আজবপুরের আজববৃত্তান্ত // সুব্রত মজুমদার // ভাগ – ৮

5646

আগেরবার যখন পচা লোহারের বৌকে ভূতে পেয়েছিল তখন ডাক পড়েছিল ঘুঘু গুনীনের। ঘুঘু যেই না থলের ভেতর থেকে জিনিসপত্র বের করেছে অমনি কোথা হতে হাজির হল বিশুকাকা।

-“রোগীকে মেরে ফেলার আগে একবারও ভাববে না ঘুঘু।” বিশুকাকা গম্ভীরমুখে বলেন। 

– কি যে বল দাদা, মরা বাঁচা সবই উপরওয়ালার হাতে। আমি দাদা নিমিত্ত মাত্র। 

– কিন্তু পচার বৌয়ের কি হয়েছে তুমি জান ? 

– হেঁ .. হেঁ.. হেঁ… তা আমি জানব না। পচার বৌকে ভূতে পেয়েছে। ঐ যে কাঁদরের ধারে হিজল গাছ সেই গাছেই ছিল ব্যাটা। তা তুই সন্ধ্যাবেলা খোলাচুলে ওদিকে গেলি কেন ? 

– আমড়ার আঁটি জান তুমি। হিস্টিরিয়া বোঝ ! হিস্টিরিয়া হয়েছে ওর। 

উপস্থিত জনতা আর ধৈর্য্য রাখতে পারছে না। তারা হৈ চৈ করে নরক গুলজার করে তুলেছে। 

-“কৈ গো গুনীন এবার তোমার কেরামতি দেখাও। না পারবে তো বলো পাশের গাঁয়ের ভল্টু মাহাতকে ডেকে আনি।” একজন পাব্লিক ফুট কাটে। পাশ হতে আরেকজন বলে ওঠে, “ওসব বাওয়ালি চলবে না। এখন হিং চিং বিং কিছু ঝাড়তো। 

– ” আরে বাপু, আমি তো রেডি হয়েই আছি। কিন্তু বিশুদাদা যে সব কথাবার্তা বলছে…” ঘুঘু তার কথার জাল পাতে।

-“না না, বিশু চক্কত্তি মহা ঘোড়েল মালিক। ওকে পাত্তা দিয়ো নাতো। ” জনতা বিক্ষুব্ধ হয়। জনতার দাবিকে নস্যাৎ করার মতো যুক্তি বিশুকাকার কাছে ছিল। কিন্তু সেসব যুক্তি এখানে বেকার। সমাজ যেখানে কুসংস্কারের বেড়াজালে আচ্ছন্ন সেখানে একা কুম্ভ হয়ে কি আর করবেন বিশুকাকা। 

সেদিন বিশুকাকা ফিরে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু ঘুঘুকে দুচক্ষে দেখতে পারতেন না। পাড়ায় বদনাম থাকলেও যেকোন কাজে বিশুকাকাকেই প্রয়োজন পড়ত। আর ঠিক এই কারণেই গ্রামের মধ্যে বিশুকাকার একটা প্রভাব ছিল। তাই ঘুঘু বিশুকাকার সাথে বিশেষ পেরে উঠত না। 

আজ হঠাৎ সেই বিশুকাকা অসুস্থ্য। তাও আবার ডাক পড়েছে ঘুঘু গুনীনের। ঘুঘু খুশি হয়েও হতে পারে না। বিশু চক্কত্তিকে বিশ্বাস নেই, – জলে আগুন লাগাতে পারে ঐ বামুনের পো। কিন্তু কি আর করা যাবে ডেকেছে যখন তখন তো যেতেই হবে। ঘুঘু ধীর পায়ে বাড়ি থেকে বের হল। 

                      ৭

                     বিশুকাকা অকৃতদার মানুষ। বাড়ির উঠোনে একটা বাবুই দড়ির খাটে শুয়ে আছেন তিনি, – চোখ বোজা। মুখে দিন সাতেকের বাসি দাড়ি। উঠোনে পাড়ার লোকজনের ভিড়। ঘুঘু সবকিছু দেখে শুনে মনে মনে হাঁসে, “সেই তো এলে বাছাধন আমার কব্জায়। এবার দেখো এই ঘুঘু তোমাকে কি ফাঁদ দেখায় !!!” 

-“দেখো সবাই, বিশুদাদা কিন্তু আমাকে তেমন পছন্দ করে না। মন্ত্র তন্ত্র ঝেড়ে আমি সুস্থ্য করে দেব ঠিকই কিন্তু সুস্থ্য হয়ে আমাকেই দাঁত দেখাবে।” ঘুঘু তার কথার জাল ছড়ায়। 

-“না বাবা, তুই তোর কাজ কর। অনামুখোটা সুস্থ্য হয়ে দাঁত দেখালে ওর দাঁত আমি নোড়া দিয়ে ভেঙে দেব না ! ” কেলোর মা ঘুঘুকে আশ্বস্ত করে। 

-” তাহলে শুরু করি। এই ভটা ঠাকুরকে খাট হতে নিচে নামা। ” ঘুঘু থলে থেকে একটা মাথার খুলি, একটা ময়ূরের পাখার ঝাঁটা ও আরো কিছু সামগ্রী বের করে। এদিকে ভটা ও কেলোর বাবা মিলে বিশুকাকাকে খাট হতে নামিয়ে মাটির ওপরে শুইয়ে দেয়। 

-” একটা পুরানো খিলের ঝাঁটা আর কিছু শুকনো লঙ্কা লাগবে। ” ঘুঘু ব্যস্ত হয়ে ওঠে। 

-” হ্যাঁ বাবা, আমি আনছি। তুই ভালো করে মন্ত্র পড় । বিশুর তিনকুলে কেউ নেই। ও বদমাইশ হতে পারে, দু’লাগানে হতে পারে, হাড়হাভাতে হতে পারে তবুও তো পাড়ার ছেলে।” কেলোর মায়ের চোখে জল চলে আসে। 

-” কেউ কাপড়ে গিঁট দেবেন না। চুল খোলা থাকলে বেঁধে নিন।” ঘুঘু তার বাঁধা গতে ভাষন ঝাড়তে থাকে। 

-” এই নে বাবা তোর ঝাঁটা আর লঙ্কা। ” কেলোর মা এসে পড়ে। 

-” হিং সিং গাধার শিং

কালো ঘোড়ার হলুদ ডিম

ঘটির ভেতর টিকটিকি 

আমার মন্ত্রে নেই ফাঁকি। 

কার দোহাই কাণাবাঘের লেজের দোহাই। 

কার দোহাই বাবা ফক্করেশ্বর মহারাজের দোহাই।” 

মন্ত্রের প্রভাবেও বিশুকাকার কোনো বিকার দেখা গেল না। তখন সমবেত সবাই এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। ঘুঘু প্রমাদ গুনল। সে তখন সমবেত জনতার দিকে তাকিয়ে বলল, “এ তো ভালো মনে হচ্ছে না। খুব জটিল ব্যাপার। বিশুদাদাকে যে ধরেছে সে কোন সাধারণ প্রেত নয়।

এবার রামবাণ দিতে হবে।” এই বলে ঘুঘু জ্বলন্ত ধূপসীতে শুকনো লঙ্কা দিয়ে ধোঁয়া সৃষ্টি করল। ধোঁয়ায় অনেকেই কাশতে শুরু করলেও লোভ বড় বিচিত্র জিনিস। তাই একটু দূরে সরে গিয়ে কষ্ট উপেক্ষা করেও ঘুঘুর কেরামতি দেখতে লাগল। 

                          এতক্ষণ বিশুকাকা মটকা মেরে শুয়ে ছিল। যেই না ঘুঘু ঝাঁটা তুলেছে অমনি সটান উঠে পড়ল বিশুকাকা। তারপর ঝাঁটাটা কেড়ে নিয়ে দমদম লাগাতে লাগল বাড়ি। ঝাঁটার বাড়ি খেয়ে ঘুঘুর অবস্থা কাহিল। সে হাত জোড় করে মাফ চাইতে থাকে। 

– তুমি যেই হও বাবা বা মা আমাকে মাফ করে দাও। বড় অপরাধ হয়ে গেছে। আর মেরো না গো……

– আর ভাঁওতাবাজী করবি…. বল ? 

– না কত্তা। আর এ তল্লাটেই আসব না 

এবার বিশুকাকা ঝাঁটা ফেলে হো হো করে হাঁসতে লাগলেন। সবাই এতক্ষণে বুঝতে পারল ব্যাপারটা ঠিক কি হয়েছিল। কিন্তু সব গল্পেরই একটা টুইস্ট থাকে। এখানেও আছে। 

                           লিলু আর মিলুর প্রাণটা হাঁপিয়ে উঠেছে ( যদিও প্রাণ বস্তুটি হারিয়েই আজ তাদের এই রূপ )। লিলু বলল, “চল ভাই একবার গ্রাম হতে ঘুরে আসি। এখানে আর ভালো লাগছে না। সবকিছু যেন পানসে পানসে লাগছে।” 

-“ঠিক কথাই বলেছিস লিলু। আমিও সেই কথাটাই ভাবছিলাম। চল…” দুজনে উড়তে উড়তে আজবপুরের দিকে রওনা দিল। 

…. (চলবে ) 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: