উত্তরাধিকার   

রণেশ রায়

সেদিন নানা বিষয়ে ঘরে  স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে প্রদীপ বাবু  জানতে পারেন যে বিষ্ণুবাবুর স্ত্রী এসেছিলেন। সেটা তেমন কোন খবর নয়।  উনি প্রায়ই আসেন। থাকেন পাশের পাড়ায় । বিষ্ণুবাবু প্রদীপবাবুর সহকর্মী ছিলেন। প্রদীপ বাবু বিষ্ণুবাবুর  ছ`মাস আগে অবসর নেন । কিন্তু এরপর স্ত্রী যা বলেন তাতে তিনি আকাশ থেকে পড়েন ।

——-তোমার বাবা একটি আস্ত বোকা ছিলেন। প্রদীপবাবুর মাথায় কিছু ঢোকে  না। তাও ভালো আস্ত গাধা বলেন নি। মৃত বাবা আবার ফিরে এলেন কোত্থেকে !  তিনি রসিক মানুষ । রসিকতা করেই বলেন-

——-জানি যে  কোন বাড়ির স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলে, কোন মেয়ে   বাড়ি ছেড়ে গিয়ে তোমাদের ভাষায় পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলে  সেসব তোমাদের আলোচনার বিষয়। সবই এই মর্ত্যের ঘটনা। কিন্তু স্বর্গ নিয়েও টানাটানি কেন  ? নাকি বাবা এসেছিলেন এখানে। তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল? আবার কোন মূর্খামী করতে ফিরে এলেন এ দুনিয়ায় ! মা বাবাকে বোকা  ঠাওরাতেন। সব স্ত্রীরাই স্বামীদের বোকা ভাবে। আমি তোমার কাছে না হয় বোকা। কিন্তু মারা যাওয়ার কুড়ি বছর পর তোমার কাছে বাবাও ! মরেও মানুষটার মুক্তি নেই দেখছি ।    

স্ত্রী হারার পাত্রী নন। বলেন :                                          

——- উনি বুদ্ধিমান হলে তুমিও মাসে বিষ্ণুবাবুর মত পঞ্চাশ হাজার পেতে  ত্রিশ নয়।. —— তা সেটাতো তোমাদের ওপরওয়ালার ব্যাপার। তিনি যদি অবিচার করে আমাকে বিষ্ণুর থেকে আগে এই পৃথিবীতে  নিয়ে আসেন তবে কি করা যাবে। বোকা বা চালাক কেউ হলে তিনিতো সেই ওপরওয়ালা। আর আমি সেই জন্যই তোমার বড় ছেলেকে দেরিতে বিয়ে দিয়েছি। তোমার নাতি যেন দেরিতে বিশ্ব দর্শন করে।

——– তোমার ইয়ার্কি ছাড়।  ওইতো বিষ্ণুবাবুর স্ত্রী বলে গেলেন ওনার শ্বশুর স্কুলে ছেলের বয়স একবছর কমিয়ে রেখেছিলেন। ও তোমার থেকেও বয়সে বড়। অথচ  বিষ্ণুবাবু একবছর বেশি চাকরি করেছেন আবার তোমার থেকে কত বেশি পেনসন পান।

——— এবার বুঝলাম। বাবা সত্যিই বোকা ছিলেন। আর বিষ্ণুর বাবা বুদ্ধিমান। তাই

ডাবল বেনিফিট। কি বল?.

——– হ্যা, তাইতো । আর তুমিও তো  বাপকা বেটা। বলেন স্ত্রী।

—— মেনেতো  নিতেই হয়।

       প্রদীপবাবু  বোঝেন আজ ওদের আলোচনার বিষয় ছিল কার কত পেনসন, সংসার চালাতে গেলে কেন  বুদ্ধিমান হতে হয় ইত্যাদি। প্রদীপবাবু অবসরের পর-ই স্ত্রীকে বলেছিলেন ছমাসের জন্য তিনি নতুন  পেস্কেলের সুযোগ কিভাবে হারিয়েছিলেন। সেটাতে ওনারও আপশোস হয় না তা নয় । স্ত্রীর বিষয়টা এখনও  মাথা থেকে যায়নি। সেটা অবশ্য স্বাভাবিক।

     প্রদীপ-বাবুর মনে পড়ে বাবা বেঁচে থাকতে  বয়স কমাবার একটা কথা উঠেছিল যখন বড় ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। অনেকেই তখন আদালতে  এফিদেফিত করে ছেলে মেয়ের বয়স কমিয়ে দেখায়। প্রদীপবাবু এ ব্যাপারে বাবার মত চাইলে তিনি বলেছিলেন:

——- জন্মলগ্নেই সন্তানের যাত্রা মিথ্যে দিয়ে শুরু করবে ? তবে তো ছেলেও মিথ্যেকে আশ্রয় করে বাঁচতে  শিখবে। অন্যেরা কি করছে আমার দেখার দরকার নেই। কিন্তু আমার মত নেই। এবার তোমরা ঠিক কর কি করবে। প্রদীপ বাবু   বাবার এই দৃষ্টিভঙ্গীকে শ্রদ্ধা না জানিয়ে পারেন নি। অবশ্য সাংসারিক ব্যক্তিদের কাছে এটা বোকামি।

      প্রদীপ বাবুর ছোট ছেলে সুজিতও  পড়াশুনায় ভালো। বারো ক্লাশের ফল বেরিয়েছে। সবাই আশা  করেছিল ভালো ফল করবে।. শুধু ভালো ফল নয় যা আশা করা হয়েছিল  তার থেকে অনেক ভালো করেছে। ফলে জয়েন্টে পাবে বলে মা যেন নিশ্চিত হন  । তবে ছেলেও জানে এধরনের পরীক্ষায় নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। বাবা খানিকটা নির্লিপ্ত ভাব দেখান। তবে ওনার টেনশন কম নয়। সবারই ইচ্ছে ছেলে মেডিকেল পড়ুক । ডাক্তার হবে। মায়ের এতটাই উৎসাহ  যে সব জায়গায় বলেন ছেলে ডাক্তারী পড়বে ডাক্তার হবে । প্রদীপ বাবু কিছুটা বিব্রত বোধ করেন। একদিন বলেন :

—— আচ্ছা তুমি যে এভাবে সব জায়গায় বলছ তা জয়েন্টে না পেলে কি হবে?  স্ত্রী বলেন:

—— পাবে না মানে? দেখলে তো হায়ার সেকেন্ডারিতে কেমন করলো !

—— হায়ার সেকেন্ডারী আর জয়েন্ট এক নয়। প্রদীপবাবু বলেন। স্ত্রীর উত্তর :

——- যদি না হয় তবে বেসরকারী কলেজে ডাক্তারী পড়বে। প্রদীপবাবুর  মাথায় হাত । বলেন:

——- টাকা যোগাবে কে? স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে বলেন:

——- তুমি না পারলে আমি। আমার গয়না বিক্রি করে দেব। যেন সব ব্যবস্থা করাই আছে।

——– কত লাগবে জান ?

——– না

——- এত খবর রাখো, এটা রাখো না। অন্তত ২০ লাখ টাকা।

স্ত্রী একটু দমে যান । ছেলে ইতিমধ্যে এসে  উপস্থিত। সে বলে

——– আমি কোনভাবেই বেসরকারী কলেজে টাকা খরচ করে পড়ব না।

রেজাল্ট বেরিয়েছে। জয়েন্টে পুত্র পায় নি। মা তো শোকাহত। সবার কাছে মুখ দেখাবেন কি করে ! বিশেষ করে  শ্রীমানের মায়ের কাছে। শ্রীমান যে মেডিকেল পেয়ে গেছে। বর্তমানে শ্রীমানের সঙ্গে প্রদীপবাবুর মায়ের সম্পর্কটা  ভালো নয়। শ্রীমান ধনী ঘরের ছেলে । ছোট থেকে স্কুলে দিয়ে আসার দৌলতে দুজনের মধ্যে শুধু পরিচয় নয় যথেষ্ট ভাব ছিল। প্রায়ই ওদের গাড়িতে  প্রদীপবাবুর স্ত্রীকে শ্রীমানের মা পৌছে দিতেন।

ভালো ছাত্র বলে সুজিতের খাতা শ্রীমানের মা নিয়ে যেতেন। তবে এ সম্পর্কে কিছু দিন হ`ল চির ধরে। শ্রীমানের মা একটু অহঙ্কারী।  তাদের পরিবারের আভিজাত্য নিয়ে সর্বক্ষণ বলে বেড়ান। তা অতিরঞ্জনে ভরা। সাধারণ মানুষকে যেন মানুষ বলেই গণ্য করেন না। বিশেষ করে তারা যদি নিচু বর্ণের হয়। সুজিতের মায়ের এটা ভালো লাগত না। কিন্তু উনি মানিয়ে নিতেন।

একদিন ছেলের খাতার লেনদেন নিয়েই বিচ্ছেদটা ঘটে। অঙ্কের খাতা নিয়ে শ্রীমান  সময়ে ফেরত দেয় না। সামনে পরীক্ষা। সুজিত মাকে নিয়ে শ্রীমানদের বাড়ি যায়। সুজিতের মা শ্রীমানকে বকাবকি করায় ওর মা রীতিমত তেড়ে আসেন। একটু কথা কাটাকাটির পর উনি অপমান করে সুজিতদের বাড়ি থেকে একরকম বার করে দেন। সেই থেকেই বিচ্ছেদ।

       শ্রীমান ছাত্র হিসেবে ভালো নয় অথচ পেয়ে গেল। আর সুজিত পেল না।  এটা সুজিতের মায়ের কাছে বিরাট পরাজয়। ওনার ধারণা শ্রীমানের বাবা টাকা দিয়ে ব্যাপারটা  ম্যানেজ করেছেন । ঘনিষ্ট মহলে সেটা তিনি বলেন-ও।

প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন নিয়ে সুজিত ভর্তি হয়ে গেছে। ওর ক্লাস-ও শুরু হয়েছে । তাতে মা খুশি নন।  সুজিতের ক্লাস কিন্তু হই হই করে চলছে। একদিন সুজিত কলেজ যাবে। সে খেতে বসেছে । মা ভাত বাড়তে বাড়তে বলেন :

——- হ্যারে, সামনের বার তুই জয়েন্ট দে। দেখিস ঠিক পাবি। সুজিত এটা পছন্দ করে না, তাও চুপ করে থাকে। বোঝে মায়ের ডাক্তার ফোবিয়া  যায়নি। মা আবার বলেন:

——– এবার একটা ভালো কোচিন-এ ভর্তি হবি । পড়াশুনা  শুরু কর। সুজিত বিরক্ত হয়ে বলে:

——- আমি এখানেই পড়ব। আমাকে বিরক্ত কর না। এই কথা শুনে মা ক্ষুন্ন হন। তিনি বলেন

——- এটা পড়ে কি হবে বল?  শ্রীমান ডাক্তার হবে। আর তুই?

সুজিত স্বল্পভাসি ঠান্ডা ছেলে। অন্যদের নিয়ে আলোচনা পছন্দ করে না। এবার যেন রেগে  ওঠে:

—— সব কিছুর সঙ্গে তুলনা হয় না। আর এটাকে সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে দেখছ কেন? যেটা বোঝো না জান না তা নিয়ে কথা বল কেন? এই কথায়  মাও অসন্ত্তুষ্ট হয়ে বলেন

—— হ্যা আমিতো  বুঝিনা। স্কুলে ভর্তি করা থেকে কোচিং নিয়ে যাওয়া সবই করেছি।  শুনতে হচ্ছে আমি কিছু বুঝি না। এত আশা করে ছিলাম। কিন্তু মুখটা রাখলি না। আবার গলা করে কথা বলিস।  প্রদীপবাবু পাশে নিজের ঘর থেকে সব শুনছিলেন। মা-ছেলের মধ্যে কথা হলে উনি থাকেন না। আজ ব্যাপারটা খারাপ দিকে গড়াচ্ছে দেখে উনি উঠলেন। এর মধ্যে সুজিত খাওয়া ছেড়ে উঠে যায় । প্রদীপবাবু  বোঝাতে গেলে স্ত্রীর সঙ্গে তর্ক বাধে । এদিকে অর্ধেক খেয়েই ছেলে কলেজের পথে রওনা দেয়। দুজনেই গিয়ে ঘরে শয্যা নেন।

         সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হল। সুজিত ফেরে না। কলেজে প্রাক্টিকাল  থাকলে ওর ফিরতে দেরী হয়। কিন্তু রাত দশটা বেজে গেল এখনো পাত্তা নেই। ফোনে দুচারজন বন্ধুর কাছে চেষ্টা করেও কোন খবর পাওয়া যায় না.।  চিন্তা শুরু হয় দুজনের। রাত এগারটার সময় যখন ভাবছেন পুলিশে খবর দেবেন তখন পুত্র এসে সোজা নিজের ঘরে |

       প্রদীপবাবু স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলেন কেন তিনি ঠিক করেননি। স্ত্রীও সেটা বোঝেন। তিনি ছেলের পাশে গিয়ে বসেন। ছেলে উল্টোদিকে  মুখ করে শুয়ে থাকে। মা ছেলেকে ডেকে বলেন:

——- দেখ আমার হয়ত ভুল হয়ে গেছে। এতদিন তোকে ঘিরে আমার একটা স্বপ্ন ছিল। আমি অন্য কিছু ভাবতে পারিনি। আজ তোর্  বাবা আমাকে বুঝিয়ে বললো তুই যেটা পড়ছিস তাও তোকে বড় করে তুলবে। সুজিত পাশ ফিরে মায়ের কোলে মাথা রেখে বলে

——- ডাক্তার না হলে সমাজে সন্মান থাকবে না এটা ভাব কেন? তোমার বাবা অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর সন্মান কি কোন ডাক্তার থেকে কম ছিল ? জান না আমি যেখানে যা পড়ছি তার দর  পৃথিবী জুড়ে। এর পর ছেলের সঙ্গে কিছুক্ষণ বাক্যালাপের পর তিনি ঘরে ফিরে আসেন। প্রদীপবাবু জানতে চান কি হলো সব ঠান্ডা কিনা। স্ত্রী বলেন

——- হ্যা। আমার আপসোস নেই। ও যেটা করছে সেটা কম কিছু নয়। তবে তুমি তোমার বাবার মত বুদ্ধুই রয়ে গেলে।

—— সে আবার কি ! ওঘরে বাবা এলো কোত্থেকে ?

——- হ্যা এসেছেন গো  এসেছেন

——- রহস্য করছ কেন?

——- বিটু  বললো শ্রীমানের বাবা শ্রীমানের জন্য তপশিলি সার্তিফিকেট যোগার করে রেখেছিল। তার  জন্যই ও মেডিকেল পেয়েছে। ও আমাদের সেটা বলে নি এতদিন। আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছল বলে তুমি সংরক্ষণের  সুযোগ নাও নি তাই ও গর্বিত। আর দেখো শ্রীমানের মায়ের কত বংশ নিয়ে অহংকার। এখন নিজেদের স্বার্থে নিজেরাই তপশিলি বনে গেছে। স্বার্থে নিজের বংশ ত্যাগ করতেও বাধে না।

       প্রদীপবাবু মনে মনে ভাবেন সত্যিইতো  বাবা এখানে উপস্থিত। তিনি চিতায় গেলেও তাঁর  মুল্যবোধটাতো ছেলের মধ্যে জীবিত। এটাকেই বলে উত্তরাধিকার।  

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *