পায়রার আকাশ

গৌরাঙ্গ মিত্র

অস্তগামী সূর্যর আলােয় পশ্চিমের আকাশটা অপরূপহয়ে উঠেছে। আকাশ রােজই এমন সুন্দর হয়ে ওঠে। জয়িতা সেকথা জানে। কিন্তু প্যাস্টেল রঙেআঁকা আকাশটা দেখে নিজেকে মুগ্ধ করার সময় কোথায়? প্রাত্যহিক রুটিন সামলাতে সামলাতে জীবন থেকে হলুদ পাতার বেদনা নিয়ে একটা একটা করে দিন খসে পড়ে।

অনেক ভাবনা জয়িতার মাথার ভিতরে খেলা করতে লাগল, যেভাবে মাছরা সমুদ্র’র নীল জলে খেলা করে, অন্তহীন সাঁতার কাটে। আচমকা একটি পায়রা তার পা’র সামনে আছড়ে পড়ল। পায়রাটিরশরীর রক্তে ভিজে গেছে। অনুসন্ধিৎসা নিয়ে জয়িতা পায়রাটির উপরে ঝুঁকে পড়ল। দেখল, কিছু সুতাে তার পায় আর ডানায় জড়িয়ে গেছে।

নিমেষে বুঝে নিল মাঞ্জা দেওয়া ঘুড়ির সুতােয় পায়রাটি বিপদগ্রস্ত হয়েছে। অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশটাকে আর একবার দেখে নিল জয়িতা। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের অনেক বাড়ির ছাদে রঙিন রঙিন ঘুড়ি আকাশময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। নিশ্চয় এমনই একটা ঘুড়ির মাঞ্জা দেওয়া সুতােয় পায়রাটির এই বেহাল দশা।

একদা গৌতম-কাম-সিদ্ধার্থর পার সামনে একটি আহত হংস আছড়ে পড়ে শুশ্রুষা প্রার্থনা করেছিল। এখন এই মুহূর্তে জয়িতা যেন সিদ্ধার্থ হয়ে গেছে। তার বিপ্রতীপে কোনও দেবদত্তকে খুঁজে পাওয়া যাবে , একথা সে বিলক্ষণ জানে।

তাদের অফিসে সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স’এর কার্যালয় রয়েছে। সেখানে পায়রাটিকে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করে নিল।

এরপর পায়রাটিকে নিয়ে মালাকারবাবুর কাছে গেল। মালাকারবাবু একজন হাতুড়ে ডাক্তার। হাতুড়ে বলে আণ্ডারএস্টিমেট করা যাবে ।

যথেষ্ট হাতযশ আছে। তার কাজের টেবিলের এককোণে হােমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স রাখা থাকে। প্রয়ােজনে সহকর্মীরা তার কাছে আসেন। এজন্য মালাকারবাবুদক্ষিণা নেন না। চ্যারিটেবল সার্ভিস। মালাকারবাবুর টেবিলের ওপরে পায়রাটাকে বসিয়ে জয়িতা বলল -মাঞ্জা দেওয়া ঘুড়ির সুতােয় পায়রাটা জড়িয়ে গিয়েছিল।

পা’র এইখানটা দেখুন। পিঠের এই জায়গাটা কীরকম কেটে-ছড়ে গেছে। একটু ওষুধ দিন। আর কী ওষুধ খাওয়ানাে যায় – নামটা বলে দিন। আমি শুভ্রকে ফোন করে আনিয়ে নেব।

একটা চিরকুটে ইংরাজিতে, ক্যাপিটাল লেটারে, মালাকারবাবু লিখে দিলেন – STAPHYSAGRIA 30. সঙ্গে সঙ্গে জয়িতা তার কর্তামশাইকে ফোন লাগাল – বাড়ি ফেরার সময় টেন এম এল স্ট্যাফিসেগ্রিয়া থার্টি নিয়ে নিও তাে।।

-কী ওষুধ বললে, আর একবার বলাে?

– লেখাে, এস-টি-এ-পি-এইচ-ওয়াই-এস-এ-জি-আর-আই-এ থার্টি। লিখেছ? ২মক চায় বাড়ি ফিরবে?…হ্যা, হা, তাড়াতাড়ি ফিরাে। আমি পাঁচটার মধ্যে ফিরছি.

না, আমার কিছু হয়নি, ঠিক আছি…বাড়ি ফিরে সব বলছি। পায়রাটিকে নিয়ে জয়িতা অফিস থেকে আগে আগে বেরিয়ে পড়ল। সে ফিরে আসার আগেই শুভ্র বাড়ি ফিরে এসেছে। একেবারে ইওরস মােস্ট ওবিডিয়েন্ট…’।

বলা বাল্য, হ্যানিম্যান কোম্পানির ১০ এম এল স্ট্যাফিসেগ্রিয়া থার্টিও কিনে এনেছে। শুভ্রর সিনসিনিয়ারিটি দেখে জয়িতা খুশি। পরম মমতায় পায়রাটিকে শুভ্র’র চোখের সামনে তুলে ধরে বলল – বেচারার কী দুর্ভাগ্য দেখ। মাঞ্জা দেওয়া সুতােয় জড়িয়ে গিয়ে একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড।

সারিয়ে তুলতে হবে তাে। মালাকারদার কাছ থেকে ওষুধের নাম জেনে নিয়ে তােমাকে ফোন করেছি। তিন-চার ফোঁটা খাইয়ে দাও তাে। মানুষের হিসেবে ভােজ দিলে চলবে না। ভেটেরিনারি অ্যাপ্রােচে ওষুধ প্রয়ােগ করতে হবে।।

শুভ্র অনুগত সৈনিকের মতাে নির্দেশ পালন করল। সে জানে, জয়িতা হল সেনাপতি আর সে একজন সাধারণ পদাতিক মাত্র।

পায়রাটিকে বক্স জানলার উপর বসিয়ে দিল জয়িতা। একটা ছােট পাত্রে একমুঠো চাল রেখে ওর ঠোটের নাগালে রাখল। যদি দু-চারটে দানা খায়। বেচারার নিশ্চয় খিদে পেয়েছে। রান্নাঘরে গিয়ে কিছুটা শুকননা আটা একটা বাটিতে তুলে নিল।

তাতে অল্প অল্প : করে জল মিশিয়ে চটকিয়ে নিল। ছােট ছােট গুলি করে দুর্দশাগ্রস্ত অতিথিকে সৎকার করার চেষ্টা করবে। মনে মনে ভেবে রেখেছে ঘন্টা তিনেক বাদে আর একবার স্ট্যাফিসেগ্রিয়া খাইয়ে দেবে।

অন্যদিনের তুলনায় আজ বেশি সকালে জয়িতার ঘুম ভেঙে গেছে। মাথার মধ্যে চিন্তার ভারি বােঝা থাকলে এমনই হয়। পায়রাটি নিয়ে কম চিন্তা নয়। যত না চিন্তা, দুশ্চিন্তা তার চেয়ে অনেক বেশি। তাড়াতাড়িওর ক্ষতস্থান সারিয়ে তুলতে হবে। শুভ্রকে বাজারে পাঠিয়ে কিছু গম জোগাড় করল।

চালের থেকে গম সম্ভবত পায়রাদের বেশি পছন্দ। খাদ্যতালিকায় আর কী কী থাকলে অতিথিনারায়ণটি খুশি হয়, তা বােঝার জন্য জয়িতাকে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। সেবা শুশ্রষার ফাঁকে ফাঁকে নিজের সংসারের কাজও কিছু কিছু সামলে নিচ্ছে। | জয়িতা সিদ্ধান্ত নিল, আজ আর সে অফিসে যাবে না।

পায়রাটির হিতসাধনের দায়িত্ব মাথার উপর। শুধু আজ কেন, স্বচ্ছন্দে ওড়ার মতাে শক্তি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত সে অফিসে যাবেনা। ছােট কাজের গুরুদায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছে সে। একজন জয়িতা ছাড়া যােগাযােগ ভবন যে গড়গড়িয়ে চলবে, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই তার।

অঘ্রাণের সূর্য মাথার উপর দিয়ে পশ্চিম আকাশের দিকে একটু একটু করে হেলে পড়তে শুরু করেছে। ভাতঘুমে জড়িয়ে এসেছিল জয়িতার চোখ। কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই তা ভেঙে গেল, ভীত সন্ত্রস্ত পায়রার আর্তনাদে।

ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়ে, বক্স জানলার দিকে ছুটে গেল জয়িতা। চোখে পড়ল, একটা কালাে রঙের বেড়াল কুতকুতে চোখে পায়রাটিকে নিরীক্ষণ করছে। জানলার গ্রিল দিয়ে ঢুকে পড়ার মতলব ভাজছে।

বেড়ালের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে পায়রাটি ভয়ে চিৎকার করে উঠেছে। এই যা, হ্যাট হ্যাট’ আওয়াজ তুলে জয়িতা বেড়ালটিকে তাড়ানাের চেষ্টা করল।

যতদিন পায়রাটি সেরে না উঠে আকাশে ওড়ার মতাে শক্ত অর্জন না করতে পারছে, ততদিন সে অফিসে যাবেনা – এই সিদ্ধান্ত আরও একবার দৃঢ়ভাবে নিয়ে ফেলল জয়িতা ; মেয়েদের অবলা বলে মনে করা হয়। জয়িতা নিজে একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও তার মনে হল পশু-পাখিরাই প্রকৃত অবলা।

ঘর-গেরস্থালি সামলাতে সামলাতে পায়রাটির যত্ন-আত্তি করছে জয়িত। অথবা অন্যভাবে বললে, পায়রাটির সেবা-পরিচর্যা করতে করতে ঘর-গেরস্থালিও সামাল দিচ্ছে। |

রান্নাঘর থেকে পায়রার আওয়াজ কানে এল। মনে হল, পায়রাটি খুব ভয় পেয়েছে। কী কারণে ভয় পেয়েছে তা আবিষ্কার করার জন্য পায়রাটির কাছে দ্রুত পায় চলে এল জয়িতা।

জানলার গ্রিলের বাইরে থেকে একটা ধান্দাবাজ বেড়াল লুব্ধ চোখে পায়রাটিকে জরিপ করেছে। কী মুশকিল! এই বেড়ালের লােভের থাবা থেকে যেভাবেই হােক, পায়রাটিকে বাঁচাতেই হবে।।

রুটিনমাফিক কাজের তাগিদে শুভ্রকে বেরােতে হয়েছে। শুভ্র বাড়ি থাকলে তাকেই দোকানে পাঠাত। ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে হার্ডওয়্যারের দোকানে ছুটল সে। জয়িতা জানে হার্ডওয়্যারের দোকানে পাখির খাচা কিনতে পাওয়া যায়।

জয়িতা যদিও পাখিদের পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে, স্বরাজের পক্ষে, তবু এক্ষেত্রে পায়রাটিকে খাঁচায় বন্দিনা করে পারা যাবে না। বেড়ালটি কোন ফাঁকে ওর মুণ্ডুটা চিবিয়ে স্বরাজের দফরফা করে ফেলবে।

খাঁচাটি হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরল জয়িতা। খাঁচাটার দরজা খুলে পায়রাটিকে অপরিসীম মমতায় খাঁচার মধ্যে বসিয়ে দিল। ছােট একটি চার প্লেটে দু-তিন রকম খাবার রেখে দিল।

খাঁচার ভিতরে জলের জন্য বাটি আছে তাতে কিছুটা জল দিল। উইণ্ডো বন্ধ করে তারের জালির কাছে ঝুঁকে জয়িতা বলল – আমাকে ক্ষমা করিস। জীবনে পাখি পুযিনি, পাখি পােষার নামে কাউকে আমি বন্দী করে রাখতে চাই না। হতচ্ছাড়া বেড়ালটার জন্য আমাকে সেই কাজই করতে হচ্ছে। তুই সেরে ওঠ, তারপর তাের আকাশ তােকে ফিরিয়ে দেব।

একদিন, দুদিন করে এক সপ্তাহ কেটে গেছে। জয়িতার আর অফিসে যাওয়া হয়নি। তবে মােটামুটি সেরে উঠেছে বেচারা। আর দু-এক দিনের মধ্যে ওকে কণ্ডিশন’ হয়ে যাবে। আজ অফিস থেকে প্রশান্তদা, হেমন্তদারা ফোন করেছিলেন। পায়রার বর্তমান পরিস্থিতি জানিয়ে দিয়েছে জয়িতা।

সময়মতাে খেয়েদেয়ে পায়রা-সমেত খাঁচাটিকে হাতে ঝুলিয়ে অফিসের পথে বেরিয়ে পড়ছে জয়িতা। দমদম স্টেশনে মেট্রো রেলের গেটে কর্তব্যরত কর্মীরা আপত্তি করলেন, এসব নিয়ে আপনি ট্রেনে উঠতে পারবেন না। প্লিজ ম্যাডাম, এসব অ্যালাউড নয়।

হাতজোড় করে জয়িতা বলল, আমাকে আটকাবেননা। দয়া করে ভিতরে যেতে দিন। প্রাণীটিকে নিয়ে আমি অফিসে যাচ্ছি। আপনাদেরই মতাে আমি কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে। ঘুড়ির সুতােয় জড়িয়ে গিয়ে বিচ্ছিরি রকম আঘাত পেয়েছিল পায়রাটি। এটাকে সারিয়ে তুলে ওর নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দেব।

কর্তব্যরত মেট্রো কর্মীদের মায়া হ’ল বুঝি। অথবা হয়তাে ভাবল, এমন খেপিকে আটকে দিলে জটিলতা বেড়ে যেতে পারে।

অফিসে পৌঁছে দেখল সেখানে গুলতানির আসর সরগরম। জয়িতাকে দেখেই শিব। বলল – দেখ জয়িতা দিদি, এরা সব কী যা-তা বলা বলি করছে তােমার নামে।

মন্টু বলল – বাজে কথায় রমেশদার জুড়ি মেলা ভার। বলে কিনা, জহিw. নিয়ে আর ফিরেছে। দেখগে যাও, পায়রাটাকে কেটে ঝােল করে খেয়ে ফেলেছে।

জয়িতা হেসে বলল – ঝােল বেঁধে খাইনি, এখন বিশ্বাস হচ্ছে তাে ? বলতে বলতে খাঁচার জানলা খুলে পায়রাটিকে ধরে খাঁচার বাইরে আনল।

সান্যালবাবু বললেন – কষ্ট করে ওটাকে এখানে বয়ে আনার কী দরকার ছিল? দমদমেই উড়িয়ে দিলে পারতে।

স্নিগ্ধ হেসে জয়িতা বলল – তা হয়তাে পারতাম, কিন্তু কী জানেন, দমদমের আকাশ ওর অচেনা। সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের সঙ্গীসাথীদের সেখানে পাবে না। নতুন সঙ্গী-সাথী পাবে কিনা, কবে পাবে – কিছুই জানি না। অত হ্যাপায় কাজ কী? তার চেয়ে বরং নিজের আকাশে উড়ে যাক। এখানে খুব শিগগির সঙ্গী-সাথীদের খুঁজে পেয়ে যাবে।

কথাগুলি বলতে বলতে জয়িতা হাত দুটিকে নীচে নামিয়ে ঝট করে উপরে তুলে পায়রাটিকে উড়িয়ে দিল। মুক্তির আনন্দে পায়ারার ডানা দুটি অনেক বেশি শক্তি অর্জন করেছে। পালকে পালকে উদ্ভাসিত হচ্ছে তার উল্লাস। ধীর গতিতে উড়তে উড়তে পায়রাটি আকাশ পেরিয়ে যেন মহাকাশের দিকেই     উড়ান দিল।

 

 

 

*  বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *