আমিও ভালোবাসতে জানি

  নীলোৎপল মন্ডল

অফিস ফেরত সুমিতের আজ কোনো সান্ধ্য কর্মসূচি নেই, অগত্যা ফোন গেল নীলাঞ্জনার কাছে – হ‍্যালো

– হ‍্যাঁ বল

– ব‍্যস্ত আছিস ?

– না না সেরকম কিছু না বল ..

– ওকে, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে আমি আসছি তোকে পিক করে নেবো,

– এখন ! কোথায় ?

– সব বলছি এসে , তুই রেডি হয়ে থাক।

– ওকে ।

হাইওয়েতে সুমিতের বাইকটা আজ একটু ধীরেই চলছে, ভাবনার আকাশে তখন নীল রঙের মেঘ এসে পুঞ্জীভূত হয়েছে। বৃষ্টির রেশটা তখনও কাটেনি, চোখে মুখে শীতল বাতাস এসে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে।

নীলাঞ্জনার সাথে এটা ওর প্রথম ডেট নয়, কলেজ ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে এরকম অনেক সন্ধ্যে তারা একসাথে কাটিয়েছে। তবুও এরকম বৃষ্টিস্মাত সন্ধ্যা খুব কমই কাটিয়েছে তারা।

সুমিত রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নিজের প্রিয় ব্লুডেনিম টার ওপর একটা ব্ল্যাক টি-শার্ট গলিয়ে বেরিয়ে পড়ল , নীলাঞ্জনার বাড়ির কাছে আসতেই কালো মেঘে আকাশ ঢেকেছে। গেট খুলে নীলাঞ্জনা বলতেই শুরু ,

– মেঘ করেছে তো খুব, এভাবে বের হই কী করে ?

সুন্দর অথচ হালকা সাজে মোহময়ী করে তুলেছিল নীলাঞ্জনা কে , এমনিতেই ও অসম্ভব সুন্দরী টানা চোখে কাজল পরে আরও সুন্দরী হয়ে উঠেছে, একটা হোয়াইট লেগিংস এর ওপর ডিপ ব্লু টপ পূর্ণতা দিয়েছিল সেই সৌন্দর্যে আর মেঘের মতোই চুল উড়িয়ে দিয়েছিল আকাশে …

নীলাঞ্জনার কথার জবাব না দিয়ে সুমিতের আবেগী কন্ঠস্বর বলে উঠলো – বাইকে বোস দিয়ে সব বলছি।

অতঃপর ‘না’ করলো না নীলাঞ্জনা।

– এই বৃষ্টি দিনে তোকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাবো, শহর থেকে দুরে কোথাও …

– বা! বা! কি ব্যাপার রে তোর আজ ? এতখানি রোমান্টিসিসম্ আমি এর আগে লক্ষ্য করিনি কখনো, হঠাৎ এতো রোমান্টিক হয়ে উঠলি কবে থেকে ? কি হলো তোর আজ ?

– আমি তোর মতো সাহিত্য পড়িনি , আমি নাকি খুব আন রোমান্টিক কথাগুলো যে মিথ্যা তা প্রমাণ করার জন‍্যই তোকে নিয়ে বের হলাম।

শহর থেকে বেরিয়েই কিছুটা দূরে ব্রিজের পাশ দিয়ে যে জঙ্গলটা চলে গেছে সেখানে একটা সেখানে একটা গেষ্ট হাউস টাইপের রয়েছে, সিমেন্ট বাঁধানো একটা ঘরে বড়ো বড়ো জানালা আর ওপরে টিনের ছাউনি … একপাশে গাছ গাছালি আর একপাশে নদী যায়গাটাকে বেশ মনোরম করে তুলেছিল, এই ছোট্ট মফস্বল শহরটার কপোত কপোতী দের কাছে এই যায়গাটার গুরুত্ব খুব বেশি।

সেখানে পৌঁছনোর আগেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে, দুজনেই ভিজেছিল অল্পবিস্তর।

বৃষ্টির আবহে যায়গাটাকে খুব মায়াবী করে তুলেছিল,  অদ্ভুত এক নীরবতা বিরাজ করছিল সেখানে.. প্রেম হৃদয়ের দুকূল ছাপিয়ে উথলে উঠেছে কিন্তু কেউ কারো কাছে ধরা দিতে রাজি নয়।

বৃষ্টির শব্দে আর সোঁদা মাটির গন্ধে উদাসী মন তখন নীলাঞ্জনার , হঠাৎ জিঞ্জেস করে উঠে

– কি রে বল কি জন্য এখানে নিয়ে এলি ?

কিছু বলতে না কি এই বৃষ্টি দেখাতে !!

দেয়ালে ঠেস দিয়ে জানালায় চোখ রেখে সুমিত ও ডুব দিয়েছে কপ্লনার সাগরে …

নিজের মনের কথা ব‍্যক্ত করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান এককথায় অনবদ্য , তাই সেই পন্থা অবলম্বন করল সুমিত,

যদিও গানটা সুমিত মন্দ করে না, অগত্যা দুকলি গেয়ে উঠল ….

” …আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায় দেখতে আমি পাইনি ….”

– হঠাৎ করে এতো ভালোবাসা জন্মালে কোত্থেকে ?

– বুজতে পারলাম তোর প্রেমে পড়েছি তাই জন্মেছে ভালোবাসা।

– ইয়ার্কি করিস না সবসময় ভাল্লাগে না।

একে অপরের হাতে হাত রেখে বৃষ্টির সুখানুভূতীতে আপ্লুত দুটি হৃদয় , বাইরে তখন মুসলধারে বৃষ্টি, কম্পমান গাছের ডাল ,  বিদ্যুতের ঘনঘটা।

হঠাৎই বজ্রপাতে র শব্দে আনমনেই জড়িয়ে ধরে ফেলে সুমিতকে , মৃদু হেসে সুমিত জিঞ্জেস করে – – -কিরে ভয় পেলি নাকি ?

নীলাঞ্জনা তখনও সুমিতের বাহুডোরে,

লজ্জায় আড়ষ্ঠ হয়ে উত্তর দিল না না ।

তুমুল বৃষ্টি তখনও ভাসিয়ে দিচ্ছে ছোট্ট শহরটাকে , দূরে বড় বড় বাড়ি গুলোকে ধোঁয়াসা দেখাচ্ছে, হাইওয়েটাও জনমানব শূন্য, গাছ গুলো হাওয়ায় দাপটে এলোমেলো, নদীটাকেও বড্ড অশান্ত লাগছে আর এই গেষ্ট হাউস টাও ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টিতে আর ভালোবাসায় …

সুমিতের কাঁধে মাথা রেখে নীলাঞ্জনা ও দুকলি গেয়ে উঠে –

” এসো এসো আমার ঘরে এসো, আমার ঘরে..

 বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে

 এসো আমার ঘরে …”

বৃষ্টির উন্মাদনা কিন্তু বেড়েই চলেছে, জানালা গুলো দিয়ে প্রচণ্ড জলের ঝাপটা আসছে।

অতঃপর দুজনেই দুজনার খুব ক্লোজ,

এবার কোরাস –

কন্টিনিউ করলো ওই গানটাকেই ,

” … স্বপন দুয়ার খুলে এসো অরুণ আলোকে

 এসো মুগ্ধ এ চোখে …

 এসো এসো আমার ঘরে এসো …” ।

হঠাৎ বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি,

অপূর্ব সে আলো ..

এবারেও ও মুখ লুকিয়েছে সুমিতের বুকে ।

পরফিউমের সুগন্ধি কেও ছাপিয়ে যাচ্ছে নীলাঞ্জনার চুলের সুমিষ্ট গন্ধ ।

নিজেকে বড্ড অস্থির লাগছে সুমিতের , হাজার হোক এরকম অভিঞ্জতা এই প্রথম,  সাথে কেমন যেন একটা দায়িত্ববোধ জন্মাচ্ছে আপনা থেকেই ।

পরস্পর পরস্পরের খুব কাছে ওরা এখন,

অজান্তেই প্রত‍্যয়ী ঠোঁট আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে কোনো এক গোপন প্রকোষ্ঠে …

বাইরে তখনও প্রবল বৃষ্টি আর এঘরেও …।

অনেক রাতে সুমিতের টেক্সট নীলাঞ্জনার সেলফোনে,   

– ” আমিও তাহলে রোমান্টিক ! আমিও তাহলে ভালোবাসতে জানি কি বল ???

প্রত‍্যুত্তরে নীলাঞ্জনা ,  – ” ..আমার নিশীথ রাতের বাদলধারা … এসো হে গোপনে … ” ।

আজ সারারাত বৃষ্টি পড়ুক, ধুয়ে দিক সব বিরহী হৃদয়, শত শত নতুন প্রেমের সঞ্চার হোক এ শহর জুড়ে ।।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *