একটা চিঠি  

                  তন্ময় সিংহ রায়

আমার গর্ভে তখন তোর দু মাস, অসততাকে চুড়ান্ত অপছন্দ করা তোর আত্মসম্মানী গরীব বাবার অল্প মাইনের চাকরীটাও চলে গেলো। একটু ভালো খাওয়ার স্বপ্নটাকে আমি নিজে হাতে হত্যা করলাম সে সময়ে। বিশেষত তোর কমপক্ষের পুষ্টিটাও চলে গেলো আমাদের ঘর ছেড়ে বহু দূরে বিশ্বাসঘাতক-এর মতন।

প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত শুধু চিন্তা করেছি তোর সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার। কত দিন ও পরিমাণ কষ্ট পেয়েছি তা কাউকে বলতে পারিনি। না বলা কথাগুলো বড়ো বেশি কষ্ট হয়ে আধিপত্য ফলাতো মনে। হতভাগীনি অসহায়া এক জননী আমি গুমরে গুমরে কেঁদেছি!  অসম্ভব বুকের যন্ত্রণায়ও শুধু কাতর প্রার্থনা ছিলো তোর সুস্থ-স্বাভাবিক একটা জন্ম।

– পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহটা সেদিন আমাদের খড়ের চাল, আধভিজে বারান্দা আর মাটির দেওয়াল কে দ্যাখেনি। হাল্কা বৃষ্টির পর মুহুর্তেই আকাশটা আবার ঢেকে গেলো জমকালো অন্ধকারে, কিছু পরেই শুরু হলো ঘনঘন বজ্রপাত সাথে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি।

আশেপাশের বড়ো গাছপালাগুলোর দেহে শুরু হলো নিদারুণ ভূমিকম্প, কোথাও মনে হলো কাদের টিনের চালটা খুলে বেরিয়ে ঝনাৎ শব্দে আছড়ে পড়লো দূরে কোথাও। হারাণদের গরুটা শুরু করে দিলো অসহায় চিৎকার…হাম্বা………।

 সম্পূর্ণ পরিস্থিতিটার বিভৎস রুপে কেমন যেনো ভয় করছিলো আমার! তোর বাবা চেপে ধরেছিলো আমার হাতদুটো। স্বাভাবিক দৃষ্টির মৃত্যু হওয়া তোর বৃদ্ধা ঠাকুমাও ছিলো আমার পাশেই। তোর তখন দশ মাস তিনদিন, হঠাৎ-ই সেই রাতে শুরু হলো অসহনীয় প্রসব যন্ত্রণা।

আমার জীবনটা বেরিয়ে যাবে এমনটা নিশ্চিত মনে হতে লাগলো, আমি চিৎকার করে উঠলাম ‘মা… আ… আ..!’ আমার চিৎকারেই সম্ভবত ভোলার মা আর ঠাকুমা পাশের বাড়ি থেকে ছুটে এলো অশান্ত প্রকৃতির চন্ডাল রাগকে উপেক্ষা করেই। একে আদর্শ গ্রাম তাও আবার প্রকৃতি হারিয়েছে তার স্বাভাবিকত্ব, স্বাভাবিকভাবেই একজন ডাক্তারের সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হলাম সেই মুহুর্তে। নানা প্রতিবন্ধকতাকে শরীর ও মনে মেখেই জন্ম দিলাম তোকে, ঘর আলো করে এলি তুই।

 রক্ত মাখা এক মাংসের পিন্ড তুলে নিয়ে চেপে ধরলাম বুকে। দুচোখ বেয়ে অবিশ্রান্ত ধারায় আনন্দাশ্রু তখন ক্রমাগত নিম্নমুখী। অসম্ভব খুশির আনন্দে আত্মহারা হয়ে অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো তিনটে শব্দ ‘আমার জীবন এটা!’ সবার চোখে মুখে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠলো খুশির আলো! ধীরে ধীরে অনেক কষ্টে, ইচ্ছা ও খুশিগুলোকে জ্বলন্ত চিতায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তোকে পরম স্নেহ-মমতায় করে তুললাম বড়ো।

তোর বাবা লোকের ফাইফরমাশ খেটে ও আমি হেড মাস্টারমশাই এর বাড়িতে কাজ করে তোকে লেখাপড়া শেখালাম। তোর মাস্টারমশাই বলতো ‘ও বিশুর মা, তোমার বিশুর মাথা ভালো গো… ওকে লেখাপড়া ছাড়িও না যেনো! যদি কিছু লাগে আমায় বোলো। ‘ তুই স্কুল থেকে গেলি কোলকাতার কলেজে, কলেজও পাশ করলি ভালো রেজাল্ট করে, শেষে অর্জন করলি একটা ভালো চাকরী। তোর গ্রাম্য মন আটকালো এক বড়লোকের শহুরে মেয়ের মনে।

জানিস তো সোনা, আমার ভয় করতো তোকে ঠকাবেনা তো! বড়োলোকের খামখেয়ালিপনা অথবা তোর বাবা নিঃস্ব এই ভেবে। মেয়ের তীব্র ইচ্ছাকে দমন করতে না পেরে তোর বড়োলোক শ্বশুর.. বাড়ি থেকে বের করে দিলেন তার মেয়েকে আর তোর কপালে জুটলো তীব্র ঘৃণিত জামাইয়ের তকমা। শেষে বিয়ে করে তুই, তোর কেনা নতুন বাড়িতে আনলি বৌমাকে।

আমাদের অবস্থান হলো তোর পাশের ঘরেই। জানিস খোকা, গ্রামের মাটির গন্ধ লাগা আর সেকেলে মানুষ বলে তোর বড়লোক বউ আমাদের পছন্দ করতোনা, সেটা তোকে বুঝতে দিইনি কখনও, কষ্ট পাবি বলে। যখন তুই অফিসে যেতিস বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠতো অপছন্দটা। জানিস সোনা আজ বৌমা তোর বাবাকে হঠাৎ বলে ‘বাজার-টাজার করে দিন, আর কতদিন এভাবে খাবেন !

 ও একা আয় করে তাতে চলে এতগুলো পেট…আপনাদের লজ্জা করেনা? ‘ এ দুর্বল শরীরে এই ভারী অপমানের বোঝা বইতে না পেরে তোর বাবা বিষে নীল করেন ওনার শরীর। চোখের সামনে নিঃশব্দে লুটিয়ে পড়ে এক আত্মসম্মানী সৎ মানুষের কম দামি শরীরটা।

সারাজীবন সহ্য করে আর নিতে পারিনি এ যন্ত্রণা! আর সামলাতে পারিনি শেষ বয়েসের এ ধাক্কা রে মানিক, তাই আমিও……………. ভালো থাকিস, ইতি তোর মা। হাত থেকে পড়ে গেলো চিঠিটা। রাগে, দুঃখে, যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলো বিশু .. মা আ আ আ আ……….. বাড়িতে এদিকে পুলিশ আর জনা পঞ্চাশ-ষাট লোকজন…… দু-দুটো মৃতদেহ

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *