তখন তোমার বয়স অল্প

 প্রিয়নীল পাল

সন্ধ্যা নেমেছে, শীতের সময় বাড়ির বসার ঘরে একটা হলুদ আলো জ্বলছে, বসার চেয়ার টা দেওয়াল-এর দিকে মুখ করে রাখা। সতীশ বাবু দুটি বোতল আর একটা গ্লাস নিয়ে চেয়ারটা তে এসে বসলো।

নিজের সিগারেটা ধরাতে গিয়ে আর ধরালেন না কারণ মণি ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না।

সতীশ বাবু একটা গ্লাস এ জল আর ব্র্যান্ডি মিশিয়ে রাখলেন।

সতীশ বাবু সামনের দিকে তাকিয়ে মণি কে বলছেন,

মণি তোমার মনে আছে সেই দিনের কথা,

তখন তোমার বয়স অল্প ছিল,

তুমি আমাদের বাড়ির পেয়ারা গাছে পেয়ারা পারতে এসেছিল। আর ঠাকুমা তোমায় ধরে খুব বকা দিয়েছিল। আমি তোমাকে উপর তলার জানালা দিয়ে দেখেছিলাম, তোমার চোখে একটা আলাদা দুরন্ত ভাব ছিল,

তোমার যেনো ধরা পড়ে যাওয়ার কোন ভয় নেই, আছে আফসোস পেয়ারা না খেতে পাওয়ার।

সেই চাঞ্চল হাসি, সেই মুক্ত আবেশ তোমাকে প্রথম দেখেই একটা অন্য রকম অনুভূতি উপলব্ধি করেছিলাম।

তার পর থেকে রোজ তোমার বারান্দায় একটা করে পেয়ারা রেখে আসতাম।

কে রেখে আসতো তুমি ভাবো নি বলো!

তুমি তখন এত চিন্তা করবেই বা কেন!

তখন তোমার বয়স অল্প, সবে একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী তুমি, আমি অবশ্য তখন স্নাতক পাশ করেছি।

আমি রোজ একটি পেয়ারা রেখে আসতাম ওটাই ভালোবাসা প্রকাশের প্রথম মাধ্যম ছিল আমার।

আমি তখন তোমার থেকে বয়েসে বড় হয়েও কত বাচ্চা দের মতোন কাজ করেছি বলো?

(একটু হেসে) আরে না না! ভালোবাসা তে এগুলোই তো হবে।

একদিন তো তোমার বারান্দায় পেয়ারা দিতে গিয়ে কত উকি ঝুকি মারছিলাম যদি তোমায় দেখতে পেয়ে যায়, আর তখনি তুমি এসে হাজির, আমি তো লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলাম, তোমার তখন কি সেই বকা,

কি বলে ছিলে মনে আছে?

মনে নেই তো!

আচ্ছা আমিই বলছি,

তখন তুমি বললে আচ্ছা লোক তো আপনি! নিজেদের বাড়িতে গাছ থাকতে আপনি আমার পেয়ারা নিতে চলে এসেছেন, এগুলো কি মশাই।

আমি তখন হাসবো নাকি কাদবো সেই কোনো রকমে ওখান থেকে চুপ করে চলে আসি।

সেদিন বাড়ি এসে আমার আর কোনো কাজ করা হয়নি জানো।

শুধু তোমাকে ভেবে সময় গুলো পেরিয়ে গিয়েছিল।

আমি বুঝতে পারছিলাম তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি, কিন্তু কৌতুহল ছিল যে আমাদের কথা নেই সম্পর্কের কোনো অস্তিত্ব নেই হয়তো চিনি না দুজন দুজন কে তাহলে এরকম কি করে আমার হচ্ছে!! কিন্তু তাৎক্ষণিক এই যুক্তি গুলো জোয়ারের জলে ধুয়ে চলে যেতো।

তুমি দ্বাদশ শ্রেণি তে যখন পা দিলে তোমার মা আমাদের বাড়িতে এসেছে।

নিচের তলার একটা ঘরে আমার মা এর সাথে কথা বলছে, আমি বুঝতে পেরেছি, ভেবেছিলাম তুমিও হয়তো এসেছো, আমি সেই সেজে গুজে নিচে আসি।

দেখি তুমি নেই,

মা বললো কি রে বাড়ি তে এত ফিট হয়ে আছিস?

আমি তাড়াতাড়ি বললাম যে এই তো একটু বেড়চ্ছি,

আর বেরোতে যাবো সেই তুমি – মা মা করে হাজির,

উফ! সেই কি অবস্থা, আমায় বাধ্য হয়ে বেরিয়ে যেতে হল আর তোমার সাথে থাকা হলো না।

তখন পারার চা এর দোকানে গিয়ে বসে ছিলাম আর সদ্য প্রকাশিত গান ‘’ এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনে’’ গান টা রেডিও তে বেজে চলেছে, আমি যেনো কল্পনার জল্পনা তে উত্তম সুচিত্রা হয়ে ভেসে চলেছি।

(হা হা হা কি সেই দিন ছিল)

           সেদিন বাড়ি ফিরে এসেই কি দুর্দান্ত খবর!

মা এর মুখে খবর পেলাম তোমার মা নাকি বলে গিয়েছেন তুমি পরশু থেকে আমার কাছে অঙ্ক দেখতে আসবে।

সেই মনের ভেতর কি যে খুশি, মা কে দেখাতে পারবো না।

প্রকাশিত হয়ে গেলে ভীষণ বিপদ তাই গুরু গম্ভীর ভাব বাজায় রেখে আমি উপরে চলে এলাম। আর রুমে ঢুকে আমি নেচে উঠেছিলাম। সেই দিন টা আজ ও মনে আনন্দ এনে দেই।

তুমি প্রথম দিন যখন পড়তে এলে,

আমি নিজেকে আদর্শ শিক্ষক রূপে প্রকাশ করার হাজার চেষ্টা নিয়ে বসে আছি কিন্তু শুধুই দাঁত গুলো হাসির সাথে বেরিয়ে আসছে, আরে মনের মধ্যে তখন হাজার আনন্দ যে, আর তুমি আমাকে দেখে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে উঠলে আচ্ছা দাদা তুমি হাসছো কেনো?

আমার মনের ভিতরে কেমন যেনো হঠাৎ করে ধাক্কা লেগে গেলো,

আমি বলে উঠলাম, ইয়ে মানে! কি দাদা কেনো?

তুমি বললে আরে তুমি তো কত বড় আমার থেকে,

তখন তো আমি বলতে পারছি না!

আরে তোমায় আমি উফ! কি করে বোঝাবো!!

অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে বললাম না দাদা নয়, তুমি স্যার বলবে,

তুমি বললে বেস স্যার।

বাবা তখন যেনো বিপদ কাটলো আমার।

তোমার খোলা চুল, তোমার মন দিয়ে অঙ্ক করা, তোমার আমাকে প্রশ্ন করা, এই যান্ত্রিক অঙ্কের মন টা কে যেনো সাহিত্যিক করে তুলেছিল।

একটা চিঠি লিখতে খুব চেষ্টা করেছিলাম আমি, কিন্তু কোনো মতে পেরে উঠিনি।

তাই আর লেখা কিংবা দেওয়া কিছুই হয়ে ওঠে নি।

তুমি সপ্তাহে চার দিন বিকাল দিকে আসতে আর আমি সকাল থেকে তোমার সামনে কেমন করে থাকবো, কি বলবো এই সব ভেবে যেতাম।

তারপরে তুমি যখন আসতে আমি তো ব্যাস সব ভুলে যেতাম।

কি দিন গিয়েছে বলো?

পুজোর সময় টা মনে আছে?

অবশেষে আমি তোমায় বলেছিলাম এই মণি পুজোর সময়ে তোমার কি প্ল্যান থাকে ?

আর তোমার উত্তর টা মনে আছে কি দিয়েছিলে!

কেনো স্যার আপনি কি যাবেন আমার সাথে!

আমি তো তখন ছটফট করে উঠেছিলাম হ্যাঁ বলার জন্য কিন্তু কই আর বলতে পেরেছিলাম বলো!

বলা হয় নি।

তবে তুমি হয়তো চোখের ভাষা বুঝতে সক্ষম ছিলে,

তাই পুজোর আগে যে সোমবার পড়তে এসেছিলে

আমায় বলে দিলে স্যার সপ্তমী তে আমি মণ্ডপে থাকি ।

আমার বুঝতে সময় লেগেছিল কিন্তু বুঝেছিলাম অবশেষে যে তুমি বলে দিলি একটা সাক্ষাত এর কথা।

সেদিন তুমি একটা হালকা হলুদ রঙের চুরিদার পড়েছিলে,

তুমি নিজেই আমাকে প্রথম সেদিন এই যে শুনছেন বলে ডেকে ছিলে।

আমার তখন মনের মধ্যে কালবৈশাখ কিশোর কুমার এর গানের সাথে যেনো মেতে উঠেছিল।

কি সেই অনুভূতি আজ ও যেনো প্রকাশ করে উঠতে পারিনি আমি।

আমি যখন তোমায় বলেছিলাম যে এরকম করে কেনো? তখন বলেছিলে সবার কাছে পুজোর দিনে, দূরত্ব টা আমাদের কম হোক।

আমি তখন রবীন্দ্রনাথ এর গানে সুর মিলিয়ে যেনো কোনো এক নিস্তব্ধ দীপে নিজেকে নির্বাসিত পাচ্ছিলাম।

আমি সত্যি জেগে আছি তো? এটাই আমার প্রশ্ন ছিল নিজেকে।

পুজোর চার দিন, আমরা অল্প গল্প আর কথা দিয়ে বেস কাটিয়ে দিয়েছিলাম বলো?

তুমি নবমীর দিন আমাকে বললে – “আমি বুঝি স্যার

আপনি আমাকে কি রকম করে ভাবেন”, আমি সব বুঝি!

বিশ্বাস করো আমি তখন ভয় এ কুপকাত হয়ে গিয়েছিলম।

মনে হচ্ছিল এই রে ভালোবাসার আগেই স্বপ্ন ভাঙ্গা হয়ে গেলো আমার।

তবে তুমি নিজেই আমার ঘামতে থাকা মুখ দেখে বলে উঠলে এই না না চিন্তা করো না, পারলে প্রকাশ করবে।

সেই রাতে আমি বাড়ি ফিরে এসে অনেকটা কৌতুহল এ ছিলাম বুঝতে পারিনি তোমার প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্য।

তোমার সাথে আসতে আসতে আমি কথা বাড়িয়ে ছিলাম বলো!

বেস একটু একটু করে হাসতে হাসতে দুজন কে চিনে নিতে চেয়েছিলাম।

             . দাঁড়াও কখন থেকে ভাবুক হয়ে বলে যাচ্ছি এক চুমুক দি গ্লাস এ!

(চুমুক দিয়ে!)

আচ্ছা সরি রাগ করো না আজ শেষ আর কাল থেকে খাবো না তো!

তোমার মনে আছে সেই রাতের কথা , মানে যেদিন তোমায় প্রথম হাতে একটা চুমু দিয়েছিলাম, আর তুমি হাত ছাড়িয়ে চলে গিয়েছিলে সেই রাতের কথা বললাম।

মন খারাপ করো না জানি পরের টা ভালো না!

সেদিনের পরের দিন তোমার বাবা মারা যান, আমার কষ্ট লেগেছিল, তোমার পরিবার, তোমরা ভেঙে পড়েছিল। আমি তখন শিক্ষিত বেকার,আমি তোমাদের পাশে চেয়েও দাঁড়াতে পারি নি। তারপরে তোমার বিয়ে দেওয়া দরকার ছিল।

আর এক মাসের মাথায় তোমার বিয়ে পাকা হয়ে গিয়েছিল।

আমি তো শুনে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না, অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম, তোমাকে যে অপ্রকাশিত ভালবাসাতে আমি জড়িয়ে ফেলেছিলাম।

কি করে এই পরিস্থিতি আমি মেনে নিতাম বলো?

তোমাকে ভালোবাসি! সেটা আর বলা হবে না,

তোমার সাথে জীবনের পথ হাঁটা হবে না সেই কত কষ্টের কথা আমাকে মেরে দিচ্ছিল, কি বলি তোমায়।

তারপরে আমি অনেকদিন তোমার সাথে কথা বলতে ছাদে উঠি নি, যায় নি পারার পেছন মাঠে, একদিন তুমি আমার বাড়ি চলে এসেছিলে অঙ্কের শেষ অজুহাত নিয়ে,

তুমি আমার রুমে হঠাৎ চলে এসেছিলে, দেখেছিলে আমি মদ খাচ্ছি, তুমি হাত থেকে গ্লাস টা ফেলে দিয়েছিলে। আমাকে বলেছিলে এখন তোমার বয়স অল্প এইসব খেয়ে নিজেকে শেষ করে দিও না।

আমি সেদিন সব ভয় লজ্জা ফেলে তোমায় জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম ভালোবাসি তোমাকে মণি।

তুমি আমাকে ছেড়ে দিয়েছিলে সঙ্গে সঙ্গে আর বলেছিলে আমার ভালোবাসা তোমার হল না গো, আমার তো আজ স্বাধীন সত্তা নেই আজ আমি নির্বাক।

আমি সেদিন তোমার চোখে নিজের জন্য সব টুকু ভালোবাসা দেখে নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে ধন্য মনে করেছিলাম।

                 . হঠাৎ করে বাড়ির কলিং বেল টা বেজে উঠলো, সতীশ বাবু গ্লাস টা রেখে ছবির সামনে থেকে উঠে দরজা খুলতে গেলেন, দেখলেন ওনার ব্লাড টেস্ট রিপোর্ট টা এসেছে, রিপোর্ট এ কর্কট রোগ বিশেষ চোখ মেলে তাকিয়ে আছে সতীশ বাবুর দিকে।

উনি ঘরে ঢুকে টেবিলে রিপোর্ট রেখে চিৎকার করে ওঠে বললেন তখন তোমার বয়স অল্প ছিল কেন অপ্রকাশিত ভালোবাসার সন্মান রাখতে ছেড়ে চলে গেলে?

আজ তোমার বারণ রাখি নি বলেই দেখো দশ বছর পর অবশেষে তোমার কাছে যাওয়ার সুযোগ পেতে চলেছি।

এই দশটি বছর তোমায় ক্ষণিকের স্পর্শ নিয়ে আমি কাটিয়েছি, ভীতু তাই আত্মহত্যা করতে পারিনি তুমি কেনো সেদিন ফিরে যাওয়ার পরে আর আমার বুকে ফিরে আসো নি মণি !

(টেবিলে শব্দ করে)  কেন ? কেন ? কেন ?

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *