ঈশানপুরের অশরীরী   // ২ //   সুব্রত মজুমদার

4564

দেবলীনা ভয়ে বিক্রমকে জড়িয়ে ধরল। বিক্রম এবার না হেঁসে পারল না। 

” ওটাই সেই কাজের মেয়েটা। চাওয়ালা বলছিল না ভূত দেখে পাগল হয়ে গিয়েছে। ডোন্ট অ্যাফ্রেইড ! “

         প্রবেশ করামাত্র একটা কালো বিড়াল রাস্তা কেটে অভ্যর্থনা জানাল। আর খিলানে বসে থাকা ডজনখানেক গোলাপায়রা ‘বকবকম বকবকম বাকুরকুটুম বাকুরকুটুম’ শব্দে ঝাপ্টাঝাপ্টি করতে লাগল।

-“কালো বিড়াল রাস্তা কেটেছে একটা অমঙ্গল না হয়ে আর যায় না দেখছি।”  দেবলীনাকে যথেষ্ট ভীত দেখায়।

-“হুমম্ ! এ পোড়া দেশের আর উন্নতি হল না। মানুষের ট্রাফিক সিগন্যালের চেয়েও কালো বিড়ালের উপর বিশ্বাস বেশি।

দেবলীনা কপট রাগের ভান করে। ” ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। মা ঠাকুমারা যা বলেন আমি সেটাই বলেছি।”

বিক্রম আর দেবলীনা সদর দরজা পেরিয়ে উঠোনের মতো জায়গাগাটায় এসে পড়ে। জায়গাটা কংক্রিটের ঢালাই দেওয়া। দক্ষিণ ঘেঁষে একটা তুলসীমঞ্চ। আর তুলসীমঞ্চের সামনেই দুর্গামণ্ডপ। দুর্গামণ্ডপের সঙ্গে ইংরেজি L অক্ষরের আকৃতি নিয়েছে মূল বসতবাড়িটি। দুর্গামণ্ডপে তখন ঠাকুরমশাই পুজো করছিলেন। মণ্ডপে ঠাকুরমশাইয়ের পিছনে লাল পাড় গরদের শাড়ি পরে এক ষাটোর্ধ ভদ্রমহিলা।

         বিক্রমদের যাবারমাত্র পুজো শেষ হল। বড় থালায় করে প্রসাদ এনে ভদ্রমহিলা বিক্রম আর দেবলীনার সামনে দাঁড়াল। প্রসাদ দিতে দিতে ভদ্রমহিলা জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের তো চিনলাম না বাবা !”

বিক্রম প্রসাদ হাতে নিয়ে দেবলীনার দিকে একবার তাকাল, তারপর বলল, “আসলে জ্যেঠিমা, মহেন্দ্র জ্যেঠু আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। বাবার শরীর খুব খারাপ, – শ্বাসকষ্ট হয় অল্পেতেই। জ্যেঠুর মৃত্যুসংবাদে তিনি খুব ভেঙ্গে পড়েছেন। তাই আমাকে পাঠালেন। আর এ আমার বান্ধবী দেবলীনা।”

“খুব ভালো করেছ বাবা। তোমরা ভেতরে এস। বৌমা.. ও বৌমা…। একবার শুনে যাও তো।” ভদ্রমহিলা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন। সাথে সাথেই একটা অল্পবয়সী বৌ বেরিয়ে এল। গা-জোড়া অলঙ্কার দেখেই এদের সম্পদ বৈভবের কথা সহজেই অনুমান করা যায়। 

” আপনারা ভেতরে আসুন। “

বৌটির সাথে সাথে বিক্রম ঘরের ভেতরে ঢুকল। পুরানো বাড়ি হলেও বেশ পরিপাটি করে সাজানো। আর ঘরের ছত্রে ছত্রে বৈভব আর রুচির পরিচয় পাওয়া যায়। বৌটির সাথে দেবলীনার খুব সহজেই বন্ধুত্ব হয়ে গেল। জানা গেল মহেন্দ্রবাবুর ছোট ছেলে রথিনের বৌ তিনি, – – নাম তিয়াশা। 

     বিক্রম ঘরের আশপাশটা ঘুরে দেখতে থাকে। ঈশান কোণের দিকে একটা কুয়ো, তার পাশেই আলাদা করে একখানা পাম্প বসানো হয়েছে। বাড়ির স্নান শৌচ আর খাবার জলের চাহিদা এই পাম্পটিই মেটায়। আর অন্যান্য কাজ যেমন বাসনপত্র ধোয়ার কাজে কুয়োটি ব্যবহৃত হয়। বিক্রম দেখল একটা মাঝবয়সি লোক বাসনপত্র মাজছে আর অস্পষ্ট ভাষায় কি যেন বলছে। বিক্রমকে দেখে সে তার মনোভাব লুকোবার চেষ্টা করল। 

” আজ্ঞে বাবু আপনি কি কত্তাবাবুর বন্ধুর ছেলে ?”

বিক্রম বুঝল যে তাদের ঠিকুজি কুষ্ঠী সব এতক্ষণে রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছে। বাড়ির গৃহকর্ত্রীর পেটে কথা থাকে না। বিক্রম বলল ” তুমিই বুঝি বাড়ির সব কাজ কর।”

চায়ের কাপগুলো ধুয়ে একটা ট্রেতে রাখতে রাখতে ফুঁসে উঠল লোকটি। ” পেটের দায়ে পরের বাড়িতে কাজ করি বাবু, কিন্তু বাসনমাজা এঁটো মোছার কাজ হাবল পাল কোনোদিন করেনি। পেটে বিদ্যে আছে বাবু, – – ক্লাস থিরি অবদি পড়েছি। তারপর বাপ মারা গেল। “

” জানাগেল তৃতীয়শ্রেণী পাশ এই কাজের লোকটির পিতৃদত্ত নাম হাবল পাল। লোকটা কাজের। একে হাতে রাখতে হবে ”   মনে মনে ভাবে বিক্রম।

হাবল আবার মুখর হয়ে ওঠে। ” কি করব বাবু, কর্তাবাবু গত হওয়ার পর থেকে সংসারে অভিশাপ লেগেছে। কর্তাবাবুর ভূত সন্ধ্যা হলেই মোমবাতি হাতে সারা ঘরময় ঘুরে বেড়ায়। সেটা দেখেই বিন্দির মাথা খারাপ হয়ে গেছে বাবু। কেউ এ বাড়িতে আসতে চায় না। কি করব বাবু তিনকুলে আমার নিজের বলতে কেউ নেই। আমি পড়ে আছি এখানে। যা আছে কপালে। “

  এবার বিক্রম একটা চাল চালে, সে মুখটা হালের অনেকটা কাছে এনে বলে,” তোমার কোন ভয় নেই। আমি একজন তান্ত্রিক অনেক মন্ত্র তন্ত্র জানি। তোমাকে বাঁচিয়ে নেব। শুধু যা বলব তাই করবে। আর হ্যাঁ, এ কথা তুমি আর আমি ছাড়া কেউ যেন ঘূণাক্ষরেও টের না পায়। “

হাবল মাথা নেড়ে সন্মতি জানায়। সে যেন মনে বল পেল এবার। ” আমি জানতাম বাবু আমার মতো সৎ লোকের ভগবান কোনো অনিষ্ট হতে দেবেন না। আমি জানতাম। “

” এবার আমাকে সব খুলে বল। একদম গোঁড়া হতে। কিচ্ছু লুকোবে না”  বিক্রম কুয়োর উঁচু অংশটাতে বসে পড়ে।

” কি আর বলব বাবু”  হাবল শুরু করে ” কর্তাবাবু এ এলাকার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। সবাই মান্যিগন্যি করে এদের। তবে পুরোনো বড়লোক এরা। কর্তাবাবু মারা যাওয়ার সময় গিন্নীমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু বলতে পারলেন না। ‘র..’ বলেই তার ঘাড়টা নেতিয়ে পড়ল। তারপর থেকেই ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। আমার মনে হয় বাবু, শেষ কথাটা বলার জন্যেই তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাবু মন্তরটা বললেন না তো। “

-” বলব, তার আগে তুমি বল এ বাড়িতে কে কে থাকে। “

-” গিন্নীমা, রথিনবাবু, বৌদিমনি, বড়বাবু আর মাসীমণি।” হাবল আঙুল গুনে গুনে বলে। 

-” বড়বাবু মানে মহেন্দ্রজ্যেঠুর বড়ছেলে ? কই তাকে তো দেখলাম না। “

-” আজ্ঞে হ্যাঁ, বড়বাবুর সাথে গিন্নীমায়ের ইদানিং তেমন বনিবনা হত না। তারউপর বড়বাবু একটা অনাথ মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। গিন্নীমা বলে দিয়েছেন ওই মেয়ে বাড়িতে ঢুকলে তিনি কুরুক্ষেত্র বাঁধাবেন। বড়বাবু বললেন যে গিন্নীমা যে কেমন মানুষ তা তিনি জানেন। সময় এলে হাটে হাঁড়ি ভাঙবেন। ”   এতটা বলে হাবল একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল। 

– ” কান কাছে আন মন্ত্রটা তোমায় দিই”  হাবল কান কাছে আনলে বিক্রম বলল,” রম্ভ করম্ভ উদুম্ব দুন্দুভি, – – এই মন্ত্রটা জপ করবে। বাকি কাজ আমার। “

মন্ত্র জপতে জপতে হাবল বিদায় নিল। বিক্রম এই সূযোগে একচোট হেঁসে নিল। হাবল পাল আর যাই হোক বুদ্ধিমান নয়। 

       এদিকে দেবলীনার সাথে তিয়াশার বেশ ভাব জমে গেল। তিয়াশা দেবলীনাকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে তার শাড়ির সম্ভার দেখাল। শাড়ির সাথে সাথে বিভিন্ন রকমের লেডিস ব্যাগের কালেকশনও তার আছে। দেবলীনা ব্যাগগুলো দেখতে লাগলো। 

-“আচ্ছা তিয়াশা, আসার সময় শুনলাম এ বাড়িতে ভূত আছে। তুমি কি তা মানো ?” দেবলীনা জিজ্ঞাসা করে। 

তিয়াশার চোখমুখ পাল্টে যায়। ” তুমি কি গোয়েন্দা ?”

…. চলবে 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *