দাড়িবুড়ো

 সেবন্তী গঙ্গোপাধ্যায়

মাঝরাতে ,যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে ঠিক তখনই  দরজায় কড়া নাড়ে সাদা দাড়ি, লাল জোব্বা, লাল টুপি পড়া এক সৌম্যকান্তি ভদ্রলোক। কেউ তাকে কখনো দেখেনি। শুধু আছে একটা নির্ভরতা। বরফের দেশ থেকে স্লেজ গাড়ি চেপে ঠিক আসবেন। মা বলতেন সান্তা ক্লাউস আসেন পৃথিবীর শিশুরা কেউ কষ্টে আছে কিনা দেখতে।

প্রত্যেক বছর ২৪এ ডিসেম্বরের রাতটা ছিল অপেক্ষার। কখন আসবেন ভদ্রলোক। যত রাত অবধি জেগে থাকা ৬-৭ বছর বয়সে সম্ভব,চেষ্টা করতাম জেগে থাকার।যদি দেখা হয়ে যায় একবার।কত কথা বলার আছে যে।আমার আশেপাশের কোন বন্ধুটা ভালো নেই,সেই খবরগুলো জানাতে হবে, বরফের সেই দেশ টার খবর নিতে হবে।

স্কুলে সকলের কাছে শুনি সবাই নাকি বড় লিস্ট বানিয়ে আগে থেকে বালিশের তলায় রেখে দেয়। সান্তা সেই লিস্ট অনুযায়ী তাঁর ঝোলা থেকে জিনিস বের করে রাখেন। একবার আমিও মহা উৎসাহে লিস্ট বানাতে বসেছি, মা দেখতে পেয়ে বললেন “সান্তা ক্লাউস লোভী শিশুদের ভালোবাসেন না, কোনো লিস্ট দেবে না।

সান্তাকে ঘুরে ঘুরে সব ছোটদের দিতে হয়,তুমি বড় লিস্ট দিলে বাকিরা কি পাবে?” সেই থেকে আর লিস্ট দেওয়া হয়নি। শুধু একটা ব্যাপার অবাক করতো, সান্তা কি করে জানতে পারে আমার বোন ঠিক আমাদের ওপরের ফ্ল্যাটটায় থাকে – প্রত্যেক বছর নিয়ম করে একই জিনিস পাই আমরা দুজন? দেখা হলে জিজ্ঞেস করবো ভেবে রেখেছি।

কিন্তু দেখা যে কিছুতেই হয়না। এক রাতে কতক্ষণ জেগে বসে রইলাম,এলেন না। এবছর সান্তা আমায় ভুলেছে মনে করে শুয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম ভাঙতেই চিরকালের অভ্যেস অনুযায়ী বালিশের তলায় হাত ঢোকালাম, হলুদ একটা প্লাস্টিক যত্ন করে রাখা। কখন এলেন? বাবা বললেন বাবার এঙ্গে দেখা হয়েছিল নাকি ভোরবেলায়, শিশুরা জেগে থাকলে সান্তা সেই বাড়িতে আসেন না – এই কথাও বলে গিয়েছেন সান্তা।

আরেকটু বড় হলাম। সান্তা ক্লাউসের পরিচয় সম্পর্কে একটা দ্বন্দ্ব মনের ভেতর ঢুকে পড়েছে ততদিনে। আশেপাশে কেউ কেউ বলছে মা-বাবা ই সান্তা সেজে বালিশের নীচে যত্ন করে জিনিস সাজিয়ে রাখেন। মায়ের কাছে বারবার প্রশ্ন করি, “কে মা এই সান্তা?” মা বলেন “যতদিন সান্তা কে বিশ্বাস করবে, ততদিন তিনি আসবেন।” একবার মাকে গিয়ে বললাম, “আমি জানি সান্তা আসলে কে, সেটা তুমি”।

তারপর থেকে আর সান্তা ক্লাউসকে আমার বাড়ীর আশেপাশে দেখা যায়নি।  তারপর ও দেখা হয়েছে বইকি সান্তার সঙ্গে।আমাদের স্কুলে ক্রিস্টমাস পার্টির দিন, রিকশা করে সান্তা ক্লাউস আসতেন, চকোলেট দিতে দিতে। তখন physical সান্তা ক্লাউসের সঙ্গে দেখা হতো বছরে একবার। কল্পনার সান্তা আর আসেন নি ২৪ তারিখ রাতের অপেক্ষার প্রহর গুলোতে।

আরো খানিকটা সময় কেটে গেল। দাড়িবুড়ো মানে এখন শুধুই সান্তা ক্লাউস নন। আরো একজন দাড়ি বুড়ো আমার মনের সমস্ত আকাশ জুড়ে। লিস্ট লেখা বা গিফট পাওয়ার ব্যাপারটা এখন চলে গেলেও,একটা গভীর বিশ্বাস আজও কাজ করে, দাড়ি বুড়ো আমার মনের সব কথা জানেন। মাঝে মাঝেই দিশাহারা হয়ে পড়লে, আমার ঘরের দেওয়াল জোড়া দাড়িবুড়োর সামনে গিয়ে দাঁড়াই, মনে মনে কল্পনা করি লাল টুপি,লাল জোব্বা,সাদা দাড়ি সৌম্যকান্তি এক ভদ্রলোক কে।

ছবির ভদ্রলোক আমার দিকে হেসে বলেন ‘তোমায় নতুন করে পাবো বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ।’ কোথাও যেন আমার সান্তা ক্লাউস আর রবীন্দ্রনাথ মিলে মিশে এক হয়ে যান। সমস্ত ঝড়-ঝাপটার ভেতর শক্ত করে হাতটা ধরে রেখেছেন যিনি, তিনি সান্তা ক্লাউস- না ঈশ্বর- না সেই ছবির ভদ্রলোক তা যখন ভাবতে বসি, উত্তর পাই না ।

আজ আবার একটা ২৪এ ডিসেম্বর। কাল বড়দিন। আজ রাতেই সান্তা পৃথিবীর সব শিশুদের খোঁজ নিতে আসেন। কেউ কষ্টে থাকলে,তার কষ্ট দূর করে দেন।এবছরও মনে মনে একটা লিস্ট ভেবে রেখেছি। নাহ, তাতে গিফট এর কথা লেখা নেই, তাই বাকিদের কম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও নেই। লিস্ট জুড়ে রয়েছে শুধু হারিয়ে যাওয়া মানুষদের নাম – সম্পর্কগুলোর নাম।

সময়ের বাঁকে বাঁকে, নতুনের খোঁজ করতে করতে যে সমস্ত পুরোনোরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ,তাদের কথা। সান্তা লোভি শিশুদের পছন্দ করেন না! কিন্ত পুরোনোকে আগলে নিজের কাছে রেখে দিয়ে বেঁচে থাকার লোভটা যে বড্ড বেশি।  সান্তা কি এবছর আমাদের বাড়ি আসবেন? ঝোলাটা না আনলেও চলবে। শুধু মানুষগুলোকে দিয়ে যাক!

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *