তানজিমুল আয়ান তানাফ – অনুগল্পঃ তোমার চোখে অত বিষণ্ণতা কেন !

বিকেলের টকটকে রাঙা সূর্যের আলো ব্রহ্মপুত্রের গায়ে উথালপাতাল সুর তুলছে। আদি অকৃত্তিম চিরপরিচিত সুর। সৃষ্টির সেই প্রথম বিকেল থেকেই বয়ে নিয়ে চলছে এই রাঙা আলোর গান। তারপরও প্রতিদিনই নতুন হয়ে কানে লাগে, তন্ময় করে রাখে; বৈচিত্রে শুনিয়ে যায়, ফিসফিস কন্ঠে বলে- ‘আমি পুরাতন তব চিরনতুন।’

মেয়েটার সাথে আমার প্রথম এখানেই দেখা হয়।

নদীর পাশে পার্ক। সাথে শাণবাঁধানো বিশাল ঘাট। এই ঘাটেই তাকে প্রথম বসে থাকতে দেখি। একা, চুপচাপ। মেয়েটা তেমন আহামরি সুন্দরী কেউ নয়, কিন্তু অতো মায়াভরা মুখ আমার সেইবারই প্রথম দেখা। কি এক অদ্ভুত অপার্থিব স্নিগ্ধতা তার চারপাশে! চোখের তারায় গাঢ় বিষন্নতা; এই বিষন্নতাটুকুই যেনো তাকে আর সবার থেকে অনন্য করে তুলেছে!

নৌকায় উঠতে ভাললাগে। প্রায় বিকেলেই তাই এদিকটায় আসি। কোনোদিন একা, আবার কোনদিন হয়তোবা বন্ধুদেরও কেউ কেউ থাকে সাথে। যদিও সাঁতার পারি না; বাবার চোখরাঙানো, তুমুল আপত্তি, বকা কোনটাই তবু শেষ পর্যন্ত আমায় দমিয়ে রাখতে পারে না।

তুমুল আকর্ষণে সব দিব্যি ভেস্তে যায়, খাড়া সিঁড়ি ভেঙে আস্তে আস্তে নামতে থাকি; অবশেষে নৌকায় পা রাখি। আমার চোখ প্রতিটামুহুর্ত মেয়েটাকে খোঁজে। প্রতিদিন তার আসা হয় না; হয়তো আসতে পারে না।

অথবা আমি যেদিন আসি, মেয়েটা ব্যস্ত থাকে; হয়তোবা এক বিকেলে সে এসে বসে থাকে আর আমি প্রাইভেট টিউটরের বাসায় উদাস হয়ে বসে থাকি।

তারপর এক বিকেলে আবার আমার তার সাথে দেখা হয়। এইপ্রথম আমি এক ভয়ঙ্কর কাজ করে ফেলি। মেয়েটার পাশে টুপ করে বসে ফিসফিস করে বলে ফেলি- ‘তোমার চোখে অত বিষণ্ণতা কেনো!’

মেয়েটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত নিচে নামতে থাকি। ভ্যাবচ্যকা ভাব তার তখনো কাটেনি, চোখে মুখে কেমন ঘোর লেগে আছে। পেছনে তাকিয়ে তার মুখটা আরেকবার দেখতে ইচ্ছে করলেও সামনেই এগোই। তখনই মেয়েটা ডেকে বসে,

‘শুনুন।‘

বেশ সামলে নিয়েছে নিজেকে। তারপর গুটিগুটি পায়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকি, বিকেলের শেষ আলোয় তার বিষন্নতাগুলো কেমন অশ্রু হয়ে ঝরে যাচ্ছে!         

অনুগল্পঃ তোমার চোখে অত বিষণ্ণতা কেন !

©তানজিমুল আয়ান তানাফ।

রচনাকালঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৮।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: