রামকৃষ্ণ রায় বা রামকৃষ্ণ কবিচন্দ্র( ১৫৯০-১৬৮৪ )

স্বপন নন্দী

সপ্তদশ শতকের শিবায়ন কাব্যধারার বিশিষ্টতম কবি রামকৃষ্ণ রায় বা রামকৃষ্ণ কবিচন্দ্র। তার কাজের মাত্র দু’খানি পুঁথি পাওয়া গেছে। মাত্র দু’খানি পুঁথিতেই তাঁর কবিত্বশক্তি, পরাণপ্রজ্ঞ, মেধা ইত্যাদির উৎকর্ষতা মূল্যায়ন করলে শুধু শিবায়ন কাব্যের ধারাতেই নয়, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে তিনি চিহ্নিত হয়েছেন।

এমন যিনি প্রতিভাসম্পন্ন কবি, তার জন্ম হাওড়া জেলার আমতা নিকটবর্তী রসপুর গ্রামে। তার বংশধর। শ্রীযুক্ত পাঁচুগােপাল রায়ের বাড়িতে সযত্নে রক্ষিত দলিলপত্র থেকে অনেক সূত্র আবিষ্কৃত। হয়েছে। ড. দীনেশরঞ্জন ভট্টাচার্য ও ড. আশুতােষ ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় সাহিত্য পরিষদ থেকে রামকৃষ্ণের ‘শিবায়ন’ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যে আত্মপরিচয়জ্ঞাপক শ্লোকে কবির বংশপরিচয় জানা যায়।

পিতামহ রায় যশশ্চন্দ্র মহামতি।

তার পদাম্বুজে মাের অশেষ প্রণতি।

পিতামহী বন্দিলাম নাম নারায়ণী।

সরস্বতী বন্দিলাম তাঁর সতিনী।

মাতামহ বন্দিলাম সূর্য মিত্র।

তেয়জ কুলীন জিহো পবিত্র চরিত্র।

পিতা কৃষ্ণরায় বন্দো সর্বশাস্ত্রে বীর।

যাহার প্রসাদে মনুষ্য শরীর।

মাতা রাধাদাসীর চরণে দণ্ডবৎ।

যাঁর গর্ভবাস হইতে দেখিনু জগৎ |

কায়স্থ দক্ষিণ রাঢ়ি বংশেতে উৎপত্তি।

গােত্র কাশ্যপ আমার দেবতা প্রকৃতি।

মিরাস বন্দিনু বাস্তু রসপুর দেশ।

এতদূরে ভাইরে বন্দনা হৈল শেষ।

কবির বংশধর শ্রী পাঁচুগােপাল রায় বলেন, ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দের আগে কবির জন্ম। এ। তথ্য যদি সত্য হয়, তবে কাব্যটি ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত বলে মনে হয়। কিন্তু মুদ্রিত গ্রন্থের সম্পাদকগণ নানা তথ্য থেকে অনুমান করেছেন যে, ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে কবির জন্ম হয়েছে এবং মৃত্যু আনুমানিক ১৬৮৪ খ্রিঃ।।

রামকৃষ্ণ রায় শিবায়ন কাব্য রচনার সময়েই ‘কবিচন্দ্র’ উপাধি লাভ করেন। পিতামহ যশশ্চন্দ্র অর্থাৎ যশ’ নাম থেকে যশপুর >রসপুর নাম হয়েছে তার জন্মভূমির। সম্রাট শের শাহের সময় শাসনকার্যের দায়িত্ব নিয়ে যশশ্চন্দ্র রসপুরে বসতি স্থাপন করেন। তিনি একজন সুদক্ষ শাসনকর্তা ছিলেন। সুতরাং তার নামে পরবর্তীকালে গ্রামের নামকরণ হওয়া অসম্ভব নয়।

ছাব্বিশটি পালায় বিন্যস্ত শিববিষয়ক এই কাব্য। এই কাব্যের পালা নির্বাচন ও অধ্যায়। বিভাগ হতে বােঝা যাবে কবি সংস্কৃত পুরাণে বিশেষ অভিজ্ঞ। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পালায় সৃষ্টিতত্ত্ব, কালবিভাগ ও তীর্থ মাহাত্ম সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে।

৪র্থ ও ৫ম পালায় সতীর দেহত্যাগ ও দক্ষযজ্ঞ বিনাশ, ৬ষ্ঠ পালায় তারকাসুর বধ। ৭ম ও ৮ম পালায় মহাদেবের তপােভঙ্গ, মদনভস্ম, পাবর্তীর তপস্যা এবং মহাদেবের গৌরীকে পত্নীরূপে গ্রহণের ইচ্ছা বর্ণিত হয়েছে।

৯ম থেকে ১৫ পালায় হরগৌরীর বিবাহ, ১৬শ পালায় মনসার কাহিনি, ১৭শ পালায় সমুদ্রমন্থন, ১৮শ পালায় সাগররাজার উপাখ্যান ও গঙ্গা আনয়ন, ২১শ পালায় ত্রিপুরাসুর ও তারকাসুরের কাহিনি।

২২শ পালায় শিবদুর্গার কোন্দল, ২৩শ পালায় অন্ধকের গল্প, ২৪শ পালায় অন্ধকবধ, ২৫শ পালায় পরশুরাম ও রাবণের গল্প এবং ২৬শ পালায় বাণরাজের কন্যা উষা ও কৃষ্ণনন্দন অনিরুদ্ধের প্রণয়, ফলে বাণের সঙ্গে কৃষ্ণের যুদ্ধ, পরিশেষে হরিহরের সখ্য এবং উষা-অনিরুদ্ধের মিলনে কাব্য সমাপ্ত হয়েছে।

যদিও শিবায়ন শিবপ্রশস্তি মূলক কাব্য, কিন্তু তাঁর কাব্যে চৈতন্য নিত্যানন্দের সশ্রদ্ধ উল্লেখ থেকে ধর্ম সম্পর্কে তাঁর উদার দৃষ্টি ভঙ্গির পরিচয় উদ্ভাসিত হয়। হরপার্বতীর জীবনচিত্রের মধ্য দিয়ে সমকালীন বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ছবিটি ফুটে উঠেছে।

বিশেষ করে শিবের বিবাহাচার প্রসঙ্গের বিস্তৃত বিবরণে বাংলার লােকায়ত আচারপ্রথা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। সমকালিক বাংলার সামাজিক প্রথায় বিবাহাচার একটি মুখ্য বিষয় ছিল। বিবাহবাসরে বরকে এয়ােতিগণ নানা প্রশ্ন করত।

প্রশ্নগুলির বিষয়বস্তুতে লােকসংস্কৃতির নানা আদল ফুটে ওঠে। ফটে ওঠে সমাজানগত্যের নানা ছবি। | মঙ্গলকাব্যের প্রথাগত ধারাকে স্বীকার করে নিয়েও রামকৃষ্ণ রায় দেবতাকে প্রিয় করেছেন এবং প্রিয়কে দেবতা।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এবং বৈষ্ণব পদাবলী-র রাধা ও কৃষ্ণ যে অর্থে কবিদের কলমে লৌকিক হয়ে উঠেছে, সেই অর্থ থেকেই শিবায়ন-এর শিব, পার্বতী, গঙ্গা, নারদ প্রমুখ চরিত্রকে এই ধূলিধূসরিত মাটির পৃথিবী প্রাত্যহিক কর্মধারা থেকে চিনে নেওয়া যায়।

প্রকৃতপক্ষে রামকৃষ্ণের লৌকিক চিন্তনের মধ্যে যে সূক্ষ্ম মনস্তত্ব কাজ করছে, তা দেশকাল নিরপেক্ষ। সপ্তদশ শতকের কবি রামকৃষ্ণের শিবমঙ্গলের যে সংস্কৃতি তার সঙ্গে একালের সংস্কৃতির সাদৃশ্য খুঁজতে যাওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনই সাহসের সঙ্গেই বলা যায় শিবায়ন-এর মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি বাংলা গদ্য সাহিত্যের সূচনা।

ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন : সপ্তদশ শতাব্দীতেও যে ইহার একটা বাঁধাবাঁধি রূপ দাঁড়াইয়া গিয়াছিল তাহা স্বীকার করিতে হইবে।

ভরত মল্লিক

হাওড়া জেলা সংলগ্ন ভূরসুটের অন্যতম কবি ভরত মল্লিক। তিনি ভূরসুটরাজ প্রতাপ নারায়ণের সভাকবি ছিলেন। তার দুটি কাব্য—‘চন্দ্রপ্রভা রচিত হয় ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে। এবং ‘রত্নপ্রভা’ কাছাকাছি সময়ে।

 

 

কবি , গবেষক স্বপন নন্দী   //  যোগাযোগ  : 7699249928

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *