বিরিয়ানি বেমাসাল  //  প্রিয়নীল পাল

1245
বিরিয়ানি হচ্ছে এমন একটা জিনিস যেটা প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের দূরত্ব একটা প্লেটেই নিমেষে মিটিয়ে দেয়। বাংলার মনে প্রাণে যেমন ভাত ডাল আলুপোস্ত এই সব আছে তেমনই সারা মন জুড়ে বিরিয়ানিও এখন সমান। দৈপান বাবুরো বিরিয়ানি প্রিয় খাবার, হেসেলে হাত না লাগলেও মশাই খুব খাদ্য রসিক, তারপরে যদি খাবার হয় বিরিয়ানি তাহলে আর দেখে কে।এই দৈপান বাবু হলেন দর্শনের অধ্যাপক, রোজ কলেজ যান আর ছাত্রদের মধ্যেও বেশ জনপ্রিয় হলেন তিনি। 
.
প্রতি সরস্বতী পুজোয় তিনি ওনার বিষয়ের ছাত্রছাত্রীদের রাতে বিরিয়ানি ভোজন করান। তা তখন দৈপান বাবু ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভগবান তুল্য। এই রাজনৈতিক অস্থির যুগে যেখানে নৈতিকতা নিয়ে মানুষের এত কেচ্ছা সেখানে বিনামূল্যে এক প্লেট বিরিয়ানি পাওয়া মানে বিশাল প্রাপ্তি। 
এরকমই একটা পুজোর রাতে সবাই বিরিয়ানি আসরে আছে, দৈপান বাবুও আছেন, ওনাকে  ওনার এক ছাত্র সৌরভ জিজ্ঞাসা করলো আচ্ছা স্যার আপনার এত বিরিয়ানি প্রেম কেন শুরু হলো! আপনি তো খাঁটি বাঙালি, আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি আপনি এতটা বিরিয়ানি প্রেমিক হবেন। 
.
দৈপান বাবু হেসে বলেন আজ কালকার দিনে যেখানে একটা প্রেমিক প্রেমিকা টিকছে না সেখানে কেমন একটা পাতে ডিম আলু চাল মাংস সাথে পনেরো রকমের মশলা এক হয়ে থাকে বল তো!লম্বা লম্বা সুগন্ধি চালের সাথে মাখামাখি তুলতুলে নরম মাংস৷ আর মোলায়েম বড় আলুর আদর ৷ সঙ্গে দেখা মেলে মুক্তোর মতো চকচকে সেদ্ধ ডিমের ৷ বেশ মাখো মাখো প্রেম গো। প্রেমিক না হয়ে উপায় কোথায়!!  আর তোমরা জানো প্রায় কুড়ি রকমের বিরিয়ানি আছে। 
.
পাশে থেকে মিতা বলে ওঠে ওরে বাপরে স্যার এখানেও দর্শন!! তা আপনি বুঝি রান্না করতে জানেন? 
দৈপান বাবু বলে ওঠেন আরে না না তা নয় আসলে এই বিরিয়ানির যে অনেক ইতিহাস আছে তাই পেট থেকে মাথা বিরিয়ানি তৃপ্তিটা ভালোই রেখেছি বুঝলে তো! 
.
সৌরভ বলে স্যার কেমন ইতিহাস! সে তো অনেক গল্প আছে, পরে বলবো। পাশে থেকে মেহুলি স্যার প্লিজ বলুন না, স্যার আবার মেহুলি কে একটু বেশিই স্নেহ করেন, কারণ সে দর্শনের টপার যে।তাই তার কথাটা ফেলা যাবে না।  তাহলে বিরিয়ানি আসরে শুরু হল বিরিয়ানি ইতিহাস উন্মোচন সভা। 
দৈপান বাবু বলতে শুরু করলেন – 
.
তোরা সবাই মমতাজ কে নিশ্চয়ই জানিস, এই মমতাজ ছিলেন খুব সুন্দরী গুণী শিক্ষিত এক রানী। অবশ্যই শাহজাহানের সব থেকে প্রিয় রানী। শাহজাহান রানীর কোনো আবদার ফেরাতেন না, তেমনই একদিন মমতাজ রাজা কে বললেন আচ্ছা আমরা আমাদের বীর সৈন্যদের দেখতে যাবো চলুন না নিয়ে, রানীর কথা মতোন শাহজাহান নিয়ে গেলেন সৈন্য ঘাঁটিতে। গিয়ে রানী অবাক। সেনাদের এ কী অবস্থা? মোগল সেনারা দুর্বল আর অপুষ্টিতে ভুগছে। বাবুর্চির সরদারকে ডাক দিলেন মমতাজ।
.
বললেন কি ব্যাপার আমাদের সৈনদের ভালো খাবার দাও না! সঙ্গে সঙ্গে রানী নিজের উপস্থিতি বুদ্ধি খাটিয়ে নির্দেশ দিলেন চালের সঙ্গে মাংস মিশিয়ে রান্না করার জন্য। সঙ্গে যেন ঘিও থাকে। ঘিয়ে ভাজা হলো চাল। মেশানো হলো মাংস। আর ওই রান্নায় মিশল বাদামসহ পনেরো ধরনের মসলা। ওই স্বাদ কেবল সেনাদের মুখেই লাগল তা না, পৌঁছাল মোগল দরবার পর্যন্ত।১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ মুঘল দরবারের বিরিয়ানির কিছুটা স্বাদ আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
.
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর চাকরীচ্যুত সিপাহী ও মুঘল প্রাসাদের রন্ধনশিল্পীরা সেই বিরিয়ানিকে পুরো ভারতে ছড়িয়ে দেয়, পেটের তাগিদে তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বিরিয়ানি বিক্রির দোকান খুলে এবং এভাবে ভারতবর্ষীয় বিরিয়ানি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
.
সৌরভ আর জিয়া প্রশ্ন করে, স্যার তাহলে মোগল থেকেই বিরিয়ানির  চল তো? 
দৈপান বাবু উত্তর দেন, ঠিক এটাই একমাত্র গল্প সেটাই নয় আমি যেটা বললাম সেটা অনেকটা ‘আইন-এ-আকবর’ গ্রন্থ অনুযায়ী। তবে আরো একটা গল্পও আছে বিরিয়ানি পেছনে। 
সৌরভ খুব উৎসাহিত হয়ে বলে ওঠে স্যার বলুন বলুন 
দৈপান বাবু আবারো বলতে শুরু করলেন – 
.
তুর্ক-মোঙ্গল শাসক তৈমুর লং মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিয়ে নেন। আর তার অন্যতম একটা পথ ছিল ভারত। ১৩৯৮ এর দিকে তৈমুরের নাগালে চলে আসে ভারতের কিছু অংশও। এ এলাকায় সেনাদের খাবারটা কী হবে? সেনাদের তো হৃষ্টপুষ্ট রাখা চাই। যেই ভাবা সেই কাজ। চালের সঙ্গে মিশল মাংস আর মসলা। বিরিয়ানির স্বাদে তৈমুরের বাহিনী সেই রকমের মুগ্ধ। 
.
মেহুলি বলে ওঠে মুগ্ধতো আমরা হচ্ছি স্যার আপনার বিরিয়ানি দর্শন শুনে!! তা স্যার আমার একটা প্রশ্ন ছিল এই যে আপনি দুটি গল্প বললেন সেখানে বিরিয়ানির সাথে চাল মশলা আর মাংস-এর উল্লেখ পেলাম কই প্রাণের আলু আর ডিম কোথায়!!!!! 
সারা ক্লাস হেসে উঠলো! 
.
দৈপান বাবু বলেন আরে না না এটা চরম গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা তুলেছো তুমি, আমিও যখন প্রথম প্রথম বিরিয়ানি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি তখন আমার মনেও প্রশ্ন জেগেছিল, তাই আমি আমার এক বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করি সে থাকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে তা তার থেকেই শুনলাম আলুর তত্ত্ব বুঝলে। 
শোনো বলি –  
.
ব্রিটিশরা অযোধ্যা থেকে বের করে দিল নবাব ওয়াজেদ আলী শাহকে।১৮৫৬ সালের ৬ মে কলকাতায় পৌঁছান নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ।১৮৫৬ সালের ৬ মে কলকাতায় পৌঁছান নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ।
মোগল সম্রাটদের বিরিয়ানিতে প্রচুর মাংস থাকত আর কেওড়া জল। গন্ধেই মাতোয়ারা।একটা বেশ নবাবি বিষয়। 
.
ওয়াজিদ আলি শাহ যখন কলকাতায় আসেন, তখন তাঁর কাছে তেমন অর্থ ছিল না ৷ তবে নবাবিয়ানাটা তো রক্তে ৷ তিনি ছিলেন, ‘খানে কা অউর খিলানে কা শওখিন’৷ খেতে এবং খাওয়াতে দারুণ পছন্দ করতেন তিনি ৷ কলকাতায় আসার বেশ কিছু বছর পর বিরিয়ানিতে আলুর যোগ করেন নবাব ৷
.
বিপুল পরিমাণে মাংস কিনে বিরিয়ানি তৈরি করার ব্যয়ভারটা কিন্তু সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না কিছুতেই সেই কারণে কিছুটা খরচ বাঁচাতে, এরই সঙ্গে বিরিয়ানির পরিমাণ বাড়াতে আলুর ব্যবহার শুরু হয় ৷সৌরভ বলে ওঠে স্যার এরকম টেস্ট তার আবার এরকম ইতিহাস কেমন ভালোবাসাটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে যে। 
.
দৈপান বাবু বলেন তাই তো গো, আমিও বিরিয়ানি ভক্ত। 
সবাই গল্প শুনতে শুনতে একটা রোমাঞ্চকর পরিবেশে নিজেদের প্লেট ফাঁকা করে ফেললো। 
দৈপান বাবু বলে ওঠেন তাহলে আজকের বিরিয়ানি আসর এখানেই সমাপ্ত হোক। এটাই বলবো বিরিয়ানির মতোন জীবনটা সুগন্ধি হোক সবার, প্রিয় হয়ে ওঠো সকলেই আর বিরিয়ানির মতোন একসাথে থাকাটা যেনো ভুলে যেও না একসাথে থাকলেই তো সৃষ্টি হবে বিশেষের।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: