কাকের প্রতিবাদ সভা

যাকারিয়া আহমদ

ভোর বিহান। আজন্ম ঘুম ভাঙে ঘুঘু আর দু’চারটা কাকের হাঁক-ডাক শোনে। কিন্তু আজ ঘুম ভাঙলো শত শত কাকের বিষাদমাখা হাঁকে। তড়িগড়ি করে বের হলাম ঘর থেকে। বের হয়ে দেখি অদূরে ক্ষেতের আলের বাঁশ ঝাড়ে তারা দরাজগলায় চিৎকার করছে।

ভাবলাম হয়তো কারও গরু, ছাগল মরেছে যা খেতে অন্য কাকদের ডাকছে। বা তাদের ধর্মানুযায়ী কোনো কাকের সাহায্যার্থে এসেছে। এদের একটা গুণ আছে এরা কেউ বিপদে পড়ে চিৎকার করলে আশ পাশের সব কাক সাহায্য করতে জড়ো হয়।

যে গুণ অন্য কোনো প্রাণীদের মাঝে নেই এবং সেরা জীব মানুষের মাঝেও আজ নেই বললেই চলে। নেই যে এর প্রমাণ আমার অবশ্য দিতে হবে না। কারণ পৃথিবীর সর্বত্র আজ জনসম্মুখে খুন করা হচ্ছে নিরীহ মানুষকে। আমরা নিজের প্রাণ বাঁচাতে কোনো কথা বলছি না। বরং শুধু চোখ ভরে দেখছি। মর্মাহত না হয়ে হাসছি। যাক গে এসব নীতিকথা। আসি কাকের কথায়।

তারা শুধু কা কা-ই করছে। আমি আবার ঘুমিয়ে গেলাম। ফের জাগলাম দশটার একটু আগে। তখনও কাক ডাকাডাকি করছে। একগ্লাস ভুষিজল খেতে খেতে শুনলাম ঘরের পাশে রাস্তা দিয়ে দু’জন যেতে যেতে বলছে “রহিমের লাশ ওই ধান ক্ষেতে কে বা কারা রেখে গেছে। হারামির বেটারা এমন ছেলের সঙ্গে এ আচরণ মোটেই ঠিক করে নি।”

এদের কথা শুনে অজান্তে চোখ ঝরে দু’ফুটো জল মাটিতে পড়লো। সব ভাবাভাবি ছেড়ে বেরুলাম রহিমকে দেখতে। যেতে যেতে রহিমের কতস্মৃতি ভাসলো চোখের সামনে। গিয়ে দেখি কাকের চেয়ে মানুষ বেশি। রহিমের মুখটা বাইরে। পুরো শরীর বস্তার ভেতরে। কেউ নাড়ছে না। মা-বাবা লাশের ধারে ধুঁকে ধুঁকে কাদছে। রহিমই তাদের একমাত্র সন্তান। মেম্বার চেয়ারম্যানকে খবর দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এলে নাকি পুলিস খবর দেবেন।

রহিম আবুলের একমাত্র সন্তান। তাকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন। মানুষের মতো মানুষ করবার জন্য তাকে লেখা-পড়া করাচ্ছে দিনমজুর হয়েও। এইবার রহিম আই এ ফাস করেছে। বি এ তে পড়বে আগামী সনে। গরিবের সন্তান হলে রাজনীতি করতে পারবে না এমন তো কোনো কথা নেই। কিন্তু সে জানতো না যে এই রাজনীতি তার প্রাণ অজান্তে ধারালো অস্ত্রের নিচে দিতে হবে।

গত কয়দিন থেকে ভার্সিটিতে দু’দলের ক্ষমতা প্রয়োগ নিয়ে তুমুল আন্দোলন চলছে। হাতাহাতি রোজ রোজ হচ্ছে। এতে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী উদ্বিগ্ন। কখন কী ঘটে। কেউ কেউ বাড়িতে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি শান্ত হলে ফিরবে। রাজনীতির খাতিরে রহিমও একটি দলে। তবে কারও সঙ্গে কথা কাটাকাটি বা ঝগড়াতে যাচ্ছে না। এসব দেখে রহিমও বাড়ি চলে এলো। বাড়ি এসেও রক্ষা পেল না সে।

পৃথক ঘরে রহিম থাকে। রাতেরবেলা দু’জন অপরিচিত লোক এসে বাড়ির বাইরে যেতে বললো। রহিম বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি খেয়াল না করে তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে যেতে তাদের সঙ্গে চললো। বাড়ির বাইরে বেরুলেই গামছা দিয়ে তার মুখ বেধে দেওয়া হলো। যাতে সে কথা বলতে পারে না।

তার মা-বাবা জানে না। ভোরে রহিমের বাবা ডাকলেন। কোনো নড়া নেই। আবুল চলে গেলেন মসজিতে। আবুল নামাযি মানুষ। মা ও ডাকলেন। কোনো সাড়াশব্দ নেই। দরজায় ধাক্কা দিলে সহজে খোলে যায় দরজা। ভেতরে গেলে খালি বিছানা। ভাবলেন হয়তো বাবার আগে ওঠে নামাযে চলেগেছে। ভাববে না কেন? বাপ দিয়ে বেটা। বাপের মতো রহিমও পাঁচওয়াক্তের নামাযি ছেলে।

সূর্য পূর্বাকাশ আলোকিত করে ওঠছে। সময় বাড়ছে। বাপ মায়ের সকল ভাবনা বেঁধ করে সকাল দশটা। আসছে না রহিম। স্বজনদের বাড়িঘরে খবরগিরি করা হলো। কিন্তু কোনো খোঁজ মিলল না। দিন গেল। রাত গড়ালো। রহিমের মা বাবার চোখের জলে মুসল্লা ভিজছে। তারা জানতেন না তাদের সহজ-সরল এই ছেলে নিখোঁজ হয়ে যাবে। ছেলের চিন্তায় চোখে ঘুম নেই, মুখে খাবার ওঠছে না। এভাবে চলে গেল পাঁচদিন।

গ্রামের এক মুসল্লি ফজরের নামায পড়ে আসার সময় বেশ কাকের ওড়াউড়ি দেখে ওই ধান ক্ষেতের পাশে গেলেন। বস্তায় মোড়ানো কী যে একটা জিনিস ফেলা, আর এই জিনিসের ওপরেই কাকের ওড়াওড়ি। কাছে গেলেন। দেখলেন বস্তার বাইরে একজন মানুষের মুখ। কিন্তু পরিচয় করতে পারলেন না।

তবে ভয়ে একটা আওয়াজ করলেন। চিৎকারে জাবেদ নামের আরেকজন মুসল্লি এলেন। তিনি দেখে পরিচয় করতে পারলেন। এতো নিখোঁজ হওয়া রহিমের লাশ। তারা উভয়ে চলেগেলেন আবুলের বাড়িতে। গিয়ে আবুলের কাছে ঘটনা বলতেই আবুল হাউমাউ করে কাদতে কাদতে ছোটলেন তাদের সঙ্গে। পেছনে পেছনে ছোটলেন রহিমের মা ও।

খবর পেয়ে পুলিস সরেজমিন উপস্থিত। পুসম্যাডেমে নিয়ে গেলেন। আত্মীরা তার মা বাবাকে ধরে ধরে কাড়িতে পৌঁছালেন। উপস্থিত লোকেরা চলে গেল। সারা গ্রামে একই মাত “এমন ছেলের সঙ্গে এমন আচরণ কে করলো?” কিন্তু বাঁশ ঝাড়ের কাকগুলোর গেল না। এরা কা কা করতেই রইল। পাশের ঘরের একজন মহিলা কাকের কা কা করার কারণটা বর্ণনা করলো।

বললো–রহিম ছুটিতে বাড়ি এলে তাদের আম গাছে থাকা দু’টি কাককে ভিন্নজাতের খাবার দিত। রহিম তাদেরকে ডাকলে তারা সাড়া দিত। নিচে নেমে এসে খাবার খেত। এরা আজ আম গাছে নেই। হয়তো এরাই আজ অসহায়ের পক্ষে প্রতিবাদ সভা ডেকেছে।

এই কাকদু’টির ডাকে মনে হয় এতো কাকের জামায়েত এবং স্ব স্ব ভাষায় জালিমকে তিরষ্কার করছে। কেন তোমরা এই সরল মানুষটাকে এভাবে হত্যা করলে? না জানি এমন আরও কত প্রশ্ন ছোড়ছে অবুঝ প্রাণী কাক আমাদের কাছে !

১৬ ডিসেম্বর ১৮ //  লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।  হাটগ্রাম, গোয়াইনঘাট, সিলেট।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *