আজবপুরের আজববৃত্তান্ত  //  সুব্রত মজুমদার  // প্রথম ভাগ

SM

                                                       ১

        মাঘ মাস শেষ হব হব করছে। আমের গাছগুলোতে মুকুল এসেছে। দক্ষিণে বাতাস এখনো বইতে না লাগলেও মনে লাড্ডু ফুটতে শুরু করেছে শ্যামলের। আর দোষটাই বা কি ! তেরো হতে সবে চৌদ্দ বছরে পড়েছেন মূর্তিমান। পাতলা প্যাটপ্যাটে চেহারা, পরনে হাঁটুর কিঞ্চিৎ উপর পর্যন্ত হাফপ্যান্ট আর একটা বুশশার্ট।  সেদিন স্নান করতে পুকুরে যাচ্ছিল শ্যামল। পুকুরের বাঁধানো ঘাটে এখন এই ভরদুপুরে কোনো বৌ-ঝিরা স্নান করতে আসে না। তাদের সময় সকাল দশটা হতে বারোটা পর্যন্ত। স্বভাবতই এখন পুকুরের ঘাটজুড়ে চ্যাংড়া ছেলেদের ভিড়।

-“কে রে শ্যামলা নাকি ? চান করবি ?” বিশুকাকা দাঁত বের করে হেঁসে ওঠেন। গোটা গ্রামে বিশুকাকা অর্থাৎ বিশ্বনাথ চক্রবর্তী আঁতেল বুদ্ধির জন্য বিখ্যাত। কার পুকুরে বোয়াল মাছ ছাড়তে হবে, কার মাচা হতে লাউ কেটে আনতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি বদবুদ্ধিতে খ্যাত আমাদের বিশুকাকা। এহেন বিশুকাকাকে সমীহ করে চলে না এমন লোক গ্রামে কমই আছে। 

যাইহোক বিশুকাকার কথায় শ্যামল মাথা নড়ে। এতে বোঝা মুশকিল যে শ্যামলের প্রতিক্রিয়াটি কি। বিশুকাকা পায়ের গোঁড়ালিটা ঝামাপাথর দিয়ে ঘষতে ঘষতে শ্যামলের দিকে তাকায়। 

– তা বেশ ডাগরটি হলি । বাপকে এবার মেয়ে দেখতে বল। ঐযে বিনয় দত্তর মেয়ে পুঁটি। খুব মানবে কিন্তু তোর সঙ্গে। 

বিনয় দত্ত গ্রামের বিত্তশালী মানুষ। জনশ্রুতি আছে বিনয় দত্ত নাকি তার তিনতলার ছাদে টাকার বস্তা খুলে সারা ছাদময় টাকা মেলে দেন। আর সারাদিন এপিঠ ওপিঠ করে শুকিয়ে আবার বস্তায় ভরে সিন্দুকে চালান করে দেন। মুস্কিল হয় জোরে হাওয়া বাতাস দিলে। তখন টাকা উড়েগিয়ে নিচে পড়তে পারে। অনেক সময় উড়ে যায়ও। এই তো সেদিন মাল পাড়ার পদা যাচ্ছিল বিনয় দত্তের বাড়ির পাশদিয়ে। এমনসময় উঠল বাতাস। কয়েক গোছা নোট উড়ে এসে ঘুরপাক খেতে লাগল পদার নাকের সামনে। পদা যেই ধরতে গেল অমনি টাকা ভ্যানিশ । 

-“বড় তামুক একটু কম খা। গাঁজার ধোঁয়ায় একবার আমিও জলহস্তি দেখেছিলাম আমাদের বাড়ির সামনের ডোবাতে। শালা আমাকে দেখেই ভেংচি কেটে জলে ভূশ করে ডুবে গেল।” বিশুকাকা খিঁক খিঁক করে হেঁসে উঠল। পদা কিন্তু অতসহজে দমবার পাত্র নয়। সে নিরীহ নিরীহ মুখ করে বিশুকাকার দিকে তাকিয়ে বলল, ” যাই বলনা কেন ঠাকুর ভূল আমি দেখি নাই। “

.

এই বিনয় দত্তের মেয়ে পুঁটি। হয়তো ভালো নাম তার একটা কিছু আছে, কিন্তু গ্রামের কারোরই  সেটা কৌতুহলের বিষয় নয়। পুঁটি বাবার ভক্ত। বিনয় দত্তের নামে কেউ কিছু বললে পুঁটি তার চোখ গেলে নিতে পারে। পুঁটিকে শ্যামলের খুব পছন্দ। আর সে বিষয়টা বিশুকাকা ভালোকরেই জানে। তাই এই নিরীহ অথচ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকনাকে শ্যামলের মনরুপী খড়ের গাদায় ঢুকিয়ে দিলেন। এখন অগ্নিকাণ্ডের অপেক্ষা। 

.

শ্যামল আর কোনো কথা বলে না। অন্যদিন সাঁতার কেটে পুকুরের এপার ওপার ঘুরে বেড়ায় শ্যামল। সময়জ্ঞান তার থাকে না। ছেলের দেরি দেখে মা নিস্তারিণী দেবী খুন্তি হাতে পুকুর পাড়ে হাজির হন। 

– এই অলপ্পেয়ে ! ওঠ, ওঠ বলছি ! বামুনের ছেলে পড়াশোনায় তো অষ্টরম্ভা, বাবু আমায় উদ্ধার কচ্ছেন। আসুক তোর বাপ। বলব, – তোমার ছেলে তুমি দেখ বাপু আমি যে দিকে দু’চোখ যায় চলে যাব। .

চিৎকার শুনে বিশুকাকা আসেন ঘোলাজলে মাছ ধরতে। 

-অনেকদিন বলেছি বৌদি তোমার ছেলে আমাদের কথা শুনলে তো। মানুষ হলো না, মাষ্টারমশায়ের ছেলেটা মানুষ হল না। 

এতক্ষণে নিস্তারিণী খড়্গধারিনী হয়ে ওঠেন। যত রাগ গিয়ে পড়ে বিশুকাকার উপর। খুন্তিটা হাওয়ায় নাড়িয়ে চিৎকার করেন, “তুমি ধোওয়া তুলসী পাতা ! গোটা গাঁয়ের ছেলেপুলেকে নষ্ট করছো তুমি।” 

 গতিক খারাপ বুঝে বিশুকাকা কেটে পড়েন। শ্যামল এই ফাঁকে পুকুর হতে উঠে ঘরের দিকে দে ছুট। নিস্তারিণী তখন ছেলের পিছন পিছন  খুন্তিহাতে রওনা দেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। 

আজ আর মনটা চাইল না।শ্যামল গা-মুছে গামছাটা পরে নিল। তারপর রওনা দিল বাড়ির দিকে। বিশুকাকা মনে মনে হাঁসলেন, – ওষুধ ধরেছে বাপধন ! 

                                  ২

                            সারাদিন ছাত্রঠেঙিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন নিখিল মাষ্টার। নিখিল সান্যাল মানুষ হিসেবে বড় ভাল। গ্রামের সবাই আপদে বিপদে তার কাছ হতে পরামর্শ নিতে আসে। পাশের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন তিনি। এই তো আগের বছর বিনয় দত্তের বড় মেয়ে শকুন্তলাকে চিঠি লিখে বসল কোন এক পাজী ছোকরা। শকুন্তলা চিঠিটা পেয়ে উল্টে পাল্টে বাঁয়ে ডানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবরকম করে দেখল। কিন্তু বিধি বাম। শকুন্তলার ক অক্ষর গোমাংস। তাই দরকারী কাগজ ভেবে নিয়ে গেল বাপের কাছে। 

– “দরকারী কাগজ বলেই তো মনে হচ্ছে। সিল সই অবশ্য নেই। তুই যা মা ভেতরে যা। আমি নিখিল মাষ্টারকে ডেকে পাঠাই। পাঁচু.. ও পাঁচু. …”  বিনয় দত্ত জলদগম্ভীর গলায় হাঁক পাড়লেন।  শকুন্তলা ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। কিন্তু পাঁচুর কোনো খবর নেই। বিনয় দত্ত রেগে গিয়ে আবার জোরে হাঁকদিলেন,” এই হতভাগা পাঁচু, কানের মাথা খেয়ে বসে আছিস ? তোর পিঠের চামড়া যদি গুটিয়ে না নিই তবে আমার নাম বিনয় দত্ত নয়। “

– “এজ্ঞে হুজুর কিছু বুলছিলেন ?” পাঁচু লাঠিয়ালের আবির্ভাব ঘটে। রোগা মার্কা চেহারা, মাথায় লাল কাপড়ের ডাকাতমার্কা পাগড়ি আর কপালে সিঁদুরের বিরাট তিলক। বিনয় দত্তের বাড়িতে ভালোমন্দ খেয়ে খেয়ে দুই ঠোঁটের শালকেতে ঘা। তবে দাপট বেজায়। 

– না হরিনাম জপছিলাম। ভালোমন্দ খাচ্ছ আর সদর দরজায় বসে ঝিমোচ্ছ। 

– তা আপনার দয়া এজ্ঞে। বুলেন বুলেন, মা জননীকে মাছ কেটে দিতে হবে। আমার টেইম নাই, বুলেন ! 

– যা, নিখিল মাষ্টারকে ধরে আন কাজ আছে। 

“যে আজ্ঞে !” বলে পাঁচু ছুটল নিখিল মাষ্টারের বাড়ি। মাষ্টার তখন খেয়ে দেয়ে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে বের হচ্ছেন। 

– এজ্ঞে মাষ্টারবাবু, কত্তা আপনেরে ডাকছেন। খুব ইমারসেন্ট্রি দরকার। 

– ইমারসেন্ট্রি নয় রে এমারজেন্সি। 

– উসব পরে হবে। আপনি চলেন। 

নিখিল মাষ্টার সাইকেলে চেপে রওনা দিল। বিনয় দত্তের বাড়ির সামনে এসে ব্রেক কষলেন সজোরে। কিন্তু কোথায় ব্রেক ! সাইকেল গিয়ে পড়ল দরজার সামনে অপেক্ষমান বিনয় দত্তের উপরে। ধাক্কায় বিনয় দত্ত পড়লেন হুমড়ি খেয়ে। তার উপর পড়ল সাইকেল আর সবার উপরে নিখিল মাষ্টার। 

ক্ষয়ক্ষতি যা হবার হল। বিনয় দত্তের ধুতি গেল খুলে। রাগে গরজাতে লাগলেন তিনি। 

                                                       –………. চলবে 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *