পূর্ণতা    –      সন্টু মান্না

পৃথিবীতে বৈপরীত্য সতত বর্তমান।সেই বৈপরীত্যের মধ্যে একত্বও বর্তমান। নদী যেমন সাগরের দিকে ছোটে, চুম্বকের উত্তর মেরু যেমন দক্ষিণ মেরুকে আকর্ষণ করে, তেমনি একটি পুরুষ আকৃষ্ট হয় নারীর প্রতি। বিশেষত কৈশোরে ,

যে সময়ে একটি বালকের নাকটিকে প্রাধান্য দিতে নাকের নিচে কালো আন্ডারলাইন গজায়, শিশুসুলভ আচরণ পরিবর্তিত হয়, পরিবর্তন হয় গলার স্বরের ;

এক কথায় বালক থেকে যুবক রূপে উত্তীর্ণ হওয়ার যে সময় সেই সময়ে একটি নারীর প্রতি তার আকর্ষণ দুর্নিবার হয়ে ওঠে।

আমাদের রবি ঠিক এই রকম এক কিশোর, বর্তমানে নবম শ্রেণীতে পাঠরত রবিকুমার দাস, বছর 15 এর একজন কিশোর। তার বাবা মহেশ্বর দাস,একজন চাল ব্যবসায়ী, মা কাকলী দেবী গৃহকর্ত্রী। পড়াশোনায় খুব একটা ভালো না হলেও মন্দও নয়।

যাক এখন আসল কথায় আসি।  এই রবি তার ক্লাসের সহপাঠিনী কুসুম কে নিজের অজান্তেই মনটা কবে দিয়ে দিয়েছে তা বুঝতে পারেনি।  ক্লাসে পড়া বোঝার সময় প্রায় সময় কুসুমের দিকে তাকিয়ে থাকে রবি।

মনের মধ্যে উত্তপ্ত লাভার মত একটা কথা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু স্বভাবতঃ লাজুক  রবি সেই লাভাকে কোনোরূপেই বাইরে আসতে দেয় না। দিন কাটছিল ঠিক এভাবেই।

কিন্তু সরস্বতী পূজার আগের দিনে যখন ওরা স্কুলের প্যান্ডেল সাজাচ্ছিল তখন ওই স্থানে শুধু ও, কুসুম, আর ক্লাস সেভেনের একজন ছেলে ছিল। রবি তাকে কিছু একটা আনতে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। তারপরে কুসুমের কাছে গিয়ে বলে,

—-কুসুম, তোকে একটা কথা বলব?

—-হুঁ, বল।

—-বলছি…..বলছি……আমতা আমতা  করতে থাকে রবি, কুসুম বলে ,

—-কিরে কি বলবি বল?

—-না, মানে……

ততক্ষনে ছেলেটি চলে আসায় রবির সমস্ত সাহসে ছাই পড়ে গেল। সন্ধ্যা হয়েছিল। আলপনা, সাজানো শেষ করে ওরা বাড়ি যাওয়ার পথে রবি কুসুমকে বলল

—-কুসুম, আগামী কাল সকাল সকাল আসিস।

—-হুঁ, জানি, অনেক কাজ, ফলকাটা, পূজার জোগাড় করা , এসব করতে হবে। আমার বান্ধবীদের ও ডেকে নিয়ে আসব। ওরা তো আজ তাড়াতাড়ি চলে গেল।

রবি বলল, —ওরা আসবে’খন, তুই আগে আসবি,

—-কেন?

—-আমি বলছি তুই আসবি। বলে একদৌড়ে রবি চলে গেল তার বাড়ির পথে। আর কুসুম একটু হেসে এগিয়ে গেল।

পরেরদিন সকাল, হালকা কুয়াশা, কিঞ্চিৎ শীত, আমের বোল, আর পলাশের রঙে সেজেছে পরিবেশ, স্কুলে স্কুলে আয়োজন চলছে বাগদেবীর আরাধনার, ভক্তিযুক্ত মনে, নতুন পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে একে একে পড়ুয়ারা আসছে বিদ্যালয়ে।

কথামত কুসুম আগে এসে আগেরদিন এনে রাখা ফল কাটা শুরু করে দিয়েছে। সেই সময় এল রবি। কুসুমের পরনে হলুদ শাড়ি, আর রবির পরনে সাদা পাঞ্জাবি। রবি কুসুমকে দেখে বলল,

—-তোকে বেশ ভালো দেখাচ্ছে রে।

—-জানি, তা আমাকে একা এত তাড়াতাড়ি আস্তে বলেছিলিস কেন?

—–বলব?

—-না, বলবি না, যদি বলবিই না, তবে ডেকেছিস কেন?

রবি চোখ বন্ধ করল, তার পাঁজরের ভিতরে থাকা হৃদপিণ্ডতা মিনিটে চার-পাঁচশো বার লাফাতে চাইছে, নিশ্বাস হয়েছে ঘন। সম্পূর্ণ সাহস জোগাড় করে রবি যেই না বলতে যাবে, অমনি,

–কিরে তোরা এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছিস, তা বেশ বেশ, রবি, তুই আমার সঙ্গে যায়, পূজার জিনিসপত্র গুলো আনবি চল।

বলে প্রধানশিক্ষক মহাশয়, গট গট করে চলে গেলেন দোতলায়। রবিও ধুত্তোর! বলে চলে গেল।

এরপর আর কুসুমকে রবি একা পেল না, সময়ে শুরু হল পূজা, বীনাপানির বীণা রবির মনে যে এক অপার অনুভূতির সুরের ঝড় তুলেছে, তাই অঞ্জলি দেওয়ার সময় রবির চোখ সরস্বতীর চরণ বা, মুখের দিকে নেই, বরং সে তাকিয়ে রয়েছে  কুসুমের মুখের দিকে।

ক্রমে পূজা শেষ, প্রসাদ বিতরণের সময়ও ওরা বহুজনবেষ্টিত,   পরে প্রধানশিক্ষক মহাশয় ওদের বললেন সন্ধারতির সময় থাকতে। রবি রাজি হল, সঙ্গে কুসুমও।

সেদিন সন্ধ্যায়, কুসুম আগেই গিয়ে সন্ধ্যারতির জোগাড় করে রাখছে, রবি এল।

রবি বলল,

—-হ্যাঁরে আমি কিছু সাহায্য করব?

—-হ্যাঁ, তুই প্রদীপের সলতে পাকা। বলে কুসুম  রবির কাছে কিছুটা তুলো দিল, রবি সলতে পাকাতে পাকাতে বলল,

—-তোকে একটা কথা বলব কুসুম?

—-বল, সেই কাল সন্ধ্যা থেকে বলছিস, বলা তো আর হচ্ছে না।

—-না, মানে, মানে, মানে,……..

—-ওই মানে বই, মানে মানে না করে মনে কি আছে তা বল।

—-মানে শুনে তুই কিছু বলবি না তো?

—-তুই এবারে না বললে আমি এই ঘন্টা দিয়ে তোর মাথায় মারব। বলে কুসুম পিতলের ঘন্টা বাগিয়ে ধরল,

—-আমি তোকে ভালোবাসি, ঝড়ের গতিতে বলল রবি।

শুনে কুসুম উদাসীন ভাবে বলল,—-জানি তো,

—-মানে!, মানে! মানে তুই জানিস?

—-হুমমম, জানি, যখন বাংলার স্যার সীতার বর্ননা দিত তখন তুই আমার দিকে হ্যাংলার মত তাকিয়ে থাকতিস, যখন সকলে সরস্বতীর মুখ দেখে ভালো বলছিল তখন তুই সেদিকে না তাকিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলি, আবার অঞ্জলি দেওয়ার সময়ও…..

কুসুমকে আর বলতে দিল না রবি, বলল,

—-ওরে এবার চুপ কর, নিলে কেউ শুনে ফেলবে।

এই ঘটনার পর থেকে স

সকালে আকাশের রবি উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রবি দৌড় প্র্যাকটিস এর নাম করে প্রতিদিন কুসুমকে দেখার জন্য যেত। একবার দেখা পেলেই চলে আসতো।

মাঝে মাঝে ওদের দুজনকে দেখা যেত একসঙ্গে বাড়ি ফিরতে, কিংবা স্কুলে যেতে।

সেদিন স্কুলে কি একটা মিটিং থাকায় স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যায়। রবিবার কুসুম একটু নদীর ধারে ঘুরে বাড়ি ফিরছিল, কোনো একসময় ওরা একে অপরের হাত ধরেছিল,

আর ঠিক সেই মুহূর্তে রবির বাবা দোকান বন্ধ করে সাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন, তিনি এই যুগলকে দেখতে পান, কিন্তু কিছু না বলে অন্য রাস্তা ধরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলেন।

কিছুক্ষন পর হাসিমুখে রবিও বাড়ি ফিরল। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল স্পেশাল জেরা, জেরার মুখে রবি স্বীকার করল ওদের ভালবাসা, তার পর যা হয়, বেড়া ভেঙে কঞ্চি নিয়ে রবির বাবা রবির পিঠে এঁকে দিলেন মারের দাগ।

সেদিন বিকেলে রবি আর খেলতে গেল না। ঘরেই বসে রইল।

রবির মা বুঝলেন ছেলের ব্যাথা, সান্ত্বনা দিলেন, কিন্তু তাতে কি আর হয়?

রাতে মহেশ্বরবাবু রবিকে বোঝালেন

—-দেখ খোকা, এই বয়সে একটু প্রেমভাব ভালোবাসা হয়, কিন্তু তা ভালোবাসা নয়, ভালোলাগা মাত্র, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ভালোলাগা হারিয়ে যাবে, হয় সে ভাঙবে নয় তুই ভাঙবি, মনে আঘাত লাগবে,

ফলে জীবনে ক্ষতি হওয়ার পূর্ন আশঙ্কা। এখন এসব ছেড়ে পড়াশোনায় মন দে, কমপক্ষে কলেজটা পাশ করে আমার ব্যবসার হাল ধর। চাকরির সুযোগ এবাজারে নেই, পৈত্রিক ব্যবসা করে তুই স্বাবলম্বী হ, তার পর ওসবের কথা ভাববি।

যে পাখি নতুন উড়তে শিখেছে, যে নতুন সাঁতার কাটতে শিখেছে, আর যে ভালোবাসার আনন্দ পেয়েছে সে  কোনো কিছুকেই মানতে চায় না। রবিও মানল না।

পরেরদিন স্কুলে গিয়ে কুসুমকে পুরো ঘটনাটি বলল রবি, দুজনে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ভাবতে থাকল উপায়। শেষে কুসুম বলল,

—-আচ্ছা, আমরা যদি অত কাছাকাছি না থেকে একটু তফাতে চলাফেরা করি তাহলেতো কেউ বুঝতে পারবে না।

ওটাই ঠিক হল।

কিন্তু মহেশ্বরবাবু ছেলের উপরে নজর রেখেছিলেন, তিনি বুঝেছিলেন ছেলে সহজে ছাড়বে না। তাই প্রতিদিন তার পড়াশোনার খবরাখবর নেওয়া শুরু করলেন। রবিও বাবা পড়াশোনার খবর নিচ্ছে দেখে ভালো করে পড়ায় মন দিলো।

দেখতে দেখতে নাইন পাশ করে ওরা উঠল টেনে, ক্রমে প্রিটেস্ট , টেস্ট পেরিয়ে এসে গেল মাধমিক পরীক্ষার দিন।  ওরা দুজনেই টেস্টের পর একে অপরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায়নি। তাই পরীক্ষার সেন্টারে হল অনেক কথা।

ক্রমে মাধ্যমিক শেষ, তারপর রবি গেল তার মামারবাড়ি , আর এদিকে কুসুমের তো উচাটন মন ঘরে রয় না।

তবে রবি বেশিদিন থাকল না , ফিরে এল। এবং লুকিয়ে কুসুমের সঙ্গে দেখা করতে থাকে।

মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেল দুজনেই প্ৰথম বিভাগে উত্তীর্ণ।

এই বারে মহেশ্বর বাবু একটি চাল চাললেন, তিনি রবিকে তার মামাবাড়ির কাছে একটি স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। রবির কিছুই করার নেই, সে ভারাক্রান্ত মনে কুসুমের কাছে বিদায় নিল।

মান্নাদে ‘র একটি গান আছে “…..প্রিয় যবে দূরে চলে যায়, সে যে আরো প্রিয় হয়…..”

কুসুম রবির ক্ষেত্রে তাই হল। কুসুম মাঝে মাঝেই রবিদের বাড়িতে এসে তার খোঁজখবর নিতে লাগল, মহেশ্বর বাবু বুঝলেন গতিক সুবিধের নয়। তাই তিনি কূটবুদ্ধির আশ্রয় নিলেন,

কুসুমের বাবাকে কুসুমের বিয়ে দিয়ে দিতে বললেন, কুসুমের বাবার অবস্থা  সচ্ছল, তার ইচ্ছাও ছিল, কিন্তু কুসুমের মায়ের আপত্তির জন্য বাড়িতে সেকথা তুলতে পারেননি। মহেশ্বরএর কথায় তিনি দ্বিগুণ আশাবাদী হয়ে বাড়িতে কথা তুললেন, কুসুমের মা পুনরায় আপত্তি জানালেন,

কিন্তু সে আপত্তি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করলেন কুসুমের বাবা। কিন্তু বেঁকে বসল কুসুম, তার সোজা কথা, আগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ, তারপর ওইসব চিন্তা। মেয়েকে খুবই স্নেহ করতেন পিতা, তাই মেনে নিলেন মেয়ের দাবী।

দেখতে দেখতে উচ্চমাধ্যমিক শেষ, রবি এবং কুসুম, দুজনে ভালো নম্বর পেয়েই পাশ করেছে, কিন্তু রবিকে বাড়ি আসতে দিলেন না মহেশ্বর বাবু, তিনি রবিকে কলকাতার এক কলেজে ভর্তি করে দিলেন,

কিন্তু তারই কথা মত কুসুমকে কুসুমের পিতা আর কলেজে ভর্তি করলেন না, পাছে কুসুম আবার কলেজ শেষ করার বায়না ধরে, তার বদলে কুসুমকে গৃহস্থালির কাজকর্ম শিখতে বললেন।  এবং সঙ্গে চলতে থাকল পাত্র খোঁজা।

সময় নিজের মত বয়ে যায়, এদিকে বহুদিনের অদর্শনে  ,স্মৃতির রোমন্থন করে রবি কুসুমের প্রেম কিন্তু জীবিত।

দেখতে দেখতে রবি 3rd ইয়ারে উঠল, আর কুসুমের জন্য পাত্র দেখাও হল, ধনী পরিবার, একমাত্র ছেলে, সুন্দর সুঠাম চেহারা, চাকরি করে পুলিশে, সবই ভালো , কিন্তু একটু বেশি গোঁয়ার, প্রচন্ড জেদী।

প্রথমে পাত্রপক্ষ দেখতে এল কুসুমকে, একবার দেখেই পছন্দ হয়ে গেল, সবাই মিষ্টিমুখ করল, কিন্তু কুসুমের বুকে বাজল শেল। রবিকে জানানোর কোনো উপায় নেই। তাই কুসুম গিয়ে কেঁদে পড়ল রবির মায়ের পায়ে, রবির মা সবই জানতেন, তার যে কষ্ট হচ্ছিল না, তা নয়, কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে  নারীর কথা শোনে কে??

পাত্রপক্ষ পণপ্রথা বিরোধী, ফলে কোনো বাধা থাকল না, বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গেল। একদিন পাত্রপক্ষ আশীর্বাদ করে গেল। বিয়ের আনন্দে যখন সবাই মাতোয়ারা, তখন অন্ধকারের অন্তরে নির্জনে কেঁদে যায় কুসুম।

রবি এসবের কুচুই জানেনা, সে জানে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে হবে বেশ ভালো করে, তার পর বাড়ি গিয়ে দেখতে পাবে তার কুসুমকে, পুজোর সময় মা আসে তাই মাকে দেখার অতটা ব্যাকুলতা নেই, কিন্তু পাঁচ বছর সে কুসুমকে দেখেনি,

বাবার ভয়ে বাড়িও যেতে পারেনি,  এই পাঁচ বছরে না জানি দেখতে কেমন হয়েছে, তার ও তো কম পরিবর্তন হয় নি, যখন ঘর ছেড়েছিল তখন তার সবই গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে, কিন্তু এখন তার পেশীবহুল চেহারা, মুখে গোঁফ, দাড়ি, সে এখন পূর্নপুরুষ। কলেজে অনেকেই প্রপোজ করেছিল, সবকটাকে কাটিয়েছে রবি, বাবাকে দেখিয়ে দিতে চায় যে প্রথম প্রেম সবসময় ভালোলাগা নয়, সেটাও অনন্ত হতে পারে।

কিন্তু বিধাতার পরিহাস,

আজই রবির শেষ পরীক্ষা, মহেশ্বর বাবুর ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে , তিনি এখন খুবই ব্যস্ত। আর ঘটনা ক্রমে আজই কুসুমের বিয়ের দিন।

তখন রাত এগারোটা রবি বাড়ি ফিরল, মনে অনেক আশা, উত্তেজনা, বাড়ি আসার পথে দেখল তার বাড়ি থেকে দেখা যাচ্ছে অনেক আলো, ও থাকগে, এখন মায়ের সাথে দেখা করি, তারপর ওসব নিয়ে ভাবব।

বলে রবি বাড়ি ঢুকল, দেখল তার মা বসে আছে , দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল রবি, মাও তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, ঘরে ঢুকে রবি বাবা কোথায় জানতে চাইল। এইসময় রবির মা উত্তর দিতে একটু ইতস্তত করলেন, শেষে রবির জোরাজুরিতে বললেন যে  মহেশ্বর বাবু একটি বিয়ে বাড়িতে গেছেন। তখন রবি জানতে চাইল যে রাস্তা থেকে যে আলো দেখা যাচ্ছে সেখানে কি?

—হ্যাঁ

—-কার বিয়ে মা,

ছেলের কাছে লুকিয়ে রাখার অনেক চেষ্টা করেছিলেন তিনি ,

কিন্ত আর পারলেন না , কেঁদে ফেললেন, এবং শেষ পর্যন্ত বলেও দিলেন যে কুসুমের বিয়ে, শুনেই তো রবির মাথায় বজ্রাঘাত, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল, প্রথমটায় সে বিশ্বাস করতে চায়নি, তাই দৌড়ে গেল বিবাহ মন্ডপে, গেটে দেখল সত্যই কুসুমের বিয়ে, আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না রবি,

ঘরে এসে কান্না শুরু করল, মাও তার সঙ্গে কাঁদতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর রবি সিদ্ধান্ত নিল, যে সে আজ রাতেই শেষ ট্রেন ধরে মামাবাড়ি ফিরবে। মা বাধা দিলেন না, তিনি বুঝলেন এখানে থাকলে রবি মোটেও ভালো থাকবে না।

কিন্তু বিধাতার পরিহাস,

রবি যেই বেরোতে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে মহেশ্বর বাবু এসে ঢুকলেন ঘরে,  অন্ধকারে রবিকে তিনি দেখতে পেলেন না, তিনি সোজা রবির মাকে বললেন,

—-সর্বনাশ হয়েছে জানো, কুসুমের বর, আজ সকালে বাইকে গিয়েছিল মিষ্টি দোকানে, হঠাৎ একটা ছিনতাইকারী এক মহিলার গলার চেন টেনে নিয়ে চম্পট দেয়,  ছিনতাইকারী বাইকে ছিল, তাই বরও নিজের বাইকে তাড়া করে, কিন্তু হঠাৎ সামনে একটা বাচ্চা চলে আসায় ব্রেক মারে, এবং ছিটকে পড়ে যায়, মরে যায়নি, তবে দুটো পা বোধহয় বাদ যাবে।

তারপর  একটু থেমে  বললেন,

—-মেয়েটা বোধহয় লগ্নভ্রষ্টা হবে গো, বরের বাড়ি থেকে জানিয়ে দিয়েছে যে কুসুমের নাকি মাঙ্গলিক দোষ আছে, তাই কুসুমের সঙ্গে আর ওদের ছেলের বিয়ে দেবে না।

রবির মা, এতক্ষন চুপচাপ শুনছিলেন, শেষ শব্দগুলো শুনে চেঁচিয়ে উঠলেন,

—-ভগবান যা করেন ভালোর জন্য ।

বলে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

রবি বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল, তিনি রবিকে নিয়ে সোজা পৌঁছালেন কুসুমের বাড়ি।

বিধাতার পরিহাসকে ছাপিয়ে গেল প্রজাপতির ইচ্ছা,

তারপরের ঘটনা অতি সংক্ষিপ্ত, কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা যেকোনো পাত্রের সাথেই কন্যার বিবাহ দিতে প্রস্তুত। আর রবিও প্রস্তুত, ফলে প্রজাপতির আশীর্বাদে শুভ পরিণয় সম্পন্ন হল। পূর্ণতা পেল ওদের প্রেম। পূর্ন হল রবির শপথ।

মহেশ্বর দাস একটু গররাজি ছিলেন, কিন্তু গৃহিণীর কটাক্ষে পুরোটাই রাজি হতে বাধ্য হলেন। অবশ্য তার কথামতোই রবি গ্রাজুয়েশন এর পরেই বিয়ে করল।

সবাই এখন বেশ আনন্দেই আছে। তাই আমরাও আনন্দে থাকি।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *