রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তি ভাবনা

স্বপন নন্দী

নব্যবাংলার ঋত্বিক কবি-অধ্যাপক ডিরােজিও উনিশ । শতকের মধ্যভাগে রেনেসার প্রদীপ্তদিনের এক আবৃত্তিকার। আবৃত্তির শ্রুতিনান্দনিকে, ছন্দলালিত্যে ও অভিব্যক্তির প্রকাশে ডিরােজিও । ছিলেন একেবারে সঠিক বাচিকশিল্পী। তার মৃত্যুর পর ক্যাপ্টেন । রিচার্ডসন ডিরােজিওর আকাক্ষা কিছুটা পূরণ করতে পেরেছিলেন। ।

তিনি মনে করতেন আবৃত্তির মধ্য দিয়ে কবিতায় প্রকৃত রসাস্বাদন করা সম্ভব। ডিরােজিওরও রিচার্ডসনের আবৃত্তিচিন্তনের প্রতিফলন । ঘটেছিল মধুসূদন দত্তের আবৃত্তি-হৃদ্যতায়। আবৃত্তির আধুনিক রীতির : সূত্র তিনি নির্দেশ করে গেছেন।

তিনি স্বীকার করে নেন উদত্ত আবৃত্তির । পক্ষে অমিত্রাক্ষর ছন্দের মুক্ত প্রবাহকে।কাব্যরচনার সময় মধুসূদন ! প্রতিটি শব্দ, বাক্য এবং পঙক্তি বারবার আবৃত্তি করতেন এবং পরিপূর্ণ । শােনার তৃপ্তিলাভ করা পর্যন্ত রচনার পরিবর্তন ও সংশােধন কাজ করে চলতেন। আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও গুণগ্রাহীদের সঙ্গে আলােচনা করতেন।

বাংলা নাটক সাহিত্যের ইতিহাসে ওরঙ্গমঞ্চে ‘ গিরিশচন্দ্র ঘোেষ এক কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব। অভিনয়কলার সঙ্গে বাচিকশিল্পের সমন্বয়টি তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন। তার নিজস্ব ছন্দকা গৈরিশ ছন্দের ওজস্বিতায় বাচিক স্বরক্ষেপন এক আশ্চর্য বৈভব। যেহেতু সেসময় কোনাে স্বরের রেকর্ডিং প্রযুক্তি ছিল না তাই গিরিশচন্দ্রের কণ্ঠস্বরটি আমাদের কাছে অজানা রয়ে গেল।

এই ধারাবাহিকতায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি সংগীত ও কবিতা চর্চায় এক অগ্রণী নাম। এই ঠাকুরবাড়িতে একক কবিতাপাঠ ও আবৃত্তির চর্চা নিয়মিত হত। মুল উদ্যােগ রবীন্দ্রনাথেরই। ১৯২০-তে আমাদের দেশে রেকর্ডিংব্যবস্থার উন্নততর প্রযুক্তি শুরু হয়।

১৯২৭-তে কলকাতায় আকাশবাণী প্রবর্তনার পর রবীন্দ্রনাথ, শিশিরকুমার ভাদুড়ি, নির্মলেন্দুলাহিড়ী, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেশ মিত্র প্রমুখের কবিতা ও নাটক-সংলাপ আবৃত্তির সামান্য ডিসক ও রেডিও রেকর্ডআগ্রহীরা শুনেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা আবৃত্তির একটি মাত্র রেকর্ডের এ পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া গেছে।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর নজরুল রবিহারা’ কবিতাটি লেখেন কলকাতা বেতার কেন্দ্রের সমকালের কর্তৃপক্ষ সেটি রেকর্ড করে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেন। রবীন্দ্রনাথের সংশয় ছিল তার কবিতা শতবর্ষ পরের প্রজন্ম গ্রহণ করবেন না। আজি হতে শতবর্ষ পরে’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের সেরকম সংশয় এবং আমরা আনন্দবােধ করে জানাচ্ছি।

রবীন্দ্রনাথের সংশয় তুচ্ছ হয়ে গেছে। | কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, কবির কষ্ঠে যেসমস্ত আবৃত্তি আমরা শুনেছিতার সবগুলিই ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে এক দুর্ঘটনায় গলার রােগে আক্রান্ত রবীন্দ্রনাথের। এ সম্পর্কে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর কথাঃ

 ‘রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের যে ভাঙা গলাটি বাজায় সবাহ-সেটা আদৌ রবীন্দ্রনাথের আসল কণ্ঠস্বর নয়। তিনি যখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন তার স্বরভঙ্গ ঘটেছে এটি সেইসময়ের গলা। এতে আমাকে ভীষণ খারাপ লাগে। তাঁর গলা তিন তিনটে octave -এ অনায়সে ঘােরাফেরা করত।একটা থেকে আর একটা octave-এ অনায়াসে চলাচল করত। তার গলা রিনরিনে ছিল ঠিকই কিন্তু এমন মেয়েলি গলাছিলনা।”

 রবীন্দ্রজীবনের বহু সুত্র থেকে জানা গেছে, রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করতে ভালােবাসতেন। এমনকির্তারকণ্ঠে আবৃত্তি শােনানাের জন্যে তিনি শিশিরকুমার ভাদুড়িও ডাঃ রাম অধিকারীকে মাঝেমধ্যে ডেকে পাঠাতেন তার আবৃত্তি সম্পর্কে মত বিনিময় করার জন্য।

তিনি উচ্চারণ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। কবিতা পড়ার কথা বললেই তিনি ঠাট্টা করে বলতেন, ‘আব্রিত্তি করতে হবে নাকি? ‘ঋ’-এর সঠিক উচ্চারণ যেঅনেকে করেননা অর্থাৎ অমৃত‘অতি’, ‘পিতৃ’কে ‘পিত্রি’ ইত্যাদিউচ্চারণ করেন, সেই বিষয়টিরঠার সতর্কতা লঘু পরিহাসে ব্যক্ত করেছেন।

অবশ্য বাংলা উচ্চারণে সংস্কৃত উচ্চরণবিধি প্রয়ােগের তিনি বিরােধী ছিলেন। ড. প্রমােদ মুখােপাধ্যায় বলেছেনঃ  “রবীন্দ্রনাথআর একটি জিনিসে জোর দিতেন— কথার অন্তর্নিহিত সুরের ওপর। আমরা যখন বাক্য গঠন করে ভাবপ্রকাশ করি, আমাদের বাক্যের মধ্যে থেকে নানাভাবের উদয় ঘটে; বিশেষ কথারমধ্যে বিশেষ সুর ধ্বনিত হয়।

রবীন্দ্রনাথের মত ছিল আবৃত্তিতে এই সুরকে সহজভাবে ফোটানাে। আবৃত্তির টান, স্বরের উচ্চনীচতা (modulation) এর volume প্রভৃতির সঙ্গে এই সুরটা রক্ষা করা উচিত। কারণ এ সুর ফুটে উঠেছে প্রাণের ভিতরকার তাগিদে।” (বাংলা আবৃত্তি সমীক্ষা)।

 সংগীতজ্ঞ শ্রীরাজ্যেশ্বর মিত্র জানিয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি সম্বন্ধে বিশেষ সচেতন ছিলেন। এখানে তার অসামান্য ব্যক্তিত্বতে মুগ্ধ হলেও আবৃত্তির শিল্পিত ভাবনাকে সম্মান না দিয়ে। উপায় ছিল না।

প্রতিবছরই তিনি কলকাতায় এসে নতুন লেখা গান ও আবৃত্তি শুনিয়ে যেতেন। বলা প্রয়ােজন যে কাব্য ও অভিনয়ের সমন্বয় সাধনতার আবৃত্তি প্রয়ােগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

অবশ্য একথা ও তিনি মনে রেখেছেন যখন তিনি আবৃত্তিকারতখন কাব্যের চাহিদাই তাকে অধিক গুরুত্ব দিতে হয়। শুধু কবিতা ক্ষেত্রে নয়, কবি যখন গদ্য পাঠ করতেন তখন তার মধ্যেও একটা সমতা থাকতাে একটা ছন্দের একাংশকে বিলম্বিত করে অন্য অংশকে সংক্ষিপ্ত পাঠ করা তাঁর রীতিবিরুদ্ধ ছিল।

গদ্যকেও যে কতাে সুললিত করে পাঠ করা যায় তিনি উপলব্ধি করেছেন।তার কাছেগদ্য একটা দীর্ঘবাক্যসমষ্টি মাত্র নয়। প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ওপর লেখা থেকে সরাসরি উদ্ধৃতিঃ

“রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তিরভঙ্গি এ-যুগেঠিক বােঝানাে যাবে । আমরা যারা তাকে সাক্ষাত্তাবে বহুস্থানে আবৃত্তি করতে শুনেছি। তারাই উপলব্ধি করতে পারব তার শ্রেষ্ঠত্ব কোথায় এবং কতদিকে।

রবীন্দ্রনাথ কখনও ওভার-অ্যাকটিং করতেন না অথবা তার গলার কোনাে কৃত্রিম ভঙ্গী ছিল না। তার গলায় অবশ্য একটা কম্পন ছিল সেটা সহজাত এবং কথা বলবার বা উচ্চারণের কতগুলি বিশেষ ভঙ্গী ছিল যেটা পারিববারিক সূত্রে পাওয়া।

অনেকে এসব ধরণকে বলতেন ঠাকুরবাড়ির ধারা।…তারকণ্ঠে আবৃত্তি যেন একটা সুসমঞ্জস পার্সোনালিটি থেকে তার সমস্ত আবেদন নিয়েবিচ্ছুরিত হতাে।

কাব্যের লিরিক, ছন্দ, অন্তর্নিহিত বিশেষ বিশেষ ব্যঞ্জনা, রস, ভাবসুষ, ভাবসাম্য, আবেগ, স্বচ্ছন্দ গতি, লাবণ্য, শৃঙ্খলা-সবগুলির প্রতি – তিনি সমান সুবিচার করতেন, একটিও তার কণ্ঠে অবহেলিত হােত শাপমােচন নৃত্যনাট্যেরঅখ্যানভাগ ছিল গদ্যে রচিত।

সেই গদ্যাংশ . যখন তিনি পাঠ করতেন তখন তার থেকে একটি নিবিড় কাব্যসুষমা সুস্নিগ্ধ ভাবে সঞ্চারিত হােত। এই ছিল আবৃত্তির মূলমন্ত্র।”  সুতরাং একথা সাহসের সঙ্গেই বলা যায়, রবীন্দ্র-উত্তর  সর্বশ্রেণির আবৃত্তিচর্চাকারীদের ধাত্রীভূমি রবীন্দ্ৰআবৃত্তি।

,

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য :  মোবাইল  নম্বর : 7699249928

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *