এক আকাশ আনন্দ

অনিতা পান

আজ থেকে পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগেকার কথা। বাবার বদলির চাকরি ছিল বলে কিছু জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার সুযােগ হয়েছিল। তার মধ্যে কয়েকটি জায়গা এত ছােটবেলায় গেছি যে ভালাে করে মনেই পড়ে না। আর কিছু জায়গা মনকে সেভাবে স্পর্শ করতে পারেনি।

১৯৮৫-৮৬ সালের কথা। বাবা তখন আসামের গৌহাটিতে পােস্টেড। ট্রেনে গৌহাটি যাওয়ার পথে অবাক হয়ে দেখছিলাম পাহাড়গুলােকে, আর উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠছিলাম। ওই কামরাতে আরও একটি পরিবার ছিল। তাদের সঙ্গে বেশ ভাব জমে গিয়েছিল।

ওদের সামনে ওরকম আদেখলাপনা করছিলাম বলেই কিনা জানিনা, যখনই আমি কী সুন্দর পাহাড়’ বলে লাফিয়ে উঠছিলাম, তখনই মা কটমট করে তাকাচ্ছিল আমার দিকে। মা-রকটমটানি দেখে একবার করে চুপসে যাচ্ছিলাম ঠিকই, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবার উচ্ছ্বাস।

আজ সেকথা ভাবলে হাসি পায়। কারণ আজ আমি সব আনন্দ প্রাণ খলে উপভােগ করি নিজের মতাে করে। | গৌহাটির বাড়িগুলাে দেখতে অদ্ভুত সুন্দর দেখতে ছিল। সব কাঠের। শুনেছিলাম, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় নাকি কাঠের বাড়িই নিরাপদ। আমাদের ভাড়া বাড়িটাও কাঠের ছিল।

বাড়িটা ছিল ছােট্ট একটা পাহাড়ের কোলে। সকালে ঘুম চোখে বাইরে বেরিয়ে চোখ মেললেই পাহাড়টাকে দেখতে পেতাম। সেই প্রথম আমার খুব কাছ থেকে পাহাড় দেখা। সে যে কি ভালােলাগা !

একটু বড় বয়সের স্মৃতি তাে, তাই ভালাে লাগাটা এখনও টের পাই। সেই বাড়িটা, বাড়ির সদস্যরা এখনও ছবির মতাে ভাসে চোখের সামনে।

তারপর দীর্ঘ বিরতি এবং এবছর আবার যাওয়া। সুতরাং সেভাবে বেড়ানাে বলতে আমার এবং আমার পুত্র’র এই প্রথম। তবে এবারের আনন্দ সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। তার অন্যতম কারণ বােধহয় আমাদের ২১ জনের বিরাট দলটা।

অনেকের সঙ্গে বেড়ানাের আনন্দই আলাদা। অতএব বলাই বাহুল্য, আমাদের আনন্দ, উৎসাহ, উত্তেজনা সবকিছুই অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই ছিল।

আমাদের ট্রেন ছিল হাওড়া স্টেশন থেকে ১১ই মার্চ ২০১৮, দুপুর ১-৩০ মিনিটে; কুম্ভ এক্সপ্রেস। সপুত্র ভাের সাড়ে পাঁচটায় পুরুলিয়া এক্সপ্রেসে চেপে দুপুর ১২-০০টায় হাওড়া পৌঁছে গেলাম।

আসার সময় রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছিলেন ট্রেন দু ঘন্টা দেরিতে ছাড়বে। (ভারতীয় রেলের দায়িত্বজ্ঞান দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম) দলের অন্যদের হাওড়া থেকেই ওঠার কথা ছিল।

কিন্তু তারা তখনও এসে পৌঁছননি। নানা কারণে এতদিন আমার বেড়াতে যাওয়া হয়নি। এবারও বেশ টেনশন ছিল, শেষ পর্যন্ত যেতে পারব তাে ! দুপুর ১-০০টা নাগাদ যখন বাকী সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা হ’ল, মনে একটু বল পেলাম।

 কিন্তু এ কী! দু’ঘন্টা পেরিয়ে গেল, তবুও ট্রেন তাে এল না। যে চোঙন একটানা চিৎকার করে যাচ্ছিল, সেটাও যেন হঠাৎ চুপ করে গেল।

বুকের মধ্যে -এই বুঝি চোঙটা বলে ওঠে, অনুগ্রহ করে শুনবেন অনিবার্য কারণবশত , আজকের মতাে বাতিল করা হ’ল। সাড়ে তিনটে – চারটে নাগাদ গদাইলস্করীর চালে রাজা কুম্ভ ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ালেন। এবার মনের জোর বেশ খানিকটা বাড়লো ।

দুপুর দেড়টার পরিবর্তে আমাদের রথ’ যখন সাড়ে চারটের সময় হরিদ্বারের উদুয়া দুয়া করে রওনা দিল, আমি তাে আনন্দে আত্মহারা। যাক, শেষ পর্যন্ত তা হচ্ছে !

আমাদের বার্থগুলাে বেশির ভাগই ছিল আপার এবং মিডল। দু-তিনটি চিল ধারে। আমার এবং আমার পুত্র’র দু’জনেরই ছিল আপার বার্থ । মনটা খুব খারাপ গেল। এতদিন পর বেড়াতে যাচ্ছি, কোথায় বাইরেটা দেখতে দেখতে যাব, তা না।

তাই উপর আমার আবার একটা বিটকেল শখ বা নেশা যাই বলুন, আছে। সারা রাত না ঘমিয়ে জনমানবহীন স্টেশনগুলাে দেখা। চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে হাওড়া যাওয়ার সময় সবাই যখন নাক ডেকে ঘুমােয় তখন আমি জানলা দিয়ে রাতের ভূতুড়ে মায়াবী স্টেশন দেখি।

যে দু-তিনটি সিট জানলার ধারে পাওয়া গিয়েছিল কিছুক্ষণ সেগুলাে নিয়ে মিউজিক্যাল চেয়ার চলল। অবশেষে ক্ষান্ত হয়ে ‘মন চল নিজে নিকেতনে’বলে বহু কষ্টে কোনরকমে শরীরটাকে টেনে তুললাম আপার বার্থে। এ যাত্রায় আর ‘নিশিথে মায়াবী স্টেশন’ দেখা আমার হ’ল না।

ট্রেন দু’মিনিট যায় তাে দশ মিনিট দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেয়। মনে হ’ল হেঁপাে রুগীর মতাে চলেছি হরিদ্বার দর্শনে। অনন্তকাল ধরে চলবে না কি রে বাবা! আমার নেশা রাতের স্টেশন দেখা, রাতের বন-বাদাড় নয়।

কুম্ভ রাজা এমন এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল যেখানে শুধুই ঝি ঝি পােকার ডাক আর নিকষ কালাে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই।

ক্ষণে ক্ষণেই বুকের ভিতর ঢিপঢিপ :..এই বুঝি ডাকাত দল উঠেবলবে –‘যাে ভি হ্যায় নিকালাে’। তবে না, ভাগ্য ভালাে, সেরকম কিছু হ’ল না।

বাবা-মা’র জীবনের অনেকটা জুড়ে রয়েছে বেরিলি। বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মা’র প্রথম বাইরে পা রাখা বলতে এই বেরিলি আসা, বাবার সঙ্গে। অনেক সুখ-দুঃখর স্মৃতি জড়িয়ে এই জায়গাটার সঙ্গে। বাবা-মা সেই স্মৃতি রােমন্থন করে চলেছেন।

বেশ লাগছিল শুনতে। আবেগ, আনন্দ শুধু তাদের গলার স্বরে নয়, তাদের চোখে-শু প্রকাশ পাচ্ছিল। যেন তারা সেই ৫০ বছর আগের জীবনে পৌঁছে গেছেন। 

১২ই মার্চ ২০১৮, বিকেল ৪.৪০ মিনিটের পরিবর্তে ট্রেন যখন হরিদ্বার ” পৌছাঁলো তখন রাত দু’টো  বাজে। লটবহর নিয়ে স্টেশনে নেমে মনে হল যে এভারেস্ট জয় করেছি।

ভারতীয় রেলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় আবারও একবার মাথা : যাতে ১৩ তারিখের আগে পৌঁছতে পারি তার জন্য কি অক্লান্ত পরিশ্রমই না। স্টেশনে নেমেই মনটা হাঁকপক করে উঠল একটা সেলফি তােলার জ” বয়স্ক এবং বাচ্চাদের ক্লান্তিতে অবসন্ন করুণ চোখ-মুখের অবস্থা দেখে হচ্ছিল না।

ঠিক তখনই ভাইয়ের স্ত্রী রেশমি বলে উঠল ‘একটা সেলফি হয়ে যাক । ’ আমি তো আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। প্রবল উৎসাহে দাঁড়িয়ে পড়লাম সেলফি তুলতে। আমার উৎসাহ দেখে বাকি সকলে হেসে উঠল।

স্টেশন থেকে অটোয় করে যখন মানস সরােবর হােটেলে পৌঁছলাম তখন রাত ১.০০টে বাজছে। সকলেই এত ক্লান্ত যে কত তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে ঘুমােবে সেই চিন্ত করছে। আমার কিন্তু অন্য চিন্তা। হােটেল লাউঞ্জে একটা সেফলি তুললে হত না! বলতে হ’ল না, রেশমি এবারও আমার মনের সাধ পূরণ করে দিল।

ঠিক ছিল বিকেলের মধ্যে হরিদ্বারে পৌঁছে হর-কি-পৌড়ি’র গঙ্গারতিটা ওইদিনই দর্শন করা যাবে। কিন্তু ভারতীয় রেলের দৌলতে সে-গুড়ে বালি।

আমাদের হােটেলটা মন্দ ছিল না, বেশ রাজকীয় ব্যবস্থা রুমগুলােতে। ভেবেছিলাম, পরিষেবাটা সেরকমই হবে। কিন্তু না, নিরাশ হতে হল।

ঘন্টা দুয়েক আধা ঘুম আধা জাগা অবস্থায় কাটিয়ে শরীরটা একটু তাজা হ’ল। হােটেলের ব্যালকনি থেকে দেখলাম সামনের পাহাড় এবং পাহাড়ের মাথায় মনসা মন্দির হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মনে পড়ে গেল সেই গৌহাটির পাহাড় দর্শন।

সেই ভালােলাগা, সেই অনুভূতি। কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম পাহাড়চূড়ার দিকে। কিছুক্ষণ পরই আমরা ওইখানে যাব ভাবতেই মনটা ভালাে হয়ে গেল।

১৩ তারিখ সকাল হতেই, আমরা বেরিয়ে পড়লাম মনসা আর চণ্ডী মন্দির দেখার উদ্দেশ্যে। আমার ও আমার পুত্র’র চোখে যেন অপু-দুর্গার প্রথম রেলগাড়ি দেখার বিস্ময়। এই প্রথম রােপওয়ে ট্রলিতে চাপলাম।

এখনও ভাবলে রােমাঞ্চ হয়। এক অদ্ভুত ভয় মেশানাে ভালােলাগা। ওপরে উঠছি আর ভাবছি এই বুঝি তার ছিড়ে ট্রলিটা তলিয়ে যাবে নিচে। এমন দিয়ে ভগবানকে বােধহয় আর কখনও ডাকিনি। আসলে এত উঁচুতে তাে এর আগে কখনও উঠিনি।

মনসা মন্দির বেশ ভালাে লাগল। চণ্ডী মন্দির আরও উঁচুতে। আবার ট্রলিতে চাপতে হ’ল। দ্বিতীয় বারে ভয় একটু কম লাগল। শুনেছিলাম এখানে নাকি বাঁদরের দারুণ উৎপাত। আমরা কিন্তু উৎপাতের কোনও আঁচ পাইনি। চণ্ডী মন্দিরের সুজির প্রসাদ এক কথায় অনবদ্য।

খিদের মুখে একেবারে অমৃত মনে হ’ল। যে যতবার পারল নিয়ে খেল। অত্যন্ত সুস্বাদু। যারা যাবেন তারা অবশ্যই পরখ করে দেখবেন। এখানে একটা জায়গা আছে অনেকটা সুইসাইড পয়েন্ট’-এর মতাে। একটা চওড়া রাস্তা ধীরে ধীরে সরু হয়ে যাচ্ছে।

দু’পাশে খাদ। নীচের দিকে তাকানাে যায় না। পাকাপছিল ঠিকই, কিন্তু খুব ইচ্ছে হচ্ছিল শেষপ্রান্ত পর্যন্ত যাই। সঙ্গীরা বাধা দেওয়ায় আর যাওয়া হল না।

হরিদ্বারে পকেটমারি-কেপমারির বেশ নাম-ডাক রয়েছে মনে হ’ল। বিকেলে যখন গঙ্গারতি দেখব বলে হর-কি-পৌড়ি ঘাটের দিকে রওনা দিলাম, সাবধানবাণী ভেসে এল ব্যাগ সামলে সবাই। ব্যাস, সেই যে ব্যাগটা হাত দিয়ে চেপে ধরলাম …।

বাপরে, কি পথাতিক ভিড় ঘাটে। তিলধারণের জায়গা নেই। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’

এই মনােভাব সবার। কিন্তু আমাকে যে সামনে যেতেই হবে, না হলে ছবি তুলব কী র! কোনও মতে এক হাতে ব্যাগ চেপে ধরে অন্য হাতে লােককে গুতাে মারতে মতে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেলাম।

মাত্র দশ টাকা দাম দেখে বেশ খুশি খুশি মনে প্রদীপ কিনে ভাসাতে যাব , পান্ডারা কি সব বোঝালো যে  মন্ত্রমুগ্ধর মতাে দু’ শাে টাকা তুলে দিলাম তাদের হাতে এরপর ভাসল আমার প্রদীপ। ওই দু’শাে টাকার জন খচখচ করলে লাগল।

এবার হােটেলে ফিরতে হবে। চারপাশে বড় বড় দোকানের জিসিসপত্র   দেখতে কখন যে অন্যমনস্ক হয়ে ব্যাগের উপর থেকে হাতটা সবেন/ সম্বিত ফিরল আমার পিছনে থাকা ভাইয়ের বন্ধুর স্ত্রী বৈশালীর   তীব্র চিৎকারে – এ্যাই কী করছিস, কি করছিস !

সঙ্গে একটা মােক্ষম চড় মারার আওয়াজ। ঘটনার আমি একেবারে হতভম্ব। ওই মুহূর্তে আমার মুখটা নাকি দেখার মতাে তথs. গর্ব করে সবাইকে বলে বেড়াই – ‘আমার কাছ থেকে কোনদিন পাঁচ পয়সাও চুরি. হয়নি। আর সেই আমার ব্যাগেই হাত ! কী লজ্জা!

পিছন ফিরে দেখি একটি বাচ্চা ছেলে গালে হাত বােলাতে বােলাতে চলে যাচ্ছে আর বিড়বিড় করছে –‘কী জোরে মারল, বাবা ! ছেলেটি কখন যে আমার পাশে পাশে। হাঁটতে শুরু করেছিল খেয়ালই করিনি।

ব্যাগের যে পকেটে মােবাইল ছিল, সেটার চেন খুলে সবে হাত ঢােকাতে যাবে ঠিক তখনই ব্যাপারটা বৈশালীর নজরে পড়ে।

আর তারপরই তার চিৎকার আর ওই মােক্ষম চড়। সত্যি, সেদিন বৈশালী না থাকলে আমার মােবাইলটা নির্ঘাত চুরি হয়ে যেত। এটি আমার প্রথম স্মার্ট ফোন … বড় আদরের। একেবারে প্রথম প্রেমের মতাে।

চুরি গেলে মরমে মরে যেতাম। বৈশালী বলেছিল – ওই দু’ শো   টাকার পুণ্যবলেই নাকি মােবাইলটা রক্ষা পেয়েছে। কী জানি! হয়তাে তাই হবে !

 ১৪ মার্চ সকাল থেকেই গঙ্গাস্নানের ধূম পড়ে গেল। জলে আমার দারুণ ভয়, তাই জল আমি এড়িয়েই চলি। মা বলল – এটাই আসল গঙ্গা। এখানে স্নান না করলে নাকি জীবন বৃথা। যাঃ বাব্বা, সে আবার কী কথা! তবে কি আমাদের হাওড়া-কলকাতার গঙ্গা নকল নাকি! কে জানে! যাইহােক,

মা এবং আরও কয়েকজন ‘আসল গঙ্গা’-য় স্নান সেরে আসার পর আমরা বেরিয়ে পড়লাম হৃষিকেশের উদ্দেশ্যে। শুনেছি কঙ্খলের রামকৃষ্ণ মিশন দর্শনীয় স্থান। কিন্তু, আমাদের যাওয়া হয়ে উঠল না।

কঙ্খলের সতীপীঠে অনেকটা সময় কাটালাম। বেশ ভালাে লাগল। খুব শান্তির পরিবেশ। হাত-ভর্তি প্রসাদ পেয়ে মনটা খুশিতে ভরে গেল।

ওখান থেকে রামঝােলা। আমার ধারণা ছিল ঝােলা নিশ্চয়ই শুধু দড়ির হবে। কিন্তু এ তাে কংক্রিটের তৈরি! তবে ঝুলন্তই। সেখানে যত না পর্যটক তার টেস্ট ১ বানের উৎপাত বেশি। পরিবেশটা ঠিক পছন্দ হ’ল না। এরপর গেলাম বিষ্ণু মাপ তিরুপতি মন্দির, ইসকন মন্দির।

বিষ্ণু মন্দিরের স্থাপত্য-ভাস্কর্য চোখে পড়া অপূর্ব শিল্পকীর্তি। দুধ সাদা রংমন্দিরের সৌন্দর্যকে আরও অপরূপ করে তুলতে মাদরের চাতাল থেকে সামনের পাহাড়টাকে এত অপূর্ব দেখায়! ওখানে বসে  হয়। ওখানে বসেই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়।

সারাদিন ঘুরে ঘুরে বেশ ক্লান্তি লাগছিল। ঠিক হল সন্ধেবেলায় ত্রিবেণা থ দেখে হরিদ্বার ফেরা হবে। মনের মাঝে উঁকি মারল হর-কি

মা হবে। মনের মাঝে উঁকি মারল হর-কি-পৌড়ি’র অভিজ্ঞতা। এখানেও প্যকে আরও অপরূপ করে তুলেছে। ইসকন ঠিক হ’ল সন্ধেবেলায় ত্রিবেণী ঘাটে আরতি তাই হবে নাকি : অবসন্ন শরীরে ঘাটে যেতেইমন ভালাে হয়ে গেল! আহা, কি শান্তির পরিবেশ! কি নিয়মানুবর্তিতা! শুরু হ’ল গঙ্গারতি। সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।

সে এক অপূর্ব মন ভালাে করা অভিজ্ঞতা। এই আরতির মনেই বার বার ঋষিকেশ যেতে ইচ্ছে করে।।  পরের দিনমুসৌরি যাওয়ার পথে লছমনঝােলা যাওয়া হল। সেখানকার অভিজ্ঞতাও একই রকম ভিড় আর দু’ চাকার হুংকার। তবে এখানে শুধু মানুষ আর দু’ চাকা নয়, চারপেয়ে জীবও বর্তমান।

তাও আবার ভীষণাকৃতির দু’টি ষাঁড়। তাদের দৌরাত্ম্যে লছমনঝােলার সঙ্কীর্ণ রাস্তা একেবারে বেসামাল। সর্বনাশ ! এই বুঝি ষাঁড়ের গুতােয় ভবলীলা সাঙ্গ হ’ল { দু চারজনকে হালকা গুঁতাে মেরে তারা নেমে গেল ঝােলা থেকে। এ যাত্রায় খুব জোর বেঁচে গেলাম।

লছমন ঝােলা দেখে আমরা রওনা দিলাম মুসৌরি-দেরাদুন-এর উদ্দেশ্যে। আমার মনের মতাে জায়গা। মুসৌরি যেন ‘আয় আয় করে আমাকে ডাকছে। পাহাড়ে ওঠার অভ্যাস তাে নেই। তাই আমাদের গাড়িটা যখন ঘুরে ঘুরে উপরে উঠছে, একটু অস্বস্তি হচ্ছিল অবশ্য।

পাহাড়ে গাড়ি-চালানাে ড্রাইভারদের স্যালুট জানাতে হয়। কী অসাধারণ দক্ষতা তাদের! একটু অসাবধান হলেই চরম বিপদের আশংকা প্রতি পদে পদে।

হােটেল আগে থেকেই বুক করা ছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখা গেল, সেটা মূল রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নীচে। সঙ্গে বয়স্করা ছিলেন, তাই বেশ চিন্তায় পড়া গেল। তারা তাে নামা-ওঠা করতে পারবেন না। অতএব অন্য হােটেলের খোঁজ শুরু হল। অবশেষে, ম্যালের কাছাকাছি বিষ্ণু প্যালেস হােটেলে পাওয়া গেল জায়গা। হােটেলে পৌঁছে মন আনন্দে ভরে উঠল।

কী মনােরম পরিবেশ! কী অপূর্ব দৃশ্য চারপাশে! ভাগ্যিস, আগের হােটেলটা বাতিল করা হয়েছিল। সারা জীবন মনে থাকবে বিষ্ণু প্যালেসের কথা। ওদের আতিথেয়তা, সেবা, ব্যবহার সবকিছুই হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

ওদের একজন কর্মচারী আমাদের দেখভালের দায়িত্ব নিলেন। ওরকম নম্র, ভদ্র, বিনয়ী মানুষ খুব কম দেখেছি আমি। শুনেছি পাহাড়ি মানুষরা নাকি এরকমই হয়।

আফশােষ, তার নামটাই জানা হয়নি। এখানকার বুফে-ব্রেকফাস্টের স্বাদ তুলনাহীন। এখনও জিভে লেগে আছে। আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেই কেদার-বদ্রীর চূড়া দেখা যেত। সাদা বরফে ঢাকা।

সকালে সূর্যর আলােয় কী অপরূপ মােহময় যে দেখাত। উফ, সে কী দৃশ্য। খুব ইচ্ছে হত ছুটে গিয়ে একবার ছুঁয়ে আসি।

১৬ই মার্চ আমরা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম কেমটি ফলস্-এর উদ্দেশ্যে। হায় হায়! এত কম জল। বেশ হতাশ হলাম। তবে প্রথম বেড়ানাে তাে তাই এই ফলস্-ই প্রাণ ভরে উপভােগ করলাম। পুত্র তাে একেবারে আনন্দে আত্মহারা। লাফিয়ে লাফিয়ে পাহাড়ের অনেকটা উপরে উঠে গেল।

কনকনে ঠাণ্ডা জলে নেমে সে তাে আর উঠতেই চায় না। অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে মন ভালাে করা স্মৃতি নিয়ে ফিরে এলাম হােটেলে। শুনেছিলাম, রাত্রিতে মসৌরির ম্যাল থেকে নাকি দেরাদুনকে অসাধারণ, অপূর্ব দেখতে লাগে। বিকেল থেকেই বেশ কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপট। তারই মধ্যে অপেক্ষা – খন সন্ধে হবে, কখন দেখব সন্ধে’র দেরাদুনকে।

সন্ধে হতেই একটা-দুটো করে আলাে জ্বলে উঠল। আহা, সত্যিই কী অপূর্ব রূপ দেরাদুনের। একবার মনে হল যে লা লা জোনাকি জ্বলছে। আবার পরক্ষণেই মনে হল, অজস্র জ্বলন্ত তারা নিয়ে আকাশটা । আর আমরা আকাশের উপরে।

এবার ঘরে ফেরার পালা। ১৭ই মার্চ দেরাদুন থেকে আমাদের ফেরার ট্রেন। মন খব খারাপ। প্রিয়জনকে ছেড়ে অনেক অনেক দূরে চলে যাওয়ার বেদনা। ক’টা দিন কেস, অন্য জগতে ছিলাম।

আমার ২১ বছরের ছেলে শিশুর মতাে বলে উঠল – (ass থাকব আমি, কোথাও যাব না এখান থেকে। আমাদের সকলকে নিয়ে গাড়িটা যত নিচে নামতে লাগল মনে হ’ল পাহাড় যেন পিছন থেকে ডেকে বলছে – ‘আবার আসিস কিন্তু।

ফেরার ট্রেন ছিল রাতে। তাই দেরাদুন চিড়িয়াখানাটাও ঘুরে নেওয়া হ’ল। অনেকটা জায়গা জুড়ে এর বিস্তৃতি। তবে সেরকম পশু-পাখি বিশেষ চোখে পড়ল না। একটি মাত্র বাঘের দেখা পেয়েছি। কুমীর, হরিণ এসবও ছিল। কিন্তু চিড়িয়াখানার পরিধির তুলনায় পশু-পাখির সংখ্যা অপ্রতুল।

দল বেঁধে প্রথম বেড়ানাের স্মৃতি সারা জীবন মনের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এক আকাশ আনন্দ সঙ্গে নিয়ে ঘরে ফিরছি আমরা মায়ে-পােয়ে।

 

 

 

 

** বাকপ্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা  থেকে সংগৃহীত

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: