দীর্ঘশ্বাস // মিজানুর রহমান মিজান

আবর্তনশীল পৃথিবীর বুকে ক্ষণস্তায়ী জীবন নিয়ে বসবাস করে মানুষ। মানুষই মানুষের উৎকৃষ্ট বন্ধু। আবার শত্র“ সেজে ধবংস করার পৈশাচিক বর্বরতাকে ও হার মানায়। দৃষ্টি প্রসারিত করলে অনেক নজির দৃষ্ট হবে সহজেই। কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচেছ মানুষকে , পৃথিবীকে ধবংস যজ্ঞে পরিণত করতে।

রক্ষা করতে ও প্রচেষ্টা রয়েছে অব্যাহত। অনেক ক্ষেত্রে বিসর্জিত হয় মনুষত্ব , নৈতিকতা , উদারতা , সহনশীলতা ও ধৈর্য। শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন। এ প্রক্রিয়া বন্ধ হলেই জীবন প্রদীপের পরিসমাপ্তি চিরতরে। তথাপি মানুষের জীবন প্রবাহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধারা উপধারায় পরিচালিত। একে অপরের সহিত নির্ভরশীল , সম্পর্ক যুক্ত। হোক তা সামাজিক , পারিবারিক বন্ধনের , ভালবাসার মধ্য দিয়ে। অস্তিত্ব , সত্ত্বা নির্ভর রতন শীলার জীবন।

রতনের এক যুগ চলছে শীলাকে নিয়ে। সুন্দর সাজানো গুছানো একটি পরিচছন্ন পারিবারিক জীবন। যেখানে অনাবিল আনন্দ , হাসি-খুশি পূর্ণ নির্মল বায়ুর পরিবেশ বিরাজমান। দারিদ্রতা কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। দুই দু’টি সন্তানের গর্বিত দম্পতি। রতনের বোধ শক্তি অর্জনের পর থেকেই আত্ব-বিসর্জনের নিদর্শন সুস্পষ্টতায় উজ্জল ভাষ্কর। হোক সামাজিক , পারিবারিক , ব্যক্তি নির্ভর প্রতিটি ক্ষেত্রে সাধ্যাতীত দায়িত্ব সচেতন , কর্তব্য ও অধিকার প্রতিষ্টায় একনিষ্ট সাধনাব্রত হিসেবে গ্রহণ যোগ্য।

নিরহংকারী , স্বাধীন চেতা রতন সবার সহিত সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ়তার প্রয়াস অব্যাহত। নিজকে অপরের তরে বিলিয়ে দেবার বাসনা হৃদয় রাজ্যে বহমান সর্বক্ষণ। প্রতিষ্টা দেয়ার উদ্দেশ্য সুস্ত , সুন্দর ও মর্যাদার আসনে। স্বপ্ন ঘেরা রাজ্য হবে আবেগ বিহীন বাস্তবতার সম্বন্বয়ে অল্প তুষ্টতায়।

রতনের লন্ডন প্রবাসী এক বন্ধু একটি স্পন্সর ভিসা ভ্রমন ও সাক্ষাৎ লাভের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। এ ভিজিট ভিসাই কাল হয়ে দাড়াল রতনের বর্তমান , ভবিষ্যত জীবন। উদ্ভাসিত , সম্ভাবনাময় আলোকিত জীবনে নেমে এলো মেঘলাকাশ , ঘোর অন্ধকার। চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণের প্রাক্কালে ধীর লয়ে যেমন গ্রাস করে । অনুরুপ যদি স্বামী ভিজিটে লন্ডন চলে যায়। তবে স্তায়িত্ব পেতে হয়ত বিয়ে করে ফেলবে এ সন্দেহ প্রবণতায় আকৃষ্ট হয়ে দীর্ঘ দিনের অমানসিক পরিশ্রমে সাজানো ফল , ফুলে ভর পুর বাগানটি ক্ষণিক এবং ক্ষণ স্তায়ী ঝড়ের তান্ডবে করে তোলে দু:সহ বেদনাময়। ”সন্দেহ প্রবণ মন , আঁধার ঘোচে না কখন। ” সন্দেহ নামক বীজ যেখানে হয়েছে পতিত , রক্ষে নেই কোন ক্রমে। শত চেষ্টা করে ও এ থেকে উত্তোরনের পথ অনেকাংশে রুদ্ধ তুল্য।

যা থেকে বের হবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ম্যাচের এক কাঠিই যথেষ্ট , গৃহ থেকে গৃহান্তরে , বন থেকে বনান্তরে আগুনের লেলিহান শিখা প্রজ্জলিত করতে। আবার ম্যাচের পর ম্যাচ সমাপ্ত করে এক গৃহ জ্বালানো হবে দু:সাধ্য।সন্দেহের বশবর্তী হয়ে শীলা শুরু করে যত্র তত্র যাত্রা।

তাবিজ কবজ থেকে আরম্ভ করে ডাক্তারী , কবিরাজী। দেখে যেন মনে হয় আউলা-বাউলা , পাগলীনি। সমাজ সংসার ত্যাগী। স্বামী রতন যতই বুঝাবার চেষ্টা করে তা হয় অরণ্যে রোদন। জবাব আসে কোথায় , কি করলাম। বাহ্যিক সকল কিছু ঠিকঠাক হলে ও অভ্যন্তরে তুষের অনলে ছাই এ রুপান্তরিত হচেছ প্রতি নিয়ত। শীলা পিতা মাতা , ভাইকে ও ক্ষেপিয়ে তোলে বিদ্রোহের আগুন জ্বালায় রতনের বিপক্ষে।

তারা বুঝে ও না বুঝার ভান স্বরুপ বেড়াতে নিয়ে আটকায়। এক বার রতন আত্ম-সম্মান বিসর্জন দিয়ে শুধু মাত্র দু’টি সন্তানের মুখ চেয়ে গৃহে আনে। আবারো অকারনে , অনাকাংখিত ভাবে স্বল্প দিনের ব্যবধানে আটকায়। উপলক্ষ্য বিহীন আটকানো মেনে নিতে পারে না বিধায় পরিক্ষার নিমিত্তে চেয়ার ম্যান মারফত তালাকের দাবী জানিয়ে নোটিশ প্রদান করে। শরিয়ত সম্মত কোন প্রকার শব্দ উচচারন বিহীন। রতন মনে করে ইচছার বিরুদ্ধে এক জনকে আনয়নের প্রচেষ্টা নির্যাতন তুল্য। স্বামী গৃহে ফিরে আসার অভিলাষ থাকলে চলে আসবে সরাসরি।

নতুবা প্রয়াস থাকবে , চালাবে লক্ষ্যকে সামনে রেখে। কিন্তু দৃশ্যত ঘটল , প্রমাণিত হল না আসার অভিপ্রায়। যা হবার তাই হল। নদীর জল অনেক গড়াল। খোরপোষ , মোহরানা নিয়ে আবার স্বামী গৃহে আসার কথা ব্যক্ত। এটা সত্যিকার না উপহাস তা ভেবে দেখার ভার পাঠকের উপর ন্যস্ত।
রতন বার বার প্রতিক্ষারত যদি শীলা তার ভুল বুঝতে পারে , অনুতপ্ত ও বিনয় ভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে সত্যিকার অর্থে ফিরিয়ে আনবে আন্তরিকতার সহিত। কিন্তু শীলা দৃঢ়তার সহিত কস্মিন আসার কথা বলেনি। সুতরাং রতন হয় চিন্তাক্লিষ্ট ভাবনার রাজ্যে বিচরণের মাধ্যমে। প্রসঙ্গত  মিথ্যার বেশাতি করে রতনের দু’চাচাত ভাইকে জড়িয়ে অপমানে জর্জরিত , আনার পথে বা রতনকে ঘায়েল করতে যে কুট-কৌশল প্রয়োগ হয়েছিল।

আজ তা শীলার জন্য কাটাঁ হয়ে দাড়িয়েছে শক্ত বাধাঁ রুপে। যারা বিন্দু বিসর্গ জড়িত নয় বা সম্পূর্ণ ভিন্নতর প্রভাব বলয় বেষ্টিত। অর্থ্যাৎ ”কুইনাইন জ্বর সারাবে বটে , কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে ” শত ভাগ বাস্তবায়িত। শীলা কুইনাইন খেয়েছিলেন বা প্রয়োগ করেছিলেন নিজের কাছে রতনকে বিপর্যস্ত করতে। সে কুইনাইন আজ শীলার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্বতসম। কারন সত্য অপরাজেয়।
পরোক্ষে শীলা আসার একান্ত ইচছা ব্যক্ত করে। কিন্তু রতন দ্বিধাগ্রস্ত , বিশ্বাস করতে বডড কষ্ট হয়। কারন বিহীন ইস্যু। ধর্মীয় , সামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে যাকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভুমিকা , মর্যাদার আসনে প্রতিষ্টা করতে বিন্দু পরিমাণ কার্পন্য করেনি। এ জাতীয় জীবন যাত্রায় এবং প্রচেষ্টা বহাল থাকা সত্তে ও মিথ্যা অপবাদে রতন হয় সীমাহীন মর্মাহত ও ব্যথাতুর। আর কি দেবার বা পাবার রতনের বোধগম্য নয়।

সুতরাং টাকা নেবার প্রাক্কালে শীলা যদি দৃঢ়তার সহিত স্বামী গৃহে আসার ইচছা ব্যক্ত করত। অবশ্য রতন ঘরে তোলার প্রক্রিয়া বা আসার রুদ্ধ পথ খোলাসার ব্যবস্থা পরামর্শ স্বরুপ বাতলে দিত। রতন প্রত্যক্ষ্যে তাই চেয়ে কেটেছে প্রতিক্ষার প্রহর। সন্তানের আদর , স্নেহ , ভালবাসার বড় কাঙ্গাল রতন। দু’টি সন্তান যখন আত্মসাৎ হলো , সে আঘাতের হাত থেকে নিজকে রক্ষা করতে দ্বিতীয় বিয়ে করে। সত্যিই অপর দু’টি সন্তান খোদার দান রয়েছে বিদ্যমান। কারন অত্যধিক আঘাত মানুষকে করে তোলে হতভম্ব পাথর সমান।

শীলা পরোক্ষে যাকে তাকে বলে রতন গিয়ে নিয়ে আসলে আসার অভিলাষ। কিন্তু রতন পারে না যেতে বিবেকবোধ বার বার বাঁধা প্রদানে দন্ডায়মান খড়গ হস্তে। কারন রতন বিদায় করেনি , তিল পরিমাণ অন্যায়-অত্যাচার করেনি মানসিক , দৈহিক যে কোন প্রকারের। এমতাবস্তায় রতন কি , কোন কথার উপর ভিত্তি করে সে বলবে আসার কথা বা আনয়নের প্রচেষ্টা থাকবে অব্যাহত। যেখানে সম্পূর্ণ মিথ্যাশ্রয়ী হয়ে রতনকে সামাজিক , আর্থিক , দৈহিক , মানসিক ভীষন ভাবে নির্যাতনের শিকার , ভুক্তভোগী করা হয়েছে। শীলা যদি স্বেচছা-প্রণোদিত হয়ে আসত উজ্জল সম্ভাবনা রতন শীলাকে তোলার বা লোকের অনুরোধ রক্ষা করার। এ অনুভব রতনের চেহারায় দৃষ্ট হয় সুস্পষ্ট আভাষ হিসাবে দৃপ্ত অবয়বে। পিতৃ স্নেহ , আদর , ভালবাসা বঞ্চিত এবং ভবিষ্যত শংকিত প্রয়াসের।

নতুবা সকল প্রকার দায়-দায়িত্ব সীমাহীন প্রান্তরে আবর্তিত। এক দিকে পিতা অপ্রত্যাসিত সন্তানের স্নেহ বঞ্চিত , অপর দিকে সন্তান র’ল পিতা নামক বস্তুও অন্তরালে , অগোচরে। দু’টি সত্ত্বা অহরহ বঞ্চনার হতাশায় নির্মল বায়ুকে বিশুদ্ধতার ছোয়াঁ বিহীন পরিবেশে সর্বক্ষণ শ্বাস-প্রশ্বাস প্রলম্বিত হয়ে বয়ে যাচেছ অনবরত আষাড়ের বারিধারা সিক্ততায়। এ সিক্ততা বৃথা যেতে পারে না , পারবে না। যেহেতু পিতা সন্তান সম্পর্ক যা অস্বীকার করার জো নেই কারো কখন ও। সৃষ্টি কর্তা প্রদত্ত অকৃত্রিম বন্ধন , বিনি সুতোর মালা চুম্বকার্ষণে দীর্ঘ শ্বাস বহে নিরবে প্রতি নিয়ত , আল্লাহর আরশ কাপিঁয়ে সংগোপনে সমান্তরালে। পিতার দীর্ঘশ্বাস হচেছ ঘনীভুত দিনে দিনে প্রতি দিনে। আকাশ বাতাস বয়ে বেড়াচেছ অবিরত দীর্ঘশ্বাসের শক্ত পাথর অম্লান , অমিলতায় প্রতিক্ষণে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: