প্রত্নতত্বে ইতিবৃত্তে হাওড়া

স্বপন নন্দী

পাল ও সেনযুগে হাওড়া জেলায় নির্মিত পাথরের বহু মূর্তির নিদর্শন পাওয়া গেছে। উলুবেড়িয়ার সন্নিকটে ভাগীরথী তীরবর্তী মিঠেকুণ্ডুতে পাওয়া যায় কোনাে বিশাল আয়তনের প্রাচীন মন্দিরে ব্যবহৃত দ্বারশীর্যের মধ্যস্থলে উৎকীর্ণ এক কীর্তিমুখের ভগ্নাংশ।

বাঁকড়া গ্রামে পাওয়া গেছে এক সুপ্রাচীন মন্দিরের প্রবেশপথের উপরের ভাগে নিবদ্ধ একটি নবগ্রহ মূর্তি ফলক। খােড়প, জয়পুর, পারগুস্তিয়া, পােলগুস্তিয়া, বালিটিকুরী, যদুরবেড়,কুলটির প্রভৃতি স্থানেও নানা ধরনের প্রত্নবস্তুর সন্ধান পাওয়া যায়।

শ্যামপুর থানার বাছরা গ্রামে পাওয়া যায় বিষ্ণুঃ মূর্তির ভগ্নাংশ, বিষ্ণুপট, পাথর নির্মিত পাদপীঠ ইত্যাদি। এগুলি ভাস্কর্য শৈলীর বিচারে দশম-দ্বাদশ শতকের প্রাচীন বলে মনে হয়। রূপনারায়ণ তীরবর্তী বাগনান থানা সংলগ্ন হরিনারায়ণপুর গ্রামে খ্রিস্টীয় দ্বাদশ ত্রয়ােদশ শতকের দুটি পাথরের বিমূর্তি এবং সপ্তম ও অষ্টম শতকের বিষু খােদিত প্রস্তর ফলক পাওয়া গেছে।

পাওয়া গেছে একটি ছােট পাথরে খােদিত মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি। পার্শ্ববর্তী বাটুল গ্রামে দ্বাদশ-ত্রয়ােদশ শতকের একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। মানকুর গ্রামে চামুণ্ডা মূর্তি, খালােড় গ্রামের কালীমন্দিরের পাশে ধর্ম ঠাকুরের থানে কুর্মমূর্তি, বিষ্ণুমূর্তি, চামুণ্ডা মূর্তি বানানে ভাঙা সূর্যমূর্তি উল্লেখযােগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টান্ত।

আমতায় মেলাই চণ্ডীর মন্দিরে রক্ষিত পাথরের একটি ফলক; স্থানীয় বাজার এলাকার মুণ্ডহীন এক বিষ্ণু মূর্তি, জয়পুরে জলেশ্বরের মন্দিরে রক্ষিত একটি অভগ্ন বিষ্ণুমূর্তি, খােড়ােপের গণেশমূর্তিযুক্ত পাথরের দ্বারশীর্ষ এবং রসপুর গ্রামের গড়চণ্ডীর মন্দিরে রক্ষিত একাদশ দ্বাদশ শতকে পাথরের মনসামূর্তি হাওড়া জেলার পুরাতত্ত্বকে সমৃদ্ধ করেছে।

 কৌশিকীর উপত্যকায় অবস্থিত তেলীবাটি গ্রামের বালি খুঁড়তে খুঁড়তে আবিষ্কৃত হয় একটি উমা মহেশ্বর মূর্তি, ভাস্করখােদিত বিষ্ণুপট এবং বিষ্ণুমূর্তির ভগ্নাংশ | সংলগ্ন চাল,  নিজবালিয়া, চোঙঘুরালি, মাড়ঘুরালি, প্রভৃতি গ্রামে পাল ও সেনযুগের পাথরের বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। উত্তর ঝাপড়দহে অর্বাচীন চামুণ্ডা মূর্তিও পাওয়া গেছে।

আসলে, এত যে ভাস্কর্যের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে এতে হাওড়া সুপ্রাচীনত্বের দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে। হাওড়ার সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় বিষ্ণু মূর্তি; তুলনায় বৌদ্ধধর্মের উপাসক পালরাজাদের বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়নি। মনে হয় হাওড়ার এই ভূখণ্ড মহাযানী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

বর্তমান হাওড়া জেলার ভূখণ্ড প্রাচীনকালের রাঢ়, সুক্ষ্ম বা তাম্রলিপ্তি জনপদের অন্তর্ভুক্ত  

ছিল বলেও অনুমান করা হয়। লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি ধােয়ীর পবনদূত’-এ গঙ্গাতীরবর্তী কানে সূল্পের অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে। উ, নীহাররঞ্জন রায় বাঙালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে

লখ করেছেন যে, গলির বেশ কিছু এলাকা এবং হাওড়া জেলা প্রাচীন সুক্ষ যা পরবর্তীকালে used রাম নামে চিহ্নিত হয়েছে। আবার দণ্ডী-র দশকুমার চরিত’-এ উল্লেখ রয়েছে। আয়ের প্রভাব তাম্রলিপ্তিতে বিস্তৃত হয়েছিল। প্রবােধচদ্র সেনের অভিমত, বর্তমান হাওড়া

আর একটি বৃহৎ অংশ সূক্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঐতিহাসিক শশিভূষণ চৌধুরীও প্রায় সমান অভিমত প্রকাশ করেছেন।  soথ পঞ্চম শতকে রচিত জৈন ধর্মগ্রন্থ ‘আচার রঙ্গশূন্তে’ এই রাঢ়ভূমির প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়।

কিংবদন্তী যে, মহাবীর ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে লাঢ়, বজ্জ ও সব্ব। ভূমিতে গিয়েছিলেন এবং সেখানের লােকেরা তার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। পণ্ডিতদের মতে সেই ‘লাঢ় থেকে সংস্কৃত ‘রাঢ়’ শব্দটি এসেছে।  হাওড়া জেলা এলাকার অবস্থিতি সম্পর্কে খ্রিস্টীয় দশম শতকের শেষদিকে শ্রীধরাচার্যের ‘ন্যায়-কদলী’ গ্রন্থে ‘আত্মপরিচয়’ অংশে রয়েছে :

* আসীদ্দক্ষিণরাঢ়ায়াং দ্বিজনাং ভূমিকৰ্মনাং।।

ভূরিসৃষ্টিৱিতি গ্রামাে ভূরিশ্রেষ্ঠি জনাশ্রয়ঃ ।।

‘ভূৱিসৃষ্টি’ বা ‘ভূরিশ্রেষ্ঠি’ জনপদই হল হাওড়ায় ভুরশুট নামে পরিচিত। বর্তমানে উদয়নারায়ণপুর ব্লকের দুটি গ্রামের নাম সেই সূত্রেই হয়েছে ডিহিভূরশুট এবং পার-ভুরশুট।

হাওড়া জেলা গেজেটিয়ারে (১৯৯০-এ প্রকাশিত) উল্লেখ রয়েছে যে, পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরে ‘মাদলা-পঞ্জী অনুসারে ওড়িশার নৃপতি অনঙ্গভীমদেব বর্তমান হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া মহকুমা এলাকা পর্যন্ত তাঁর রাজ্য বিস্তৃত করেন। রাঢ় দেশের দামােদর তীর মুসলমান শাসন আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত ওড়িশার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

 সমগ্র বাংলায় আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন সেন বংশের বিজয় সেন। তার আধিপত্যের এলাকায় হাওড়াও অন্তর্ভুক্ত। ষােড়শ শতকের মধ্যভাগে ওড়িষ্যারাজ মুকুন্দদেব হরিচন্দন বাংলা আক্রমণ করে বর্তমান হাওড়া জেলার দক্ষিণপূর্ব অংশ দখল করে নেন।

১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে টোডরমলের রাজস্ব এলাকাবিভাগের কালে বর্তমান হাওড়া জেলার অনেকটা অংশ তিনটি সরকার সাতগাঁ, সুলিয়ামানাবাদ এবং মান্দারণের মধ্যে বিভক্ত করা হয়।।

 সেকালের মঙ্গলকাব্যসাহিত্যে সমকালীন কিছু বিদেশী বৃত্তান্তে ও মানচিত্রে হাওড়া জেলার কয়েকটি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। চৈতন্যমঙ্গল কাব্যে উল্লেখ রয়েছে শ্রীচৈতন্য নীলাচল যাত্রার সময় শান্তিপুরের কাছে ভাগীরথী নদী পার হয়ে বর্তমানের কয়েকটি স্থান অতিক্রম করে দামােদর পার হবার আগে হাওড়া-হুগলির সীমানায় অবস্থিত শিয়াখালায় উপস্থিত হন।

চৈতন্যচরিতামৃত-তে বলা হয়েছে শ্রীচৈতন্য তাম্রলিপ্ত যাবার পথে পিছলদহে কিছুক্ষণ অবস্থান করেছিলেন। বিপ্রদাসের মনসামঙ্গল চাঁদ সদাগরের সমুদ্র যাত্রাপথের তীরবর্তী স্থানগুলির মধ্যে এই জেলার বেতড় ও ঘুষুড়ির উল্লেখ আছে। কবি মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘অম্বিকামঙ্গল’-এও আমতার মেলাই চণ্ডী ও বালি গ্রামের উল্লেখ আছে। পুরাতন হাওড়া

জেলা গেজেটিয়ার-এ সিজার ফ্রেডারিকের এক ভ্রমণ বৃত্তান্তে উল্লেখ করা হয়েছে, আনুমানিক ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে সরস্বতী নদীর অগভীরতার জন্য সপ্তগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যােগাযােগ রক্ষা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠলে ভাগীরথী তীরবর্তী বেতড় বিদেশী বণিকদের ব্যবসা বাণিজ্যের এক মুখ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। নদী ও সমুদ্রপথে অর্থকরী পণ্যের চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় মগজলদস্যুদের আক্রমণ শুরু হয়।

এই মগ দস্যুদের প্রতিহত করতে সমকালের মুসলমান শাসকেরা ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান মেটিয়াবুরুজের বিপরীতে ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে এক দুর্গ নির্মাণ করে যা থানা মাকুয়া কেল্লা নামে পরিচিত। ১৬৬০-এর ভ্যানডেন ব্রুকের মানচিত্রে স্থানটিকে থানা কিল্লা এবং ১৬৭৬-এর স্ক্রিনশ্যাম মাস্টারের ডায়েরিতে তানা দুর্গ নামের উল্লেখ। রয়েছে।।

 ১৬৫১-তে বাংলায় ইংরেজ বণিকরা প্রথম বাণিজ্য স্থাপন করেন হুগলিতে। হুগলি বাণিজ্যকুঠির ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী জোব চার্ণক সুবেদার শায়েস্তা খাঁর সঙ্গে বিরােধের ফলে ভাগীরথীর পূর্বতীর সুতানুটিতে এসে আশ্রয় নেন।

এ সময় মােগল-ইংরেজ সংঘর্ষ এবং সংঘর্ষ থেকে যুদ্ধের সূত্রে এক চুক্তি অনুযায়ী চার্ণক ১৬৮৭-এর ১৭ জুন উলুবেড়িয়াতে এসে পৌঁছান তার রণতরী নিয়ে উলুবেড়িয়াতে তিনি তিন চার মাস অবস্থান করেন। চার্ণক উলুবেড়িয়াতেই ইংরেজ ঘাঁটি তৈরির সুপারিশ করেছিলেন।

কিন্তু কোম্পানি সুতানুটিকেই যােগ্যতার বিবেচনা করে ১৬৯০-এর আগস্ট সুতানুটিতেই ফিরে আসেন। ওই তারিখটিই কলকাতা মহানগরীর ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠা দিবস। উলুবেড়িয়াতে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের রাজধানী হওয়ার একটা সম্ভাবনা সেসময় সূচিত হয়েছিল।

 খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতকে দিল্লির সমকালীন বাদশাহ ফারুক শাহের কাছে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির এক প্রতিনিধিদল ভাগীরথীর পূর্বতীরে তেত্রিশখানা ভােগদখলী গ্রামের পুনরায় বন্দোবস্তের প্রার্থনা জানায়। সেই সঙ্গে ভাগীরথীর পশ্চিমতীরের শালিখা, হাড়িড়া, কাসুন্দিয়া, রামকৃষ্ণপুর ও বেতড় এই পাঁচটি গ্রাম বন্দোবস্তের জন্য পাট্টা দেবার প্রার্থনা জানায়।

কিন্তু সেই প্রার্থনা মঞ্জুর হয়নি। ১৭২২-২৪ খ্রিস্টাব্দে মুশদিকুলি খাঁ এবং তার জামাতা সুজাউদ্দিনের আমলে ভূমিরাজস্ব বিধি সংশােধনের জন্য উলুবেড়িয়া মহকুমার সমগ্র অংশ এবং হাওড়া সদর মহকুমার এক বিরাট অংশ বর্ধমান জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়।

হাওড়ার বাগনান অঞ্চলের নবাসনে জেলার একমাত্র পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা, মূলত জেলার একমাত্র পুরাতাত্ত্বিকতারাপদ সাঁতরার অক্লান্ত পরিশ্রমে জেলায় প্রাপ্ত বহু পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন এই মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ১৯৬২ সালের ১৪ই জানুয়ারি, এটির উদ্বোধন হয়। ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ২৩শে এপ্রিল ১৯৭২ সালে এটি পরিদর্শন করেন।

 

 

কবি , গবেষক স্বপন নন্দী  //  যোগাযোগ : 7699249928

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: