ট পায়। এ নিয়ে হয়তাে স্বামীর কাছে অনেক কথা শুনতে হবে। তবে ছেলেটা তাে ঠাণ্ডার হাত থেকে রেহাই পাবে, নিশ্চিন্তে ঘুমােবে।  কালাম লেপের খােল সেলাই করছে দ্রুত হাতে। ছেলেটা অবাক চোখে কালামের হাতের কাজ দেখছে।

মােটা সঁচটা কাপড়ের মধ্যে পানকৌড়ির মতাে ডুবছে আর উঠছে। কালাম এক গ্লাস জল চায়। আমিনা জলের সঙ্গে বাটিতে করে একটু খেজুর গুড় এনে দেয়। এত দরিদ্রতার মধ্যেও এই সামান্য আন্তরিকতাও কালামের মনকে ছুঁয়ে যায়। তার বিবিও। কি তার অনুপস্থিতিতে এরকম আপ্যায়ন করে?

লেপের খােল তৈরি। এবার তুলাে পেঁজার পালা। রােদ প্রায় পড়ে এসেছে। দিনের আলাে যতটা সম্ভবকাজে লাগাতে চায় কালাম। কাল সকালেই কাজ শেষ করে অন্য গাঁয় যেতে হবে। বস্তা থেকে তুলাে বের করে কালাম। সাদা ধবধবে তুলাে যেন শীতে বেশি ফুলে উঠেছে।

ছেলেটা তার মাকে জিজ্ঞাসা করে –মা, এত তুলা কুথায় পাওয়া যায়?

কালাম-ই উত্তরটা দেয় সে অনেক কাণ্ড বাবু। দেখেছ তাে আকাশে কেমন সাদা মেঘ উড়ে বেড়ায়। আমার বাড়িতে একটা যন্ত্র আছে। ওই মেঘগুলাে ঘুরতে ঘুরতে যখন আমার বাড়ির সামনে আসে, তখন ওই যন্ত্র দিয়ে মেঘগুলােকে ধরে সােজা বস্তায় পুরে রাখি। দিন কতক বস্তায় রেখে দিলে মেঘগুলাে মরে যায়, তারপর তুলাে হয়ে বস্তায় থেকে যায়।

ছেলেটা হতবাক। বেশ মজার ব্যাপার তাে। সে মার দিকে তাকিয়ে আবদার করে – আমারও এরকম একটা যন্ত্র চাই। আমিও অনেক লেপ বানাবাে।

মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে – বাবা ফিরে আসুক। তখন কিনে দুবাে। ছেলেটা এবার আকাশের দিকে তাকায়। একটাও সাদা মেঘ নেই আকাশে। সেভাবে – কোথায় গেল মেঘগুলোে? তবে কী এই নােকটা সব বস্তায় পুরে নিয়েছে?

কালাম এবার ধুনুরি দিয়ে তুলাে ধুনতে থাকে। ঠিক যেন এক শিল্পী সেতার বাজাচ্ছে। এক অদ্ভুত শব্দে তুলাের খণ্ডগুলাে লাফ দিয়ে পালানাের চেষ্টা করে। তবে কালামের হাত থেকে পালাবার জো নেই। তাদের টেনে এনে কালাম ধুনতে থাকে।

ধুনুরি চালাতে চালাতেই কালাম আমিনাকে জিজ্ঞেস করে – তােমার স্বামী কোথায় চাকরি করে?

– বর্ধমানে? – সে তাে অনেক দূর! কী কাজ করে? – লাইন হােটেলে।

কালামের ধুনুরি থেমে যায়। লাইন হােটেল’কথাটা শুনেই আমিনার দিকে তাকায়। জায়গাটা যে খুব সুবিধার নয়। এই বিষয়ে তার তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে।

প্রয়ােজনে তাকেও হােটেলে দু-একরাত কাটাতে হয়েছে। অন্ধকার নামলেই লাইন হােটেল’ হয়ে ওঠে রহস্যপুরী। নানা দৃশ্য তার চোখে এখনও ভেসে ওঠে। অর্থর বিনিময় কত প্রলােভন। রঙিন হাতছানি সরিয়ে টিকে থাকাই মুশকিল। সে-ও একদিন

এই প্রলােভনে পা দেয়। তারপর ফতর হয়ে বিশ্রি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। কোনরকমে উদ্ধার পেয়ে মনে মনে সে আল্লাহর কিরে কাটে – এ পথে আর কোনদিন পা বাড়াবে।

না।

কালাম আমিনাকে বলে – অন্য কোথাও কাজ করলে বােধহয় ভালাে হত। আমিনা নিরুত্তর। তার চোখের চাহনি না-বলা অনেক কথাই বলে দেয়।

ধীরে ধীরে রাত নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। আর কাজ করা অসম্ভব। পেঁজা তুলােকে আলাদা বস্তায় রেখে ধুনুরিটা সযত্নে তুলে রাখে কালাম। ছেলেটার নজর এখনও এই ধুনুরি যন্ত্রটার উপর। সে কালামকে অনুনয়ের সুরে বলে – একবার দেখতে দিবে?

কালাম ধুনুরিটা ছেলেটার হাতে তুলে দেয়। ছেলেটি গভীর মনোেযােগ সহকারে যন্ত্রটিকে দেখে। দড়িটা ধরে একবার টান দেয়। শব্দ হলেও কিন্তু কেমন যেন। মনে মনে ঠিক করে – বড় হয়ে এ রকম একটা যন্ত্র বানাবে। নতুন নতুন সুর বাজিয়ে মাকে শােনাবে।

রাত ঘনিয়ে আসে। শীতের কাঁপুনিতে নিস্তব্ধ প্রকৃতি। একটা টিনের থালায় সামান্য কিছুমুড়ি আর খেজুড় গুড় নিয়ে আসে আমিনা। থালাটা কালামের সামনে রেখে বলে 

আজ আর কিছু নাই।

একটা লণ্ঠনের আলাে কালামের সামনে রেখে দিয়ে যায়। লণ্ঠনের আলােয় থালায় রাখা সাদা মুড়িগুলাে অমৃত’র মতাে দেখাচ্ছে। কালাম এতেই খুশি। খাওয়া শেষ করে উঠোনেই মুড়িসুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে।

গভীর রাতে আমিনার চিৎকারে কামালের ঘুম ভেঙে যায়। সে তড়িঘড়ি উঠে পড়ে। চোর এলাে নাকি? আমিনা লণ্ঠন হাতে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।

কালাম শশব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে গাে?

কাঁদতে কাঁদতে বলে, ছেলেটার খুব জ্বর। থরথর করে কাঁপছে। ভুল বকছে। এখন কী করব? * কালাম তৎক্ষণাৎ লেপের খােলটার মধ্যে পেঁজা তুলাে ঢুকিয়ে দেয়। খােলের মুখটা সুতলি দিয়ে বেঁধে নিয়ে আসে ছেলেটার কাছে। কালাম লেপটা ছেলেটার গায় চাপিয়ে দেয়।

আমিনাকে জিগ্যেস করে ঘরে জ্বরের বড়িআছেকিনা। আমিনা মাথা নেড়ে বলে নেই। তখন সে আমিনাকে ছেলের মাথায় জলপটি দিতে বলে। আমিনা তাই করে। কালাম ভীষণ অসহায় বােধ করে।

বারবার ছেলেটার কপালে হাত দিয়ে জ্বরের প্রকোপ বােঝার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে ছেলেটার জ্বর কমে আসে। আমিনা আর কালাম দুজনই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আমি মনে মনে কালামকে ধন্যবাদ দেয়।

কালাম ঘরের বাইরে আসে। ভাের হতে এখনও একটু সময় বাকি। হালকা কুয়াশায় মুড়ে রয়েছে চরাচর। বাকি রাতটা সেনা ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়। | সকাল হতেই বাকিকাজটা শেষ করায় মন দেয় কালাম। ছেলেটার আর এখন লেপের। দরকার নেই।

দক্ষ হাতে মােটা সঁচ খােলবন্দী তুলােকে এফোঁড়-ওফোড় করে নানা নক্সা ফুটিয়ে তােলে। কাজ করতে করতেই সে আমিনাকে জিজ্ঞাসা করে – তােমার পছন্দর। কোনও নক্সা করব নাকি?

আমিনা তাকে একটা তাসন এনে দেখায়। তাতে সূন্দর নক্সা করে আমিনা খাতা’

লেখা।

কালাম বলে – এ আর এমন কী? কালামের হাতের দক্ষতায় আমির নাম ভেসে aঠ লেপের উপর। আমিনার চোখ খুশিতেঝলমল করে ওঠে।

কালাম বলে – আমার নামটা ছােট্ট করে একপাশে লিখে দিলে আপত্তি নেই তাে?

আমিনা কী যেন ভাবে, তারপর বলে – ঠিক আছে, সেখ। কালাম লেপের উপর তার স্বাক্ষর রেখে দেয়।

লেপ প্রস্তুত। ছেলেটা যে কখন বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছে দু’জনের কেউ-ই লক্ষ্য করেনি। নতুন লেপ দেখে তার আর আনন্দ’র সীমা নেই। হঠাৎ কালামের কাছে এসে বলে – তুমি খুব ভালাে লােক। জানাে, আমার বাবা আমাকে একটুও ভালােবাসে না। তুমি যদি আমার বাবা হতে ..

আমিনা আর কালাম দুজনই চমকে ওঠে। বাবাকে কাছে না পাওয়ার বেদনা আর ছেলের প্রতি বাবার উদাসীনতা বুঝতে পারে দু’জনই। আমিনা ছেলেকে কোলে তুলে নেয়।

তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে না বাবা,উ কথা বলতে নাই। ইবার দেখবি তাের বাবা তাের জন্যি দারুণ খেলনাগাড়ি লিয়ে আসবে।

মা’র আশ্বাস ছেলেটার মনে বাবার প্রতি তার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনল না। কালামকে উদ্দেশ্য করে সে আবার বলল -তুমি সত্যি খুব ভালাে।

একটা ভালােলাগা কালামের মনকে ছুঁয়ে যায়। নিঃসন্তান কালামের মনে বাৎসল্য রস জাগ্রত হয়। তার মনে হয় যদি তারও এরকম একটি সন্তান থাকত তাহলে তাকে সে মনের মতাে করে মানুষ করতে পারত।

কালামের মনে পড়ে তার বিবির কথা। সে নয় ব্যবসা নিয়ে মেতে আছে, কিন্তু তার বিবিকে তাে একলা জীবন কাটাতে হয়! এ রকম একটা ছেলে থাকলে …।

কালাম আমিনাকে বলে – বাবুকে একবার আমার কোলে দিবা?

আমিনা একটু ইতস্তত করে। তারপর গত রাতের ঘটনাটা মনে পড়ে তার। এই অজানা অচেনা মানুষটি তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল বিপদের সময়।

কই, তার স্বামী তাে কখনও নিজের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে স্ত্রী-ছেলের সেবা করেনি। শরীর খারাপের কথা বললে, তির্যক হেসে বলত – ছোেটলােকের আবার শরীর খারাপ!

তারপর থেকে শত কষ্টেও আর শরীর খারাপের কথা বলেনি আমিনা। দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করত।

কালাম হাত বাড়াতেই, ছেলেটা তার কোলে চলে আসে। শরীরের প্রতিটি কোষে একটা শিহরণ খেলে যায় কালামের। সে ভেবে পায় না কীভাবে একে আদর করবে। কোল থেকে নামিয়ে, ছেলেটির হাতে একটা দশ টাকার নােট ধরিয়ে দেয় কালাম।

বলে – এটা রাখ বাবু, পরে কিছু কিনি খাবা।

আমিনা আপত্তি জানায়। বলে – টাকা দিচ্ছ কেন? তুমার কাছেই আমাদের ধার থাকছে…।

– এটা ব্যবসার টাকা নয়। টাকাটা ফিরত দিলে খুব দুঃখ পাবাে। কালাম বলে। আমিনা আর কথা বাড়ায় না।

বেলা বাড়ছে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। আরও দুটো গ্রাম ঘুরতে হবে। তুলাের বস্তা মাথায় আর ধুনুরিটা কাঁধে নেয় কালাম। যাবার আগে বলে – আমি ঠিক এক মাস পরে আসব। তখন না কোরাে না কিন্তু।

আমিনা মাথা নাড়ে।

– লেপ বানাবে… লেপ। কালামের চিৎকার ধীরে ধীরে গ্রামের প্রান্তে মিলিয়ে যায়। কালামের দেওয়া দশ টাকার দিকে তাকিয়ে থাকে ছেলেটা।।

(দুই) ছেলেটা উঠোনে খেলছে। ঘরের চৌকাঠে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে আমিনা। তার হাতে একখানা পােস্টকার্ড।

এই সময় হাজির হয় কালাম। ঠিক এক মাস পর সে এসেছে। হাতে একটা ঝােলা, উসকো-খুশকো চুল। গালে বহুদিনের না কামানাে দাড়ি। চোখে মুখে একটা বিহুল দৃষ্টি। কালামকে দেখে আমিনা উঠে দাঁড়ায়। মনে মনে এই ভেবে বিরক্ত হয়, যে টাকা পাবে বলে দিনের দিন হাজিরা দিতে হবে।

তারপর মনে হয় – কালামের দোষ কোথায় ? সে-ও তাে গরিব মানুষ। লেপ বেচে তার কতই বা লাভ হয়? তাকে সে ধার দিয়েছে এই ঢের। শীতকালে তাে ঠাণ্ডায় কষ্ট পেতে হয়নি।

কালাম এসে ছেলেটাকে ডাক দেয় – কই গাে বাবু, কোথায় গেলে?

ডাক শুনে ছেলেটা ছুটে আসে। কালাম তার ঝােলা থেকে দুটো চকোলেট বের করে তার হাতে দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে বলে – এগুলাে তােমার জন্য এনেছি, নাও।

ছেলেটা বলে ওঠে – তুমি ভুত?

কালাম হাে-হাে করে হসে ওঠে। একমুখ দাড়ি, উসকো-খুশকো চুল, ভূত ছাড়া আর কী বলা যায় তাকে।

ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে বলে – ভুত হয়ে তােমাকে ধরতে এসেছি।

– তুমার তুলার বস্তাটা কুথায়? আর সেই যন্ত্রটা?

কালাম তাকে বুঝিয়ে বলে, শীত চলে গেলে তুলাে আর বস্তায় থাকতে চায় না। তখন তাদের আকাশে ছেড়ে দিই। আবার যখন শীত আসবে তখন যন্ত্র দিয়ে ওদের বস্তায় ভরে নেব।

– আচ্ছা, আমাদের লেপের তুললাগুলাে পালাতে পারবে নাই ? -একদম না। এমন সেলাই করে দিয়েছি যে ওরা আর নড়তে চড়তে পারে না।

ছেলেটার চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক্করে। সে কোল থেকে নেমে সােজা ঘরে চলে যায় দেখতে, যে লেপের তুললাগুলাে নড়াচড়া করছে না চুপচাপ আছে।

আমিনা এগিয়ে এসে বলে -তুমার কি টাকাটো আজই চাই?

কালামের চোখ দুটো আমিনাকে জরিপ করে। আমিনার চোখেমুখে একটা ছন্নছাড়া ভাব। পােকায় কুরেকুরে খাওয়া ফোপরা বাঁশের মতাে মনটাও যেন ওই বিষন্ন চেহারায় ধরা দিয়েছে।

কালাম ধরা গলায় বলে – টাকাটা দিতে পারবে না?

– না। একটা অসহায় নারীকণ্ঠ ক্ষীণভাবে বেরিয়ে আসে। – তুমিই তাে বলেছিলে …। টাকাটা না পেলে আমার খুব ক্ষেতি হয়ে যাবে। – কিন্তু … : – কিন্তু কি? মুঠোর মধ্যে ধরে থাকা চিঠিটা প্রায় অপরিচিত এক ভিনদেশীর হাতে দিয়ে বলে – তুমি তাে পড়তে জান?

– হ্যা জানি। নিজের সংসারের দুঃখের কথা অপরকে জানিয়ে সহানুভূতি আদায় করা আমিনার স্বভাব নয়। কিন্তু লেপের বাকি টাকাটা দিতে পারবে না – এ কথাটা বিশ্বাস করাতে এছাড়া তার অন্য কোনও পথ নেই।।

কালাম চিঠিটা পড়ে। শুধুমাত্র কয়েকটি অক্ষর যা একজন অসহায় নারীর কাছে শক্তিশেলের চেয়েও মারাত্মক।

চিঠিটা ফেরত দিয়ে কালাম শুকনাে গলায় বলে – তােমার স্বামী এতটাই নিষ্ঠুর? এমন সুখের পরিবার কেউ ছেড়ে দিতে পারে?

বুকের মধ্যে আটকে থাকা দলাপাকানাে দুঃখটা আমিনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে – | ও আমাকে কখনােই পছন্দ করত না। অনেকদিন আগেই ছেড়ে দিত। কিন্তু বাবার চাপে

পড়ে কিছু করতে পারে নাই। গতবছর বাবা মারা যাওয়ার পর উ যা খুশি তাই করতে থাকে।

কালামের এই দুঃখের পরিবেশেও হাসি পায়। ভাবে দু’জনেরই সমান দুর্ভাগ্য আজ একই জায়গায় নিয়ে এসেছে। কালাম বাড়ি ফিরে দেখেছিল, তার বিবি বাড়িতে নেই। ভেবেছিল বাপের বাড়ি গেছে, ফিরে আসবে।

কিন্তু প্রতিবেশী রসিক মল্লিকের কথায় তার সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। রসিক মল্লিক বলে – তাের বিবি পাড়ার ছােকরা আবদুলের সঙ্গে পালিয়েছে।

কালামের চোখ ফেটে জল আসছিল। তবু সে কাদতে পারছিল না। সে নিজেকে সংযত করে। ভাবে – যে ধােকা দিয়ে চলে গেছে তার জন্য কান্না কীসের?

অতীতের বহু স্মৃতিই তার মনে ভােলা পাতার মতাে উড়ছিল। সংসার যে অসার – মনে মনে এই ধারণা তার বদ্ধমূল হয়।

‘বউ পালিয়েছে, এই নিয়ে কম টিটকিরি সহ্য করতে হয়নি তাকে। সেদিন মােক্তার চাচা বলে –হ্যা রে কালাম, বিবিকে ধরে রাখতে পারলিকনাই? বিবিকে ঠিকঠাক খাতি দিতিস তাে?

কালাম উত্তর দেয় – খাতি না দিলে চলে চাচা? মােক্তার রহস্য মাখা হাসি হেসে বলে -তুই শুধু পেটের খিদেটাই বুঝিস, শরীরেরও যে একটা খিদে থাকে সেটা বুঝলি না!

কালাম স্পষ্ট বুঝতে পারে, মােক্তার চাচার ইঙ্গিত তার পৌরুষ নিয়ে। তার নিজের মনে ধিক্কার জন্মায়। সত্যি তাে, সে তার বিবির মন বােঝার চেষ্টা করেনি কোনদিন।

আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটিও কী তার স্বামীর মনের খিদে মেটাতে পারেনি?

কালাম আর ভাবতে চায় না। তার টাকা চাই। মন দিয়ে ব্যবসা করবে। কোনও নারীর পাল্লায় সে আর পড়তে রাজি নয়। কী দরকার মরীচিকার পিছনে দৌড়ে? কালাম নির্লিপ্ত

গলায় বলে – আমার টাকার কী হবে?

আমিনা অথৈ জলে পড়ে। তৈরি করা লেপ তাে আর ফেরত দেওয়া যায় না। হঠাৎ কালামের হাত দুটো চেপে ধরে। কালামের শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়।

আমিনা কান্না-ভেজা গলায় বলে – আমার আর কেউ নাই। বাবা ছিল, মারা গেছে। পাড়ার দু-একটা খারাপ লােক আমার পিছনে লাগে। ইবার সুযােগ পেয়ে আমারে ছিড়ে খাবে।

তুমার টাকাটাও দিতে পারব নাই। এখন কী করব আমি? | কালাম অকুল পাথারে পড়ে। লেপ বিক্রি করতে এসে এমন আজব সমস্যায় পড়বে ভাবতেও পারেনি সে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। এবার ফিরবেকীভাবে? এ সময় না এলেই ভালাে হ’ত। আমিনাকে শেষ বারের মতাে জিজ্ঞেস করে – তাহলে টাকার ব্যবস্থা কী হবে?

আমিনা নীরব থাকে। কালাম ভাবে, চলে যাবে কিনা।

আমিনা হঠাৎবলে ওঠে – আজ রাতটাইখানে থাকে যাও। কাল সকালে যেমন করে পারি তুমার টাকার ব্যবস্থা করবই। | কালাম দ্বিধাগ্রস্ত হয়। আমিনা বলে – এই গেরামে একজন আছে যে রেতের বেলায় টাকা দিবেক নাই। কাল সকালে অবশ্যি তুমার টাকা মিটাই দুব।

টাকাটা তার চাই -এটা ভেবেই কালাম রাতটা সেখানে কাটাতে সম্মত হয়। উঠোনে পাতা ছেড়া মাদুরের উপর বসে পড়ে কালাম। আমিনা ঘরের ভিতরে চলে যায়।

বাচ্চা ছেলেটা কালামের কাছে এসে নানা রকম প্রশ্ন করতে থাকে। কালাম ছেলেটাকে কোলের উপর বসিয়ে হাসিমুখে সব প্রশ্নর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে।

কিছুক্ষণ পর আমিনা একটা বাটিতে একটু মুড়ি আর এক গ্লাস লাল চা এনে কালামের সামনে রাখে। কালামের পেটে বহুক্ষণ কিছু পড়েনি। মনে মনে আমিনার আতিথেয়তাকে সে ধন্যবাদ জানায়।

আমিনা সামনের কলতলায় জল আনতে যায়। লণ্ঠনটা মাটিতে রেখে, সে টিপকল চেপে কলসীতে জল ভরতে থাকে। হঠাৎ লণ্ঠনটা নিভে যায়, আর একটা লােক তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। লােকটার লাম্পট্য’র হাসি আমিনার কানে বিধতে থাকে। আমিনা অসহায় ভাবে চিৎকার করে ওঠে।

কালাম চা-টা শেষ করে বাচ্চাটার সঙ্গে গল্প করছিল। আমিনার চিৎকার তার চমক ভাঙে। সে বাচ্চাটাকে পাশে বসিয়ে রেখে দ্রুত কলতলার দিকে যায়।

দেখে আমিনার সঙ্গে একটি লােকের ধস্তাধস্তি চলছে। কালাম দেরি না করে সােকটাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। আচমকা আক্রমণে লোেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কালাম সােকটার মুখে একটা ঘুষি মারে। লােকটা ভয় পেয়ে পালায়।

আমিনার অবস্থা ঝড়ে বিধ্বস্ত পাখির মতাে। কালাম বুঝতে পারে আমিনার সামনে সমূহ বিপদ। আমিনা যে তাকে মিথ্যা বলেনি, সেটা তার হৃদয়ঙ্গম হয়। কালাম বুঝতে  পারে, এবার ব্যর্থ হলেও লােকটা আবার ফিরে আসবে।

নিজের সীমাবদ্ধতা জেনেও কালাম আমিনাকে বলে – ভয় নেই, আমি আছি।

ভরসা দিয়েও কালাম মনে মনে ভাবে, টাকাটা মকুব করা ছাড়া আর সে কী-ই বা করতে পারে?

কালাম ঘরের দিকে পা বাড়াতে, আমিনা তার হাত দুটো চেপে ধরে।

কালাম মুখে কিছু বলে না। মনে মনে ভাবে তার হাত দুটো ধরে যদি আমিনার মানসিক শক্তিটা ফিরে আসে, ক্ষতি কী!

ছেলেটা ইতিমধ্যে কাঁদতে শুরু করেছে। আমি ঘরে এসেই ছেলেটাকে কোলে তুলে নেয়, তারপর অঝােরে কেঁদে ফেলে। কালামের খুব খারাপ লাগে ক্রন্দনরত মা-ছেলেকে দেখে।

রাত বাড়ে। সামান্য কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ে সবাই। কালাম উঠোনে পাতা ছেড়া মাদুরের উপর গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে।

আমিনার চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে সে ছটফট করতে থাকে। চোখ বন্ধ করতেই কলতলার দৃশ্যটা অক্টোপাশের মতাে গিলে খেতে চায় তাকে। লােকটা যদি আবার আসে তখন কী হবে ভেবে তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে যায়। মাথা যন্ত্রণা করছে। তাকে কী শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে হবে? তাহলে তার বাচ্চা ছেলেটার কী হবে? আর সে ভাবতে পারে না।

দরজা খুলে বাইরে আসে আমিনা। কালাম অঘােরে ঘুমােচ্ছ। ছেড়া মাদুরের উপর তার সুঠাম শরীরটা দ’-এর আকারে পড়ে আছে। আমিনার মনে অনেক অঙ্কর খেলা চলে। একজন ভিনদেশী হওয়া সত্ত্বেও,

কালামকে তার আপন বলে মনে হয়। কালামের শরীরে হাত দিয়ে গিয়েও সে থমকে যায়। অস্থির পেণ্ডুলামের মতাে তার মনটা আশা-নিরাশায় দুলতে থাকে।

সে আবার ঘরে চলে আসে। একটা মাদুরের উপর নতুন লেপটা পাতে। তার উপর শুয়ে সে কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে। চোখ বন্ধ করলেই তার কলতলার দৃশ্যটা তার চোখের সামনে আসে। আমিনা এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। দ্বিধা-দ্বন্দ’র ধারালাে কচি তার মনকে ফালাফালা করে দিতে থাকে।

আমিনা আবার দরজা খুলে বাইরে আসে। কালাম এখনও গভীর ঘুমে অচেতন। সে স্বপ্ন দেখছে, তার বিবি ফিরে এসেছে, তাকে ডাকছে। ক্ষমা চেয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

বহুদিনের বুভুক্ষু কালাম তার বিবিকে আদর করে বুকে টানতে যেতেই, তার ঘুমটা ভেঙে যায়। দেখে আমিনা তার বুকের উপর। সে লজ্জা পেয়ে আমিনাকে দূরে সরিয়ে দেয়। জিগ্যেস করে – তুমি এখানে?

আমিনা ফিসফিস করে তাকে জিগ্যেস করে – তুমি আমাকে পছন্দ করাে? কামাল কোনও উত্তর দিতে পারে না।

আমিনা আবার বলে – কই বললে না তাে ? তুমি না বললে ওই শয়তানগুলাে আমাকেশকুনের মতাে ছিড়ে খাবে।

কালাম দোটানায় পড়ে। তার বিবি চলে যাওয়ার পর সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল -সে আর কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়বে না। সে আমিনার কেউ নয়। কী দরকার নতুন

করে ঝামেলায় পড়ার! সে বলে ওঠে – কিন্তু! ‘ আমিনা ক্ষুব্ধ হয়ে বলে ওঠে – তুমি পুরুষ মানুষ! আমি তবে গলায় দড়ি দিয়েই

মরব।   আমিনা দৌড়ে ঘরে ঢুকে যায়। দরজা বন্ধ করে না। কালাম খােলা দরজা দিয়ে ভিতর দিকে তাকায়। এখনও তার মন দোলাচলে ভুগছে। দ্বিধা-দ্বন্দ’র ঘূণপােকাটা তাকে করে কুরে খাচ্ছে।

কালাম ধীর পায় ঘরে ঢােকে। আমিনা মেঝেতে পাতা লেপের উপর শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। কালাম এসে ফিসফিস করে বলে — মরণ কি এতই সহজ? | আমিনা মনে শক্তি ফিরে পায়। মনের মধ্যে শয়তানদের উল্লাসের ছবিটা ফিকে হয়ে যায়।

লতার মতাে সে কালামকে জড়িয়ে ধরে। কালাম বাধা দেয় না। ধুনুরি চালানাের দক্ষ হাতে সে আমিনার শরীরে নতুন সুর তােলে। সে যে কাপুরুষ নয়, তার প্রমাণ দিতে।

একমাসের পুরানাে লেপের উপর অচেনা দুটো শরীর দীর্ঘদিনেরনা পাওয়া অনুভূতিগুলাে খুঁজে নিতে ব্যস্ত।

কালামের সুঠাম শরীর আশ্রয় করে আমিনা নিজেকে উজাড় করে দিতে চায়। দু’জনের মিলনের সাক্ষী হয়ে পড়ে থাকে নকশা কাটা লেপটা ।

 

 

 

বাকপ্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা  থেকে সংগৃহীত  **

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *