কবিশেখর-রচনাবলীর নিবিড় পাঠ – সুকুমার রুজ

( লেখক পরিচয়  :  প্রথিতযশা , কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক , ‘আলো’ সাহিত্যপত্রিকা , কলকাতা )

ইংরাজি সাহিত্যর কবি ড্রাইডেন নিজের লেখালিখি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এক জায়গায় যা বলেছেন, তার বাংলা অনুবাদ মােটামুটি এরকম – আমার মনে এত দ্রুতগতিতে বিভিন্ন ভাবের উদয় হয় যে আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি, সে ভাবগুলিকে ছন্দে রূপ দেব, নাকি ছন্দোবদ্ধ গদ্যে গেঁথে তুলব।’

কবিশেখর কালিদাস রায়ও মাঝেসাঝে এমন দ্বিধাগ্রস্ত হতেন নিশ্চয়ই। কেননা, তার এমন কিছু কবিতা আছে, যা গদ্যে লিখলে বেশি ভালাে হত; অথচ তিনি তা কবিতায় ধারণ করেছেন। আবার গদ্যে তিনি এমন কিছু বিষয় ধরেছেন, যা কাব্যে প্রকাশ করা মানানসই ছিল। এর একটাই কারণ – গদ্যে এবং পদ্যে ছিল তার সমান পারদর্শিতা ।

কবিশেখর তার ছিয়াশি বছরের দীর্ঘ জীবনে নানা বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণ, রচনা, অভিধান, উপপাঠ্য গল্পবই – এ সমস্ত বাদ দিয়েও তার কাব্যগ্রন্থ, অনুবাদগ্রন্থ, সমালােচনাগ্রন্থ, শিশুকিশাের-পাঠ্যবই প্রায় একশােখানি। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর গ্রন্থ থাকলেও তাঁকে শুধুমাত্র রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের একজন বিশিষ্ট কবি হিসেবে বরণ ও স্মরণ করা হয়। এটা তার প্রতি কিছুটা অবিচার বলেই মনে হয়।

তাঁর রচনাকে বিষয়ভিত্তিক বিভাজন করতে গেলে নানা বিষয় উঠে আসে। বৈষ্ণবীয় ভাবানুষঙ্গ, ভারতীয় পুরাপ্রসঙ্গ যেমন পাওয়া যায়, তেমনই পাওয়া যায় বাংলার গ্রাম ও গ্রাম্য সমাজ-জীবন এবং প্রকৃতি। তাঁর সাহিত্যকৃতিতে প্রেম-বিষয়ক রচনা যেমন অজস্র, তেমনই রঙ্গব্যঙ্গ ও তির্যক রচনাও যথেষ্ট। তাঁর রচনায় ইতিহাস-চেতনা ও মনীষী-বন্দনা যেমন বহুল পরিমাণে রয়েছে, তেমনই দার্শনিকতাও লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া গীতরচনা, শিশুতােষ রচনা, অনুবাদ এবং সমালােচনা সাহিত্যও রয়েছে। কবিশেখরের সৃষ্টিতালিকায়।

কবি কালিদাস রায়-এর কাব্যরাজি বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নানা বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের কবিতা তিনি রচনা করেছেন। ‘আহরণ’ এবং আহরণী’ কাব্যগ্রন্থ দু’টিতে সংকলিত কবিতাগুলিকেই প্রাচীন ভারতবর্ষ ও প্রাচীন বঙ্গ-বিষয়ক’, ‘ব্রজের পথে ও প্রেমের স্বপ্ন-বিষয়ক’, ‘পল্লীপথে ও গার্হস্থ্য জীবন-বিষয়ক’, ‘পুষ্পকুঞ্জ ও ঝরা ফুলের সাজি-বিষয়ক’, ‘ঋতুরঙ্গ ও বেলাশেষে-বিষয়ক’ ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এছাড়া তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ-বিধৃত কবিতাগুলিকে সূক্তিমূলক, রূপকাত্মক, প্রতীকাত্মক ও শিশুতােষ কবিতা ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়।

বিভিন্ন আলােচনাসভায় কবিশেখরকে বৈষ্ণব কাব্যরসিক কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, কেননা তাঁর বহু কবিতায় পদাবলী সাহিত্যর প্রভাব যথেষ্ট। বৃন্দাবন লীলার দাস্য, বাৎসল্য ও মধুর রসকে তিনি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ও নতুন তাৎপর্যপূর্ণ ভাব

নিবিড়তায় সিক্ত করে পরিবেশন করেছেন, যা মধ্যযুগীয় ভাব ও রস-সর্বস্বতাকে অতিক্রম করে এক আদর্শ ও অভিজাত বৈষ্ণব ভাবাশ্রয়ী কবিতায় পরিণত হয়েছে। তিনি বৈষ্ণবীয় ব্যবহারিক দিকে না এগিয়ে বৈষ্ণব সাহিত্য ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনকে তাঁর কাব্যে ধরার চেষ্টা করেছেন, যাতে কবির একান্ত কাক্ষিত ব্রজভূমি আবার ‘ভক্তি-অশ্রু-সরােবরে প্রস্ফুটিত পদ্ম’ হয়ে ওঠে; ‘বঙ্গের ভূঙ্গ’ হয়ে তিনি সেখানে মাধুকরী করতে পারেন। কবির এই বৈষ্ণব-ভাবনা তার মনের কোনও আপাতক বা আকস্মিক বিষয় নয়। কবি  তাঁর যৌবনে বৃন্দাবন অন্ধকার’ কবিতায় মাথুর বেদনাকে বিধৃত করে বৈষ্ণব কাব্যরসিক | কবি’-পরিচিতির সূচনা করলেও, তিনি নিজেই বলেছেন –

‘অন্তরে ছিল না ভজি বচনে ছিল না অকৈতব ধন

অনুপ্রাসে বাগবিলাসে সুলভে করেছি তৃপ্ত তৃষিত শ্রবণ। ‘

 

তবুও সেই ‘নন্দপুরচন্দ্র’র স্পর্শেই যে তার ছন্দ’র শিকলটি একসময় সােনার   শিকলে পরিণত হয়েছে, তা তিনি স্বীকার করে লিখেছেন –

 

‘সারাটি জীবন তারে উপলে উপলে খুঁজি খ্যাপার মতন’ – নন্দপুরচন্দ্র

বৃন্দাবন অন্ধকার, অভিসার, মান, মানভঞ্জন, দোল, ঝুলন, ব্রজবেণু, 

চিরকিশাের, জন্মাষ্টমী, আবাহনী, সখার ডাক, সখার দাবী, গােষ্ঠলীলা, মথুরার দ্বারে,

পূর্বরাগ ইত্যাদি কবিতা কবিশেখরকে ‘বৈষ্ণব কাব্যরসিক কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

কবিশেখরের কাব্যে ‘ভারতীয় পুরাপ্রসঙ্গ অবশ্যই বিশিষ্টতার দাবি রাখে। মাইকেল মধুসূদন বাংলা কাব্যে এক নতুন জানলা খুলে দিয়েছিলেন- এ কথা অনস্বীকার্য। সেই জানলা দিয়ে বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্য’র প্রবেশ। পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত – এ | সবের বিভিন্ন চরিত্র নতুন ভাবনায় ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণে বাংলা কাব্যে প্রাথমিক স্থান করে নেয় মধুসূদনের কলমের মাধ্যমে। নবীনচন্দ্র সেন তাঁরই অনুসারী। ভারতীয় এই পুরাপ্রসঙ্গ বিহারীলাল চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলম ছুঁয়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতীন্দ্রমােহন বাগচীকে যুগানুগ স্বদেশ-ভাবনায় ভাবিত করে কবিশেখরকেও সিক্ত করেছে।

কালিদাস রায় তাঁর কাব্যে বৈদিক দেবতা থেকে শুরু করে গ্রামের মঙ্গলচণ্ডী অবধি সমস্ত দেবদেবীকে স্মরণ করেছেন। ঋক বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত ইত্যাদি থেকে কবিশেখর বহু চরিত্র নির্বাচন করে পাঠকের দরবারে পরিবেশন করেছেন। অন্য আঙ্গিকে। রামায়ণ ও মহাভারত থেকে কবি বেছে নিয়েছেন লক্ষ্মণ, ভীষ্ম, একলব্য, দুর্বাসা, নারদ, মেনকা, উর্বশী, তিলােত্তমা প্রমুখ চরিত্রকে। | রামানুজ, নারদ, মা মেনকা, তিলােত্তমা, গােপাল ইত্যাদি কবিতায় পৌরাণিক ও মহাকাব্যিক চরিত্র স্থান পেয়েছে। শিবরুদ্র’ কবিতায় কবি রুদ্র’র ভীষণদর্শন কায়ারূপে মঙ্গলময় শুভঙ্কর শিবের শঙ্কাহরণ মূর্তি প্রত্যক্ষ করেছেন। কবির দৃষ্টিভঙ্গিতে শঙ্কর কিন্তু তার দৈবী মহিমা জলাঞ্জলি দিয়ে সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছেন –

.. আমাদের মত ভুল কর দিনরাত/ তাই তােমা বলে ভােলানাথ

তােমারি মতন মােরা ক্ষুৎপীড়িত অন্নের কাঙাল/তােমারি মতন দন্ধ মােদের কপাল

শঙ্করের মধ্যে কবি এভাবে মানুষকে দেখেছেন –

চিরন্তন মানুষের রূপ হেরি মাঝারে তােমার’

আবার মঙ্গলকাব্যের ‘চাঁদ সদাগর’-এর পৌরুষ ও ‘বেহুলা’র সতীত্ব’র তেজকে  স্বীকৃতি দিয়ে শিবায়ন’-এর কৃষক শিবকে গোচারণের কাজে অতি সহজেই আহ্বান ভানিয়েছেন। এ হল এই দুঃখী দেবতার প্রতি তার অনুকম্পা।

কেননা, তিনি মনে করতেন, অনুকম্পা হ’ল ভক্তি-সাধনার অঙ্গ। তাই গ্রামের পথে যে মানুষটি সিদুরমাখা পাথুরে পুতুল কাঁধে ঝুলিয়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষার জন্য ঘােরে, নিতান্ত ভক্তিবশেই তাকে এক বা ভিখারী না ভেবে ধর্ম’র বাহক হিসেবে উন্নীত করেন।

‘ওগাে গৃহস্থ জাগাে মঙ্গলচণ্ডী এসেছে দ্বারে।

পূজা দাও তবে মঙ্গল হবে তােমাদের সংসারে।

কবিশেখর তার গাথাঞ্জলি’র গাখাগুলি রচনা করেছেন ভাগবত, মহাভারত, ভক্তমাল, বৌদ্ধ সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, তামিল সাহিত্য, মারাঠা সাহিত্য, পারসীয় ও আরবীয় সাহিত্য ইত্যাদির উপাখ্যান থেকে উপাদান নিয়ে। এরকম হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ, কোনও কবিই অতীত-বিচ্ছিন্ন হয়ে যুগান্তকারী হতে পারেন না। টি. এস. এলিয়টের কথায় – No poet, no artist of any art has his complete meaning alone. His significance, his appreciation is the appreciation of his relation to the dead poets and artists.’

কবিশেখরের মধ্যেও এই গুণাবলী লক্ষ্য করা যায়। কালিদাস রায়কে কেউ কেউ ‘গার্হস্থ্য জীবনের কবি’ বলে থাকেন। এ-কথাটিও যথার্থ বলে মনে হয়। কেননা, তার মনন ও যাপন ছিল গৃহগত জীবননিষ্ঠ। গ্রামবাংলার শাস্ত্রিক, নৈতিক, সামাজিক ও আদর্শগত রীতিনীতিকে তিনি তাঁর কাব্যে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। বাপ-পিতেমার ভিটে’, ‘পিণ্ডদান’, ‘শৈশব সঞ্চয়’, ‘কুড়ানী’, ‘বাংলার মেয়ে’, ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়’, ‘বঙ্গলক্ষ্মী’, ‘সােনার বাংলা’, ইত্যাদি বহু কবিতায় তিনি গার্হস্থ্য জীবনকে নিখুঁত ছন্দে ও মাত্রায় তুলে ধরেছেন। ‘বঙ্গলক্ষ্মী’ কবিতায় কবিশেখরের মমতা-মাখা আর্তি ফুটে ওঠে –

‘এস মা লক্ষ্মী ফিরিয়া আবার কাঙাল লক্ষ্মীছাড়ার ঘরে,

রান্নাঘরের কান্না থামাও, এস মা শূন্য ভাড়ারঘরে।

সন্তান তব ভিখ মের্গে খায়, অন্নের দায়ে চা-বাগানে যায়,

কাঠ পাতা কুটো গােবর কুড়ায় মাঠে জঙ্গলে পেটের তরে। ’

আবার, তাঁর শেষকথা’ কবিতায় পাই –

‘আমি বাঙ্গালীর কবি বাঙ্গালীর অন্তরের কথা

বাঙ্গালার আশ-তৃষা, স্মৃতি-স্বপ্ন, চিরন্তন ব্যথা

ছন্দে গেয়ে যাই আমি। অভ্রভেদী নহে তার তান

দেশ-দেশান্তর লাগি নহে কোন ক্ষীণকণ্ঠে গান।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথ যেভাবে দেখিয়েছেন, অন্য । কেউ সেভাবে দেখাননি। প্রকৃতি বিষয়ে এমন আত্মগত উপলব্ধিতে পৌছতে বাংলা ভাষার কবিদের অনেক সময় লেগেছে। ঈশ্বর গুপ্ত’র প্রকৃতি-বর্ণনায় প্রকৃতির শুধু বস্তুরূপ  দেখা গেছে। মধুসূদনের ‘ব্রজাঙ্গনা’য় শ্রীরাধার সহচরী প্রকৃতি। হেমচন্দ্র’য় এসে প্রকৃতি ও মানুষ ভাব-বিনিময় করেছে। প্রকৃতি বিষয়ে বিহারীলালের ছিল ভাব-তন্ময়তা। কিন্তু, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে অভিন্নসত্ত।

রবীন্দ্রনাথের নিসর্গ কবিতায় যেমন একটি ক্রমােনন্মষ লক্ষ্য করা যায়, রবীন্দ্রপরবর্তী কবি হিসেবে কালিদাস রায়ের কবিতায় কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতাে প্রকৃতির চিত্র, ভাব ও সঙ্গীত-এর মিলিত ত্রিধারা বা দার্শনিকতা লক্ষ্য করা যায় না। প্রকৃতির চিত্ররূপ আঁকাতেই যেন তার বেশি কৌতূহল। তাঁর প্রকৃতি-বিষয়ক কবিতায় ঋতুবর্ণনার বিপুলতা দেখে আমরা বিস্মিত হই। যেমন –

‘বাদল হয়েছে শেষ, ফড়িং উড়ে

ধােয়া ওঠে পাক দিয়ে দোচালা কুঁড়ে।

পাখীগুলি ঝাকে ঝাকে তরুশাখা থেকে ডাকে

প্রভাত হইল যেন দিন দুপুরে।

– বাদল শেষে

 

কিংবা,

 

‘শরতেরও আছে শােভা, তারাে আছে দান,

সিদ্যোজ্জ্বল রবিকরে চন্দ্রিকায় ধরা করে স্নান।

নদী-নীর হয় স্বচ্ছ ব্যোমে চলে হাসিকান্না খেলা,

শেফালি, কুমুদ, কাশ, কমলেরে কে করিবে হেলা ?

 

– শরতের সান্ত্বনা

 

কালিদাসের নিদাঘ, উজ্জয়িনীর নিদাঘ, নববর্ষের প্রার্থনা, বর্ষাবরণ, তরুর আতিথ্য, কাজরী, শরতের গান ইত্যাদি বহু কবিতায় কবিশেখর প্রকৃতিকে এঁকেছেন । কবির শৈশব কৈশাের কেটেছে গ্রামবাংলায়, তাই প্রকৃতি-বর্ণনায় গ্রামবাংলার ছবিই বেশি  ফুটে উঠেছে।

 

কবি, অথচ প্রেম-বিষয়ক কবিতা লিখবেন না – এমন কখনও হয় নাকি! প্রাচীন মহাকাব্য থেকে এ যুগের অ-কাব্য, না-কাব্যতেও প্রেমের ছড়াছড়ি। হর-গৌরীর  প্রেম, রাম-সীতার প্রেম, বিশেষত রাধা-কৃষ্ণ’র প্রেম এদেশে সর্বজনগ্রাহ্যতা ও মান্যতা  পেয়েছে। প্রাচীন ঋক বেদেও প্রেমের উল্লেখ আছে –

‘দিবস-রজনী শান্ত আমারে দীর্ঘ বরষ জীর্ণ করে,

প্রতি উষা হরে কায়ার কান্তি, আসুক পুরুষ নারীর তরে।

 

ঋকবেদ / অনুবাদ – সুশীলকুমার দে।

 

চর্যাপদ, মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্য,শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকাব্য থেকে শুরু করে উনিশ শতকের মধুসূদন, বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথ পার হয়ে প্রেমের ঢেউ কবিশেখর কালিদাসের কলমে যে লাগবেই, তাতে আর আশ্চর্য কী! তাই তাঁর কলম থেকে উৎসারিত হয় –

‘কেন এত প্রখর দহন

আসঙ্গ-তৃষ্ণার মাঝে? শ্বাসবায়ু উষ্ণ কেন লাগে ?

বিন্দু বিন্দু স্বেদজল ললাটে উরসে কেন জাগে ?

শত শত চুম্বনেও নাহি ঘুচে অধরের শােষ

রসহ্রদে ডুবিয়াও কেন নাহি লভে পরিতােষ

তৃষিত তরুণ হৃদি ?

– পঞ্চশর

‘ব্রজবেণু’ ও ‘ঋতুমঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থে কবি প্রেমকে বড়সড়ড়া জায়গা দিয়েছেন। পূর্বরাগ, পল্লীবালার ব্যথা, আহতা হরিণী, গাগরীডরণ ইত্যাদি বহু কবিতায় পূর্বরাগজর্জর হৃদয়ের নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। প্রেমের ধর্ম-অনুযায়ী নারী ও পুরুষ সমব্যথী হয়, এ ভাবনাকেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বিদেশী সাহিত্যে প্রেমকে নানা ভাবে দেখানাে হয়েছে। কবিশেখর সে বিষয়ে অবহিত ছিলেন। তাই তার ওপাড়ার রূপসী’ কবিতায় ইংরেজ কবি ক্রিস্টোফার মালো’র ‘The Passionate Shepherd to His Love’-এর ছায়া লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া, কবিশেখরের অন্যন্য কিছু কবিতায়ও বিদেশী কবিতার প্রভাব দেখা যায়। তবে, মােটেও তা অনুকরণ নয়। নিজস্ব ভাবনায় জারিত করে তিনি তা পরিবেশন করেছেন। তাঁর প্রেমনির্ভর একটি কবিতায় পাই –

‘প্রথম চুমায় যেদিন দোহায় খুলে গেল ত্রিদিবদুয়ার

কপােলতলে উঠল ফুটে পারিজাতের হিরণভাতি,

ভুলিনি হেম-সিংহাসনে মােদের প্রেমের বরণ-রাতি।

– বাসরস্মৃতি

ঈশ্বর গুপ্ত’র ‘এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা’ কথাটি যথার্থ। রঙ্গপ্রিয় বঙ্গজাতি সেই রামচন্দ্র’র আমল থেকে ভাড়-সঙ্গ করে আসছে। প্রাচীন ও মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যে বহু ভাঁড়ের সন্ধান পাওয়া যায়, যাদের কাজ ছিল ভাঁড়ামি অর্থাৎ রঙ্গব্যঙ্গ’র মধ্য দিয়ে হাস্যরস পরিবেশন করা। তবে, মধ্য যুগের ভাঁড়ামির বেশিরভাগই ছিল অপরিমার্জিত বা আদি রসাত্মক। কালীপ্রসন্ন সিংহ’র ‘হুতােম পেঁচার নকশা’, প্যারীচাদ মিত্র’র ‘আলালের ঘরের দুলাল কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত’র ব্যঙ্গ-কবিতাগুলিতে যথেষ্ট আবিলতা ছিল। মার্জিত রূপে প্রথম রঙ্গব্যঙ্গ পরিবেশন করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার ‘কমলাকান্তর দপ্তর’-এর মধ্য দিয়ে অনাবিল হাস্যরস এল বাঙালি পাঠকের কাছে। তারপর ‘পঞ্চানন্দ’ ছদ্মনামে ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভারত উদ্ধার কাব্য’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের হাসির গান’, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’র ‘হসন্তিকা’ ইত্যাদি এসে বাংলা সাহিত্যর ভাণ্ডারকে হাস্যরস, রঙ্গব্যঙ্গ ও শ্লেষাত্মক রচনায় পূর্ণ করেছিল। এসব রস পান করে বাঙালি পাঠককুল পেল ‘কপিঞ্জল’ ছদ্মনামে কুমুদরঞ্জন মল্লিক-এর ‘রসভাণ্ড’ এবং কবিশেখর কালিদাস রায়-এর ‘রসকদম্ব’।

‘রসকদম্ব কবিশেখরের যৌবনকালের রচনা। কিছুটা লঘু ব্যঙ্গ ও মৃদু রঙ্গ মেশানাে কবিতা। কিন্তু তার প্রৌঢ় বয়সের দন্তরুচিকৌমুদী’-তে সামাজিক জীবনের নানা রকম কাপট্য, ইতরামি, নীচতা ইত্যাদিকে সহানুভূতির সঙ্গে কটাক্ষ করেছেন কবি; বলা যায়, বিষাক্ত শরক্ষেপ না করে পুষ্পবাণেই জর্জরিত করেছেন। অভিমত’-এ লিখছেন তিনি –

… এদেশে কে বুঝবে বলাে  কর্জ করে বিলাত চলো

চেষ্টা করতে হবে ব্রাদার একটা নােবেল প্রাইজ পাবার।  

তুমিই এখন দেশের আশা, বগল বাজাক বঙ্গভাষা।

পরম ভাগ্য তােমার বাবার তস্য বাবার তস্য বাবার । …’

 

নির্ভেজাল কৌতুক-কবিতা রচনাতেও কবিশেখর ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাই তার অভিনব পরিকল্পনা হ’ল সুখাদ্য দিয়ে সুন্দরী নির্মাণ। ভােজনরসিকের মন মজে মােদকদুহিতা মিঠাইসুন্দরীতে, যার পান্তুয়া ঠোটে রস পিইবারে … রসনা উঠিছে গুঞ্জরি’। সে সুন্দরীর কী অপরূপ রূপ! ‘কালােজামে তার দু’চোখ গড়া চিবুক গড়া তালশাঁসে’। পরের নির্মিতি এমনতরাে –

 

‘… কিবা – জিভে-গজা জিভ সিভেরার নাক

শুকপাখী তাহে লাজ পায়

ফুলাে কচুরীতে গড়া কপােল তােমার

হাসিলে কেমন টোল খায়।

জিলিপির কানে মিহিদানা দুল

পুলীর আঙুল করে তুলতুল,

হাসাে তুমি কিবা এলাচ-দানার শাদা দাঁতগুলি বার করি।

– মিঠাইসুন্দরী

কল্পনার অভিনবত্বে অভূতপূর্ব রচনা; যা কালিদাস রায়ের বিশেষত্ব।

ইতিহাস-চেতনা ও মনীষী-বন্দনা কবিশেখরের কাব্যরচনার অনেকখানি জায়গা জুড়ে রয়েছে। ঐতিহাসিক বিশ কিছু নারী-পুরুষ তার কাব্যে স্থান করে নিয়েছেন। ‘আলেকজান্ডার’, ‘বন্দী শাজাহান’, মমতাজ’, ‘সিরাজ’, ‘মীরকাশেমের বিদায় ইত্যাদি বেশ কিছু কবিতায় তিনি বীর রস, করুণ রস, বাৎসল্য রস, দেশপ্রেম, পরাধীনতার কষ্ট ইত্যাদিকে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর কলম-নিঃসৃত হয়ে আমাদের পাঠগােচরে আসে

. জপি না খােদার নাম তসবিতে, খােদা মাের বাম –

সােনার বাংলার নাম জপিতেছি তাই অবিরাম।

– মীরকাশেমের বিদায়। ভারত-ইতিহাসের সমসাময়িক পর্ব থেকেও উপাদান সংগ্রহ করে কবিশেখর তাঁর কবিতায় জায়গা দিয়েছেন। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু-প্রমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেমন আছে আছে সেখানে, তেমনই আইজ্যাক নিউটন, উইলিয়াম কেরী, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, রাজা রামমােহন রায়, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবীনচন্দ্র সেন, রজনীকান্ত সেন-প্রমুখ প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বকেও । তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছেন। লাজাঞ্জলি’, ‘সন্ধ্যামণি, | ‘পূর্ণাহুতি’, ‘আহরণ’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে প্রকট হয়েছে তার ইতিহাস-চেতনা ও মনীষাবন্দনা। তাঁর কবিতায় পাই –

‘আপনার জন ভেবে তাই মাের আঙিনার কোলে তুলি

শিশিরসিক্ত  কুকুসুমগুলি

 

এক মুঠা শুধু তােমারে দিলাম, হাত দিয়ে পরশিলে

মধুর হাসিয়া শুভাশিস বরষিলে।

– রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে

কালিদাস রায়ের রচনায় যত-না ইংরাজি সাহিত্য’র প্রভাব আছে, তার চেয়ে বেশি মহাকবি কালিদাস তথা সংস্কৃত সাহিত্য’র প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তাঁর ঋতুমঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থটিতে সংস্কৃত সাহিত্য’র প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ঋতুলক্ষ্মী’ কবিতাটিকেই ধরা যাক। এর মােট আঠারােটি পঙক্তির আটটিকে বাদ দিলে, বাকি দশটি পঙক্তি ‘সাহিত্যদর্পণ’-এর ‘কবিপ্রসিদ্ধি’ ও ‘মেঘদূত’ থেকে নেওয়া হয়েছে। উজ্জয়িনীর নিদাঘ’ কবিতায় মহাকবি কালিদাসের ‘ঋতুসংহার’ কাব্য’র প্রভাব যথেষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদও লক্ষ্য করা যায়। যেমন, মূলরচনায় আছে –

‘নিতম্ববিষৈঃ সদুকূল মেখলৈঃ স্তনৈঃ সহাভরণৈঃ সচন্দনৈঃ।

শিরােরুহৈঃ স্নানকষায়-বাসিতৈঃ স্ত্রিয়াে নিদাঘৎ শময়ন্তি কামনাম  ।

আর, কবিশেখরের অনুবাদে পাই –

‘নিতম্বিনীরা শিথিল মেখলা স্বচ্ছ কোমল দুকূলে

মলয়জ-পরিমল-বলয়িত ভূজবল্লরী-মুকুলে,

হারমন্ডিত শান্তি-উরসে, স্নান সুশীতল অঙ্গপরশে,

কেশকলাপের ধূপসৌরভে চম্পা শিরীষ বকুলে। ’

তবে, এতে দোষের কিছু নেই। পূর্বসূরী কবির সৃষ্টিকে নতুন আঙ্গিকে পাঠকের কাছে পৌছে দেওয়াটাও কিন্তু উত্তরসূরী কবির কাজ। প্রাচীন দর্শনকে আরও সহজ করে পাঠকের কাছে নিবেদন করলে পাঠক সহজেই তার রস আস্বাদন করতে পারে। কালিদাস রায়ের রচনায় তাই অনেক গুরুগম্ভীর দর্শনকে সহজতর ভাষায় ও বাক্যবিন্যাসে পাওয়া যায়। দার্শনিকতা ছাড়া কোনও কবি-সাহিত্যিক কালজয়ী হতে পারেন না। প্রকৃত পাঠক / বিদগ্ধ পাঠক তার রচনায় অবশ্যই দার্শনিকতা খুঁজে পান।

তাই বলে, কবিশেখর যে শুধু বড়দের জন্যই লিখেছেন, এমনটা অবশ্যই নয়। শিশুতােষ ছড়া এবং শিশুকিশােরদের জন্য তাঁর অজস্র রচনা রয়েছে। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করার সুবাদে শিশুমনকে তিনি যত বুঝেছেন, ততখানি বােঝ অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। বিজ্ঞান দিয়েও শিশু মনস্তত্ত্বকে সেভাবে অনুধাবন করা যায় , যতখানি বােঝা যায় অভিজ্ঞতা দিয়ে। কবিশেখর তার অভিজ্ঞতা দিয়েই কিন্তু পৌছতে পেরেছেন শিশুমনের কাছে; এবং সেই শিশু-মনস্তত্ত্ব তিনি বিধৃত করেছেন তাঁর বহু রচনায়।

গাথাকাহিনী, তৃণদল, ভক্তের ভগবান, ছােটদের রামায়ণ, ছােটদের মহাভারত, কুরুরাজ, কথামালিকা, গল্পমালিকা, জাতকমলিকা ইত্যাদি প্রায় কুড়িখানি গ্রন্থ ছােটদের জন্য রচনা করেছেন কবিশেখর। এছাড়া, বাংলা বানান, শব্দতত্ত্ব ইত্যাদি পরিশীলিত করার জন্য তার সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘শাব্দিক শুধু ছােটদেরই নয়, সকলেরই পড়া উচিত; তাহলে লিখতে গেলে, বানান ভুল কম হবে। এ-প্রসঙ্গে কবিশেখরের সরস উক্তি – “…

‘ভুল’ বানান ভুল করা উচিত নয়। উচিত’ বানান ভুল করে ‘উচিৎ’ লেখা উচিত নয়।” সুতরাং, কবিশেখরকে শুধুমাত্র বড়দের কবি’র সীমায় বন্ধ করা কখনও উচিত নয়।

 কালিদাস রায় কবিশেখর’ উপাধিতে ভূষিত হলেও অনুবাদ সাহিত্য, সমালােচনা সাহিত্য ও গীত রচনাতেও তার অবদান অপরিসীম। মৌলিক সাহিত্য রচনার চেয়ে অনুবাদ সাহিত্য যথেষ্ট কঠিন কাজ। এ-প্রসঙ্গে একটি প্রচলিত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। স্বামী বিবেকানন্দ একটি গান গাইতেন- ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস, ওরে মন হবেই হবে …। সিস্টার নিবেদিতা নাকি এই গানটির অনুবাদ করতে বসে, সারা রাত জেগে অনেক কাগজ-কালি নষ্ট করে শেষমেশ হতাশ হয়ে বলেছিলেন ‘Translators are Traitors’।

যা-ই হােক, অনুবাদকরা বিশ্বাসহন্তা হােন বা না-ই হােন, অনুবাদ কাজটি যে সহজ নয়, এটা বােঝা যায় সিস্টার নিবেদিতার উপরােল্লিখিত মন্তব্য থেকে [সম্পাদকীয় সংযােজন: সহজ নয় এই জন্যই যে একজন প্রকৃত অনুবাদককে মূলত তিনটি বিষয়ে, অর্থাৎ (এক) উৎস ভাষা (Source Language); (দুই) উদ্দিষ্ট ভাষা (Target Language) এবং (তিন) বিষয়বস্তু (Subject Matter) সম্পর্কে প্রশ্নাতীতভাবে পারদর্শী হতে হয়, যা সব অনুবাদকের ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে না। প্রকৃত প্রস্তাবে, কখনও কোনও সাহিত্যকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করে মূল সাহিত্য’র প্রসাদগুণ ও বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তােলা যায় না। এটা আসলে ‘দুধের স্বাদ ঘােলে মেটানাে’র প্রচেষ্টা মাত্র। সে কাজটিও যথেষ্ট দুরূহ।

কবিশেখর সেই দুরূহ কাজটি করেছেন অবলীলায়। সংস্কৃত সাহিত্যভান্ডার থেকে ছ’খানি গ্রন্থ নির্বাচন করে সেগুলির অনুবাদ করেছেন তিনি। শ্রীমদ্ভাগবত গীতা, গীতগােবিন্দম্, অভিজ্ঞান শকুন্তলম, কুমারসম্ভবম্, মেঘদূতম্ ও রঘুবংশম্ – এই ছ’খানি গ্রন্থ’র চারখানিই মহাকবি কালিদাসের রচনা; একটি নাটক আর তিনটি কাব্য। এই অনুবাদ-কর্ম’র কারণেই হয়তাে কবিশেখরের কাব্যে কালিদাসের প্রভাব দারুণভাবে পড়েছে।

‘শ্রীমদ্ভাগবত গীতা’র অনুবাদ গীতা লহরী’ খুবই প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা। পাঠকের আকর্ষণ বাড়ানাের জন্য এতে তিনি ছন্দ-বৈচিত্র্যও এনেছেন। যেমন, পয়ারে লিখেছেন –

জনম মরণশীল দেহের মতন

তাই যদি ভাবাে এরে হে কুন্তীনন্দন

তবু তব শােক করা হয় না উচিত

কেন ? তাহা বলি শুন হয়ে অবহিত।

আবার, অন্যতর ছন্দে আর একটি অনুবাদাংশ –

‘কিরীট চক্র গদা তব করে/সব ঠায়ে হেরি ও রূপ তব,

দুর্নিরীক্ষ্য তেজঃসংঘাত/বহ্নি সূর্য সম প্রভ।

তুমি অব্যয় পরম বেদ্য/বিশ্ব-নিধান হে অক্ষর,

নিত্য ধর্মরক্ষক তুমি/তুমি সনাতন পুরুষবর।

‘গীতা লহরী’র তুলনায় ‘গীতগােবিন্দ’র অনুবাদে কবিশেখর সম্ভবত বেশি  মনােযােগী হয়েছেন; বেশি শ্রম ও সময় দিয়েছেন বলে মনে হয়। কেননা, মূল ‘গীতগােবিন্দম্’-এ কবি জয়দেব ব্যবহার করেছেন মন্দাক্রান্তা, শার্দূলবিক্রীড়িত, স্নগ্ধরা, পুষ্পিতাঘা, শিখরিণী ইত্যাদি ছন্দ। কবিশেখর কিন্তু শুধু গীতগুলির অনুবাদের ক্ষেত্রে জয়দেবকে কিছুটা অনুসরণ করেছেন। গীতা ছাড়া অন্য শ্লোকগুলির ক্ষেত্রে তিনি মূল ছন্দকে ব্যবহার করেননি। হয়তাে তার মুল লক্ষ্য ছিল, অনুবাদের ভাষা যেন প্রাঞ্জল ও সাবলীল হয়। অনুবাদে খুব গুরুগম্ভীর ধ্বনি-গাম্ভীর্য তিনি রাখতে চাননি। |

‘অভিজ্ঞানম্ শকন্তলম্-এর অনুবাদ হ’ল কাব্যে শকুন্তলা’। এটিকে কাব্য ও নাটকের মাঝামাঝি একটি রূপ দিয়েছেন কবিশেখর। ভাষা ও ছন্দ’র উপর যে তার প্রবল দখল ছিল, একথা বােঝা যায় এই অনুবাদটি পড়লেই। এটিকে একটি ভালাে কাব্য নাটকও বলা যেতে পারে।

বেশ কিছু ইংরাজি কবিতার অনুবাদও করেছেন কবিশেখর। লাজাঞ্জলি ও ‘ক্ষুদকুড়া’ কাব্যগ্রন্থে সেই অনুবাদগুলি রয়েছে। এমনকি তিনি ফারসি কবিতার ভাব অবলম্বন করেও কয়েকটি কবিতা লিখেছেন। যেমন, ‘ইউসুফের প্রতি জুলেখা’, ‘জুলেখা এবং এরকম আরও কয়েকটি কবিতা। কিন্তু তা পাঠকমনে তেমন ছাপ ফেলতে পারেনি।

কালিদাস রায়ের রচনার এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সমালােচনা সাহিত্য। প্রাচীন বঙ্গসাহিত্য’ নামের গ্রন্থটি তাে সম্পূর্ণ অন্য এক ধারার সাহিত্য। এই গ্রন্থমাধ্যমে প্রাচীন সাহিত্যকে কবি শিক্ষকের মতাে সুন্দর করে বুঝিয়ে বুঝিয়ে পাঠককে যেন হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যান। যেমন, আপাত-শুকননা আখকে মাড়াই কলে ফেলে রস বের করে পাত্রপূর্ণ করে রসভােজা’র সামনে ধরা হয়, তেমনই রসহীন অধ্যায়গুলিকে সুন্দরভাবে রসােত্তীর্ণ করে পাঠকের কাছে এই গ্রন্থ-মাধ্যমে পরিবেশন করেছেন কবিশেখর। এছাড়াও পদাবলী সাহিত্য, শরৎ সাহিত্য (দু’ খণ্ড), বঙ্গ সাহিত্য (তিন খণ্ড), বঙ্গসাহিত্যের ক্রমবিকাশ ইত্যাদি পনেরােখানি সমালােচনা-গ্রন্থ কবিশেখরকে সমালােচকসাহিত্যিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, দ্বিজেন্দ্রগীতি, রজনীকান্ত’র গান ইত্যাদি শব্দবন্ধগুলি হামেশাই ব্যবহার করে থাকি। অবশ্য, তার যাথার্থ্যও আছে। কিন্তু ‘কালিদাসের গান’ – এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করি না। হয়তাে আমাদের অনেকেই জানি যে কবিশেখর বাংলা গানের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। কিন্তু আমরা তাঁকে সে কৃতি দিই না। তার বৃন্দাবন অন্ধকার’ গানটি কত না গায়ক কতরকম সুরে, কত ঢঙে গেয়েছেন ! ওড়িশার পুরী-কেন্দ্রিক অঞ্চলে এই গানটি খুবই জনপ্রিয়। তবে, গীতিকারের নাম না-জেনেই এটি গাওয়া হয়ে থাকে।

কবিশেখরের লেখা হাসির গান নিয়ে নলিনী সরকারের কণ্ঠে রেকর্ড বেরিয়েছিল। এছাড়া, তার হাসির গানের রেকর্ড করেছিলেন যােগীন্দ্রনাথ সরকার। মােহিনী সেনগুপ্ত তার অনেক গানের স্বরলিপি তৈরি করে ভারতবর্ষ, বঙ্গবাণী, মাসিক বসুমতী ইত পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন।

কবিশেখরের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর কিছু গান নিয়ে গাথাঞ্জলি’ নামের একটি ক্যাসেটও হয়েছে। হেমন্ত মুখােপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, সিদ্ধেশ্বর মুখােপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্ত-প্রমুখ প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পী এই গানগুলি গেয়েছেন। সেই ক্যাসেটের একখানা অত্র নিবন্ধকারের সংগ্রহে রয়েছে। ক্যাসেটটিকে সিডিতে কনভার্ট করতে পারলে বহু মানুষকে কবিশেখরের রচিত গানগুলি শােনানাে যায়। আর তাতে করে, মনে হয়, তাঁর প্রতি যথাযােগ্য শ্রদ্ধাঞ্জলিও জানানাে হয়।

শেষ পাতে মিষ্টান্ন পরিবেশনের মতাে, শেষ করা যাক কবিশেখরের দু’টি পান পরিবেশন করে, যাতে ‘মধুরেন সমাপয়েৎ’ হয়।

( এক )

এ দিন যদি ফুরিয়ে যায় আঁধার আসে ঘিরে,

চিন্তা কিসের? গগন ছেড়ে ফিরব তখন নীড়ে।

মিলিয়ে যাবে রূপের ভুবন, | প্রসার পাবে রসের জীবন

করবে পরশ সরস তখন রূপের স্মৃতিটিরে

তােমার ভূষণ বেশ প্রসাধন লাগবে না আর কাজে,

তনু ছেড়ে লােভন শােভা জাগবে মনের মাঝে।

কাঁদব নাকো পদ্ম-শােকে ফুটবে কুমুদ চন্দ্রালােকে,

নিবিড় হবে বাহুর বাঁধন স্বপ্ন সায়র-তীরে

(দুই)

যাত্রাকালে পড়ল একট হাঁচি ,

তাই দিল্লী যেতে গিয়ে আমি ভুলে এলাম রাচি।

ট্যাকসিতে তাই উঠতে গিয়ে পড়লাম উঠে ট্রামে,

যাবার কথা শিয়ালদহ এলাম  বনগ্রামে।

সুটকেসটা মুটেয় দিয়ে গেলাম ট্রাকটা ঘাড়ে নিয়ে।

রেলের টিকিট কিনতে গিয়ে কিনে ফেললাম কাঁচি ।

বর্ধমানে কিনতে খাবার কিনলাম চটিজুতাে,

হঠাৎ দেখি রেলের কাছে মারল ষাঁড়ে  গুতাে।

শুতাের চোটে ঘুমিয়ে পড়ে জেগে দেখি একা চড়ে

মেঘনা নদী হচ্ছি যে পার পুনার কাছাকাছি।

পরণে কোটপ্যান্ট যে ছিল তা হল যে আলখাল্লা,

তামাক বলে গাঁজা সেজে খাওয়ালাে এক মাল্লা।

দিতে গিয়ে লম্বা পাড়ি ছিড়ে গেল লম্বা দাড়ি

হাঁচির ঠেলায় ঘটলাে এসব ফিরতে পেলে বাঁচি।

 

( এই প্রবন্ধটি  বাক্প্রতিমা  সাহিত্য পত্রিকা থেকে  সংগৃহীত  )

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: