কবির উপলব্ধি // রনেশ রায় // ভাগ – ৩

450

সমাধি লিপি ( পৃ :১৯৬ )

(কবি মধুসূদন দত্ত)  

 

দাঁড়াও পথিক-বর, জন্ম যদি তব

বঙ্গে ! তিষ্ঠ ক্ষণকাল ! এ সমাধিস্থলে

( জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি

বিরাম ) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত

দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন !

যশোরে সাগরদাঁড়ি কবতক্ষম-তীরে

জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি

রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী।

মৃত্যুর প্রাক্কালে তাঁর এই উপলব্ধিটা আগেই প্রকাশ পেয়েছিল যখন তিনি লিখেছিলেন:

                        বঙ্গদেশে জন্ম মোর

                      কেউ ভাবে না পর,

                    আমি সেথায় সাত রাজার ধন

                      সবাই যে মোর আপন,

                     তাদের প্রেমে ধন্য আমি

                        অধম আমি লো,

                      তাদের আমি বাসি ভালো

                        নাই যে তাতে গোল,

                        তবু ঝরে অশ্রুধারা

                 দুচোখ ভরা জল;

                       প্রিয়া আমার ওই সুদূরে

                  তার বিরহে পাগল আমি।  

                      ব্যাকুল আমি যার তরে

                  সে জেনো মোর জন্মভূমি।

  

আজকে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় সারা ভারতে দেশপ্রেমিক বিভিন্ন ভাষাভাষীর প্রতিটি মানুষের কাছে কবির এই উপলব্ধিতটা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।  কবির উপলব্ধিটা এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিচার করা প্রয়োজন।

হে বঙ্গ  ভাণ্ডারে তব  বিবিধ রতন; —

তা সবে,( অবোধ আমি ! ) অবহেলা করি,

পর-ধন লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি !

অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মন :,

মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;—

কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল কানন !

স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে—

“ ওরে বাছা মাতৃ-কোষে রতনের রাজি,

এ ভিখারি-দশা তবে কেন তোর আজি ?

যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যা রে ফিরি ঘরে !“

পালিলাম  আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে

মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে।

দ্রষ্টব্য: মধুসূদন রচনাবলী, সাহিত্য সংসদ

ষষ্ঠ মুদ্রণ আগস্ট ২০১২,পৃ:১৫৯

উপরোক্ত কবিতায় কবি স্বীকার করছেন বাংলা ভাষার যে সম্ভাবনা তাকে আশ্রয় করে যে সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়োজন সেটা অস্বীকার করে তিনি কি মারাত্বক ভুল করেছেন। তাঁর এই কবিতার মধ্যেই ধ্বনিত হয় কবি রবীন্দ্রনাথের বার্তা:  মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ। আমাদের আজ ঘরে ফেরার ডাক এসেছে। শুধু বাঙালিদের জন্য এটা সত্যি নয়। এটা সত্যি সব ভাষাভাষী মানুষের জন্য।

জাপানে তারা তাদের মাতৃভাষাকেই শিক্ষার  বাহন হিসাবে ব্যবহার করে। এইসব দেশে সাধারণ মানুষ ইংরেজি খুব একটা জানে না। এসব দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের ভাষাও মাতৃভাষা।এবার আসা যাক ইউরোপে। ইউরোপে বিভিন্ন প্রত্যেক  দেশই প্রায় নিজের নিজের মাতৃভাষার মাধ্যমেই দেশ চালায়। ফ্রান্স বা জার্মানের মত দেশে তো ইংরেজি সেভাবে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি।

শিল্প বিপ্লবের প্রাক্কালে ব্রিটেন যখন মুক্ত বাণিজ্যের ঢক্কানিনাদ বাজিয়ে চলেছে আজকের বিশ্বায়নের মত তাকে ভারতের মত দেশে  আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে তখন জার্মানের মত দেশ মুক্ত বাণিজ্য নয় সংরক্ষণ নীতি অনুসরণ করে উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল। অন্যান্য ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজনে যেখানে দরকার মুক্ত বাণিজ্য যেখানে দরকার সংরক্ষণ নীতি অনুসরণ করেছিল। এমনকি বৃটেনও সম্পূর্ণ মুক্ত অর্থনীতি চালু করে নি।

এমনকি নরওয়ের মত এককালের ইংরেজের অধীনে থাকা দেশও তাদের স্বাধীন ভাষানীতি নিয়ে আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্স স্পেন দক্ষিণ আমেরিকার মত দেশে ফরাসি, স্প্যানিশ ও  ল্যাটিন ভাষায় সাহিত্য চর্চার গৌরব ইংরেজদের ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা থেকে কম গৌরবময় নয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মাতৃ ভাষায় শিল্প সাহিত্য চর্চায় ফ্রান্স শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। ডেনিশ ভাষা ডেনমার্কে তাদের জীবনের সবক্ষেত্রেই উন্নতিতে সাহায্য করেছে।

সোভিয়েত বিপ্লবের পর ভাঙাচোরা বিভিন্ন দেশকে একজোট করে সোভিয়েত গঠন করে আঞ্চলিক ভাষাকে যথাযত মূল্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল বৃহত্তর সোভিয়েত রাশিয়া। রাশিয়ান ভাষার সাহায্যেই তাদের শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞানে বিপ্লব পরবর্তী পনেরো বছরে যে উন্নতি করেছিল তাকে চোখ ধাঁধানো উন্নতি বলে ব্রিটিশ আমেরিকা সবাইকে স্বীকার করতে হয়েছে। সুতরাং ইতিহাস  যা প্রচার করা হচ্ছে তার বিপরীতটারই সাক্ষ্য বহন করে। আরো উল্লেখযোগ্য যে ব্রিটিশরা উপনিবেশ স্থাপন করার আগে ভারত ইউরোপের দেশগুলো থেকে উন্নত ছিল।

ভারতে প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব ছিল না। শিল্প সাহিত্যে উন্নতি করছিল। সেই অবস্থায় ঔপনিবেশিক দখলদারি ভারতকে উন্নতির লড়াইয়ে পেছনে ফেলে দেয়। ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতি, ইংরেজি চাপিয়ে দেওয়ার নীতি সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলে। ইংরেজদের এই নীতির অনুগামী কবি মধুসূদনের ফ্রান্সে গিয়ে চোখ খোলে।

উনি প্রত্যক্ষ করেন মাতৃভাষাকে অবলম্বন করে কি ভাবে একটা দেশ শিল্প সাহিত্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে। তাঁর নিজের প্রতিভার স্ফুরণ ঘটা সম্ভব মাতৃভাষায়, বিদেশি ভাষায় নয়।তাঁর আফসোসের শেষ থাকে না। তিনি পশ্চিমের জগতে প্রতি তাঁর মোহগ্রস্ততার কথা খোলাখুলি স্বীকার করেন। নিজের দেশ সম্পর্কে হীনমন্যতার কথা স্বীকার করে তিনি তাঁর অপরাধবোধটা, তার হতাশাটা  তুলে ধরেন অকপটে নিচের কবিতায় :

ছন্নছাড়া                                     

     কবি মধুসূদন দত্তের AN ACROSTIC থেকে  একটি ইংরেজি কবিতার ভাবানুসারে  //         পৃষ্ঠা ৪১৮   //        [ ৮ ]

                                                                                                                                                    

আমার আচ্ছন্ন  চেতনা                                                

লালায়িত সমুদ্র বিহারে,

আমারে আপ্লুত রাখে

সুদূরের সাগর মোহনা,

সবুজে সবুজে ভরা

সেই উপত্যকা

যে  থাকে ঘেরা

পাহাড়ে পাহাড়ে

আমি  হয়ে পড়ি  নামগোত্রহীন,

আত্নীয় বর্জিত কে সে অধম ;    

তবু ঢেউয়ে ঢেউয়ে  ভেসে

পাড়ি দিতে চাই সিন্ধু  

দেখি না ঘরের  দাওয়ায

একটি শিশির  বিন্দু`।

তাহার  উন্মাদ ভাবনা  

পীড়া দেয়   তাকে ,

যশের কাঙাল যে সে !

নিশ্চিত সমাধি তরে  

আজ সে ভাসে;

অবোধ সন্তান সে, মা

তারে  তুমি করিও  ক্ষমা।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *