টুকিটাকি // ছোটবেলা – ২০ // বন্য মাধব

আসি এবার পড়াশুনোয়। মোড়লরা পড়াশুনোয় কবে মন দিলো এ নিয়ে ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। আমাদের ঠাকমা দিবসবালা, যাঁকে একেবারে খুব হালকা মনে পড়ে, তিনি ছিলেন সাত গ্রামের রাজার মেয়ে! আমাদের চোদ্দ পুরুষের বাসস্থান ডিঙেভাঙার পাশের গ্রাম বকসর বা বাউসহর বা বাবুসহর ছিল ঠাকমার বাপের বাড়ি। গায়েন বা গানদের মেয়ে তিনি। আমি যেহেতু শেষ বয়সের সন্তান, আমার কপালে সেসব বোলবোলা দেখা সম্ভব হয় নি। তাঁর ম্যাট্রিক পাশ কোনো এক ভাই মোড়ল বংশকে মুখ্যু বংশ বলায় নাকি মোড়লদের আঁতে ঘা লাগে।
ঠাকুরদারা গ্রামে নিজেদের জমিতে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দুই ঠাকুরদার পাঁচ পাঁচ দশ ছেলের কেউই ম্যাট্রিকের গণ্ডি পেরোতে পারেন নি। ছোটকাকা, কানাইলাল ম্যাট্রিক পেরোবার মুখে গিয়েছিলেন। শুনেছি আমার বাবা ক্লাস টু পর্যন্ত পড়েছিলেন। কিন্তু বাবা কাকা বড় জেঠাকে দেখেছি বাংলাটা চর্চা করতে। আনন্দবাজার নিয়মিত আসতো, ছানি অপারেশনের পর বাবা চোখে হাই পাওয়ারের চশমা পরতেন, কাগজ বা বঙ্কিম, শরৎ রচনাবলি তাঁকে কেউ না কেউ পড়া শোনাতো।
আমার মা কোনদিনও স্কুলের চৌকাঠ মাড়ান নি। তিনি সাধবেড়ের ধনী নস্কর ফ্যামিলির মেয়ে। কিন্তু সেখানেও পড়াশুনোর সেই একই হাল। এগারো বছর বয়সে মোড়ল বংশে বউ হয়ে এসেছিলেন। বাবার সঙ্গে কোনদিনও তাঁর ঝগড়া হতে দেখি নি। দশ সন্তানের জননীকে সবাই বলতো রত্নগর্ভা। ছেলেদের নিয়ে তাঁর চিন্তার, মানতের আর গর্বের শেষ ছিল না। বাড়িতে রাশভারী বাবার ছিল কড়া শাসন। ছেলেদের পড়াশোনায় কোনোরকম ব্যাঘাত, হেলা তিনি সহ্য করতেন না। একটু হেলা দেখলেই বলতেন, পড়াশোনা ভাল না লাগলে বাঁকা মুঠে ধর, অর্থাৎ চাষ করে খাও, পড়াশোনা তোমার লাইন না। 
(চলবে)
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *