নয়ন সম্মুখে তুমি নাই/ নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই

সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে।২২শেশ্রাবণ।
এই ২৫শে বৈশাখ আর স২২শে শ্রাবণ মূলতঃ কয়েক মাসের ব্যবধান মাত্র! আসলে বাঙালি জীবনে এই দুটো
দিনের মূল্য অপরিসীম এবং এর সময়কালও বাংলার১২৬৮/২৫বৈশাখ হতে ১৩৪৮এর ২২শ্রাবণ অর্থাৎ ১৮৬১/৭মে আগমন করে ১৯৪১/৭ইআগষ্ট এ প্রত্যাবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সর্বজনীন বা বিশ্বজনীনতা লাভ করেছে যার জন্য তিনি আর কেউ নন বিশ্বকবি , নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
   ২২শে শ্রাবণ তাঁর প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় বলি বৃক্ষ যদি বা হয় পুরোনো ফুল তার চিরনতুন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিরোধান বহু বছর পেরিয়ে ও তাঁর
সৃষ্টি অনবদ্য এবং চিরনতুনত্বে ভরা আজোও।
    রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁরই জীবদ্দশায় বা রবীন্দ্রোত্তর কালেও বহু আলোচিত।অনেকে কটাক্ষও করেছেন অবশ্য তাঁর লেখনীর কৃতিত্বে। অনেকে আবার নিরপেক্ষ
মূল্যায়ন করতে বসে নানান বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন।অবশ্য তাতে রবীন্দ্র প্রতিভার বিন্দু মাত্রোও নিবু নিবু হয়নি বরং আরও সমুজ্জল হয়ে উঠেছে। আগের চেয়ে
অনেক বেশি রবীন্দ্র-সাহিত্য পাঠ্য হয়ে উঠেছে।
    আগে ইউরোপে আমেরিকায় রবীন্দ্র‌পঠন খুব কম হলেও আজকাল অবশ্য বেশি বেশি পঠিত হচ্ছে। তথাপি বাংলা সাহিত্যে বাঙালি জীবনে অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব।
    তিনিই উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন:-
“আজকের মতো বলো সবাই মিলে –
যারা এতদিন মরেছিল তারা উঠুক বেঁচে
যারা যুগে যুগে ছিল খাটো হয়ে
 তারা দাঁড়াক মাথা তুলে।”
তাঁর আরো ঘোষণা—-
       ” শেষের মধ্যে অশেষ আছে
               এই কথাটি মনে
          আজকে আমার গানের শেষে
                জাগছে ক্ষণে ক্ষণে।”
 তাঁর স্বদেশ প্রেম, ঈশ্বরপ্রেম, মানব প্রেম প্রেমাস্পদ হয়ে উঠেছে। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়ে তিনিই বিশ্ববাসীর হৃদয়ে বাংলা ভাষার জন্য এক নির্দিষ্ট আসন আদায় করে নিয়েছিলেন।
        ১৯০৫ সালে রাখী উৎসবের দিন গান বেঁধেছিলেন–            বাঙালির প্রাণ বাঙালির মন
               বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন
                এক হউক এক হউক
                     হে ভগবান।
    তিনি বারবার নানান মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন। তাঁর বৌদি কাদম্বিনী, স্ত্রী মৃণালিনী এবং ভ্রাতুষ্পুত্র ও আদরের পুত্র শমীন্দ্ররনাথের মৃত্যু শোক তাকে পীড়িত করলেও আজীবন সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে সরে থাকতে পারেননি। জমিদারির পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা পুরোদমে করে গেছেন।
    ভ্রাতুষ্পুত্রের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে লিখলেন—
         সায়াহ্ন বেলার তালে অস্তসূর্য দেয় পরাইয়া
          রক্তোজ্জ্বল মহিমার টীকা
          স্বর্ণময়ী করে আসন্ন রাত্রির মুখশ্রীতে,
          তেমনি জ্বলন্ত শিখা মৃত্যু পরাইল মোরে
             জীবনের পশ্চিম সীমায়।
পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে লিখলেন
   আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে
   বসন্তের এই মাতাল সমীরনে
    যাব না গো যাব না গো
    রইনু পড়ে ঘরের মাঝে
   এই নিরালায় রব আপন কোনে
     যাব না এই মাতাল সমীরনে।
আবার নিজের জন্মদিনে মংপুরে  পাহাড়িদের পুষ্পমাল্য নিবেদন উপলক্ষে লিখলেন:-
   ধরনী দিয়াছিল কোন ক্ষণে
    প্রস্তর আসনে বসি,
   বহু যুগ বহ্ণিতপ্ত তপস্যার পরে এই বর–
      এ পুষ্পের দান
     মানুষের জন্মদিন উৎসর্গ করিবে আশা করি।
তিনিই দৃপ্ত কন্ঠে মৃত্যুকে বলেছেন
   মরণ রে
    তুহু মম শ্যামসমান।
——-তাপবিমোচন করুণ বেদের তব
    মৃত্যু-অমৃত করে দান।
     তুহু মম শ্যামসমান।
আবার কোথাও বলেছেন—
 যা দিয়েছ আমার এ প্রাণ ভরি
   খেদ রবে না এখন যদি মরি
   রজনী দিন কত দুঃখে সুখে
কত যে সুর বেজেছে এই বুকে,
কত বেশে আমার ঘরে ঢুকে
    কত রূপে নিয়েছ মন হরি
     খেদ রবে না এখন যদি মরি।
কিং বা,
আমার আমি ধুয়ে মুছে
তোমার মধ্যে যাবে ঘুচে,
সত্য, তোমায় সত্য হব
    বাঁচবো তবে—-
তোমার মধ্যে মরণ আমার
    মরবে কবে।
তিনিই জেহাদ তুলেছিলেন ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে
অপমানিত কবিতায়—
 যারে তুমি নিচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নিচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে
      অজ্ঞানের অন্ধকারে
       আড়ালে ডাকিছে যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি রচিছে সে ঘোর ব্যবধান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
এমন যে রবীন্দ্রনাথ তিনি হারিয়ে গেছেন বিশ্বাস করতে ভুল হয়, হারিয়ে যান সেটাও অভিপ্রেত নয়।তাই তাঁর কথাতেই বলি–
     চাই গো আমি তোমারে চাই,
      তোমায় আমি চাই—
      এই কথাটি সদাই মনে
         বলতে যেন পাই।
———রাত্রি যেমন লুকিয়ে রাখে
           আলোর প্রার্থনাই,
        তেমনি গভীর মোহের সাথে
           তোমায় আমি চাই।
    শান্তিতে ঝড় যখন হানে
শান্তি তবু চায় সে প্রাণে,
তেমনি তোমায় আঘাত করি
       তবু তোমায় চাই।।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *