রবীন্দ্রচিন্তায় মৃত্যু’র নান্দনিকতা – বীরেন মুখোপাধ্যায়

 

( লেখক পরিচয় :  প্রতিষ্ঠিত কবি , গল্পকার  ও প্রাবন্ধিক ,  মাগুরা , বাংলাদেশ )

মরণ রে, তুহু মম শ্যামসমান।

মেঘবরণ তুঝ মেঘজটাজুট,

রক্ত কমলকর, রক্ত অধরপুট

তাপবিমােচন করুণ কোর তব

মৃত্যু অমৃত করে দান …’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের প্রথম প্রভাতে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে অমৃত’র স্বরূপ বলেই আহ্বান করেছিলেন ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীর ‘মরণ কবিতায়। আবার, ‘… আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে /তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে (পূজা-২৪৮) গানটির আলােকে সহজে অনুমান করা যায় রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তায় নান্দনিকতার সফল উপস্থিতি আছে।

অসীম প্রতিভাধর রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে যেমন বিশ্ব-স্বীকৃতি এনে দিয়েছেন, তেমনি তার চিন্তার স্তরে স্তরে যে মানবকল্যাণের বিচিত্র দিক প্রতিফলিত, রবীন্দ্র-গবেষণায় সেসব দিকও উঠে এসেছে।

সুদীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে রবীন্দ্রনাথকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ধারণ বা লালন করতে হয়েছে। বালক বয়সে মা’র মৃত্যু এবং পরবর্তীতে সন্তান ও স্ত্রীর অকালমৃত্যু এর মধ্যে অন্যতম। মৃত্যুর মতাে বেদনাবহ ঘটনা যেখানে সমগ্র মানবসত্তাকে উলট-পালট করে দিতে সক্ষম, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একান্ত স্বজন হারিয়েও নিজেকে স্থির রেখেছিলেন।

তবে কাব্য-সাহিত্যে কবির মৃত্যু-দর্শন’ নানা অনুষঙ্গে বিকশিত ও সমম্বিত হওয়া থেকে উপলব্ধ হয়, তারও অন্তঃস্থলে প্রচুর ভাঙচুর চলেছে, যতই তিনি বেদনাবহ ঘটনাগুলাে সসম্মান আত্মস্থ করে উপেক্ষা করুন না কেন।

নিজের জন্মদিনের আড়ম্বর নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লেখেন … খ্যাতির কলরবমুখর প্রাঙ্গণে আমার জন্মদিনের যে আসন পাতা রয়েছে, সেখানে স্থান নিতে আমার মন যায় না। আজ আমার প্রয়ােজন স্তব্ধতায় শাস্তিতে। আবার, নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে ‘মৃত্যু কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেন

‘মৃত্যু অজ্ঞাত মাের

আজি তার তরে

ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাপিতেছি ডরে

এত ভালােবাসি

বলে হয়েছে প্রত্যয়

মৃত্যুরে আমি ভালাে |

বাসিব নিশ্চয়

অস্বীকারের সুযােগ নেই, ‘মৃত্যু’ এমনই এক বাস্তব সত্য যে, মৃত্যু সম্পর্কে বিশ্বাসের কোনও প্রয়ােজন পড়ে না। যদিও, মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে। মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থা উঁকি দিয়ে কিংবা যন্ত্র দিয়েও অনুভবযােগ্য নয়, বিধায় বিষয়টি নিয়ে নানা কথা-চিন্তন উঠে আসাও স্বাভাবিক।

মানুষ সবচাইতে বেশি ভয় করে মৃত্যুকে। তাই সে সব সময় মৃত্যুকে এড়িয়ে পালিয়ে বেড়াতে চায়। তবুও মৃত্যুকে আলিঙ্গন না করে কোনও উপায় নেই মানুষের।

রবীন্দ্রনাথ মৃত্যু নিয়ে অনেক ভেবেছেন। অল্প বয়স থেকেই মৃত্যুবিরহ কাতর হৃদয়ের একটি আর্তনাদ, এই দুঃখস্বর প্রশ্নরূপে উত্থিত হয়েছে বারবার, কিন্তু পরিণত বয়সে বিশেষ করে অন্তিম বিদায়ের কয়েক বছর আগে থেকে মৃত্যু সম্বন্ধে বহু কবিতা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেগুলি কেবল প্রশ্ন নয়, মানুষের চির-নিরুত্তর কিছু প্রশ্ন’র উত্তরও তার মধ্যে রয়েছে।

একবার কঠিন রােগ থেকে মুক্তিলাভের পর একখানা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মৃত্যুর ভিতর দিয়ে ফিরে আসা সকলের ভাগ্যে ঘটে না। যদি ঘটে, তবে অন্তত তখনকার মত অহমিকা শিথিল হয়ে আসে… কতখানি স্থায়ী হয় বলতে পারিনে… প্রিয়জনের মৃত্যুর পর বৈরাগ্য আসে … মৃত্যুর ব্যথা দেখে তাকে যেন অশ্রদ্ধা না করি।’

মৃত্যু-বেদনা মানুষকে ক্ষণিকের জন্য হলেও পৃথিবীর প্রতি অনাসক্ত করে তােলে – এ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে কবির কথায়। মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর হওয়া উচিত নয় বলে তিনি উপদেশ দিয়েছেন। সুতরাং রবীন্দ্রমানসে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার এই প্রত্যয় এবং ব্যঞ্জনা মূলত মৃত্যুচেতনায় সৌন্দর্য অবলােকনের নন্দিত প্রয়াস বলা যেতে পারে।

কবির অধিকাংশ কবিতা এবং গানে পরমাত্মায় নিবিষ্ট হওয়ার গভীর আকুতি প্রতিভাত। পরমপুরুষের সান্নিধ্য লাভের মধ্য দিয়েই কবি যে পরম সুখের সন্ধান করেছেন তা অনন্ত জীবনেরই ইঙ্গিতবাহী। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বতানকে জীবন গানে মেলাবার চেষ্টা করেছেন।

তিনি রচনা করেছেন দুঃখের গান যা শুনে মানুষের মন অনন্তর পানে ধেয়ে যায়। এই অনাবিল অনন্ত’র ধারা মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থায় পর্যবসিত। তিনি বলেন

‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসাে।

সকল মাধুরী লুকায়ে যায়, গীতসুধারসে এসাে॥

কর্ম যখন প্রবল-আকার গরজি উঠিয়া ঢাকে চারিধার

হৃদয়প্রান্তে, হে জীবননাথ, শান্ত চরণে এসাে॥ …

‘ জীবনকে আটকে রাখা যাবে না, এই পরম সত্যকে বারবার উপলব্ধিতে এনে রবীন্দ্রনাথ তার রচনায় যে মৃত্যুদর্শন এঁকেছেন, তা কালক্রমে হয়ে উঠেছে নান্দনিক এক জীবনদর্শন। তিনি লিখেছেন, ‘… জীবনেরে কে রাখিতে পারে, আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।’

তিনি স্বাভাবিকভাবে ঝরে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন লেখায়। এ সব সত্য কবি জীবন দিয়ে বুঝেছেন। তাই তিনি মৃত্যু সম্পর্কে সানাই-এর ‘ক্ষণিক’ কবিতায় লিখেছেন

‘এ চিকন তব লাবণ্য যবে দেখি

| মনে মনে ভাবি একি

ক্ষণিকের পরে অসীমের বরদান

আড়ালে আবার ফিরে নেয় তারে

দিন হলে অবসান। ।

রবীন্দ্রনাথের বিশাল প্রতিভার পরিব্যাপ্তি সম্পর্কে তুলনামূলক আলােচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্র-গবেষকরা বলেছেন, বিশ্বকবির রচনায় পাশ্চাত্ত্য’র রবার্ট ব্রাউনিং-এর শিল্পময় দার্শনিক উপস্থাপনা, স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ এবং লর্ড বায়রনের জীবনমুখী বাস্তবতা, তরুণ কবি জন কীটসের অনিঃশেষ সৌন্দর্যচেতনা, উইলিয়াম ওয়ার্ডসােয়ার্থের পরিশুদ্ধ প্রকৃতির প্রতি অনাবিল আস্থা ও প্রেম এবং পি. বি. শেলীর অতীন্দ্রিয় সত্তার গূঢ় রহস্যময়তা মিলেমিশে এক স্পর্শকাতর অনুভূতিতে অপূর্ব সমন্বয়তা লাভ করেছে।

সুতরাং কেবল বাংলা সাহিত্যর ক্ষেত্রেই নয়, বিশ্বসাহিত্যেও তাঁকে যােগ্য সম্মান দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, কবি যতই পরিণতির দিকে ধাবমান হয়েছেন, ততই তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি ও গভীরতা বেড়েছে। মৃত্যু সম্পর্কে তার ধারণারও পরিবর্তন ঘটেছে। গীতিমাল্যর কবিতায় ইন্দ্রিয় জগত ও ইন্দ্রিয়াতীত জগতের জিজ্ঞাসা ও প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়েছে। কবির জিজ্ঞাসা

‘ওগাে পথিক, দিনের শেষে

যাত্রা তােমার কোন্ সে দেশে,

এ পথ গেছে কোনখানে?

রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে জীবনের অপর নাম’ আখ্যা দিয়েছেন। ইন্দ্রিয়াতীত বিভিন্ন জিজ্ঞাসার আলােকেও তা স্পষ্ট। মৃত্যুকে তিনি অনন্ত জীবনের যাত্রাপথে পরমাত্মীয়’র মতাে নতুন নতুন জীবনপথের অনুসন্ধানদাতা হিসেবে উপলব্ধি করেছেন। কখনও দেখেছেন মহাকালের মহামিলনদূত হিসেবে; কবির মানসসরােবরে উপলব্ধির বর্ণচ্ছটায় যার নিগূঢ় সত্তা রহস্যময়তার আবরণ পরে, চাক্ষুষ বাস্তবতা অতিক্রম করে, বিশেষকে ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে নির্বিশেষ।

আবার পরক্ষণেই নির্বিশেষ থেকে বিশেষের স্তরে নেমে এসেছে ব্যক্তিসত্তা হয়ে, ঠিক যেন প্রণয়িনী রাধিকার শ্যামরূপী অমৃত’র উৎস। বৈশ্বিক দর্শন আত্মস্থ করার মধ্য দিয়েই কবির চেতনায় ও পৃথক দর্শনে একান্ত অন্তরঙ্গতা লাভ করেছে চিরায়ত এই মৃত্যু। জীবন ও বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে নিজস্ব উপলব্ধির নিরবচ্ছিন্ন উৎসারণ থেকেও তাঁর মৃত্যুচিন্তার নান্দনিকতা স্পষ্ট।

. উপনিষদের সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা মনে করেন, এই জগৎ সেই মৃত্যুহীন শাশ্বত সত্তার আনন্দ-সম্মিলনের মহাপ্রকাশ। বিশ্বসৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষহীন বলে যা কিছু বিরাজিত আছে, তাদের সবই সেই চিরসুন্দর, চিরশুদ্ধ অমরনাথের আনন্দময় অভিব্যক্তি।

বিশ্বের সব সৌন্দর্য, পার্থিব জগতের সঞ্চিত সমস্ত সুধা তার থেকে সৃষ্ট বলেই অবিনাশী। অনাদিকাল ধরে নানা রূপে বিকশিত। জীবনপ্রবাহ তাই মৃত্যুহীন। হে অমৃত’র অমর সন্তান, এই পরম সত্য জ্ঞাত হয়ে অমৃততত্ত্ব লাভ করাে। রবীন্দ্রনাথ

জীবন এবং বিশ্বসৃষ্টির সুগভীর এসব তাত্ত্বিক দর্শন পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছেন। আর অনন্যসাধারণ শিল্পময়তায়, অতীন্দ্রিয় সত্তার প্রগাঢ় রহস্যময়তায় চিত্রায়িত করেছেন। মৃত্যুচিন্তার ভেতর থেকেও মৃত্যুর নান্দনিক দিকটির উন্মােচন ঘটিয়েছেন।

“… কিশাের বয়সে বন্ধুপ্রতিম বৌদি কাদম্বরী দেবীর অকালমৃত্যু ও আরাে পরে স্ত্রীর মৃত্যু এবং একে একে প্রিয়জনদের মৃত্যুর নীরব সাক্ষী ও মৃত্যুশােক রবীন্দ্রনাথের এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভে সহায়ক হয়েছিল। কবি জীবনস্মৃতিতে ‘মৃত্যুশােক পর্যায়ে। অকপটে লেখেন, ‘জগৎকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে দূরত্ব প্রয়ােজন, মৃত্যু সে দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল।

আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার ওপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম, তাহা বড়াে মনােহর।” ফলে মরণের শতধারায় ধৌত হয়েই জীবনের সংকীর্ণতা, অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্তি ঘটে, অনন্ত’র আনন্দরস মৃত্যুর বিচ্ছেদবেদনা থেকে উৎসারিত হয় বলে মানুষ তাতেই উপভােগ করে শাশ্বত অমৃত’র পরশলাভ – কবির এই বিশ্বাস অমূলক নয়।

অকাট্য সত্য যে, এই দেহ মানবজীবনের সর্বাপেক্ষা মহার্ঘ্য ও রহস্যঘেরা আধার; এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতি এবং মন। এই দেহ যখন মৃত তখন তা জড়, আর যখন জীবিত তখন তা অজড়। যে অলীক বস্তুর অনুপস্থিতিতে দেহ জড় পদার্থে পরিণত হয় সেই অলীক বস্তু’র ধারণা থেকে ‘আত্মা’ ধারণার সূচনা এবং তা এক সময় সর্বপ্রাণবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে।

“মৃত্যু কিংবা ন্দ্রিা হইতেই প্রাগৈতিহাসিক মানুষ আত্মা নামক এক অতিপ্রাকৃত বস্তুর অস্তিত্ব’র সন্ধান পাইয়াছিল। জীবিত ও মৃত’র মধ্যে পার্থক্য কী? একজনের মধ্যে কিসের অভাব তাহাকে জড়ের মতাে নিশ্চল করিল, আর একজনের মধ্যে কিসের অস্তিত্ব তাহার ব্যতিক্রম করিল ? গুহাবাসী মানুষ একদিন এই কথাই ভাবিতে গিয়া এক অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্ব কল্পনা করিল। এই অদৃশ্য শক্তিই আত্মা।”

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-দর্শনেও দেখা যায়, প্রেক্ষণবিন্দুতে আছে একটি বােধ; তা হল – মত্যু তার শােক ও দুঃখ’র মাধ্যমে জীবনের সত্য, মুক্তি ও শক্তির ত্রয়ীরূপকেই ফুটিয়ে তােলে। সুতরাং সুখের মতাে দুঃখকেও স্বাগত জানাও, স্বাগত জানাও জীবনের মতাে মৃত্যুকেও। এই চেতন-প্রক্রিয়া মৃত্যুর মাঝেও নান্দনিক অনুভবের ইঙ্গিতবাহী।

রবীন্দ্রনাথ যাপনের অতলস্পর্শী হৃদয়মুখরতার গাম্ভীর্য থেকে খুঁজে এনেছেন মহিমান্বিত নান্দনিকতা। আবার সেই নান্দনিকতার কোলেই তিনি বস্তুত একা হয়েছেন, প্রাণময়ী উষ্ণতায় মেলে ধরেছেন জীবনের সহস্র রঙ। তাই রবীন্দ্রনাথের ‘জীবন-দর্শন’ এর মতাে তার মৃত্যু-দর্শনও গুরুত্বপূর্ণ।

বােধ করি, জীবনের প্রতিটি মাধুর্যমণ্ডিত মুহূর্তেই তিনি পরম মমতায় মৃত্যুর অনিবার্য শূন্যতাকে উপলব্ধি করেছিলেন; তাই ছিন্নপত্রাবলীতে তিনি লিখেছেন ‘ইচ্ছে করে জীবনের প্রত্যেক সূর্যোদয়কে সজ্ঞানভাবে অভিবাদন করি

এবং প্রত্যেক সূর্যাস্তকে পরিচিত বন্ধুর মতাে বিদায় দিই।’

রবীন্দ্রনাথ পুরােপুরি মানবকল্যাণে নিবেদিত ছিলেন বলেই হয়তাে স্বজন বিয়ােগ বেদনা বা মৃত্যুবেদনা থেকে উখিত জীবনবিমুখতা তার কাছে স্বার্থমগ্নতারই অন্য এক রূপ। তিনি বলেন – মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ … তােমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ  আপনার পানে চাই’, কিংবা, তােমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই – কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই’। প্রিয়জনদের নানারকম দুঃখ-সওয়া এবং দুঃখ-দেওয়া অকালমৃত্যুগুলি প্রত্যেকটিই একটিমাত্র প্রশ্ন করে বসে আছে।

রবীন্দ্রনাথের মনে – মানুষের জীবনে দুঃখ’র ভূমিকা কী ? এ প্রশ্ন’র উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি দুঃখকে বুঝতে সক্ষম হন। যে কারণে কবির ভাবনায় মৃত্যু কখনও প্রণয়ী, বাউল, কখনও বা বালিকাবধূর বর বেশে, সখা সেজে বন্ধুরূপে, অন্ধকারের ধ্যাননিমগ্ন ভাষার মতাে অবগুণ্ঠনের আবরণ পরে, অরুণবহ্নির রুদ্র সাজে, জীবনরথের সারথি হয়ে, ললিত লােভন মােহন রূপে কিংবা জ্যোতির্ময়ের পরশমণি হয়ে ধরা দিয়েছে।

মৃত্যুর সৌন্দর্য আস্বাদন করে তিনি সেই পরম উপলব্ধির অমিয়ধারা ছড়িয়ে দিয়েছেন কবিতায়, গানে, সাহিত্যর নানা শাখায়। | প্রশ্ন জাগে, মৃত্যু যদি সবার জীবনে বিনাশসাধনই ঘটাবে, তাহলে জীবন থেকে জীবনান্তরে এই যে অশেষভাবে পথ চলার সহস্র স্মৃতির আনাগােনা, সেটা কেমন করে সম্ভব ?

তাই বিনাশসাধন নয়, নিরন্তর চলার জন্যই মৃত্যুর স্পর্শলাভে দেহ’র খােলস বদলে যায় বারংবার। কারণ এমন বদলেই সম্ভব হয় নানা রূপ-পরিগ্রহ’র ভিতর দিয়ে বিবিধ বৈচিত্র্য’র আস্বাদন-রবীন্দ্রনাথে যার সার্থক উপস্থিতি। মানুষের ভালােবাসার অকৃপণ উৎস কবিকে ভালােবাসার অপরাজেয় শক্তি যুগিয়েছে। বিদায় তাকে নিতেই হবে, এ সত্য জেনেও তিনি ভালােবাসার কাছে দাঁড়িয়ে লিখেছেন

.. এ বিশেরে ভালােবাসিয়াছি।

এ ভালােবাসাই সত্য এ জন্মের দান।

বিদায় নেবার কালে।

এ সত্য অম্লান হয়ে মৃত্যুরে করিবে অস্বীকার।’

কবির ভাবনা – জীবনকে সত্য বলে জানতে গেলে মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তার পরিচয় পেতে হবে। যে মানুষ ভয় পেয়ে মৃত্যুকে এড়িয়ে জীবনকে আঁকড়ে রয়েছে, জীবনের পরে তার যথার্থ শ্রদ্ধা নেই বলে জীবনকে সে পায়নি।

যে লােক নিজে এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুকে বন্দী করতে ছুটেছে, সে দেখতে পায়, যাকে সে ধরেছে সে মৃত্যুই নয়, সে জীবন…’ (ফাল্গনী, ১৩২২)। রবীন্দ্রনাথ মূলত জীবন অনুসন্ধানের দিকেই গুরুত্বারােপ করেছেন। আর তাই জীবন-মৃত্যুর নিঃশব্দ প্রণয়খেলা কবির কাছে নবজীবন, নবযৌবন লাভের আহ্বান নিয়ে এসেছে। এসেছে নান্দনিক বােধের উৎস হয়ে।

তথ্যসহায়তা

১. মনসুর আহমদ, প্রবন্ধ: রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদর্শন’। ২. দীপিকা ঘােষ, প্রবন্ধ: রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-ভাবনার বিকাশের স্তর’, ভােরের কাগজ, ০৭ আগস্ট ২০১৫। ৩. শাহ মতিন টিপু, প্রবন্ধ: রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু উপলব্ধি’ রাইজিং বিডি ডট কম, ০৮ আগস্ট ২০১৫। ৪. ড. আশুতােষ ভট্টাচার্য, প্রবন্ধ: বাংলার লােকশ্রুতি। ৫. ড. আনন্দ দাশগুপ্ত, প্রবন্ধ: মৃত্যুর রূপ জীবনে, সৃষ্টিতে’, অবসর নেট ব্লগ। ৬. মধুছন্দা মিত্র ঘােষ, প্রবন্ধ: রবির বৈশাখ, কবির শ্রাবণ, আনন্দবাজার পত্রিকা, ০২ আগস্ট ২০১৫।

(  প্রবন্ধটি বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত )

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: