ভূত  চতুর্দশীর  রাত

অরিজিৎ   ভট্টাচার্য্য

“বুঝলে তো ভায়া,কাল কালীপূজা আর আজ ভূত চতুর্দশী। সমস্ত প্রেতাত্মারা পৃথিবীর বুকে নেমে আসে আজ রাতে। আর সেজন্যই বলছি আজ এই রাতে এইসব পাড়াগাঁয়ে রাত বিরেতে না বেরোনোই শ্রেয়।” কথাগুলো বলে থামলেন শিবদাদু।

কালীপূজা উপলক্ষে আমরা বেড়াতে এসেছি ময়নাগুড়িতে জয়ন্তকাকুর বাড়িতে কালীপূজা আর দিওয়ালি দেখতে। এই জয়ন্তকাকুর বাবা হলেন শিবনাথদাদু বা শিবদাদু। আমাদেরকে নিজের নাতির মতোই স্নেহ করেন।

এককালে নামী স্কুলমাস্টার ছিলেন,কিন্তু আমাদের কাছে তিনি বরাবরই খুব কাছের একজন দাদু। আমরা ভালোবেসে শিবদাদু বলে ডাকি।যাই হোক,গ্রাম্য মানুষ তিনি।ভূত আর ভগবানের প্রতি হৃদয়ে অন্ধবিশ্বাস বজায় থাকা তো খুবই স্বাভাবিক।

তা বলে আজ রাতে আমরা বেরোবই না,তাই হয় নাকি! আজ রাতে তো ঠিকই করেছি আমার পরম বন্ধু ইন্দ্রের সাথে আমরা যাব বাওড়ের ধারে। শুনেছি আজ এই ভূত চতুর্দশীর রাতে এই হুসলুডাঙা গ্রামে সাক্ষাৎ নেমে আসবে মহাপিশাচ।

ঘুরে বেড়াবে বাওড়ের আশেপাশে। আজ যে হতভাগ্য মানুষ ভুলক্রমেও বাওড়ের ধারেকাছে যাবে,তার অদৃষ্টে লেখা রয়েছে মৃত্যু। আমি আর ইন্দ্র দুজনেই কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে কেমিস্ট্রির ছাত্র। ছোটবেলায় এই গ্রামে বহুবার এসেছি। তখন এইসব কথায় ভয় পেতাম।

কিন্তু,এখন আমাদের মনে প্রবেশ করেছে বিজ্ঞান চেতনা আর যুক্তিবাদের আলোক। তাই এইসব অর্থহীন গ্রাম্য লোককথায় ভয় পাবার কোনো মানেই হয় না।

আজ আমরা প্রমাণ করে দেব যে,উত্তরবঙ্গের এই হুসলুডাঙা গ্রামের বুকে এই ভূত চতুর্দশীর রাতে মহাপিশাচের আগমন গল্পকথা ছাড়া আর কিছুই নয়!

পাড়াগাঁয়ে ভূত চতুর্দশী কিভাবে পালিত হয় দেখলাম। আজ আমরা চৌদ্দ শাক খাব,সব বাড়িতে চৌদ্দ প্রদীপ জ্বালানো হবে।

কথায় আছে,আজ রাতে অভিশপ্ত প্রেতাত্মারা ,ডাকিনী-যোগিনীরা,পিশাচেরা ইহজগতে নেমে আসে। এইসব অপদেবতারা যাতে গৃহস্থালীর মধ্যে প্রবেশ না করতে পারে সেজন্য এই পবিত্র চৌদ্দ প্রদীপের শিখা।

আবার অপর এক মতানুযায়ী,আজ সব পরিবারের চৌদ্দ প্রজন্মের পূর্বপুরুষরা পৃথিবীতে নেমে আসে। তারা যেন সহজে তাদের গৃহের পথ চিনতে পারে,সেজন্য চৌদ্দ প্রদীপ। তাদের পথ আলোকিত করে তাদের আলো দেখায়। যাই হোক,

এই গেল ভূত চতুর্দশীর ইতিহাস।গ্রামের লোকেরা দেখলাম ভালোই ভয়ে কাটায়। সন্ধ্যা হতে না হতেই পথ ঘাট জনশূন্য হয়ে যায়,দোকানপাট ঝাঁপ বন্ধ করে দেয়,গৃহস্থালী দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়।  

গভীর নিঝুম রাত। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শিবদাদুর কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে আমরা গেছি বাওড় অঞ্চলে। শোনা  গেল অজানা রাতজাগা পাখির ডাক। হঠাৎ শুনতে পারলাম শিশুর ক্রন্দনধ্বনি। বুঝতে পারলাম কাছেই কোথাও শকুনির বাসা আছে,শকুনির বাচ্ছা কাঁদছে। শকুনির বাচ্ছার ক্রন্দনধ্বনি মানবশিশুর মতো শোনায়।

 দূরে জলাভূমি,জ্বলে উঠছে আলেয়া। আমরা জানি যে,ওটা মিথেন বা মার্স গ্যাস ছাড়া আর কিছুই নয় ।মাঝে মাঝে ভেসে আসছে যামঘোষক শিয়ালের ডাক। আলোকবিন্দুর মতো ঝোপে জোনাকি জ্বলছে। আকাশে কালপুরুষ। নভেম্বর মাস। চারিদিক কুয়াশার চাদরে আবৃত।  মহাপিশাচের তো কোনো পাত্তাই নেই।সত্যিই গল্পের গরু গাছে ওঠে!

কেটে যাচ্ছে রাতের একেকটি প্রহর। রাত বারোটা হবে। হঠাৎই দেখলাম ফোন বাজছে ।অচেনা নম্বর। ফোন রিসিভ করতেই ইন্দ্রের গলা,”ভাই ,কি খবর!তন্ময়দার বাড়ি গিয়েছিলাম আটটার দিকে তোকে না জানিয়ে। এসে শুনলাম তুই কোথায় বেরিয়ে গেছিস!তোর সাথে আজ রাতে অ্যাডভেঞ্চারটাই হল না। ছাড় আমি এখন শিবদাদুর বাড়িতে। তুই কখন ফিরছিস বল!”

কাঁপতে লাগল আমার সারা শরীর। উত্তেজনায় হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল ফোন। ইন্দ্র যদি এখন বাড়িতে থেকে থাকে তাহলে আমাকে যে এই অতি ভয়ঙ্কর মহাপিশাচের বিচরণভূমি বাওড় অঞ্চলে সঙ্গ দিচ্ছে ইন্দ্রের রূপ ধরে এই ভয়ঙ্কর ভূত চতুর্দশীর রাতে,সেই মানুষটি কে! আদৌ কি সে কোনো মানুষ না কি অতিলৌকিক কিছু! মহাপিশাচ নয় তো। শুনেছি মহাপিশাচ মানুষের রূপ ধারণ করে পথিকদের বিভ্রান্ত করতে সিদ্ধহস্ত।

আমার সাথে যে ইন্দ্র ছিল ,তার দিকে তাকাতেই রক্ত জল হয়ে গেল আমার। চোখ রক্তবর্ণ,চোয়াল দিয়ে বেরিয়ে এসেছে দুই তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত,ঠোঁটের আগায় ক্রূর হাসি। বুঝতে বাকি রইল না যে,আজ রাতে আমিই মহাপিশাচের শিকারে পরিণত হতে চলেছি।

কোনো ঠাকুর দেবতার নাম স্মরণে আসল না,শুধু মনে পড়ল আজ রাতে বেরিয়েই আমি ভুল করেছি। আজ রাত ভয়ঙ্কর ভূত চতুর্দশীর রাত। আমার দিকে এগিয়ে আসছে ইন্দ্র! অনুভব করছি আমি ওর অতিশীতল নিঃশ্বাস।

ওর সারা শরীর থেকে ভেসে আসছে নরকের দুর্গন্ধ। রক্তাভ দুই চক্ষু । মহাপিশাচের জেগেছে রক্ততৃষ্ণা। না,আর থাকতে পারলাম না। এতক্ষণ হৃদস্পন্দন দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে উঠছিল,এখন চরম উত্তেজনায় সেটাই স্তব্ধ হয়ে গেল।আমার দুচোখে নেমে এল এক নিকষ কালো অন্ধকার।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: