উপলব্ধি 

                              কিশলয়  মিত্র

আজ দীর্ঘদিন পর আবার নতুন করিয়া সাহিত‍্যসাধনার স্বাদ জাগিল। অবশ‍্য মানুষের মন যে নিত‍্য পরিবর্তনশীল এবং তাহাতে নিত‍্য ভাঙা-গড়া প্রক্রিয়া চলিতে থাকে তাহা উপলব্ধি করা সহজ ব‍্যাপার নহে। কেন না আমরা এই মুহূর্তে যাহা ভাবি তাহা হয়ত ক্ষণিকের মধ‍্যে বা পরমুহূর্তে পরিবর্তিত হইয়া অন‍্য ব‍্যাপার হইয়া দাঁড়াইতে পারে।
যদিও মর্মে আমরা অনুভূতি জাগাইয়া তাহার নিশ্চিত বিধান করিয়া লয়। অবশ‍্য তাহাতে হইত কোনো বন্ধু-বান্ধবের বা পরিজনের শলাপরামর্শ থাকিতে পারে আবার নাও পারে। তাহাতে কাহারও দুঃখ জাগিতে পারে বা কাহারও মনে সেই উক্ত ব‍্যক্তির কথাটিই সত‍্য বলিয়া গাঁথিয়া যাইতে পারে।
এত কথা বলিবার প্রয়োজন এই জন‍্য যে, আজ আমার হৃদয় ভীষণ ক্লান্ত ও নানা ভাবনায় বিভোর। কারণ ভালোবাসিলেই যে প্রত‍্যাঘাত স্বরূপ আঘাত পাইতে হইবে এমন নহে। তবে ভালোবাসাও পাওয়া যাইতে পারে ;
কিন্তু সবার সৌভাগ‍্য তা নহে। অত‍্যন্ত ভালোবাসার দুঃখ যে সর্বাধিক বেশি, তাহা মর্মে অনুভব করিতে পারিবেন ভুক্তভোগী মানুষ মাত্রই। তবে তা মায়ের সহিত সন্তানের ভালোবাসা নহে, ইহা হইতে পারে বন্ধু-বান্ধবের মধ‍্যকার ভালোবাসা।
সজীব বুদ্ধিশীল বস্তুমাত্রই নিত‍্য পরিবর্তনশীল। আর আজকালকার দিনে ইহা তো মুহূর্তের ব‍্যাপার। কারণ কে যে শিকার আর কে যে শিকারি তাহা বুঝিবার কোনো উপায় নাই। তাহাতেই তো পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন শিথিল হইতে শিথিলতর, অবিশ্বাসের হাতে সঁপিত।
এজন‍্য অবশ‍্য সমাজের কিছু ভূমিকা নাই তাহা নহে, বিরাট অংশে রয়েছে অত‍্যাধুনিক হইয়া উঠিবার কঠিন প্রয়াস এবং যান্ত্রিক সভ‍্যতার নাগপাশে আবদ্ধ হইয়া চালিত হওয়া।
জীবন সর্বস্ব দিয়া যাহাকে ভালোবাসা যায়, তাহার কাছ হইতে নিত‍্যান্ত সম্মানটুকু পাইবার প্রত‍্যাশা সকলেরই থাকে। অবশ‍্য তুমি ভালোবাসিবে বলিয়াই যে তাহারও তোমাকে ভালোবাসিতেই হইবে, ইহা তো হইবার নহে। ইহার জন‍্য হইতে হইবে যান্ত্রিক; সমস্ত রস নিঙরাইয়া হইতে হইবে পাষাণ ও মেকি সভ‍্যতার তাবেদারি, তবে যদি কোনো সুফল সামনে আসে।
অবশ‍্য সত‍্যের প্রকাশ খুব ধীরে ঘটে ও যাহা চিরন্তন তাহা যে কেহ অবরোধ করিতে পারিবে না ইহা সত‍্য, কারণ “মরার বাড়া গালি নাই”। জীবনধারণের তাগিদে ভালোবাসার বন্ধন থাকা প্রয়োজন তাহা না হইলেই ঘটে ছন্দপতন। তবে কপট প্রেমের ভালোবাসা বাসিতে গেলে চলিবে কি করিয়া, এ ভালোবাসা হওয়া উচিত ভারতমাতার সহিত সুভাষচন্দ্র-বিবেকানন্দের ভালোবাসা।
অবশ‍্য হৃদয় সর্বস্ব উজার করিয়া ভালোবাসা। তবে তা যেন ‘অপাত্রে দানেন নঃ জায়তি’ হয়, তাহা হইলেই ঘটিবে আঘাতের চরম বজ্রাঘাত যাহা সকলের পক্ষে সহ‍্য করা অত‍্যন্ত কঠিন। বর্তমানে নর-নারীর প্রেম একটা ফ‍্যাশান হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহাতে কোনো রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ নাই, স্টাইল নাই ; আছে কেবল তমসাচ্ছন্ন রতি কামনা। সহানুভূতিশীল মানুষ মাত্রই ভুক্তভোগী হইয়া ইহা উপলব্ধি করিয়া থাকিবেন।
অবশ‍্য নর-নারীর প্রেম-ভালোবাসা, তহাদের রংমেশানো কথা সকলই সেই আদিমকাল হইতে আজিকার সুসভ‍্য সমাজে এমনই রূপ লইয়াছে। প্রকৃত প্রেম-ভালোবাসার যে একটি মাধুর্য আছে তাহা আজিকার সমাজের সুসভ‍্য নর-নারী কিঞ্চিত বুঝিতে পারেন। অনেকেই তমসাচ্ছন্ন মোহমুগ্ধ জালে আবিষ্ট হইয়া প্রকৃত প্রেমিক-প্রেমিকার স্বরুপ উদ্ঘাটন করিতে অসহায়।
বর্তমান যুগে প্রেমের মহিমা কাগজ-কলমে প্রকাশ দুর্বিসহ ব‍্যাপার বটে, অবশ‍্য চিঠির অপেক্ষায় বসিয়া-বসিয়া দিন কাটাইবার আনন্দ যেন কোনো অংশে খর্ব হইয়া তিক্ত স্বাদ লাভ করিয়াছে। সর্বোপরি যান্ত্রিক সভ‍্যতার নাগপাশে আবদ্ধ হইয়া আমরা যেন কোনো অংশে যান্ত্রিক হইতে বসিয়াছি, যাহাতে রূপ-রসের স্বাদ-গন্ধ নাই আছে কেবল কঠিন এনামেলের বিস্বাদময় যান্ত্রিকতা।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *