আজবপুরের আজববৃত্তান্ত // সুব্রত মজুমদার // ভাগ – ৫

4121

– “কি করবি রে ভেতরে যাবি ?” মিলু লিলুর মুখের দিকে তাকায়। 

দুজনে সাহস জুটিয়ে কৃতান্তের ঘরে ঢুকে পড়ে। কৃতান্ত কাত হয়ে শুয়ে থাকায় রুদ্রাক্ষের মালাটির কিছুটা অংশ হাতের তলায় চাপা পড়ে ছিল। কৃতান্তকে পাশফেরাতে লিলু কৃতান্তের নাকে সুড়সুড়ি দিতে শুরু করে। কৃতান্ত “খড়ড়.. খসস্.. হ্যা…” করে থেমে যায়। হাঁচি আর হয় না। এবার মিলু পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিতে শুরু করে। কৃতান্ত এবার পাশ ফিরে শোয়। আবার তার রুদ্রাক্ষের মালাটি অন্য হাতের তলায় চাপা পড়ে যায়। এবার লিলু মিলু দুজনে মিলে কৃতান্তকে চ্যাংদোলা করে তুলে ধরে। 

-” হ্যাইয়া মারো হেঁইয়ো.. মারো জওয়ান হেঁইয়ো…..” লিলু মিলুর ঐক্যতাণে শ্যামলের ঘুম ভেঙ্গে যায়। লিলু মিলুর কথাবার্তা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। চোখ খুলেই যা দেখল তাতে করে শ্যামলের চোখ আবার বন্ধ হয়ে গেল । এটুকু সময়ের মধ্যেই সে দেখতে পেল দুটো কঙ্কাল কৃতান্ত তান্ত্রিককে চ্যাংদোলা দোলাচ্ছে ।

                              ৫

            সকাল হতেই আজবপুরে হইচই বেঁধে গেল। নিখিল মাষ্টার মাথায় হাত দিয়ে চণ্ডীমণ্ডপে বসে পড়লেন। বিনয় দত্ত, বিশুকাকা, কেলোর মা, পাঁচু সবাই একে একে হাজির হতে লাগল। সর্বপ্রথম নিস্তবদ্ধতা ভাঙল কেলোর মা। 

– বলি হ্যা গো মাষ্টার, তা সক্কাল সক্কাল মাথায় হাত দিয়ে বসে আছো কেন ? মাথার ব্যামো হয়েছে ? 

নিখিল মাষ্টার মাথা নেড়ে না বলে। তখনই পাঁচু বলে ওঠে, “দান্ত বেথা হয় !”  

– “ওরে বাবা আমার কিছু ব্যাথা করে না।” নিখিল মাষ্টার কঁকিয়ে ওঠেন। 

-“ব্যাটা আধা মাওড়া আধা বাঙাল, ভাষা ঠিক কর আগে। বলে কিনা দান্তে বিথা। হারামজাদা তাতে তোর কি রে !”  কেলোর মা চিৎকারে পাড়া মাথায় করে তোলেন। তারপর গলার স্বরকে আবার কোমল করে জিজ্ঞাসা করেন, “বল না মাষ্টার, কি হয়েছে ? “

– হবে আর কি !  আমার ছেলে – – শ্যামলকে খুঁজে পাচ্ছি না। সেই কাল সন্ধ্যা হতে নিখোঁজ, কত জায়গা খুঁজলাম কোত্থাও নেই। 

-” কেন হয়েছিলটা কি ? রাতবিরেতে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেই বা কোথা ?” বিনয় দত্ত জানতে চায়। 

– “কি আর হবে, অতবড় ছেলেটাকে চোরের মার মারলে গো ! আমার শ্যামলা যদি না ফেরে তবে তোমারও এ ঘরে অন্নজল উঠল বলে দিলাম।” শ্যামলের মা কাঁদতে কাঁদতে এসে দাঁড়ায়। 

-“মেরেছি কি আর সাধে, বাবুর ডানা গজিয়েছে। ঐটুকু ছেলে বলে কিনা বিয়ে করব। আপনারাই বলুন ঐ ছেলেকে মারব না তো পুজো করব। ” নিখিল মাষ্টার সাফাই দেয়। 

-” তাবলে অতবড় ছেলেকে মারবে। বিয়ে করব বললেই তো আর হয়ে যাচ্ছে না। বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল ।” বিনয় দত্ত তার ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করে। 

– না দাদা, শুধু বিয়ে নয় কণেও ঠিক হয়ে আছে। 

-” বল কি হে, তা বৌমার নামটা কি ? ” বিনয় দত্ত বিষয়টার রসগ্রহণের চেষ্টা করে। 

-“আপনার মেয়ে পুঁটি !!! ” নিখিল মাষ্টার সক্রোধে বলে ওঠেন। সঙ্গে সঙ্গে সকালের শান্ত পরিবেশ আরো শান্ত হয়ে ওঠে। বিশুকাকা এতক্ষণ নানান ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলেন। এবার তিনি আস্তে আস্তে কেটে পড়লেন। সারা ফ্যাসাদের জড় যে তিনি তা প্রকাশ পেলে আজবপুরের ভাত চিরকালের মতো উঠে যাবে তার। 

এতক্ষণে বিনয় দত্তের ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি এবার বুদ্ধ অবতার ত্যাগ করে সাক্ষাৎ কল্কি অবতার গ্রহন করেছেন। 

– কি বললে মাষ্টার, – – – পুঁটি ?… আমার মেয়ে পুঁটি ? আগুন জ্বলবে… গোটা গ্রামে আগুন জ্বলবে। আমি শেষবারের মতো বলছি মাষ্টার ঐ ছেলে যদি গ্রামে ঢোকে তবে গোটা গ্রামে আগুন জ্বলবে। 

– ”   ল্যাজে জড়ানোর ন্যাকড়া লাগলে বলবেন কাকা, ঐ মিনসের অনেককটা জামা পড়ে আছে।” শান্তিময়ী ফোড়ন কাটে। সদানন্দের উপর জমে থাকা রাগের বহিঃপ্রকাশ করল শান্তিময়ী। বিনয় দত্ত কটমট করে তাকালেন শান্তিময়ীর দিকে। আগেকার দিন হলে শান্তিময়ী ভস্ম হয়ে যেত। 

– “নিজেদের সমস্যা এখানে আন কেন বৌমা ? দেখছ পুঁটিকে নিয়ে শ্যামলা পালিয়েছে। ” কেলোর মা অযাচিত উপদেশ প্রদান করে। আর সঙ্গে সঙ্গে বিনয় দত্ত চিৎকার করে ওঠেন, “চোপ ! একদম চোপ ! কে বলল পুঁটি পালিয়েছে ! পালিয়েছে তো ঐ নিখলে মাষ্টারের সুপুত্তুর। আমার পরিবারের উপরে পড়ে আছে ঐ মাষ্টার আর ওর ব্যাটা। “

– মানে… কি বলতে চান আপনি ? 

– ঐ যে নিকুচি ! কার নাম… 

– কার নাম…… 

– “তোমার ! নি তে নিখিল আর কু তে কুমার।” বিনয় দত্ত বিশ্বজয়ী কাষ্ঠহাঁসি হাঁসেন। 

-” আর চি টা কি বলুন ? ” নিখিল মাষ্টার বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আজ সন্মানের প্রশ্ন। 

-” চি নিয়ে আর কি হবে ? যা চিনিয়ে দিয়েছ মাষ্টার।” বিনয় দত্ত একটু দমে যায়। সে গোঁজামিল দেবার চেষ্টা করে। 

পাশেই ছিলেন নিস্তারিণী, তিনি এবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন। হাতের ঝাঁটাটা দমদম পড়ে নিখিল মাষ্টারের পিঠে। 

– তলে তলে এই ! ছেলেটাকে তাড়িয়ে রাজত্ব করবে ! ও মেয়ে এ বাড়িতে ঢুকলে আমিই লঙ্কাকাণ্ড বাঁধবব। 

নিখিল মাষ্টার বিনাদোষে মারধর খেয়ে হতাশ হয়ে বসে পড়ে। বিনয় দত্ত কিছু বলতেই যাচ্ছিল এমনসময় আচমকা ঝাঁটার বাড়ি পড়তে থাকে তার পিঠে। 

– বেণের পো, তুই ভেবেছিস কি মেয়েকে লেলিয়ে দিয়ে আমার সংসার ভাঙবি ! 

ঝাঁটার বাড়ি আটকাতে গিয়ে বিনয় দত্ত হুমড়ি খেয়ে পড়লেন কেলোর মায়ের উপর। কেলোর মা বিশাল শরীর নিয়ে মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগল। তারপর কোনোক্রমে উঠে বিনয় দত্তকে মারতে গেলেন চড়, কিন্তু দৈবযোগে সেই চড় গিয়ে পড়ল শান্তিময়ীর গালে।

শান্তিময়ী রাগে গরগর করতে লাগল। সে নিস্তারিণীর হাত থেকে ঝাঁটা কেড়ে নিয়ে কেলোর মা কে উদ্দেশ্য করে মারল সজোরে বাড়ি। কিন্তু কেলোর মা হঠাৎ সরে যাওয়ায় ঝাঁটাটা হাবুল বোসের টাঁকে আঘাত করেই ছিটকে পড়ে। সেই ঝাঁটা গিয়ে লাগে পাশেই বসে থাকা একটা হনুমানের গায়ে।

হনুমান বাবাজী একপাশে বসে বসে মানুষদের বাঁদরামো পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ করে গায়ের উপর ঝাঁটাটা এসে পড়ায় মাথা গরম হয়ে যায় হনুমানের। সে তখন ভিড়ের মধ্যে ঢুকে তাণ্ডব চালাতে থাকে। যাকে সামনে পায় লাগায় চড়। সবেমিলে অবস্থা যথেষ্ট ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

….  চলবে  

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *