ভিন্ন স্বাদের পাঁচটি কবিতা

লক্ষ্যভ্রষ্ট  

 সুদীপ্ত বিশ্বাস

 

পথিক আমি, পথের কাছে কথা আমার দেওয়াই আছে

ঠিক যেভাবে ছোট্ট নদী ছুটতে-ছুটতে দারুণ বাঁচে!

মাধুকরী করেই আমি পাহাড় দেখে ঝর্ণাতলে

সেই যেখানে অরণ্য-বন ভালবাসার কথাই বলে;

সেই সে দেশে যেই না গেছি ছুটতে ছুটতে হন্যে হয়ে

নদীও দেখি দারুণ খুশি, আমার জন্যে যাচ্ছে বয়ে।

টুনটুনিটার মতই সরল, আমার হাতে রাখল সে হাত

তারপরে তো আপন হল, নদীর সে গান, জলপ্রপাত।

ছপ-ছপা-ছপ সাঁতরে শুধু ডুব-সাঁতারে, চিৎ-সাঁতারে

যাচ্ছি ডুবে উঠছি ভেসে কুল না পেয়ে সেই পাথারে।

এরপরে তো হঠাৎ করে সেই ফোয়ারা উথলে ওঠে

এমনি করেই ঝলমলিয়ে বাগানজুড়ে গোলাপ ফোটে।

গেলাম ভুলে পথের কাছে কথা আমার দেওয়াই আছে

বন্দী আমি আটকে গেছি, আটকে গেছি তোমার কাছে!

 

 

নদী ও প্রেমিক

 সুদীপ্ত বিশ্বাস

 

পাহাড়ের বুক চিরে ঝর্ণাটা নামে

অনেক না বলা কথা আছে নীলখামে।

 

ঝর্ণারা মিলেমিশে হয়ে যায় নদী

শুনবে নদীর গান, কান পাতো যদি।

 

ও নদী কোথায় যাও? ছলছল তানে?

দাও নদী দাও বলে, জীবনের মানে।

 

ঘন্টার ঠুনঠুন, আজানের সুর;

নদী জলে মিশে যায় সোনারোদ্দুর।

 

ছোটছোট ঢেউ তুলে নেচেনেচে যায়

সব মেয়ে তাই বুঝি নদী হতে চায়?

 

ও নদী চলেছ বয়ে, নদী তুমি কার?

প্রেমিকটা প্রাণপণ কাটছে সাঁতার।

 

সাঁতরে-সাঁতরে আরও কতদূর যাবে?

কতটা গভীরে গেলে তবে তল পাবে?

 

নদীটা যেই না গিয়ে সাগরেতে মেশে,  

প্রেমিক ঘুমিয়ে পড়ে  সঙ্গম শেষে।

 

 

প্রেমিক

 সুদীপ্ত বিশ্বাস

 

ওগো নারী,

তোমার সাজানো ঘরে দুদণ্ড বিশ্রাম নিতে পারি?

পেতে পারি পিপাসার জল?

পেড়িয়ে এসেছি মরুভূমি,অনেক যুদ্ধের কোলাহল।

বড়ই ক্লান্ত আজ

তোমার বাগানে বসে আনমনে বাজাব এস্রাজ।

তোমার পরশ পেলে নারী,

আমিও কৃষক হয়ে ফুলেফলে ভরে দিতে পারি

অকর্ষিত যত ঝাউবন।ওগো মেয়ে,

কেটেছে বসন্ত কত তোমার ছবির দিকে চেয়ে,

অনেক মায়াবী রাতে। প্রণয়ের দারুণ আকালে

বৃথাই আশারা বাঁচে, মরুভূমে মরীচিকা জ্বালে,

দেয় না তো পিপাসার জল।

বড় অসহায় আমি, ভালবাসা আমার সম্বল।

তুমিই আমার নদী।আমি চির-উপবাসী দ্বীপ।

তোমার মায়ার জালে, ওগো নারী,জ্বালাও প্রদীপ।

আঁধারের বুক চিরে, নিয়ে এস পাখি ডাকা ভোর-

সম্পদ চাই না আমি,চাই শুধু,ওই বাহুডোর।

 

 

পরাবাস্তবতা

 সুদীপ্ত বিশ্বাস

এখানে হৃদয় জুড়ে শুধুই বিস্মৃতি

হাঁচড়-পাঁচড় শেষে অবসন্ন দেহে

তীরভূমি ছুঁয়ে দেখি, হাসে মহাকাল।

সবকিছু মিশে যায় দিকচক্রবালে

অবিরাম বেজে চলে কালের সেতার।

অতীতেরা চুপচাপ ফিরে ফিরে এলে

সময়ের গাছ থেকে খসে পড়ে পাতা

মিশরের মমি থেকে উঠে আসে কেউ

আগামীর বুক থেকে ভাটির সাঁতারে

প্রতিদিন চুপচাপ ফিরে আসে ঢেউ।

যেটুকু দেখছ তুমি তাও শুধু নয়,

যতটুকু বেঁচে আছি তাও নয় শুধু,

যেটুকু মরেও গেছি সবটুকু মিলে

ওই শোন একটানা বাজছে সেতার।

 

 

বৃষ্টি এলে

 সুদীপ্ত বিশ্বাস

 

বৃষ্টি এলে বুকের ভিতর গোলাপ কুঁড়ি ফোটে

বৃষ্টি এলে মনটা বড় উদাস হয়ে ওঠে।

বৃষ্টি এলে শিউলিতলায়, ছাতিমগাছের ডালে

মনটা বড় কেমন করে বৃষ্টি-ঝরা কালে।

এখন তুমি অনেকদূরে না জানি কোনখানে,

ভিজছো কিংবা গুনগুনিয়ে সুর তুলেছো গানে।

তোমার গানের সেই সুরটাই বৃষ্টি হয়ে এসে

টাপুরটুপুর পড়ছে ঝরে মেঘকে ভালবেসে।

মেঘ বিরহী, কান্নাটা তার বৃষ্টি হয়ে ঝরে

তোমার বুঝি মেঘ দেখলেই আমায় মনে পড়ে ?

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *