দিদিগিরি – রণেশ রায়

                   মিত্রবাবুদের ঘোর দুপুর বারোটার  পর পাড়ার মোরের আড্ডাটা ছাড়া চলে না। জীবনের সব ক্ষেত্রে ঋতু চক্র কাজ করে।

গরম যায় বর্ষা শরৎ বসন্ত হয়ে শীত আসে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শীতের আক্রমনটাও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। যত বয়স হচ্ছে তত বসন্ত ছোট হয়ে আসছে কিন্তু শীত যেন প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য দুদিক দিয়েই  বেড়ে চলেছে।

শরীরের তাপ কমায় গ্রীষ্মের দহন জ্বালাটা অসহ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু আড্ডার ঋতুচক্র নেই। তার বসন্ত যায় না। সে চিরবসন্ত। চিরবসন্ত যদি কারও জীবনে থাকে তবে তা এই আড্ডার।

সেই বসন্তের ছোঁয়াতেই আড্ডার বুড়োগুলো যেন চনমনে হয়ে ওঠে। নিজেদের জীবনের বসন্তের দিনগুলো স্মরণ করে। জীবনের বিভিন্ন ঘটনা উঠে আসে আলোচনায় । মজলিস জমে ওঠে।

তারা অতীতচারি হয়ে পরেন। আড্ডার বিষয়ে চাল থাকে না, বেচাল হয়ে যায়। ওদের আলোচনা শুনে পাশ দিয়ে যাওয়া কিশোর কিশোরী যুবক যুবতীরাও লজ্জা পায়। কিন্তু বুড়োদের লজ্জা নেই। একদিন মিত্রবাবুর স্ত্রী তাঁকে বলেন:

             ——- কি সব আজে বাজে আলোচনা হয় তোমাদের আড্ডায় ! মেয়েও  লজ্জা পায়

        ——- মেয়ে কেন শুনতে যায় বড়দের কথা ! আর মায়েদের রসকষ ফুরিয়ে গেলেও  আমাদের তো কিছু অবশিষ্ট আছে। মিত্রবাবু রসিকতা করার চেষ্টা করেন বুঝে স্ত্রী আর কথা বাড়াননা। আবার কি বলতে কি বলবেন।মেয়ে পাশের ঘরে।এসব লোককে না ঘাটানোই ভালো।

               আজ রোদটা পূর্ণ মাত্রায় পেকেছে। ঘামের সঙ্গে দহন জ্বালা। লু চলছে যেন। আবহাওয়া অফিস থেকে  দুদিন ধরে এর বিরুদ্ধে সাবধান বাণী শোনাচ্ছে। জানা যাচ্ছে আজকের গরম গত পঁচিশ বছরে সব থেকে বেশি। আড্ডার সময় হয়ে এল। স্ত্রী অফিস গেছে। মেয়ের কলেজ নেই তাই ব্যাঙ্কের কাজ সারতে গেছে।

ও একটা কলেজে পড়ায়। বাড়িতে ওই অভিভাবক। ওর অভিভাবকত্বে বাবা মা দুজনেরই প্রানান্ত। বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া হলে ও সালিশীতে বসে। কার কি অন্যায় বোঝাতে বসে। বোঝে না যে এটা বিবাহিত  জীবনের অঙ্গ। বাবাকে এই গরমে বারণ করে গেছে কিন্তু নিজে বারণ করা সত্ত্বেও বেরোল।

না গেলে নাকি তার চলবেই না। সবাই বলে বাপকা বেটি। একবার যা ভাববে তা করা চাই। অথচ অন্য সবাইকে “এটা কোর না ওটা কর“ নির্দেশ। কলেজে পড়ানোর মেজাজটা এখানেও। মিত্রবাবু জানেন আজ বেরোলে ঘরে কুরুক্ষেত্র । ও বাবার আড্ডায় যাওয়াটা যে পছন্দ করে না তা নয়। বরং বলে ঘরে বসে আর কি করবে, আড্ডায় যাও, সেটাই ভালো। মন ভালো থাকবে।

কিন্তু আজ ব্যতিক্রম। মিত্রবাবু ভাবেন উনি যদি আজ বেরোন তবে মেয়ের সর্দারি করার কিছু থাকবে না কারণ সেও বাবার কথা না শুনে বেরিয়েছে। তবে ওর একটা যুক্তি থাকবে। বাবা বেরিয়েছে অকাজে আর মেয়ে বেরিয়েছে কাজে। আর দুজনের বয়সতো এক নয়।

একজন সত্তর বছরের বুড়ো আরেকজন মাত্রই ত্রিশ বছরের তরুণী। সুতরাং যুদ্ধের মযদানটা  তৈরী হবে বাবা বেরোলে তাতে সন্দেহ নেই। তবে সে ময়দানতো তৈরিই। যুদ্ধটা রোজের ব্যাপার হয় মায়ের সঙ্গে না হয় বাবার সঙ্গে। এইতো সেদিন বিয়ে করতে বলায় কুরুক্ষেত্র বাধল। কি আর করা যাবে !

                   মিত্রবাবু এই গরমে বেরোবেন  না বেরোবেন না করেও ঘরে চাবি দিয়ে নিচে  নেমে আসেন । অভ্যেসমত নিচে ভাইয়ের ঘরে চাবিটা রেখে পা বাড়ান  আড্ডার দিকে। সঙ্গে তাঁর সঙ্গী ছাতা। আড্ডায় পৌছে দেখা গেল রোজের মত প্রায় সবাই উপস্থিত। সকলেই গরমে কাতর। তাও আসতে হল ।

বসন্তের টানে। সত্যিই বসন্ত। আড্ডা শুরু  হতেই যেন গ্রীষ্ম উধাও। আজ আড্ডায় নেশা ধরেছে। মদ বা পুড়িয়া নয়, ওতে মিত্রবাবুদের বিশেষ কারও আগ্রহ নেই। যাদের একটু আধটু আছে তাঁরা এখানে মদত পান না।

আজকের নেশার উপাদান হ`ল সাম্প্রতিক রাজপটের পরিবর্তন। পরিবর্তনে মিত্রবাবু উৎফুল্ল। দাস বাবু নিরাশ। তবে দাসবাবু নৈরাশ্য প্রকাশ করেন না। কে যেন দাস বাবুকে উস্কে দেওয়ার জন্য বলেন :

          ——- কি হ`ল, অস্ত গেল ! সূর্যকে আকাশে বসিয়ে দিলেও তিনি থাকতে চাইলেন না। উদয় হলে তো অস্ত যেতেই হয়। দাসবাবু জানেন এটা আজ তাঁর  দিন নয়। এতদিন অনেক বলেছেন এখন তাঁর শোনার পালা। তিনি ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে আগুন কিন্তু তা চেপে রেখে বলেন :

            —— বাজে বোক না। দুদিন হল  এসেছ তাতেই গান শুরু হয়ে গেছে, কাজ করব কি করে, সব লুঠে  নিয়ে গেল। আরে কোন বাপের বেটা ভারতে একনাগারে পয়ত্রিশ বছর রাজত্ব করেছে ? রাযবাবু একটু খোঁচা দিয়ে বলেন

              ——ওটা পয়ত্রিশ নয় চৌত্রিশ

          —— ওই হলো। এরই মধ্যে কাঁদুনি শুরু হয়ে গেছে কাজ করব কি করে, ওরা লক্ষীর ভান্ডার লুঠে নিয়ে গেল। আরে লক্ষীর ভান্ডার ছিল বলেইতো সেটা লুঠ  হল। আজতো লক্ষীই তার ভান্ডার নিয়ে পালিয়েছে। আরে পাঁচ বছর টেঁক, তারপর কথা বলিস।

         —— লুটে পুটে  নয়ত কি ? প্রচার করে বেরালি সবেতে প্রথম, তবে এখন লাস্ট  কেন। বললেন ব্যানার্জি।

                            পর্দা চড়ছে, আড্ডাটা জমে উঠেছে। পাশে বসা মজুমদার বাবু কোনুই  মেরে মিত্রবাবুকে বলেন

             ——- ওই দেখ কে আসছে

                         মিত্রবাবু দেখে একটু অপ্রস্তুতে পড়েন, কি হলো এখানেই হুজ্জুতি বাধাবে নাকি। মেয়ে আসছে। বোধহয় গরমে বেরিয়েছেন বলে ও তেতে গেছে। এখানে সবাই ওকে স্নেহ করে। যদি যুদ্ধ বাঁধায় তবে সবাই ওর সেনাপতি হয়ে যাবে। একা লড়বেন কি করে? ভাবতে ভাবতে  মেয়ে হাজির। একটু ইতস্তত হয়ে আগ বাড়িয়ে মিত্রবাবু বলেন :

                ——- এইতো বাড়িতে একা, ভালো লাগছিল না তাই এলাম। দেখতো  গাছের নিচে কি হাওয়া। সবাই এসেছে দেখ। মেয়ে বলে:

               —— কে কৈফয়েত চেয়েছে। তোমরা জাহান্নামে যাও। মজুমদার ফোড়ন কাটে

             —— পাগলি দেখ, আমরা বলছিলাম এই গরমে বেরলি কেন ? ছোটবেলা থেকে কাকুরা  ওকে পাগলি বলেই ডাকে । মজুমদার শয়তানটা নাম দিয়েছে। রীতা উত্তর দেয়

               —— তা তোমরা বেরিয়েছ কেন ?

          —— আমাদের বাড়িতেতো তোর মত একটা পাগলি মেয়ে নেই । আজ কোথায় মেয়ের ছুটি, তার সঙ্গে বসে গল্প করবে না এই গরমে বেরোনো চাই। মজুমদার ওকে তাতিয়ে দেন  । রীতা রেগে যায়, বলে

             ——দেখো ফালতু কথা বোল না, আমি কাজে এসেছি।

             —— কি কাজ সেটা বল।  কেউ বাড়িতে এসেছে নাকি? জানতে চান মিত্রবাবু

             —— না, তোমরা আমার সঙ্গে চল

             —— কেন কোথায়?

          —— ব্যাঙ্কে। চল, চল বলছি। এত ব্যাখ্যা দিতে পারব না। মিত্রবাবু একটু ব্যস্ত হয়ে  পড়েন, যা ঠোঁট কাটা মেয়ে ! আবার কাকে কি বলে বসলো ! নাকি ব্যাঙ্কের সামনে যে চ্যংরাগুলো বসে তাদের সঙ্গে লাগলো।

         ——সবাইকে যেতে হবে? বলত মালপত্র নিয়ে যাই। শিক্ষা দিয়ে দেব। ঠাট্টা করে জানাবাবু বলেন ।

         —— ও! তোমাকে কে বাঁচায়  তার ঠিক নেই, তোমার মুরদ কত জানা আছে। কথাটা রীতা খুব ভুল বলেনি। জানা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভিতু। কোন গোলমাল দেখলে পিঠটান দেয়।

            —– দেখো তোমরা কিন্তু দায়িত্ব এড়াচ্ছ। না গেলে বল আমি যাচ্ছি। রিতা  যেন আরও বিরক্ত হয়।

          —— কিসের দায়িত্ব কি ব্যাপার কিছুই বুঝলাম না আর তুই আমাদের দোষ দিচ্ছিস? কোথায় যাবি চল।  মজুমদার বলে।

                সবাই ওঠে। মিত্রবাবু বলেন সবাই এভাবে যাওয়া ঠিক নয়। চল মজুমদার, আমরা দুজন  যাই আগে দেখি ব্যাপারটা কি।

                রিতা রওনা দিয়ে দিয়েছে, আমরা ওর পেছন পেছন যাই। ও প্রায় ছুটছে। যেন সামরিক বাহিনীর জোয়ান। মজুমদার বলেন :

           ——- দেখো কোথায় কি হোল, ওকে বিশ্বাস নেই। মনে আছে একটা ছেলেকে কেমন ঠাসিয়ে দিয়েছিল ওর পেছনে লাগার জন্য।

—— সেটাইতো ভয়।

—— তারপর থেকে ওর পেছনে কেউ লাগে না। সব মেয়েরা এরকম হলে রাস্তাঘাটে ওদের আর ভুগতে হয় না। মিত্রবাবু একটু শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। কি জানি কি হল!

                  তারা ব্যাংকের দরজায় চলে আসে। সেখানে গিয়ে  ঢোকে । মনে হল কর্মচারীরা সবাই যেন রিতার জন্যই অপেক্ষা করছে। সামনে বসে এক বৃদ্ধ।  উঠে এসে রিতার হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। মিত্রবাবুরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করেন। কি হল রে বাবা ! কিছুই বোঝেন  না। কোন ডাকাতি টাকাতির ব্যাপার নাকি ! মজুমদার এগিয়ে যান ভদ্রলোকের দিকে। রিতাকে বলেন

—– কিরে কি হল  ? ভদ্রলোক নিজেকে সামলে বলেন

—– এই মেয়ে ছিল বলে আজ আমি বাঁচলাম। মজুমদার বলেন

—– কেউ কি ছিনতাই করতে এসেছিল?  বৃদ্ধ বলেন

—– সেটা হলে তো  একটা কথা ছিল। যেটা হয়েছে সেটা আমার কাছে খুব লজ্জার ব্যাপার। আমার ছেলে, বলি কি  করে ! উনি আবার কেঁদে ফেলেন। মিত্রমশাইরা ভাবেন কি জানি উনার ছেলে রিতার সঙ্গে কোন অসন্মানজনক ব্যবহার করলো কিনা। তবে ছেলে আসেপাশে কোথাও আছে বলেতো  মনে হচ্ছে না। এসবের মধ্যে ব্যাঙ্কের একজন বয়স্ক কর্মচারি এসে বলেন:

 —— উনার ছেলে উনাকে উনার জমানো পাঁচ লাখ টাকা তাকে  লিখে দিতে বলে। ভদ্রলোক সেটাতে রাজি না হওয়ায় ও জোর করতে থাকে।কথাকাটাকাটির পর সুপুত্র বাবাকে মারতে থাকে। তখনই ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে ছেলের গালে এক চড় মেরে উনাকে ছাড়িয়ে নেন। আমরা সবাই মিলে তখন ছেলেটিকে ঘাড় ধরে বার করে দিই। ধন্যি মেয়ে।আমরা যেটা পারিনি ও সেটা করলো। রিতা যেন একটু লজ্জা পেল। ও বলে,

            —— ওসব কথা থাক। মেসোমশাই-এর একটা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। উনি বাড়ি যেতে ভরসা পাচ্ছেন না। মজুমদার একটু উচ্ছসিত বোধ করেন। বলেন

          —— সেটা এমন কোন ব্যাপার নয়। আমার বাড়িতে না হয় থাকবেন। আজ থেকে তোর মেসোমশাই আমাদের আড্ডার ক্লাবের সদস্য। রিতা তুই বাড়ি যা। হ্যা মাকে বলিস রাতে মাংস ভাতের ব্যবস্থা করতে। সবার জন্য কিন্তু। তোর অনারে। টাকা দেবেন তোর মেসোমশাই। ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলেন:

 —– কি রাজি তো।

রীতা টিপ্পনি কাটে

—– এটা তোলাবাজি হয়ে যাচ্ছে না ! সবাই হেসে ওঠে। ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসে।                                                                                            

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: