একতরফা ঝগড়া কি তাকত! // ইন্দ্রানী দলপতি

(রান্নায় যেমন নুন-মিষ্টির পাশাপাশি টক-ঝালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটা সম্পর্কেও ভালোবাসার পাশাপাশি ঝগড়া-অভিমানটাও প্রয়োজনীয়.. অপরিহার্যও বটে! তবেই না রসায়নটা জমজমাট হয়ে ওঠে.. ‘একতরফা ঝগড়া কি তাকত’ গল্পে সেই রসায়নই ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা করা হয়েছে॥ )

4546

সেই কখন থেকে এক পেট রাগ নিয়ে বসে আছি, অন্য সময় কানে হেডফোনটা লাগানো থাকে, যাতে বাইরের কোনো শব্দ তুষের ভূমিকা পালন না করে, কিন্তু আজ হেডফোনটা জট পাকিয়ে বিছানার এক কোণে পড়ে আছে, অফিসে যাওয়ার সময় বাসস্টপে দাঁড়িয়ে যে বিরক্তি আর অধৈর্য্য তৈরী হয়, বেশ ভালো মতোই সেটার উপস্থিতি টের পাচ্ছি এখন… মোবাইলটা ভাইব্রেট হতেই হাতে নিয়ে দেখলাম জ্বলজ্বলে একটা লাইন-‘ফাইনালি ব্রেক আপ তো?’ অনর্থক চিন্তা না বাড়িয়ে প্রত্যুত্তরে জানালাম- ‘হ্যাঁ, ফাইনাল’… বেখেয়ালে হিসাব কষে দেখলাম এরই মধ্যে প্রায় দুরন্ত শতরান ছুঁয়ে ফেলেছি আমি!

ঘুমটা ভাঙতে খেয়াল হল বেলা অনেক গড়িয়েছে, এই চোদ্দ মাসে অনেক অভ্যাসেরই পরিবর্তন ঘটেছে, চলতি কথায় যাকে বলে অ্যাডজাস্টমেন্ট! মোবাইলে অ্যালার্ম দেওয়াটা আমার কাছে এতদিনে অহেতুক হয়ে উঠেছিল, আমার কপালে তার শীতল ঠোঁটের স্পর্শটাই ভোরের উপস্থিতি জানান দিত, কিন্তু কাল তো সদ্য শতরান হয়েছে কিনা! অফিস যেতে আর ইচ্ছে হল না, বাড়ি এখন ফাঁকা, আপাতত সময়টা একান্তে নিজের সাথেই কাটাতে পারবো, চটপট ফ্রেশ হয়ে পেটপুজো সেরে নিয়ে আবার বিছানায় নিজেকে উজাড় করে দিলাম, হাতে দ্য স্যাডো লাইনস্ আর ব্যাকগ্রাউন্ডে ইমন-বেহাগের ইন্স্ট্রুমেন্টাল তালে তাল মিলিয়ে বাজতে থাকল…

সন্ধ্যের পর এদিকের পরিবেশটা অদ্ভুতরকমভাবে নির্জন হয়ে যায়, নির্জনতার অনেক প্রকার হয়, যেমন কোনো নির্জনতা মানুষকে একাকী করে তোলে, কোনো নির্জনতা মানুষকে হিসেবী করে তোলে, কোনো নির্জনতা মানুষকে আত্মমগ্ন করে তোলে, অনুসন্ধানী করে তোলে, আবার কোনো নির্জনতা ভালোবাসতে শেখায়, আর সেইরকমই একপ্রকার নির্জনতা এখানে বিরাজমান, পরিবেশটা কেমন ভালোবাসাময়, যেকারণে শাক্য আর আমার প্রথম পছন্দ ছিল, আর অফিসে যাওয়াটাও এখান থেকে অনেকটাই সহজলভ্য, তাই আর বেশী সাত-পাঁচ না ভেবে এই বাড়িটায় ভাড়া থাকতে শুরু করি আমরা, বাড়িওয়ালার নজরদারিও নেই, মাসে একবারই তার দেখা মেলে, থাকতে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা জেনে নিয়ে প্রাপ্য হাতে নিয়ে বিদায় নেন, যদিও শাক্যর এই লিভ-ইনে ভীষণ রকম আপত্তি ছিল, কিন্তু প্রতিজ্ঞাভঙ্গের পাপবোধ জাগ্রত হওয়ায় কিন্তু-পরন্তু করেও একসময় রাজী হয়ে যায়…

শাক্যর সাথে আমার প্রথম দেখা অ্যারেন্ঞ্জ করে, ম্যারেজ অব্দি এখনো গড়ায়নি, পুরোটাই দোলাচলে রয়েছে, লিভ-ইনের ব্যাপারটা কারোর বাড়ীতেই জানে না, বিশেষত বাঙালী বাবা-মায়েরা লিভ-ইন শব্দটা শুনলেই মুদ্রাদোষে আক্রান্ত হয়ে পড়ে! তাই জীবনে অযথা এই অতিরিক্ত চাপটা আর বাড়াতে চাইনি… শাক্যকে ভালো লাগার গুটিকয়েক কারণ আছে বইকি! যেমন, ছেলেটি মোটামুটি সুদর্শন, বইপোকা, মিউজিক লাভার, গীটার বাজাতে পারে,

গানটাও ভালো গায়, ঘর অগোছালো রাখাটা একদমই না-পসন্দ, টুকটাক রান্নাও করতে পারে, আমাদের কমন ফ্যাক্টর প্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর হেঁটে হেঁটে কলকাতা শহর ঘোরা, ঘুরতেও বেশ ভালোবাসে, গোটাটাই অ্যাডভান্টেজ! তাই অতশত না ভেবে বিয়ের প্রস্তাবে রাজী হয়ে গিয়েছিলাম, আর আমার আগেও দুই বাড়ী থেকে সবাই রাজী হয়ে গিয়েছিল! তবে ডিসঅ্যাডভান্টেজ একটাই, এত গুণসম্পন্ন ছেলেটা ঝগড়া করতে পারেনা, আর এটা আমার যথেষ্ট বিরক্তির কারণ, রাগেরও কারণ, বলা ভালো এটাই ওর একমাত্র ডিসপুট!

অন্যদিন শাক্য এইসময় অফিস থেকে ফিরে দুকাপ চা বানিয়ে এনে পাশে বসে, তারপর হয় গীটার বাজিয়ে গানের আড্ডা চলে, আর নাহলে বেশিরভাগই বই পড়ে শোনায়, উভয়ক্ষেত্রেই আমি মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা, কিন্তু আজ এখনো ফেরেনি, অফ করে রাখা ফোনটা এতক্ষণে অন করলাম, একটু অবাকই হলাম, শাক্য একবারও ফোন করেনি, আর কোনো এসএমএস ও নেই, অদ্ভুত!

রাত তখন ন’টা, এই অসময় ডোরবেল বাজাতে একটু অবাকই হলাম, শাক্যর কাছে তো চাবি আছে, তাহলে কে আসতে পারে? দরজা খুলতে দেখলাম সেই মূর্তিমান দন্ত বিকশিত করে সামনে দাঁড়িয়ে, বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- ‘এসবের মানে কি? তোর হাতঘড়ি বুঝি বন্ধ হয়ে গেছে? তা মোবাইলেও তো দেখা যায় ক’টা বাজে, নাকি সেটাও আচমকা স্লো হয়ে গেছে? কোনটা রে? আর ফোন করিসনি কেন সারাদিন? কোন রাজকার্যে ব্যস্ত ছিলিস তুই? একটু বেশীই বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?’ এক নিঃশ্বাসে এতগুলো প্রশ্নবাণ ছুড়ে একটু থামলাম, পরিবর্তে একটা অতি-সংক্ষিপ্ত উত্তর আসল-‘কাজ ছিল’,

আমার হাতে এক গ্লাস জল ধরিয়ে দিয়ে শাক্য ঘরে ঢুকে গেল, যত না বিরক্ত হলাম তারও বেশী আশ্চর্য হলাম! গলাটা হালকা ভিজিয়ে নিয়ে নতুন উদ্যমে দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম পরবর্তী প্রশ্নবান ছুঁড়বো বলে, কিন্তু ততক্ষণে আমি এক্কেবারে ক্লীন বোল্ড! শাক্য নিজের জামাগুলোকে ব্যাগবন্দী করছে দেখে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম সে বাড়ি ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় করছে…হয় হয়, মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতি হাজির হয়, যখন আকাশে একইসাথে কাঠফাটা রোদ আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, সুন্দরভাবে বোঝাপড়া করে সহাবস্থান করে!

তবে কপালে থাকলে রোদ আর বৃষ্টির সাথেই রামধনুরও দেখা মেলে, আর সেটার অন্যথাও হল না, মাঝরাতে আমার পাশে তার উপস্থিতি টের পেলুম, কানের কাছে ঠোঁট এনে বলল- এত কষ্ট করে ঢাকাই শাড়ি আর পাঞ্জাবীটা ম্যাচিং করে কিনে আনলুম, একবারো দেখলি না? আমার মুখে তখনও একরাশ কালো মেঘ, জড়ানো গলায় জিজ্ঞাসা করলাম- ন্যাকামো করছিস কেন? একটু আগেই তো নিজের ব্যাগ গোছালি… আমার কথা শেষ হল না, তার আগেই শাক্য বলতে লাগল- হ্যাঁ, সে তো তোকে উৎসাহ জোগানোর জন্য, যাতে তুই এই একতরফা ঝগড়াতে বোর ফিল না করিস..

– শোন, তুই কিন্তু…. আক্রমণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে প্রতি-আক্রমণে হার স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করলাম, আমার ঠোঁটে শাক্য তার আঙ্গুল ছুঁয়ে বলতে লাগল- নিজের আশীর্বাদের তারিখটাও ভুলে গেলি! এটা কি এই একতরফা ঝগড়া কি তাকত? দুজনেই একসাথে হেসে ফেললাম…

বুকের ভেতরে ততক্ষণে পেন্ডুলামের সশব্দে নড়ন-চড়নটা বেশ ভালোমতই টের পেলাম॥

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *