বৃষ্টির শোক ও সুখ

     নীলোৎপল মন্ডল

বৃষ্টির রাতগুলো আমার কাছে বড়োই ভয়ঙ্কর জানিস ! মনে হয় আবার হয়তো সব কেড়ে নেবে ওই মায়াবী বৃষ্টি আমার যা কিছু আপন, আবার হয়তো হারিয়ে ফেলব আমার জীবনের সবচেয়ে দামী জিনিস, তাই খুব ভয় হয় রে, বৃষ্টি বিবক্ত রাতে এসব কথা শুনলে,
জানালায় মুখ রেখে অরুণিমা প্রায় নিজের অজান্তেই কথাগুলো বলে চলেছে অয়ন কে।
আকাশে প্রচণ্ড মেঘ , বিদ্যুতের ঝলকানি , দু এক পশলা বৃষ্টির ঝাপটা এসে বিছানায় পড়ছে , ভ্রুক্ষেপ নেই অরুণিমার।
অনেকক্ষণ একটানা অরুণিমার কথা শোনার পর অয়ন বলে উঠলো , কেনরে আমি তো জানি বৃষ্টি মানেই নতুন প্রাণের সঞ্চার, নতুন সৃষ্টি, নতুন উদ্দীপনায় ভরে ওঠা, তা তুই বৃষ্টিকে কেন এতো অবঞ্জা করিস সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
যদি সমস্ত কিছু শোনার পরেও তুই আমায় মেনে নিস তাহলে তোর প্রস্তাবে আমি রাজি অরুণিমার উত্তর।
অয়ন ও অরুণিমা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু , একই শহরে থাকার সুবাদে বলতে পারেন স্কুল – কলেজ প্রায় সবকিছুই একসঙ্গে কাটিয়েছে ওরা। কর্মসুত্র আজ দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ওদের আবার একসঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছে। শহরের নামী এক বেসরকারী কোম্পানীর এইচ আর অয়ন মজুমদার, কফির কাপ হাতে নিয়ে  চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন আজকের সংবাদপত্রে। রিবলভিং চেয়ারটায় বসে দেখে নিলেন কেন্ডিডেট গুলোর নামের তালিকা, চোখ আটকে গেল চতুর্থটায় , অরুণিমা বিশ্বাস !!
অরুণিমা , মানে কি তার কলেজের বান্ধবী অরুণিমা ? নাও হতে পারে , পৃথিবীতে কী একই নামের দুজন মানুষ থাকতে পারেন না, এমন সব ভাবনার শেষে অয়ন তার পিওন কে বলল অরুণিমা বিশ্বাস যিনি আছেন ওনাকে পাঠান, দরজায় হালকা আওয়াজ করে May i coming sir ? সন্দেহ ভুল করেনি অয়ন। Yes come. Seat down please. স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অয়ন জিজ্ঞেস করলো Am i not wrong , you are Arunima Biswas from chandannagar ?
Yes sir i m frm chandannagar , but how can you know me ???
চিনতে পারলি না বল ! আরে আমি অয়ন, অয়ন মজুমদার , ইংরাজী ডিপ্টার্টমেন্ট. চন্দননগর গর্ভমেন্ট কলেজ।
স্মৃতি হাতড়ে অরুণিমা মনে করার চেষ্টা করলো কলেজ জীবনের ছেলে বন্ধুদের কথা, চন্দননগরের কথা কিন্তু কৃষানুর চলে যাওয়া তাকে এতোটাই কষ্ট দিয়েছে যে অতীতের প্রায় সমস্ত স্মৃতিই তার মনের মনিকোঠা থেকে লোপ পেয়েছে. খানিকটা সঙ্কোচ হয়েই অরুণিমা উত্তর দিল, sorry sir, actually … অয়ন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল Its okk, অনেকদিন আগের কথা তো ,
তোর মনে নাও থাকতে পারে, এই নে এটা আমার কার্ড, আমার Address and phone no দুটোই এটাতে আছে, ফোন করবি. অবশেষে চাকরিটা অরুণিমার হয়ে যায় এবং বেশ কিছুদিন পর অরুণিমাও অয়নকে চিনতে পারে, তাদের পুরোনো বন্ধুত্ব ক্রমশ বাড়তে শুরু করে।
আজ পয়লা শ্রাবন , অরুণিমার ফ্ল্যাটে অয়ন তার প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, একই অফিসে কাজের সুবাদে তাদের সম্পর্কটার একটু ঘনিষ্ঠ হয়েছে। অনেকদিন ধরেই অয়ন ভাবছে অরুণিমাকে বিয়ের কথাটা বলা যেতেই পারে।
সমস্ত কুণ্ঠাবোধ দূরে সরিয়ে অয়ন জানালো তার ভালোবাসার কথা, শুধু অয়নের নয় এই কদিনে অরুণিমার মনেও অয়নের জন্য একটা জায়গা তৈরী হয়েছে।
বৃষ্টির সন্ধ্যায় দুজন গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আলোচনা করছে এসব , এমন সময় অরুণিমা বলে উঠল , বৃষ্টির সন্ধ্যাগুলো আমার কাছে বিভীষিকার মতো, বড় ভয় হয় আবার যদি আমার জীবনটা তছনছ করে দেয় এই বৃষ্টি , তাহলে ? মাফ করতে পারবো আমি নিজেকে ?
অয়ন বলল তোর অতীতকে আমি মেনে নেবো অনায়াসে , তবে তার সাথে বৃষ্টির কী যোগ সেটাই জানতে ইচ্ছে করছে ।
অরুণিমা বলতে শুরু করল,
ঘটনার সূত্রপাত উত্তরবঙ্গের কালিম্পং শহরে,
কৃষানু মুখার্জি, কালিম্পং কলেজের ইকনমিক্স এর প্রফসর, চন্দননগরেরই ছেলে, ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম আমি, বিয়ের পর ওর সাথেই কালিম্পং এ থাকা শুরু করি।
পাহাড়ী ছোট্ট একটা শহর , আমার খুব পছন্দের ছিল জায়গাটা ,  শহরের খুব পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ী এক নদী, বেশিরভাগই কাঠের তৈরী বাড়ি। সকালবেলা ও কলেজ চলে গেলে আমি রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র নিয়ে বসতাম , ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত মানুষজন দেখতাম,
দিনের বেলা শহরটা একরকম আবার রাত্রি বেলা অন্যরকম, রাত্রে শহরটাকে খুব মায়াবী লাগতো , বিশেষ করে যদি বৃষ্টি পড়ত, অদ্ভুত একটা গন্ধে শহরটা ভরে উঠতো, যা আমায় খুব টানতো জানিস। কেন জানিনা বৃষ্টির ওই গন্ধে একপ্রকার নেশা ছিল, মাতাল করে তুলতো আমায়।
সেদিনটা ছিল তেমনই এক বৃষ্টির রাত, সন্ধ্যে থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, কৃষানু কলেজ থেকে বেরিয়ে আমায় ফোন করে বলল, তোমাকে রাত্রে কিছু রান্না করার দরকার নেই আমি বাইরে থেকে খাবার নিয়েই বাড়ি ফিরবো। বাইরে বৃষ্টির পরিমাণ ক্রমশ বেড়েই চলেছে, সাথে ঝড়ো হাওয়া , বিদ্যুতের ঘনঘটা, মনটা অস্থির হয়ে উঠলো, ঘরের মধ্যে পায়চারি করছি ,
কখনও ব্যেলকনিতে গিয়ে দেখছি কোনো গাড়ি দরজার সামনে এসে দাঁড়িলো কী না, রাত্রি 8 টা বেজে পার হলো , কৃষানুর মোবাইলটাও সুইচ অফ বলছে , ভাবলাম দুর্যোগের জন্য হয়তো নেটওয়ার্ক নেই। বিভিন্ন রকম দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এমতাবস্থায় মনকে বোঝানো ছাড়া আর কিচ্ছু উপায় নেই।
রাত্রি নটা বেজে কুড়ি , আর থাকতে পারলাম না বাড়িতে, নিচে নেমে এলাম , বাইরে তখন মুসলধারে বৃষ্টি আর তুমুল ঝড়। পাশের বাড়ির দরজায় গিয়ে কড়া নাড়লাম, ভদ্রমহিলাকে সমস্ত কিছু বললাম, আমি এ শহরের কিছুই প্রায় জানি না, তাই উনাকে গিয়ে বললাম যদি উনি আমাকে সাহায্য করেন। ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা দুজনেই লেপচা জনজাতির মানুষ এবং খুব সাহায্যপরায়ন. উনাদের গাড়িতে উঠে কলেজের দিকে এগিয়ে চলেছি ,
প্রচণ্ড বৃষ্টির জন্য গাড়ী চালাতেও খুব অসুবিধা হচ্ছে ভদ্রলোকের, কিছুদূর এগিয়ে দেখি পুলিশ রাস্তার উপর ব্যরিকেড করে দিয়েছে, বৃষ্টির ফলে রাস্তায় ধ্বস নেমেছে তাই আগে যাওয়া যাবেনা।  গাড়ীর মধ্যে বসে আমি অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকি, সমস্ত রকম খারাপ চিন্তায় মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, ভদ্রলোক খবর নিয়ে এলেন , এসে বললেন , ” রাস্তে মে ধ্বস কে কারণ এক বাস খাই মে গির গেয়া হে, বাস কো উপ্পর তক লা নে কি কাম চল রাহা হে, ইসলিয়ে রাস্তা বন্ধ কর দিয়া গেয়া হে”।
কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হল পৃথিবীর সমস্ত আলো আজ আমার জীবনে অন্ধকার ডেকে আনলো।
আর হাঁ ঠিক ধরেছিস ওই বাসেই কৃষানুও ছিল, পরের দিন সকালে আমাকে বডি আইডেন্টিফাই করার জন্য ডাকা হলো,
শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখলাম একটা শরীরকে , যে শরীরটাকে আমি আমার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতাম , কিন্তু সেদিন কৃষানুর শরীরটা ছিল প্রাণহীন – নিথর।
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে অরুণিমা, অয়ন তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। অরুণিমাও অয়নের বুকে মুখ লুকিয়ে কান্না চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল।
অয়ন এবার অরুণিমাকে বলল আমি রাজি তোকে বিয়ে করতে, হয়তো তোকে কৃষানুর মতো ভালোবাসতে পারবো না, কিন্তু আর কোনো বৃষ্টিই তোর অয়নকে কেড়ে নিতে পারবে না।
অরুণিমা আরও শক্ত করে চেপে ধরল অয়নকে , অরুণিমার ঠোঁট ততক্ষণে অয়নের ঠোঁট স্পর্শ করেছে।
সেদিনও খুব বৃষ্টি পড়ছিল, জানেন ….
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: