টুকিটাকি // ছোটবেলা – ৪  // বন্য মাধব

সুন্দরবনের এই আবাদ অঞ্চলে সাপের ভয় খুব। কেউটে, শাঁখামুটি, চিতি, কালাচ ইত্যাদি সাপের দেখা প্রায় মিলত। ওদের কামড় অনেকেই খেয়েছে। বাস্তু সাপ, সে যতই বিষাক্ত হোক, গৃহস্থের ক্ষতি করে না এমন একটা ধারণা চালু ছিল। মা মনসার পুজো এ এলাকায় বাড় বাড়ন্ত। বাস্তু সাপকে গৃহস্থ কখনও মারতো না।
বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব সবচেয়ে বেশি থাকত, খুব গরমের সময়ও। আর সাধারন জলঢোঁড়া, দাঁড়াস, মেটে গুড়গুড়ে বা লাউডগাকে প্রায়ই দেখা যেত। ডাকাবুকোরা এদের লেজ ধরে বাঁই বাঁই করে ঘুরিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিত। কিন্তু আমরা যখন আবাদ ছেড়ে এসেছি আমাদের আদি বাসস্থান শাঁকসরের ডিঙেভাঙায়, তখন আমাদের এক জ্যাঠতুতো বৌদি, ছোটবেলায় যাঁর অনেক আদর যত্ন পেয়েছি, তিনি সাপের কামড়ে মারা যান।
গবাদি পশুও সাপের কামড়ে মারা যেত। হাঁস মুরগীও বাদ যেত না। মাঝে মধ্যে সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনতাম আমাদের বা আশেপাশের কারো হাঁস মুরগী সাপে কেটে বা ভয়ে মরেছে। কেউ কেউ বদমায়েশি করে খড়ের দড়ি হাঁস মুরগীর ঘরে ঢুকিয়ে সাপের ভয় ধরাতো। এভাবে সফলও হতো তাদের মেরে ফেলতে। বাগদিপাড়া, বুনোপাড়ায় খবর যেত মরা প্রাণিগুলোকে নিয়ে যেতে। ওরা নিয়ে গিয়ে ওগুলোকে খেত।
সাপে কামড়ালে ওঝাদের ডাক পড়ত। তখন এত হাসপাতালও ছিল না। যাতায়াতের রাস্তাঘাটও ছিল না। বর্ষাকালে মাটির রাস্তাও গদে ভরে যেত। এঁটেল মাটির গদে পা আটকে যেত। মাঝে মাঝে রাস্তা ভেঙেও যেত। এগুলোকে আমরা ছেওড় বলতাম। হাঁটু জল থাকত সেখানে। বইয়ের ব্যাগ পিঠে, দু’ হাতে হাফ পেন্টুল আরো উপরে তুলে আমরা হি হি করতে করতে ছেওড় পেরোতাম। মাঝে মাঝে গদে বা ছেঁওড়ে পা হড়কে যে পড়তাম না তা নয়।
পড়লে সেও এক হাসির কান্ড হত। আর মামা ভাগিনার খালের উপর নড়বড়ে বাঁশের সরু সাঁকো পেরোনোও আমাদের কাছে বেশ ভয়ের ছিল। পা হড়কে জলেও মানুষ পড়ে যেত। এই খাল আর আমাদের পাড়ার গা লাগানো পাণিখালে বিদ্যাধরীর লোনা জল জোয়ারের সময় ঢোকানো হত। আবার বানের সময়ও নদীর জল চাপ কমাবার জন্যেও জল ঢোকানো হতো। দু’টি খালই প্রতিবছর মাছ চাষের জন্যে লিজে দেওয়া হতো। খালের মাছ পাহারা দেবার জন্যে নৌকো ছিল। সে নৌকোতে আমরা ম্যানেজ করে মাঝে মধ্যে চড়তাম।
(চলবে)
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: