কেন  কার জন্য কি লেখা

রণেশ রায়

১০/১২/২০১৮

আমাকে আমার লেখালেখি নিয়ে কিছু লিখতে বলেছেন। কবে থেকে লিখি কেন লিখি, লেখালেখির জন্য বিশেষ তালিম নেওয়ার দরকার আছে কিনা, লেখার প্রেরণা কি, লেখার জন্য পড়াশুনো করতে হয় কি না ইত্যাদি। বিষয়গুলো নিয়ে আমিও ভাবি। তবে সব কটা প্রশ্নের যথার্থ উত্তর আমিও পাই না। তবে আমি বিষয়গুলো যেভাবে ভাবি তা লিখছি। প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছি। কবিতা লেখা নিয়েই আমার এই প্রতিবেদন।

.

আমি কবিতা লেখা শুরু করি বছর ছয়েক আগে। জীবনে একটা অঘটন ঘটে যাওয়ায় তার ঋণাত্বক সম্ভাব্য প্রভাবের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য আমি কবিতা লেখা শুরু করি। অর্থাৎ একটা ঋণাত্বক বিষয়কে ধনাত্বকে পরিণত করার একটা প্রচেষ্টা এটা। এটা আমার জীবনের বিশ্বাসের অঙ্গ যা নিয়ে আমি বেঁচে থাকায় বিশ্বাস করি।

এতেই আনন্দের সঙ্গে ভবিষ্যতের আশা নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব বলে আমি মনে করি। সেই অর্থে আমার কবিতা লেখাটা সমাজ আন্দোলনের অঙ্গ বলে আমি মনে করি। লেখার জন্য লেখায় আমি বিশ্বাস করি না।

জীবনের চিন্তা ভাবনার প্রতিফলন ঘটা উচিত লেখায় বলে  মনে কর। দুরূহ বিমূর্ত লেখায় আমি বিশ্বাস করি না। আমার বক্তব্যের সমর্থনে জীবনে যেটা ঘটেছে তা ছোট করে বলে নিই যেন এর থেকে কেউ উৎসাহিত হতে পারে, তার সাহায্যে আমার অভিজ্ঞতা কাজে লাগে।

২০১২ সালে আমি কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়। আমার জিভ অপারেশন হয়। সারাজীবন জিভের সাহায্যে বকে জীবিকা অর্জন করেছি, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কাটিয়েছি। আমার আশঙ্কা হয় আমি হয়তো আর স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারব না। প্রশ্ন জাগে তবে কি ভাবে বাকি জীবন কাটাব?

এই আশঙ্কা থেকে মুক্ত হবার জন্য আমি কবিতা লেখা শুরু করি। আমার উদ্দেশ্য এই লেখার দৌলতে অর্জিত হয় বলে মনে হয়। মনোবল ফিরে পাই। আংশিকভাবে হলেও আমি স্বভাবিক জীবন ফিরে পাই।

আমি বহুদিন ধরে কাগজপত্রে সেমিনারে প্রবন্ধ লিখি। আমার প্রবন্ধের মূল বিষয় সমাজ আন্দোলন। কবিতা লেখা আমার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা। কবিতার ব্যাকরণ আমার জানা নেই। লেখার জন্য কোন তালিম নিই নি। অবশ্য তালিম নেওয়া দরকার নেই তা বলব না। তবে কবিতা মানুষের একটা মনের ভাবগত বিষয়।

বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পড়াশুনা না জানা গ্রামের নিরক্ষকর মানুষ কি অসাধারন কবিতা ছড়া মুখে মুখে বলে যায় সেটা আমরা জানি। তারা লিখতে পড়তেও জানে না। সুতরাং তালিম নেওয়াটা আজ শহুরে শিক্ষিত কবিদের দরকার হলেও স্বভাব কবিদের ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য নয়।

আর আমি কবিতার নিদৃষ্ট ব্যাকরণে বিশ্বাস কর না। জীবনটাই ছন্দময়, লয়  গতিতে ভরপুর। নিজের মননে কবিগুন থাকলে সেটা কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। আধুনিক কবিতার বিমূর্ত রূপে আমি বিশ্বাস করি না। সেটা শুধু কবির আত্মসন্তুষ্ট ঘটায়। সমাজের প্রয়োজন মেটায় না।

দুরুহের জাল বোনে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার ধরন বদলায়। তা যদি সঞ্চিত বাস্তব অভিজ্ঞতাকে রূপ দিতে পারে তবে নি:সন্দেহে কবিতা অসাধারণ হয়ে ওঠে। ছন্দময় হয়ে ওঠে গদ্যের আকারে তার প্রকাশ ঘটলেও। তবে যে কবি যে যুগে বাস করে তার বাস্তব রূপায়ন ঘটে তার কবিতায়।

সেই অর্থে যুগের প্রেক্ষাপটে নিজের যুগের আধুনিক কবি সবাই। কৃত্রিম ভাবে আধুনিক আর সাবেকি কবিতায় কবিতাকে ভাগ করার দরকার হয় না। কবিতা মানুষের জন্য লেখা দরকার। সে যেন ভবিষ্যৎকে আমরা যেভাবে অবলোকন করি তার ছবি আঁকতে পারে। আমার কবিতা কেন কার জন্য তার প্রেরণা কি তা আমি উপস্থাপিত করছি আমার একটা কবিতায়:

আসে যায় আমার

ওরা বলে কি লিখছো আবার

কি আছে তোমার কবিতায়

কে পড়বে কবিতা তোমার

যে পড়বে সে হাসবে এ লেখায়।

আমি বলি আমি লিখি আমার ভাবনায়

আমার মনন ভাবনা খুঁজে বেড়ায়

ভাবনা মেলে মননে আমার কবিতায়।

কেউ যদি হাসে হাসুক না

যদি না পড়ে কি আসে যায় কার!

কিন্তু যদি না লিখি আসে যায় আমার

আমার মনন মরে যায়

ভাবনা আর তাকে খুঁজে পায় না

আমি হারাই মনন আমার

আমায় ছেড়ে পালায় আমার ভাবনা

আমার সময় কাটে না আর

আমি মরি অজানা এক বেদনায়

মরেও বেঁচে থাকা আমার।

আমি মনে করি না কবি তার কবিতার মূল্যায়ন চায় না সে নেহাৎ তার খেয়াল চরিতার্থ করতে কবিতা লিখে। বরং আমি মনে করি নিজের কাজের জন্য সবাই প্রশংসা আশা করে। পাঠকের কাছে সেটা পেলে তার লেখা অনুপ্রাণিত হয়। তা না হলে কবি ও তার সঙ্গে তার কবিতাকে সন্যাস

নিতে হয়:

এস বাঁচি

প্রিয়তমেষু,  কেমন আছ?

শরীর মন ঠিক আছে তো!  

পাঠানো উপহারটা পেয়েছো  নিশ্চয়,

বাহক তো সেটাই জানালো,  

তোমার দিক থেকে সাড়া নেই কোন

তাই ধরে নিতে পারি  তুমি পড় নি এখনও,

আর   পড়বেই বা কেন ?

এখন বিশেষ কেউ কবিতা পড়ে না,

লোগো সহ ব্র্যান্ডেড  না হলে

পড়ার  প্রশ্নই  ওঠে না !

আমার লোগো নেই,

আমি ব্র্যান্ডেডও নই ;

হায় রে কবি কত না আশা

বৃথা তোমার উচ্চাশা !

স্বীকার করতে আপত্তি নেই আর,

কবি হল হ্যাংলা আর ক্ষুধার্ত  

পাঠকই তার ক্ষুধা   মেটায়,

আহারের ব্যবস্থা করে ,

পাঠকের  শংসাই তার আহার,

তা নইলে তাকে উপোসে  থাকতে হয়

উপোসে থাকতে থাকতে

ক্ষিধেটাই  মরে যায়।

উৎসাহে ভাটা পড়ে,

লেখা আসে না কলমে।

আরে, আমি ধরে নিয়েছি তুমি পড় নি !

আমি কেমন মূর্খ,

বিকল্পটা  ভাবতে পারি না,

মূর্খ না, আসলে  এটা আমার অহং,

ভাবি, যা লিখি ভালো লিখি

প্রশংসাটা আমার প্রাপ্য,

কেউ পড়লেই  মনের দরজা খোলে

আমার ঘরে পৌঁছে যায় ।

এমন তো হতে পারে তুমি পড়েছো

কিন্তু তোমার খিদে  মেটে নি,

ভালো লাগে নি,

ভালো লাগাটাই  যে পাঠকের আহার ,

সেটার যোগান দিতে পারি নি

তাই তুমি সংকোচে  সাড়া দাও নি,

তুমিও উপোসে,

উপোসে থাকতে থাকতে !

তোমার ক্ষিধেও  মরে যাবে,

পাঠকের অপমৃত্যু  সঙ্গে কবিরও

বরং এটাই ভালো  

তোলা থাক কবির  লেখা,

হাতে হাত ধরি  

এসো দুজনেই  বাঁচি

পাশা পাশি  বসে গল্প করি।

আর গিন্নির মত পাঠক পেলে মনের অবস্থা কেমন হয়?

গিন্নি

গিন্নি বলে গলা তুলে,

ও মরন! কি লেখো অত?

কাজ নেই কম্ম নেই সারাদিন বসে

ছাই পাশ যত,

তার চেয়ে ভালো একটু ঘুরে এসো

শরীরটা থাকবে ভালো,

শরীর ভালো থাকলে ভালো থাকে মন।

আমি বলি,

বসো এসে ঘর করে আলো,

এ যে প্রেমের উপাখ্যান

জীবনের জয় গান,

ছন্দ সুর লয়ে

কবিতার প্রচ্ছদে

আমার জীবন প্রাঙ্গণ,

একাকিত্বের অবসানে

কবিতা আমার

বহুত্বের সন্ধানে

ছবি আঁকে জীবনের

কথা বলে ক্ষুরধার।

না লিখলে ভাল থাকে না মন

আজের এই দিনান্তে শরীরের ক্ষয়

সে তো জানে সর্বজন

তাই মন কর জয়

মন না থাকলে ভাল

শরীর থাকে কেমন!

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: