এক : আবৃত্তি যখন শিল্প – উত্তম দাশ

.

ব্যাকরণের কথা ভাবতেই হয়, যখন মেনে নিই শিল্প হিসেবে। এখন তাে আবৃত্তিকে একটা আলাদা  শিল্প-মাধ্যম বলে গ্রহণ করেই নানা অনুশীলন কেন্দ্র, অনেক শিল্পী, নামীদামী। বিজ্ঞাপিত অনুষ্ঠান , টিকিট , ভরা প্রক্ষাগৃহ   এই শিল্পরূপের শুরু অনেক আগে। একেবারে শ্রুতির যুগে । বলা হত

বটে সামগান কিন্তু গান নয় ঠিক, আবৃত্তিই। অনিবার্য, যুগে যুগে পদ্ধতি বিধি পাল্টেছে এবং দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু ভারতীয় আলংকারিকেরা প্রথম থেকেই বিষয়টা ভয়ছিলেন না। সাহিত্যের সব শাখাকেই  তাঁরা বলতেন, কাব্য।

ভাগ ছিল, চোখে দেখার কাব্য আর কানে শােনার দৃশ্যকাব্য আর শ্রব্যকাব্য। দৃশ্যকাব্য নাটক, আর শ্রাব্যকাব্যই একালের গল্প , উপন্যাস কবিতা— বিশেষ করে কবিতা। সব কিছুতে ব্যক্তিগত পঠনই প্রধান, কিন্তু কবিতা যেন অন্যকে শুনিয়ে তৃপ্তি। সে কারণে শ্ৰব্যকাব্য অভিধা যেন কবিতাকেই মানায় ভালাে।

অন্যকে শোনাতে গিয়ে আর পাঠ নয়, আবৃত্তি করতে হলাে—অর্থানুগ ধ্বনিময় উচ্চারণ। অর্থাৎ ভাবাবেগ । তখন আর নিজের রচনা মাত্র নয়, অন্য কারাে। ফলত অন্যের লেখায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে, অর্থকে যথাযথ তুলে আনতে গিয়ে, শব্দ উচ্চারণের একটি একটি বিশিষ্ট পদ্ধতি খুঁজে বের করতেই হলাে।

আবেগ কিভাবে আরােপ করা হবে, ভাবতে হলাে তাও এবং কতখানি সুর প্রয়ােগ করা যাবে, এসব নিয়ে চিন্তা।

কবিতা পাঠেসংস্কৃত স্তরে একটা সুর ছিল, গানের নয় ধ্বনির। স্বরের দীর্ঘহ্রস্ব উচ্চারণে লঘু গুরু স্বরক্ষেপনে সুর জাগে, কিন্তু তা ধ্বনির উচ্চারণ বলেই সে সময়ে সুরের পরিমিতির জন্য ভাবতে হয়নি, নিয়ন্ত্রণটা ধ্বনিই সামলেছে।

প্রাকৃতের মধ্য দিয়ে বাংলাভাষা বা আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলির জন্ম-সময় থেকে শব্দের ধ্বনিগুণ বর্জিত হয়ে সুর নির্ভর হলাে ভাষা। এভাবেই বিবর্তন পথে পাঁচালীর জন্ম। একটানা একটা সুরে বাংলা কবিতা পড়া ছিল নিয়তি। নয়তাে গান।

মধুসূদন ভাঙলেন এই পদ্ধতি, শব্দের ধ্বনিগুণ আবিষ্কার করে, পুনরায়। পুরাননা কবিতা টানা সুর করে পড়ে যাওয়া, বাক্যবন্ধে শব্দের কোন স্বাতন্ত্র নেই, নেই বিশিষ্ট কোন উচ্চারণ, টানা চালে শুধু চলা-মন্থর, গতানুগতিক। যেমনঃ

মহাভারতের কথা অমৃত সমান।

কাশীরাম দাশভনে শুনে পুণ্যবান।।

শব্দের স্বরান্ত উচ্চারণ বজায় রইল পাঁচালী পাঠের অভ্যাসে। কিন্তু মধ্যযুগের মধ্যপর্ব যে শব্দের হলন্ত উচ্চারণ বাঙালির জিহ্বায় পৌছে গেছে, সংস্কারে-বদ্ধ সে সব আমরা সে ভুলেছি কবিতা পাঠে। মধুসূদন বাঙালি সংস্কারকে নাড়া দিলেন অন্যভাবে। প্রাচীন চোদ্দ মাত্রার পঙক্তিমাপ বজায় রেখে যতি স্থান নাড়িয়ে দিয়ে শুরু করলেন এভাবেঃ

সম্মুখ সমরে পড়ি বীরচূড়ামণি

বীরবাহু চলি যবে গেলা যমপুরে 

অকালে,

শব্দের শরীর থেকে সুর মুছে গিয়ে জাগল ধ্বনি, আলাদা চিনিয়ে দিল   প্রতিটি শব্দকে আর স্বাতন্ত্রে ও নিজস্ব অর্থে, পর্বের যত্রতত্র প্রস্বর যেন এক একটি শব্দকে অনুসারে বিশিষ্ট করে তুলল। অন্তত তখন থেকে বাংলা কবিতা পাঠের ও আবৃত্তির তৈরী হলাে। মধুসূদন নিজেই দেখিয়েছিলেন কিভাবে পড়তে হবে তার কবিতা। অর্থতিতে থেমে থেমে প্রতিটি শব্দের বিশিষ্ট উচ্চারণ, বােঝা যাচ্ছিল কবিতা পা পরিবর্তন ঘটেছে।

পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথও প্রচুর পড়েছেন, তার কবিতা, সভাস একটা সুর ছিল সে সব পাঠে, লিরিক্যাল মেজাজের। শব্দের হলন্ত উচ্চারণের চেয়ে উচ্চারণে ঝোক ছিল, গানের ক্ষেত্রে যেমন তিনি ব্যবহার করেছেন, প্রায়শই।

আমাদের উচ্চাস জল দাও, তার উচ্চারণ হয়েছে ‘জল-অ দাও। এসব সত্ত্বেও তখন থেকেই কবিতা আর রীতি প্রচলিত হয়েছে বলা যায়। বিধিবদ্ধ ব্যাকরণ। এই ব্যাকরণের একটা রূপরেখা গডেনে সময় হয়েছে। অনেক প্রবর্তন সহ্য করবে সে ব্যাকরণ। তবু একটা রূপরেখার এটাই সময়।

অভিনয়ের দুটি দিক, কায়িকও বাচিক। প্রয়ােগগত এই দুটি বৈশিষ্ট্য অনুশীলনে অর্জিত। কণ্ঠস্বরের গভীরতা ও স্বরবৈশিষ্ট্য জন্মগত সন্দেহ নেই কিন্তু মার্জনা তাকে প্রখর ও নিয়ন্ত্রিত করে। স্বরের উত্থান পতন, বিভিন্ন আবেগ সৃষ্টির কলাকৌশল অনেক লােকের সমাবেশে স্পষ্ট পৌঁছে দেওয়া সকলের কাছেবহুদিনের অভ্যাসে আয়ত্ত।

নাটকের বাচনভঙ্গিতে অতিরেক অনিবার্য, কিন্তু তাও যুগভেদে পরিবর্তন সাপেক্ষ, এ-কালে ক্রমাগত স্বাভাবিক উচ্চারণে আসছে অভিনীত চরিত্র, কণ্ঠস্বরেও বাচনভঙ্গিতে  নাটকে বাচিক অভিনয়ের সাহায্যকারী কায়িক অভিনয়, ভাবাবেগ প্রকাশে।

কিন্তু খুবই কঠিন শরীর ব্যবহার। হয়তাে কণ্ঠ শব্দের উচ্চারণে আর প্রকাশক্ষম নয়, এমন অবস্থায় শরীরের বিভিন্ন আন্দোলন ও অভিব্যক্তি শব্দের ও ভাষার অক্ষমতাকে ঢেকে দিতে পারে, তুলে আনতে পারে প্রার্থিত উচ্চারণ। শুদ্ধ ভারতনাট্যমে বােঝা যায়, শরীর কি অর্থে বাঙময়।

নাটকের অভিনয়ে কায়িক ও বাচিক দুই শক্তিকেই ব্যবহার সমর্থ অভিনেতা, আবৃত্তি একক শক্তির লীলা, শুধু কণ্ঠ সহায়। বােঝা যায় একেবারে ভিন্ন কলাকৃতি, অভিনয়ের স্থান নেই। না, উচ্চকণ্ঠ স্বরেরও নয়।

কিন্তু নিয়ন্ত্রণ শিখতেই হয়, লঘু গুরুস্বরের দীর্ঘ হ্রস্ব উচ্চারণে, অল্পপ্রাণ মহাপ্রাণে প্রভেদ ঘটাতে পারলে, কিম্বা ঘােষধ্বনির সঙ্গে অঘােষধ্বনির, নতুন মাত্রা পায় কণ্ঠস্বর। তরুণ কণ্ঠে সংস্কৃত কবিতাস্পষ্ট ও যথাযথ উচ্চারণে-অভ্যাসে পরবর্তীকালের অন্যেরশ্রমের লাঘব ঘটায়, নিজের নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস জাগে। লঘু নাটকীয়তায় চপল কণ্ঠ তখন আর টানে না, সস্তা হাততালিতেও নয়।

বাংলা ভাষার উচ্চারণ একজন বাঙালি শিখে নেয় শৈশব থেকেই, মাতৃভাষার ঢানে টানে। কিন্তু উচ্চারণ পদ্ধতি যেহেতু কোন ভাষাভাষীর এক নয় কখন না, সে কারণে শে; থেকেই কোন না কোন আঞ্চলিক উচ্চারণে জিহ্বা অভ্যস্ত হয়। এখন যে বাংলা ভাষা বলতে আমরা, কলকাতা কেন্দ্রিক সে উচ্চারণ, গৃহীত কথ্যভাষা। কিন্তু সে ভাষা বলতে গিয়েও বিপণ থাকে কিছু।

বাংলা ভাষার দুটি স্বরধ্বনির উচ্চারণ খুবই প্রতারক এবং দুটি ব্যঞ্জন ধ্বনিও, এলে একটি আবার যুক্তব্যঞ্জন। খুব একটা সমস্যা নেই স’ এর উচ্চারণ নিয়ে যদিনা আঞ্চলিক নাকাল করে। বাঙালির  জিহ্বায় একালে আর তিন স-এর আলাদা উচ্চারণ নেই।

 

 

.( শম্পা সাহিত্য পত্রিকা  থেকে সংগৃহীত )

সম্পাদনা : স্বপন নন্দী

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: