লক্ষ্মীমন্ত

সম্পূর্ণা সাহা    

‘লক্ষ্মীমন্ত’ শব্দটা মোটামুটি সকলেই শুনেছি।মেয়েরা সাধারণত: ছোটো থেকেই শব্দটা শুনে থাকে।বাড়ির লোকেরা আষ্টেপিষ্টে তাকে লক্ষ্মীমন্ত করতে চায়,নাহলে যে ভালো ঘরের বউ হতে পারবে না।

আর ছেলেরা একটু প্রাপ্তবয়সের ধারে কাছে ঘেঁষলে ‘লক্ষ্মীমন্ত’ কথাটা ভালো করে বুঝে যায়।তখন তার বাড়ির লোকের চিন্তা ছেলের বউটা যেন লক্ষ্মীমন্ত হয়।ব্যাস,শুরু হয় সেই প্রচেষ্টা।

আগেকার দিনে মেয়েদের ছোট থেকে ওই ‘লক্ষ্মীমন্ত’ করেই বড়ো করা হত।সারাদিন ঘরের কাজে ব্যস্ত,পড়াশোনার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই,বাড়ির ছেলেদের সব কথা মুখ বুঝে মানতে হবে-অন্যথায় সে লক্ষ্মীমন্ত নয়।ধীরে ধীরে যুগ পাল্টালো।

মেয়েরা স্বাধীনতা পেতে শুরু করলো।তবে এই স্বাধীনতা বাহ্যিক মাত্র।তারপরেও কত ঘরে মেয়ে সন্তানকে লক্ষ্মী নয়,বোঝা মনে করা হয়।তাদের বেশীদূর পড়াশোনা শেখানো হয় না,সেই তো বিয়েই দিতে হবে।পড়ার টাকা বাঁচিয়ে সেই বিয়ে দেওয়া হবে।

এখনও কন্যাভ্রূণ হত্যা হয়,মেয়েদের সঠিকভাবে লেখাপড়া শেখানো হয় না,স্বাবলম্বী হতে দেওয়া হয় না।কিছু উদারচিত্ত মা-বাবা আছেন এই সমাজে।তাঁরা মেয়ে সন্তানদেরও ছেলেদের মতো মানুষ করেন।তবে সেই মেয়ের ঘর পাল্টালে মানসিকতাও পাল্টায়।তখনই লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটা হয়ে ওঠে অলক্ষ্মীমন্ত। প্রশ্ন ওঠে মা-বাবার দেওয়া শিক্ষায়।

আচ্ছা,যে মেয়েটা বন্দুক হাতে সীমান্তে পাহারা দিচ্ছে সে কী লক্ষ্মীমন্ত নয় ? যে মেয়েটি শহরের কোনো বড়ো দুর্ঘটনাকে আটকাচ্ছে,সে কী লক্ষ্মীমন্ত নয়?যে মেয়েটা নিজে রোজগার করে স্বামীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসার চালায়,সে কী লক্ষীমন্ত নয়?

ঘরের অসুস্থ বাবা-মাকে যে রোজগার করে খাওয়াচ্ছে,সে কী লক্ষ্মীমন্ত নয়?শহরের নিষিদ্ধ গলি থেকে উপার্জন করে আনা যে মেয়েটা অনাথ ভাই-বোনদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে, সে-ও কী লক্ষ্মীমন্ত নয় ?

তাহলে লক্ষ্মীমন্ত কারা?কেমন হলেই বা লক্ষ্মীমন্ত হওয়ায় পুরো নম্বর পাওয়া যাবে?সত্যিই কী তাতে জীবনটা শুধরাবে?রাতের অন্ধকারে নির্ভয়ে রাস্তায় চলা যাবে?

বিয়েতে কম পণ সত্বেও নতুন সংসারে মাথা উঁচু করে বাঁচা যাবে?নাকী সেই লক্ষ্মীমন্তকেই আবার নিজেকে রক্ষা করতে সংহারক হতে হবে?তাহলে কী লাভ?সেই তো সংহারক রূপ দেখে আঙুল উঠবে অলক্ষ্মীমন্ত বলে।

থাক ! তার চেয়ে বরং আমরা মেয়েরা ‘অলক্ষ্মীমন্ত’ হয়েই থাকি ।

 

………………..————–………………..

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: