লঞ্চ দুর্ঘটনার সন্ধ্যায়

  সব্যসাচী নজরুল

হেমন্তের শুরুতে ঝলমলে সোনারোদে বালিহাঁসের এলোপাতাড়ি ওড়োখেলার মাঝে, ঢেউহীন পদ্মার ডুবোচরের খানিক পাশ দিয়ে খানিক উপর দিয়ে ঠ্যা ঠ্যা শব্দ করে মাওয়া ঘাটের পানে এগিয়ে চলেছে লঞ্চ। কেউ কেউ লোকাল সিটে, কেউ কেউ কেবিনে বসে খোস গল্পে মেতেছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নদীজল,পাখির ওড়াওড়ি,পাড়ের কাশবনের দোল খাওয়া দেখে আনন্দে হঠাৎ হঠাৎ হইচই হইহূল্লোর করাটাও বেশ জমে উঠেছে।

কনক যাতায়াতের মাঝে বরাবরের মতই লঞ্চের মাষ্টার ব্রিজে সারেংয়ের পাশে বসে এসব অবলোকন করছিলো আর সারেংয়ের সাথেও টুকটাক কথা বলছিলো। এরই মধ্যে দিনের আলো নিভে গিয়ে জলের মাঝে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দারুন একটা রিদমে জলকেটে লঞ্চ টি একটু বেশি স্পিডেই সম্মুখে এগিয়ে চলছিল।

কেন জানি মনের অজান্তেই কনক সারেংকে বেশ ক’বার বলে একটু সাবধানে দেখে শুনে লঞ্চ চালান, সারেং কনকের কথায় কর্ণপাত না করে অনেক টা অন্যমনস্ক হয়ে লঞ্চ চালাচ্ছিল। পাশাপাশি দুটি লঞ্চ অল্পের জন্য কোন সংঘর্ষ না হয়ে ওভারটেক করে যায়।

এবার কনক সারেংকে ধমকের স্বরে বলে লঞ্চ ডুবাবেন  নাকি, বলতে বলতেই ফুল স্পিডে ফেরী কেতকী সামনাসামনি এগিয়ে আসছে। ভয়ানক দৃশ্যটি দেখে কনক সহ লঞ্চের প্রায় সকল যাত্রীই আল্লারে বলে চিৎকার করে ওঠে। লঞ্চ সরান সরান বলতে বলতেই, সারেং লঞ্চ সরাতে গিয়ে ডুবোচরের বালি কেটে অপসারণকারি সিনো হাইড্রোর ডাম্প পাইপের সাথে বিকট শব্দে ভয়াবহ সংঘর্ষ  ঘটে একপাশে কাত হয়ে যায়। অল্পের জন্য না ডুবলেও পিছনদিকে ফেটে গিয়ে দ্রুত পানি ওঠতে শুরু করে লঞ্চটিতে। যাত্রী সকল আল্লারে, আল্লারে, বাঁ-চা-ও বাঁ-চা-ও…  বলে চারিদিকে চিৎকার চেঁচামেচি করে ওঠে।

কনকও এর বাইরে নয়, তবুও কনক সাহসের সাথে এ বিপদের মোকাবিলা করার মানসে মাষ্টার ব্রিজ থেকে বেরিয়ে এসে দেহের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে চিৎকারে বলে ওঠেন কেউ নড়াচড়া করবেন না, যে যেখানে আসেন সেখানেই দাড়িয়ে থাকুন।

নড়াচড়া করলে লঞ্চ একদিকে কাত হয়ে ডুবে যাবে। এরই মধ্যে একটু অদূরে যাত্রী নিয়ে চলতে থাকা  ১৫-২০টি স্পিডবোট, দুটি লঞ্চ দুর্ঘটনায় পতিত লঞ্চের কাছে চলে আসে। সাথে সাথেই কনক অনেক টা নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে দ্রুততার সাথে লঞ্চে স্পিডবোটে তুলে দিতে লাগলেন।

কনক চিৎকার করে বলতে থাকেন, বড়রা কেউ একপাশে না এসে দু’পাশ থেকেই লঞ্চে, স্পিডবোটে উঠে পড়ুন। এদিকে লঞ্চে পানি ওঠার মাত্রাও বেড়ে যায়। যা হোক একদিকে পানি ওঠছে অপরদিকে যাত্রীরা অন্য লঞ্চ ও স্পিডবোটে উঠছেন। ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে কোলে করে কনক নামিয়ে দিচ্ছেন।

কখন যেন ডানহাতের পৃষ্ঠদেশ, কব্জি বরাবর কেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে সেদিকে কনকের কোন ভ্রক্ষেপও নেই। বারবারই মনে হচ্ছিল, এমন করেই ক’বছর আগে এমভি পিনাক লঞ্চ টি প্রায় ২৫০জন যাত্রী নিয়ে ডুবে যায়। ৩০-৪০ সাঁতরে পাড়ে ওঠতে পারলেও বাকি সবাই পদ্মার জলের অতলে চিরতরে হারিয়ে যায়। হয়তো এ যাত্রা আল্লাহ বাঁচিয়ে দিবেন..

কতো ভাবনার উদয় হয় কনকের মনে, তবুও সে সাহস হারাননি। যারা যাত্রীদের নিরাপদ নামানোয় সাহায্য করেছে এমন ৫-৬ জন যুবকসহ কনক ও লঞ্চ স্টাফরা মাষ্টার ব্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে। যেন কনক আজকের এ যাত্রী নিরাপত্তা প্রতিবিধানের প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত, সবাই কনকের নামার অপেক্ষায়।

কনক ফিরে তাকাতেই ক’জন বলে ওঠে ভাই আমাদের এখনি নামতে হবে, তা না হলে আমাদের সহ লঞ্চ টি ডুবে যাবে। চলেন নেমে পরি। ভাবনার জগতে কনক যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। অল্প সময়ে সবাই উদ্ধারকারী স্পিডবোট, লঞ্চে করে মাওয়া পাড়ে চলে আসে। কনকও স্পিড থেকে নেমে পার্শ্ববর্তী ডাক্তারের কাছে রক্তক্ষরণ বন্ধের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিয়ে ঢাকার পথে যাত্রা করে। তবে কিছুতেই মন থেকে নামাতে পারছে না দুঃসহ লঞ্চ দুর্ঘটনার সন্ধ্যার সেই ভয়ানক স্মৃতি।

লেখক: সব্যসাচী নজরুল
ছড়াকার, কবি, মঞ্চাভিনেতা ও কলামিস্ট।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *