পাখি উড়ে যায়

সুদীপ ঘোষাল

চান্ডুলি গ্রামের মধু লরির ড্রাইভার।মধু বলছে  মালিকের ব্যবসার মাল লরি করে চলে যায় ত্রিপুরা,ঝাড়খন্ড,বিহার,উত্তরপ্রদেশ,পাঞ্জাব পর্যন্ত। সারা ভারত ব্যাপি উন্মুক্ত চলাচল। মালিকের অনেক লরি। লাভের কমতি নেই। তাই আমাদের টাকার কোনো অভাব থাকে না। আমরা সব সময় মালিককে বাঁচিয়ে কাজ করি। ছোটোখাটো চালাকি, , চুরি তো থাকবেই। তা মালিকেও জানেন। সতন শুনছে মন দিয়ে।

মধুর এখন একটা খালাসি চাই। খালাসি তৈরি করে নিতে হয়। মধু সতনকে ট্রেনিং দিচ্ছে।

সতন বললো,ঝেড়ে কাশো তো। কি কি কাজ করতে হবে বলো।

মধু বললো,তিরপল দিয়ে মুড়ে মাল ঢাকা দিয়ে বাঁধা তোর কাজ। চাকা ফেঁসে গেলে আমার সঙ্গে লেগে পাল্টে ফেলতে হবে। রান্না করতে হবে। ছ’ মাস,বা এক বছর লরি থেকে ছেড়ে পালানো হবে না। আর গোরুর গাড়ির মতো বাঁয়ে বাঁয়ে, ডাইনে, ডাইনে জ্ঞান থাকতে হবে। তু যেমন বলবি লরি সেমনি যাবে। বিরাট দায়। বুঝে নাও।

পারবা কি পারবা না প্রথমে চিন্তা কোরো। পরে বেগরবাঁই করলে কেলানি খেতে হবে। আর রাগ থাকলে হবে না। তোর কেউ থাকবে না যে রাগ ভাঙাবে, কি করবি দেক বাপু।

সতন অনেক কিছু শুনেছে। লরি তো অনেক দূর দূরান্ত পাড়ি দেয়। ছমাস,নমাস নামা যায় না। খাটনি আছে। তবে মজাও আছে। কত দেশ,কত মাইয়া যে দেকতে পাবো তার হিসাব নাই।

মধু বললো, পিঁয়াজি করলে চলবে না। আমাকে মালিক রেখেছে। আর খালাসির মালিক আমি। আমার কথা শুনলে লিতে পারবি না কেরি মদ,ইংলিশ। চ, চ,আরও কত কি।

সতন বললো,আমি রাজি। আমাকে যা বলবা তাই করবো।  বাড়িতে বসে বসে অরুচি হয়ে গেয়চে।চ, তোর সঙ্গে যাই মারা অত চিন্তা করতে পারচি না। বাড়ি থেকে কি কি লোবো।

মধু বললো,সাদু মারা সাধু। কিছু লিতে হবে না। সব কিনবো।। একবার চ,তালে বুঝতে পারবি।

সতন বাড়িতে বলে লরিতে উঠে পরলো। বৌটা ভাবলো, শালা বাঁচলাম। কুঁড়ে ব্যাটাছেলে দেখতে লারি। শুধু বিসনায় ডাকবে। আর কোনো কাজ নাই। পাশের বাড়ির পুঁয়ে তালেই ছিলো। বললো,গেলো হারামিটা,তোমাকে না দেখলে ভাত হজম হয় না।

বৌ বললো,পরের বৌ খুব ভালো লাগে লয়।

পুঁয়ে বললো,যা বলেচিস। এক জিনিস ভালো লাগে না মাইরি। বলেই সতনের বৌকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় ফেললো। বৌটা বললো,অনেকদিন পরে আকাশটা ভালো লাগচে লয়। খড়ের চাল ফুটো হয়ে এক টুকরো নীল আকাশ হাসছে।

লরি তীব্র বেগে ছুটছে। যাবে ঝাড়খন্ড। সতন রাস্তা দেখছে আর গাঁজা হাতের তালুতে নিয়ে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঘষছে। তারপর কলকে তে ভরে আগুন দিয়ে দীর্ঘ এক টান। গাঁজা পুড়ছে। এবার মধু টানছে। সুখ টান।

সতন ভাবে ড্রাইভার বটে। যতই নেশা করুক,স্টিয়ারিং কতা বলে। ঘোরাইচে দেকো,বোঁ, বাঁ…

মধু বলচে বুঝলি বোকা—-, এ ছেলে খেলা লয়। তিরিশ বছর হলো, একটাও খাম হয় নাই। খাম হলে তোরও শেষ,আমারও জান শ্যাস। সতন বললো,মা তারার নাম করবি।

—- ওই তো ছবি আছে। ধূপ দেকাবি।

—–ওসব তোকে বলতে হবে না।

প্রায় ছ,ঘন্টা চলার পর সন্ধ্যেবেলা ওরা থামলো বনের ধারে। আলোআঁধারি। সতন বললো,এখানে ক্যানে। মধু বললো পেত্নি দেকাবো তোকে। সতন ধূপ দেখালো। তারপর কান্ট্রি বোতল খুললো।মাংস হোটেলে নিয়েছে। সতন বললো প্যাগ দোবো। মধু কিছু না বলে ঢকঢক করে আদ্দেক খেলো। সতনও খেলো।

সতন বললো,পেত্নি কই।

মধু বললো,কথা কম বলো। কাজ সেরে কেটে পরো। নরক শালা নরক।

নেশা বেশ জমেচে এমন সময়ে, এক সুন্দরী এলো। বয়স কুড়ি হবে।

মধু বললো,আর নাই।

সুন্দরী বললো,দাঁড়া আসছে। তারপর সতন দেখলো,

একটা কম বয়সি মেয়ে এলো।  সতনের চোখ মাছের চোখ হয়ে গেলো। মধুর মায়া হলো। দাঁড়ানো সুন্দরীকে বললো, পয়সা আমি দোবো,যা ওর কাছে। হারামির চোখ দেখো।পলক নাই শালার।

সুন্দরীকে দেখে সতনের বুক ধক ধক করছে। সে বলছে, কোথা বৌ আর কোতা এই সন্দরী।  কি জাদু জানে শালা। জেবন সার্থক হোলো। সতন নেশার ঘোরে বক বক করে। মধু বললো,নরক। কিন্তু এখানে তো স্বর্গসুখ।  মাতাল কখন যে কি  বলে, লে? আহা! আহা! সুন্দরী আমার পেটে চেপে লাপাইচে দেখো।

মধু বললো,ও হো, ওহো। কি ফাঁদ, পেতেচো তুমি,আমি পরেছি, মরেছে কত, পাই না গুণি।

মধুকর মধু অভিজ্ঞ। মধু বলছে, শালা পয়সা উশুল।  কিন্তু খালাসি নতুন। মধু বললো,শালা নেঙা বাসুলে, তড়িঘড়ি মাল ফেলে, ঠিক উশুল হলো না। খুচ খুচ করছে মনপাখি তোর লয়? খ্যাক,খ্যাক…।

সতন বললো,পরের বারে শোধ লেওয়া লোবো। সুন্দরী হাসে। বলে,সবাই তাই বলে সোনা, করতে গিয়ে দেখি কানা। খচ্চর, কানা বেগুন। যাঃ…

তারপর সামনের একটা মার্কেটের পাশে লরি দাঁড় করালো মধু। অনেক কিছু কেনাকাটি করলো সতন ও মধু। খাবার জিনিসও নিলো। শুকনো খাবার। তাছাড়া কাজু,কিসমিস ও মদিরাতে ইংলিশ মাল। পাঁচ বোতল নিলো। মধু বললো,পয়োজনে আরও লেওয়া হবে লেওড়া। জেবনে কিছুই নাই।

খাও,দাও,হাগো, ফুর্তি করো। ব্যস,আবার কি। জেবন একটা ভোমোস। সব জল ফুটোতে যাবে। সতন বললো,যা বলেচিস। ওই ছোটো পারা ফুটোতে বিঘে বিঘে জমি ঢুকে যায়।তিনঘরার বিমান পালের তিরিশ বিঘে জমি মিতা খানকির ফুটোয় বেমালুম ঢুকে গেলো। শালা এখন ভিখারি। সত্যি কতা বললেই খারাপ হয়ে যাবি। শালা এই তো জেবনের ইয়ে।

সতন বললো,শরীলটা ও বোঝে রে । কিসে শেষ হবে এই বাসনা।

মধু বললো, হবে না,পোতোমে হবে না। পরেও হবে না। আমার হাজার পেরিয়ে গেলো। হোলো নো হোল। সারা জাগার মেয়েছেলে পেলেও মন মানে না। বাবা এই শরীরে সারা পিতিবি বাস করে। মধুর ভাব জেগে ওঠে। পাগলা মধুর গলা ভালো,গান ধরে,ওরে দেহের ঘরে,কাদা মেরে,দে বুজিয়ে কামের ঘর। ওরে আমার রসের নাগর…

সতন ভাবলো মধুর গলা খুব ভালো। বললো,কার লেখা গান গো।

মধু বললো,বাল,লেকাপড়া শিকি নাই। আমি নিজে গড়ে নিজে গাই।

সতনের নেশা হয়েচে। শুয়ে পরলো। সুন্দরী সঙ্গে আছে। কেনাকাটা করে খুশি। মধুর সঙ্গে অনেক দিনের আলাপ।  বলচে,গান কর মধু। গান কর।

মধু বললো,এই খারাপ কাজ করিস কেনে।

—-খারাপ কি বলছিস। এই কাজ করে আমরা সমাজকে সুস্থ রাখি,নির্মল রাকি।সুন্দরী এখন খুব সিরিয়াস। সবসময় ওরা নষ্টামো পছন্দ করে না। ওবলে, সবারই একটা নিয়মরীতি আছে। যখনকার কাজ তখন,বুঝলি, বোকা । এটাও একটা চাকরীর মতো। ওভার টাইমে, ডবল পয়সা।

মধুর আর কথা বেরোলো না। সতন সাবধান হয়ে গেলো সুন্দরীর গম্ভীর মুখ দেখে।

দুজনেই ঘুমিয়ে পরলো। ড্রাইভাররা ক্লান্ত হলে এইসব জায়গায় বিশ্রাম নেয়। এগুলোকে ধাবা বলে। খাওয়া, শোওয়া, মাল,মাগি সব ব্যবস্থা এখানে আছে। কোনো পুলিশের ঝামেলা নেই। এইসব হাত অনেক লম্বা।  পাশেই আর একটি গুমটি আছে। খাওয়ার কোনো অসুবিধা নাই। পয়সা থাকলেই হবে।

দুঘন্টা ধাবায়  বিশ্রাম নিয়ে মধু আবার লরি ছোটালো। মানি ব্যাগটা পরে গিয়েছিলো। সতন খুলে দেখলো কম কোরে তিরিশটা দুহাজার টাকা।  বাইরে বেরোলে টাকার পয়োজন ভাবে সতন।

মধুকে ব্যাগটা দিলো।, হারিয়ে গেলে কি করতিস বললো সতন। মধু বললো,আমরা এক জায়গায় টাকা রাকি না। লরির ভেতরে গিয়ে দেখালো অনেক টাকা। দেকে রাক, আমি রাস্তায় মরে গেলে টাকাগোলা জলে না যায়। সতন ভাবে কি জ্ঞান মধুর। মৃত্যুকে ভয় করে না। আবেগে জোরে বলে উঠলো,তু তো সাধু রে মদু। মধু বললে,সাধু নয় চদু।

সতন ভাবে বেশ ভালো জীবন। আমরা তো মরেই আচি। তবু বাইরে বেরিয়ে অনেক কিচু বোজা যায়,দেকা যায়। মধু বললো,জল পরচে,একবার দেকে আয়। জল ঢুকলে তোর দোষ। সতন গেলো, ভালো করে ঢাকা দিলো। কাজে ফাঁকি মদু বরদাস্ত করবে না। তারপর নিচে এলো। শীতের জল।ছ্যাঁকা লাগচে গায়ে। মধু বললো, ভালো করে ঢাকা দিলি তো। সতন গা মুছতে মুছতে বললো,হ্যাঁ।

আবার গাড়ি চলতে শুরু করলো। সতন বললো,একটা কতা বলবো।

—–বল,বল

—–আবার মেয়েচেলে পাবো।

মধু বললো,পরের ব্যাপার পরে।দেকচিস না মা তারার ছবি। ওসব বলতে নাই। বাড়ি আর লরি সমান কতা। মন্দিরের মতো। কোনো খারাপ কতা সেখানে বলতে নাই।

সতন ভাবে,বহুদিন আগে মিঠুনের একটা সিনেমা দেকেচিলো। ঘর এক মন্দির। বটে,বটে ঠিক বলেচে মধু।

মধুর সঙ্গে ছেটো  থেকেই একসঙ্গে মানুষ হয়েছে। কত ঘটনা মনে পরচে। মনকে চেপে ধরলো, এক ঢোক মদ খেলো। ওসব বাবুগিরি কল্পনা তবু মুছে গেলো না  সতনের। সে এখন কবি।

সকালের দৃশ্য বড়ো মনোহর । লরি থেমেচে।এখানে শহরের মহিলা পুরুষ  সকলেই একসাথে ভ্রমণে ব্যস্ত । সবুজের নির্মল ছোঁওয়ায় , মন হারিয়ে যায়, সুন্দর হাওয়ায় ।লরি থেকে নেমে মধু বাসি মুখে কান্ট্রী মদ খায়।  তারপর সারাদিন মার্কেটের ব্যস্ততার সময়ে শরীর ঠিক থাকে । ঠিক গোধূলির আলোয় আবার মানুষের মন হারানোর পালা । এ পালা শেষ হবার লয়।

সতন জানে, চুপিচুপি অন্ধকার, রূপের আদরে আশাতীত ভালোলাগার পসরা সাজায় ।হারিয়ে যাওয়ার আনন্দে, আলোকের গোপন ঈশারায়। খানকি      মাইয়া  গোলা সেজে বেরোয় মধুর মতো মরদের খোঁজে।  আঁধার ভোগের শেষে, আবার আলো। আঁধারের মূল্য অসাধারণ । আলোর পরশে ভালোলাগার কারণ এই আঁধার।আবার সতন ভাবতে শুরু করে, আমি অনেক সাধুর সঙ্গে ঘুরেচি।

আবার সাদুর বেশে অনেক চাঁদুকেও দেকেচি। ভালো মন্দ অনেক কাজই আমি করেচি।  তাই ভাবি ভগমানের কথা। মনে আমার ভালো খারাপ সব চিন্তা আচে যা অনেক সাদুর থাকে না। আমি শুনেচিলাম গুরুর কাছে অনেক সাধনার কথা। সেগুলো আমার মনে মনে ভাসে। আমি লুকিয়ে,অন্ধকারে থাকতে ভালোবাসি। লোককে সাদুগিরি দেকাইতে ভালো লাগে না।  

কালো সন্দর,  আনন্দের সাজি সাজায় কালো । এইসব চিন্তা করতে করতে আমি দেখলাম ঝপাং করে রাত নামলো । আলো জ্বালিয়ে বুড়োদের,ছোকরাদের তাসখেলার আসর শুরু হলো জুয়ো খেলা।  আর একদিকে আলো। সমস্ত অভিমান ঝেরে ফেলে ঝরঝরে নবীন মনে বাড়ি ফিরলো তারা । অনেক মানুষ একসাথে বসে দুঃখ ভুলে হরি নাম সংকীর্তনে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। নতুন ভাবে বাঁচার রস পেয়ে যান রসিক মানুষ ।

সতন ভাবছে,আমি সামান্য খালাসি। এইসব ভাবনা আমার সাজে না। কাজটা ভালো করে করতে হবে। তবে মন মানে না। আবার ভাবতে শুরু করে,

সুখে দুঃখে ওঠা, পরায় জীবন পাল তোলা নৌকার মতো এগিয়ে  চলে পতপত শব্দে। সূর্য ঘড়ির থামা ‘ বলে কোনো শব্দ জানা নাই।মনে পরে তার,চান্ডুল গ্রামে বেসকা বুড়ি তিরিশ বছর আগে একটু জায়গা দখল করে বসেছিলো। তার আসল নাম ছিলো বিশাখা।  তখন জায়গাগুলো বন বাদাড়ে ভরে ছিলো। নানারকম সাপ,জন্তু, জানোয়ারে ভর্তি ছিলো এই অঞ্চলটা।

বেসকা বুড়ির মুখে বোলচাল ছিলো খুব। সে প্রায়ই বলতো,জানিস, আমরা বাঘের সঙ্গে লড়াই করেচি। আর তোরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে মরিস। আরে আমরা মিলেমিশে ছিলাম বলেই তো টিকে আছি। দশটা লাঠি দেখে বাঘও ভয় পায় রে। মনে রাকিস কথাটা।

সতন দেখতো,বুড়িকে সবাই ছেদ্দা করতো। সে জানে, সবার সুখে দুখে সে থাকতো। পরামর্শ দিতো। সবাই তার শান্ত স্বভাব দেখে আদর করে, দাতা বুড়ি, বলে ডাকতো। সবার সুখে তার সুখ।

দাতাবুড়ি যখন কুড়ি বছরের যুবতি জীবনে পা দিয়ে চলতে শুরু করেছে তখন থেকেই তার অনাথ শিশুদের প্রতি ভালোবাসা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। রাস্তায় একদিন একটি অনাথ বাচ্চা বললো,দিদি আমাকে কিছু খেতে দাও।

—–ঠিক আছে আয়। কচুরি খাবি আয়।

পরম যত্নে বাচ্চাটাকে খাইয়ে তার ভিতরে একটা আনন্দঘন শক্তির অনুভূতি হলো। সে বলে,এই আনন্দ বলে বোঝানো যায় না। যার হয় সেই বোজে রে। সতন জানে,

তারপর থেকে সে শুরু করেছিলো  দীন, গরীবদের একমুঠো খাবার মুখে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা। নিজে বাড়ি বাড়ি ঝিগিরি করতো। পয়োজনে ভিক্ষা করতো। তবু পতিদিন দশ জনের খাবার ব্যবস্থা করতো।

তার শরীরের সুন্দর বাড় দেকে অনেকে তাকে সংসারী হতে বলেছিলো।

সে প্রথমেই জিজ্ঞেস করতো , প্রতিদিন দশজন বাচ্চার খাওয়ার দায়ীত্ব নিলে সে চিন্তা করতে পারে। পারবে কি?

কেউ রাজি হয় নি। সাহস করে বুকের পাটা দেখায় নি। একটু একটু করে সময়ের কাঁচিতে ছোটো বিবর্ণ হয়ে গেছে তার ভরন্ত শরীর।

মনে পরছে সতনের, দাতাবুড়ি তার ছোট্ট খড়ের চালের কুটিরে বসে। ক্যামেরা এনে কতগুলো লোক রাস্তায় ল্যাংটো বাচ্চাদের সাথে তার একটা ছবি তুলেছিলো। পুরস্কার দেওয়ার জন্য ডেকেছিলো। তাদের একজন বলেছিলো,আপনাকে পুরস্কৃত করবো আমরা। শিশুদের সেবা করার জন্য।

বুড়ি বলেছিলো, পুরস্কার নয়। আমাকে চাল দিন।ডাল দিন। নুন দিন। তাহলেই আমার পুরস্কার পাওয়া হবে। তা না হলে মরগা,ঘাটের মরাগোলা। কি আমার ঢঙের মালা রে। মালা লিয়ে পেট ভরবে? যত ওলাওঠার দল

পালা পালা,যত ঝামিলি…

তাদের একজন বুড়িকে ভালোবেসে ফেলেছিলো। সুশান্ত নামের ছেলেটা খুব শান্ত স্বভাবের। সে রাজী হয়েছিলো বুড়ির বিয়ের শর্তে। বুড়িকে দেখে তার চোখে কান্নার বান আসতো।

তারপর সুশান্ত বিয়ে করেছিলো

 প্রায় কুড়ি বছর তারা দুজনে সেবাশ্রম চালিয়েছিলো। বুড়ির সন্তান হয় নি। সবাই বলতো ও বাঁজা। অলক্ষুণে…

সুশান্ত বলতো, তোমার অ নেক সন্তান গো। তাই  ভগমান তোমাকে আলাদা করে কোনো ছেলেপিলে দেয় নাই।

সুশান্ত মরে যাওয়ার পরে আবার পুরোপুরি নিজের কাজে ডুব দিয়েছিলো। ধীরে ধীরে তার বয়স বাড়লো। তার তো জমানো মূলধন নাই। তাই  সকলের কাছে চেয়ে নিজের খিদে মেটাতো। এখন সে ভালো করে হাঁটতে পারে না। কত জনাকে খাইয়ে এসে শেস জেবনে তাকে খাবার দেবার লোক নাই। কেউ জানলো না তার আজীবন সাধনার বিষয়। দাতাবুড়ি ভিকিরি হয়ে গেলো। সতন দেখতো,

বুড়ি বসে বসে ভাবতো তার জীবনের কথা।সতনকে সে কথায় কথায় বলতো, আমার আসল নাম বিশাখা। সবাই ছোটোবেলায় বেসকা বলে ডাকতো। আর এখন আমার  নাম হয়েছে দাতাবুড়ি। আমার ভগমান মানুষ। ভালোবাসা। আমার জ্যান্ত ভগমানের সঙ্গে মিলিত হবার শেষ আয়োজন শুরু হয়েছে। মনে পরচে, আমার সামনে থেকেও রকেটের দাগের মতো মিলিয়ে গেলো সোয়ামী।  

গঙ্গার জলে ডুব দিয়ে আর উঠলো না সুশান্ত । তলিয়ে গেলো স্রোতের তোড়ে। রোজ আকাশে তারা হয়ে জ্বল জ্বল করে আমার চোকের আয়নায়। হাওয়ায় ওড়া আমার বেহিসাবী মন আজও দেখতে পায় অই আকাশে তার বিচরণ। বুড়ি বক বক করে আপনমনে।সতন যেতে আসতে তার প্রতি নজর রাখতো। আঁকে আমলে মানুষের ভালোবাসা জড়ায় জেবনে।

যে সব মানুষ অন্ধ, খোঁড়া, সে কারণে মানুষের সাহায্য চেয়ে বাঁচতে চায় তারা ভিখারি নয়। বুড়ি বলতো।

বুড়ি ভাঙ্গা গলায় ফোকলা দাঁতে বলতোকাউকে জানিয়ে তো আমার সাদনা সফল হবে না। নীরব,নির্জন পরিবেশে সাধনা করতে হয়। তবেই সিদ্দিলাভ ঘটে গো। বুঝলা কিছু বাবাসকল।

বুড়ি বসে বসে শুধু পুরোনো দিনের কথা ভাবে আর বলে। কিন্তু শোনে না কেউ।  সে তো লেখাপড়া জানে না। তাই মন পাতায় লিখে রাখে ভাবনার কলমে। কালের বিচারক কোনোদিন ঘুষ খায় না গো। অপেক্ষায় প্রহর গোনে নিজের অন্তরের দীপ শিখা জ্বালিয়ে  বুড়ি ভাবে আরও অনেক স্বপ্নের কথা।

বুড়ি বলছে, আমার জীবনে দেকা ঘটনার কথা। গল্প লয়। ভালো করে শোনবা।  আজকে বৃষ্টি পরচে বলে তোমরা চারজন পাড়ার বৌ শুনছো আমার বকবকানি। তাদের বলছে বুড়ি, শোনো সত্যি ঘটনা। কয়েকদিন ধরে দেখছি,

একটা দশ বছরের বাচ্চা মেয়ে আমাদের  পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। কে ওর বাবা কে যে ওর মা কেউ জানে না। কারও জলএনে, কারও চা এনে ও কাজ করে আপনমনে। তারপর মুড়ি নিয়ে, কারও কাছে চেয়ে ভাত খায় আধপেটা।যে মা জন্ম দিয়ে সন্তান ফেলে পালায় সে তো অপরাধি বটেই।

কিন্তু তার থেকে বেশি অপরাধ করে কাপুরুষগোলা। তারা রাতের আঁধারে মেয়েছেলে পেলেই পশু হয়ে যায়।দিনের বেলায় ভদ্র সেজে ঘুরে বেড়ায়।আর রেতের বেলায় গুয়ামারানির দল গু চেটে খায়। নিজের মেয়ের বয়সী মেয়েকেও ছাড়ে না। শালাদের পরকাল ঝরঝরে।

বুড়ি সব জানে,সব বোঝে। তবু তার পাড়ায় নাবালিকা, নাবালক অনেকে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি শুধু দুমুঠো খবারের আশায় পরে থাকে। খোলা আকাশের নীচে শোয়। শীতে ঢাকা পায় না। রাতে রাতচড়ার আক্রমণ। কচি মেয়েদের শালারা কুকুরের মতো চাটে। বোকাশালাদের  বিচার না করে গুলি করে মারা উচিত।

কিন্তু ঘন্টা বাঁধার মানুষের বড্ড অভাব। বুড়ি বলে তার পাড়ার লোকদের। সে বলে,আর কোথায় বা বলবো বল। তোরাই আমাকে শ্মশানে পোড়াইতে লিয়ে যাবি। আমার জন্য কাঁদবি। তোরাই আমার আপনজন। সুখে,দুখে,শ্মশানে যারা থাকে তারাই তো আসল বন্ধু রে। আর বাকিরা সব টাকার গোলাম। তুমি দিতে পারলে ভালো। দিতে না পারলে বোকা ।

সত্যি কথাগুলো মনে করলেই  বুড়ির মুখটা কালো মতো হয়ে যায়।

ও বলে পাড়ার বৌ, ঝিদের। ওসব বড়ো বড়ো কথা ভেবে লাভ নেই। আমরা আদার ব্যাপারি গো। কতজনকে খেতে দোবো?আমাদের খ্যামতা কতটুকুন?

কথা বলা আর কাজ করে দেখানোর মধ্যে বিস্তর ফারাক গো।ভগমান খ্যামতা দিলে একবার দেকতাম। বুড়ি বলে যায় তার পরিচিত লোকদের।

এবার সতন বুড়ির কথা ছেড়ে বাস্তব জগতে ফিরে এলো। বললো,বাঁয়ে বাঁয়ে…। লরি চলছে। বসে ভাবা ছাড়া কাজ নাই। এত ভাবুক হলে হবে না সে ভাবে মধু তো পাকা ড্রাইভার। ঠিক সামিলে নেবে। আবার ভাবে, বোকা  বিশাল মাতাল।  ভাই কেনে যে গাড়ি চালাবার আগেই মদ খায়, জানিনা। আমরা খালাসি, একটু,আধটু খেতে পারি। কিন্তু তু তো ড্রাইভার। তোর খাওয়া উচিত লয়। আবার ডুবে যায় চিন্তায় সতন। সামলাতে পারে না নিজেকে, অতীতের ভালোবাসা, থেকে,স্মৃতির আকর্ষণ থেকে।

আবার বুড়ির  কতা মনে পরচে।যে চারজন পাড়ার বৌ তার সঙ্গে  ছিলো। তার মাজে আমার বৌটাও ছিলো। তার মুকেই শোনা। বুড়ি বলচিলো,আমি ঝিয়ের কাজে যেতাম আর বাচ্চা মেয়েটাকে দেখতাম। আজ কয়েকদিন হলো পাড়ায় কোথাও মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে না। বেশ কয়েক বছর আগে ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে পরেছিলো।

তখন মেয়েটা পনেরো বছরের। বাবা, মা কেউ নাই। কোতায় গেলো বাপু। আমাকে ওর মতো বয়সে এক বুড়ো  আমাকে কি সব করেছিলো। শালা, সেই শালাকে ঠেলে সিঁড়িতে ফেলেছিলাম। ভয়ে আর আমার গতরে হাত দেয় নাই। তাহলে আমার মতো ঘটনা ঘটে নাই তো। মেয়েটোকে লিয়ে পালায় নাই তো ?

বুড়ি শুনলো,সবার মুখেএকটাই কথা।  গেলো কোথা ? যে বাচ্চাটি ওর সঙ্গে কাজ করে সে এসে বুড়িকে বললো, গতরাতে দুজন লোক গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে মেয়েটাকে লিয়ে পালাইলো। আমরা চেঁচামেচি করেছি কিন্তু রাতে কাউকে পাই নাই। একজন মটর সাইকেলে ছিলো। মেয়েটাকে মাজে বসিয়ে কাপড় ঢাকা দিলো। মেয়েটা দেকলাম নেতিয়ে পরলো।

বুড়ি বললো,দিনরাত দেকচি রে লীলাখেলা।  শালারা অজ্ঞান করে তারপর লিয়ে যায়। যা কাজ কর। শালা, লোকগলা পাপিষ্ঠ। কোনো বেশ্যাখানার গলিতে বেচে দেবে। মুখোশ পরা আসামীর দল। মেয়েটাকে ছিঁড়ে খাবে হায়েনার দল। বুড়ি বলচে, নিয়ম আছে।   সারা জাগায় কে বসে থাকবে পাহারা দিতে।

তবে ওপরওলা আচে। তিনি সব দেকচেন। বুড়ি বলে চলেছে তার অভিজ্ঞতার কথা। সে বললো,শালা, কি আর বলবো। আবার নতুন আমদানী।  অনেক দিন পর আবার মাঠপাড়া বস্তিতে দেখলাম একটা বুড়ি কাজ করছে। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সোজা হতে পারচে না। একটা বৌ বললো, আমাদের বস্তির গো,তমালের বেটা পড়লো না স্কুলে। মদ খেতো।বিড়ি খেতো।  তামিলনাড়ুতে সোনার দোকানে কাজ করচে।

ছোটো ছেলের রোজগারে বাপ মা খায়। কি করবে,বস্তি তে থাকলে, মামেগো, মদ খাবে। তাই তার দিদিমা ওদের খেটে খাওয়ায়। মায়ের রোজগারে মেয়ে, জামাই খেচে। লজ্জার কতা বাফু। বুড়ি সব জানে,তাই সে বললো, শোনো গো আমার কতাটা। মাঝে কোনো কতা বোলো না। তোমাদের কথা পরে শুনবো। আমি নতুন বুড়ির কতা বলি।

মধু হঠাৎ সতনকে সাবধান করলো,ভালো করে দেকিস,গাড়ি ঘোড়া। বেশি বাড়ির কতা ভাবিস না। লাভ নাই। ও বলছে,সতনকাজ না করে চুপ করে বালছাল চিন্তা কোরোনি,শালা মরবা নাকি?

তবু বেহায়া সতন আবার ভাবছে পুরোনো দিনের কথা। বৌয়ের কাচে শোনা কতা। দাতাবুড়ির কতা।

বুড়ি  দোকানে জিজ্ঞাসা করলো,কি গো নতুন বুড়ি দেকচি।  ভাই,একে পেলে কোতায়?

— আর বলবে না ঠাকুমা । রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেড়াতো। কথা বলে না। কম বলে। বুড়ি,আর কদিন পরেই ভোগে যাবে। আমি কত বলি,কতা বলো গো। একবারও বলে না।

—– কেনে গো…

–; অত বুঝি না, খাটে খায়।

বুড়ি বলে,আমার বনধু ঝুমা যেচে  বাজারে। আমি তার সঙ্গ নিলাম।

—- চায়ের দোকানে বুড়িটা দেকলি?

—- হ্যাঁ, দেকেছি,ওর সব কতাই শুনেছি। কিছু করার নেই। পারবি চ,ওকে হাসপাতালে দি গা।

—- যদি মরে যায়।সব খরচ,ঝামেলা তোমার মাথায় চাপবে। আর তোমার সমত্থ বয়েস নাই। আমার সংসার আচে গো। তুমি রাকোগা।

বুড়ি ভাবে, ও তো জানে না আমার কথা। আমি এই বয়সে আর। মাজা তুলতে পারবো না। পুরোনো ঘোড়া, ঘুরে ঘাস খাবে না।  আমিও রাস্তায় রাত দেকেচি। বড়ো হয়েচি। এখন একটা খড়ের চালের ঘুপচি ঘরে আচি। কোতায় রাকবো ওকে।

পরের দিনেই কথা না বলা, বুড়িটা মরে গেলো। দোকানের লোকেরা চাঁদা তুলে পোড়াইলো। এইজন্যে দোকানের লোকগোলাকে ভালোলাগে। বেপদে ওরাই আগিয়ে আসে গো। বাছারা বেঁচে থাকো ।

বুড়ি কাপড়ের খুঁটে চোখ মোছে। নাকের জল মোচে। রাস্তার ছোটোলোক ছেলেদের পরমায়ু বাড়ার আশীর্বাদ করি। ওরা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক ভগমান। আমার এই গল্প আজ শেষ হলো গো। তোমরা বাড়ি যাও।

বৃষ্টি  পড়া থেমে গেলো। সবাই কাজ আছে বলে ঘরে চলে গেলো। আমার বৌটা ঘরে এলো। সতন ভাবে,বৌ এর কাছে আমি বুড়ির সব কথা শোনতাম। বৌটাও বুড়িকে ছেদ্দা করতো ।

এটা সেট খাবার রান্না করে দিতো।

তারপর আমি বাইরে এলাম দেখলাম, বুড়ির কোনো কাজ নাই। ষাঁড়ে গুঁতিয়ে ফেলে দেওয়ার পর থেকে কোমর ভেঙ্গে গেয়েছে। দুহাতে ভর করেই নিত্য কাজগুলি করে খুব কষ্ট করে। সতন আরও দেখলো,দুটো পাড়ার মাতাল এসে বললো,নিজের জন্যে কিছুই নাই। ভিখারী কোতাকার। আবার বড়ো বড়ো বাতেলা। রাকতে পারো নাই কিচু। আমি বললাম,ওকে কিচু বোলো না গো। ও দাতাবুড়ি । আমাদের বস্তির নামকরা নোক। একটা নেপও লাই যে,ওকে দোবো। কিচু নিজের বলে লাই গো বুড়ির। মাতাল দুটো কেঁদে ফেলে। পালিয়ে পেন্নাম করে পালায়।

বুড়ি বলে, শুনে যা। টাকা, পয়সা রেকে কি করবো রে। একবার চোক বুজলে দেকতে পাবি তোর বাড়ি,জমি। সব হাসবে। জোর করে চোক খুললেও দেকবি না তকন। মলে আর কিচুই তোর লয়। শালা মাতাল হয়েও চোকে জল। হুঁ হুঁ বাবা, এই হলো আমার দেশের নোক।

তিনকুলে আমার কেউ নাই। মরলে তোরাই কাঁধে নিবি বাবা, আমি জানি। সতন দেখেছিলো,জোড় হাতে মনে মনে ওদের মঙ্গলের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিলো দাতা বুড়ি। সে ভাবে,দাতা বুড়ি,এত বড় মন কোতায় পেলো?

দাতাবুড়ি আজ সাতদিন হলো মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আচে। কিছু খেতে পায় নাই ঘরে পরে আছে। ঘেন্নায়  পায়খানার গন্ধে কেউ কাছে যায় না। সাতদিন পর সকালে সে পৃথিবীতে গোলাপ মনের পাপড়ি র সুগন্ধ ছিটিয়ে পরলোকে চলে গেলো। সবাই বললো,একটা দাতাবুড়ি  ছিলো বটে,পাড়ায়।

সতন পরে শুনেচে,পাড়ার দুজন গাঁজা খোর লোক বুড়ির খুঁটে বাঁধা টাকা চুরি করতে গিয়ে দেখলো তার অভাব নাই। অনেক টাকা। সমাজের উপকারে লাগাতো। পাড়ায় জানাজানি হলো। লোক দুজন  মাথা হয়ে পাড়ায় চাঁদা তুললো। প্রায় পাঁচ হাজার টাকা হয়েছিলো।তাদের নেশা তীব্র হলে বিবেক জাগ্রত হয়ে বলে, বুড়ির দয়ায় ফুরতি হলো। এবার ওর ছেরাদে মচ্ছপ করবো। ছেলেপিলে খাবে। আমরা একা খাবো কেনে। পাপ হবে না।

দাহ করার দশদিন পরে বাকি টাকায় বাচ্চাদের খিচুড়ি খাওয়ালো পাড়ার লোকজন। লোক দুটিও বলে উঠলো,জয় দাতাবুড়ির জয়।

ছেলেমেয়েরা সমস্বরে বলে উঠলো,জয়  জয়…

দাতাবুড়ির জয়ধ্বনিতে ভরে গেলো পাড়ার একটুকরো আকাশ…

অনেক দূরে এসে সতনের পাড়ার কথা মনে পরছে। লরি আবার চলতে শুরু করলো। মধু খুব স্পিডে গাড়ি চালায়, ঝাড়খন্ড যেতে হবে যে। সে অন্য মনস্ক হয়ে গেলো।

মধু জোরে ব্রেক মেরে লরি দাঁড় করালো। সতনকে বললো,কি ভাবছিস। লরি থেকে নেমে ভাববি। এখুনি কিন্তু গাড়ি পাল্টি খেয়ে যেতো। মা তারা বাঁচিয়ে দিলো। দুবার সুযোগ পাবি না। সাব ধান।  সাধু সেজো না। খালাসিগিরি করো। সতন সাবধান হলো। সে ভাবলো,ঠিক বলেচে মদু। গরীবলোকের এত শক ভালো লয়। প্রায় পাঁচঘন্টা পরে লরি আবার থামলো।

গাড়িটা সাইড করে লাগিয়ে গাড়ির আড়ালে বসলো দুজনে। এখানে বৃষ্টি হয় নাই। রান্না শুরু করলে সতন। লরি থেকে স্টোভ, হাঁড়ি, চাল,ডাল সব নামালো। তারপর ফুটতে শুরু করলো খিচুড়ি। সামনে নদী ছিলো। ঠান্ডা জলে চান করে প্রাণমন শান্ত হলো। খাওয়া হয়ে গেলো

তবে শোন, বলি,সতন শুরু করলো,পমদের গ্রামে চাঁদু বায়েন বরাবরই নাস্তিক প্রকৃতির লোক। সে রাস্তা দিয়ে গেলে,বিড়াল যদি রাস্তা কাটে তিন পা পিছিয়ে গিয়ে থুতু ফেলে না। এক শালিক দেখলে মুখে চুক চুক শব্দও করে না। আবার জোড়া শালিক দেখলে পেন্নাম করে না। শক্ত পোক্ত মন ও দেহের মানুষ। পম বলে ছেলেটা তাকে খুব শ্রদ্ধা করে। জীবনে সে এত শক্ত লোক দেখে নাই।  তাই চাঁদু দা, কে দেখলেই সে নমস্কার জানাতো।

একদিন চাঁদুকে রাস্তায় দেখতে পেয়ে   গ্রামের প্রবীণ মোড়ল মশাই বললেন, আমাশা হাগিয়ে দেবে। পরো নাই তো সত্যি ভূতের কবলে। নিশি ভূত দেখেচিস।

চাঁদু বললো, দেখা আছপ সব দেখা আছে।

পূর্ব বর্ধমানের লোকেদের ভাষা শুনতে ভালো লাগে।

মোড়ল বললেন,ঠাকুর একদিন ওকে সত্যি ভূতের কবলে ফেলে দাও। পঙ্গু করে দাও শালাকে। কোনো কিচু মানা শোনে না গো।

মোড়ল আরও বললেন,জানিস আমাকে নিশি ভূতে ডেকে  নিয়ে গেয়েচিলো। সারারাত দুনি করে জল হেঁচেছি।সকালে দেকচি জলে জলময় জমিগুলো। শীতের সকালে জলে আমার জীবন চলে যেতো। এই গেরামের লোকেই তো বাঁচিয়েছে রে। তাই তোকে বলচি,তেনাদের নামে খারাপ কতা বলো না। সতন আর মধু পুরোনো দিনের কথা নিয়ে গল্পে মত্ত। বাইরে বেরোলেই নিজের গ্রামের মাটি সোনা হয়ে যায়।

মধু বললো,ওই শালো পম ভোগ করতো আমার কাকার  মেয়েটাকে।শালা ওকে ভালো লাগে না। চ,চ এবার লরিতে উঠি। ভাট বকলে আসল কাজ হবে না। তবে সতন তু যখন গল্প বলিস। ভাষাগোলা অত ভালো বলিস কি করে রে ? আসলে তোর মধ্যে জ্ঞান ছিলো,ফুটে বেরুলো না রে। তু ক্লাস সেভেন পড়েছিস আর আমি নাইন। আরও পড়লে ভালো হতো রে। আমাদের ছেলেরা যেনো মানুষের মতো মানুষ হয় ঠাকুর। তাদের জন্যই তো এত কষ্ট করি প্রভু।

সতন বললো,হা রে চ বাড়ি যাই। তিন মাস হয়ে গেলো। মেয়েটার জন্যে মন খারাপ করছে রে। বউটা কি করচে কে জানে।

মধু বললো, যাবি কি করে মাল খালাস করে তবে তো যাবো। শালা,আমার বৌটা কিছু কতা শোনে না। মজা দিতে জানে না। মাঝে মাঝে খাসি খেতে মন হয় রে। ওইজন্যে বাইরে শখ মিটিয়ে লি।

মধু বললো,আমি আর একটা বিয়ে করেচি। সেখানে কিচু পয়সা ঢালতে হবে। কাউকে বলিস না, বাল। অশান্তি হবে।

সতনের মনটা ফুক ফুক করচে। মধুকে বার বার বলচে, আর একবার কচি মালটা পাবো না। তখনকার রক্ত চোষার মজাটা আর একবার পেতে চায়। মধুর মতো নাচতে চায় মন। পাবো না পভু।

——পাবি,পাবি থেমে খা দই খাবি। তোর হচে বড়ো দোষ। ধর তক্তা মার গজাল। গজাল শান দে। আমার বউটা কেমন রে?

সতন বলে,তোর বউ হেমার সঙ্গে…

মধু বলে,বাল,আমরাও তো তাই। করুগ, ওদেরও তো কাম ওঠানামা করে। ভদ্দলোকের বৌদের, মারা কত মেরেছি। আর আমরা তো ছোটোলোক। একবার ওই শালা মাষ্টারের বৌটা ডাকলো। মাষ্টার ছ,মাসে ন,মাসে বাড়ি আসে। বৌটা বাঁজা ব’ লে বাড়ির লোকে দেকতে লারে। ডাইনি বলে। শালী,ডাইনি বটে।

একবার দেখি কাপড় তুলে, বড় বাজারের দোকান। তারপর ছ মাসের উপোসী ছারপোকা। দু ঘন্টায় সব মাল খালাস করেছিলাম। খুশি হয়ে অনেক টাকা দিয়েছিলো।  দু বছর পরে একদিন দেখলাম,একটা ফুটফুটে বাচ্চা নিয়ে বাজারে যেচে। আমাকে চিনতে পারলো না। স্বামী,শ্বাশুড়ি সবাই খুশি। আর আমার মালিকের বাড়ির পাশেই ওদের বাড়ি। তাই অত কতা জানি। ছাড় মারা,গাঁড় মারাগগো।

সতন বলে,ঠিক বলেচেস। ওই যে  স্টেডিয়ামের কাছে তিনতলা সাদা বাড়িটার বৌটা,শালি, আমাকে দিয়ে করিয়ে কতবার টাকা দিয়েচে। বরটা শালা বুড়োচোদা।

মধু বলে,ঠিক করে। শালা বরটা দেকগা বাইরে কি করচে। নতুন নতুন  মাইয়া । আর যত দোষ মেয়েছেলের বেলায়। আগুন লাগা, শালার সমাজের মুখে। ভাবে গান ধরে মধু,

ও মন আয়নাঘর, মনপাকি শুদু ধরি ধরি,ধরতে পারি না। আমার আমার করে ভুলি, কে বা আপন,কে বা পর। কামের ঘরে কাদা মেরে দে বুজিয়ে কামের ঘর…

ড্রাইভারের এত ভাব ভালো লয়। সতন বললো,গাড়ির দিকে মন দে চদু। মধুর মনে মধুকর মাতাল ঢুকে পরেচে। সে ভাবে লক্ষণ ভালো লয়।

সতন বলে,তোর গানের মাতা নাই,মুন্ডু নাই। শালা মাতাল। ভালো করে  চালা আর গান করতে হবে না। সামনে খাল। দেখে চালা। মারবি নাকি নিজেও মরবি শালা, আমাকেও মারবি।

মধুর মাথা ঘুরছে,বুকটাতে ব্যাথা করছে।   হাত পা অবশ হয়ে আসছে। সতন কি বলছে কানে ঢুকছে না শুধু ওর মনে পরছে একটা  বিখ্যাত কবির লেখা গানের লাইন,মরণ কারো বারণ শোনে না রে,মরণ কারো মানা শোনে না…

সতন খালাসি বলে চলেছে, ঠায়ে,ঠায়ে চ,বায়েঁ বাঁয়ে,  মধু গেলো,গেলো, বিরাট খাল ডাইনে। ওরে মাতাল, ওরে দামাল,ওরে কবিয়াল, সামালকে…, সতন লরির দরজায় চাপড় মারছে বাঁ হাত দিয়ে,ধপ,ধপ,ধপ…

হঠাৎ ভীষণ শব্দে লরি পাল্টি খেলো। ডানদিকের নয়ানজুলিতে উল্টে পরলো  মাল সমেত , ভরপেট ফুল পাঞ্জাব লরি । লরিটা নয়ানজুলির জলে পরে আদ্দেক ডুবে গেলো, ইঞ্জিন সমেত। সতন,আর মধু প্রচন্ড চাপে তলিয়ে গেলো কাদায়, পাঁকের ভেতরে। ওপরে জল, ছল ছল করছে।

রাস্তায় ব্যস্ত জীবনের কলরব শুরু হয়ে গেলো প্রথামত…

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: