আজবপুরের আজববৃত্তান্ত // সুব্রত মজুমদার // ভাগ – ৪

shruti

নদী পেরোবার আগেই মুরগি যায় উড়ে। সেই মুরগি ধরতে বাঘবাবাজী সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। তার দৌড়ঝাঁপ আর গরজানিতে মাঠের আগলদারদের নজরে পড়েযান বাবাজীবন। আর আগলদারদের তাড়া খেয়ে বাঘবাবাজী মারেন টেনে দৌড়। তারপর সোজা এই ঝোঁপে ।

ঘাবড়ে ছিল বলে বাঘ লিলু-মিলুকে দেখতে পায়নি। চোখবুজে নিজের গাল চাটতে গিয়ে যখন নরম কিছুতে জিভটা ঠেকল তখন আরো নার্ভাস হয়ে গেল বাঘ বাবাজীবন। আর এরপরেই তিনজনের ম্যারাথন রেস। জঙ্গলে গাছের ডালে অনেকগুলো বানর বসেছিলো তারা জাজ হবার চেষ্টা করলেও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারলো না। কিন্তু হুপ হাপ শব্দ করে উৎসাহ জোগানোর কোনো ত্রুটি রাখল না। 

লিলু, মিলু আর বাঘ তিনজনেই গিয়ে পড়ল কাদাভর্তি ডোবার ভিতরে। আর কাদায় ডুবে তিনজনেরই পরলোকপ্রাপ্তি ঘটে। লিলু আর মিলুর জুটি মৃত্যুর পরেও অক্ষুন্য থাকলেও বাঘবাবাজী কিন্তু এদের সামনাসামনি হয় না। 

আর এই লিলু-মিলুর যত রাগ কৃতান্তের উপর। জঙ্গলে আসার সময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের গলার চাঁদি বাঁধানো রুদ্রাক্ষের হার আর ফিতেওয়ালাবেলকাঠের সুদৃশ্য খড়ম চুরি করে এনেছিল। এখন দৈবযোগে সেগুলো সব কৃতান্তের সম্পত্তি। 

– “ভাই, এই কৃতান্তের বাচ্চাকে আমি ছাড়ব না। আমাদের সর্বস্ব নিলি নিলি আবার অপমানও করলি। ব্যাটা ভণ্ড তান্ত্রিক তোর আন্ত্রিক না ধরলে আমার নাম লিলু নয়। 

-” আমার নামও মিলু নয়। ” দুজনে একচোট হেঁসে নেয়। প্রেত হবার পর এই হয়েছে রোগ। কথায় কথায় হাঁসি পায়, সে সুখই হোক আর দুঃখই হোক। 
আর বাঘ, সেও মরার পর বেশ ফুরফুরে জীবন কাটাচ্ছে। এখন সে কৃতান্তের সবসময়ের সঙ্গি। কৃতান্তের স্থির ধারনা যে মন্ত্রের বলে বনের বাঘকে বশ করতে পেরেছে। আর এই ভেলকিতেই আজবপুর সমেত আশেপাশের সমস্ত এলাকার লোকজনের মনে ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছে।

সবাই বলে, “জীবনে তান্ত্রিক সাধক তো অনেক দেখলাম কিন্তু কৃতান্ত তান্ত্রিকের মত তান্ত্রিক দুনিয়া ঢুঁড়লে পাওয়া যাবে না। বাঘের পিঠে চেপে চলাফেরা করে ! কজন পারে বলতো এমন কাজ !!!!!” কৃতান্তের নামে আরো অনেক গুজব প্রচলিত আছে। কেউ বলে কৃতান্তকে সে আকাশে উড়তে দেখেছে, কেউ বা বারো শত ভূতের সাথে কৃতান্ত তান্ত্রিককে ফিস্ট করতে দেখেছে। 

এহেন কৃতান্তের কাছে এসে শ্যামল যে নিরাপদ বোধ করেনি সেটাই স্বাভাবিক। এর চেয়ে বাপের পাচনপেটা হওয়াই ভালো ছিল। শ্যামল একরকম নিশ্চিত যে বিয়ে তার আর হবে না।

“আচ্ছা কৃতান্ত তান্ত্রিককে দিয়ে আরেক গালে চড় মারিয়ে নিলে কেমন হয় ?” মনে মনে ভাবে শ্যামল। “যা আছে কপালে একবার চেষ্টা করে দেখতেই হবে।” 

কৃতান্তের ঘরে চাল ডালের অভাব নেই। একবার লোকালয়ে গিয়ে দাঁড়ালেই কাজ। ভক্তিতে গদগদ হয়ে লোকজন চাল ডাল আনাজ রাশিকৃত করে দেবে কৃতান্তের পায়ের কাছে। তবে শর্ত একটাই কৃতান্ত যাবে না আজবপুরে আর লোকজনও যাবে না কৃতান্তের ডেরায়। কৃতান্ত ভয় করে শান্তিময়ীকে তাই আজবপুরের মাটিতে সে পারতপক্ষে পা রাখে না।

আর লোকজনও কৃতান্তকে ভয় পায়। তাই জঙ্গলে ঢুকতে সাহস করে না। ব্যতিক্রম কেবল শান্তিময়ী। সে না ভয় করে কৃতান্তকে আর না বিশ্বাস করে কৃতান্তের তন্ত্রবিদ্যাকে। 
– অলপ্পেয়ে মিনসে ! তান্ত্রিক হয়েছেন। তুই তান্ত্রিক নয় রে হাভাতে তুই আন্ত্রিক। আয় একবার ঘরে, তোর মুখে নুড়ো না জ্বালি তো আমার নাম শান্তিময়ী নয়। 

কৃতান্ত প্রথম প্রথম গালাগালি সহ্য করতে পারত না। সেও পাল্টা গালাগালি করত। কিন্তু সেবার এই পাল্টা গালাগালিতে শান্তিময়ী গেল ভড়কে। সোজা ঝাঁটা নিয়ে কৃতান্তের ডেরায় হাজির। গালাগালির সাথে সাথে সমান তালে চলতে থাকে ঝাঁটার বাড়ি। মিশন শেষ করে শান্তিময়ী বাড়ি ফিরে গেল।

আর কৃতান্ত ও কৃতান্তের পোষ্য বাঘ রইল মেঝেতে পড়ে। দুজনেরই সারা শরীরে ঝাঁটার বাড়ির দাগ আর সর্বাঙ্গে ব্যাথা। বাঘবাবাজী মরার আগে কাঁটার খোঁচা, শিকারীর তীর, আগলদারদের ধোলাই এইরকম অনেককিছুই খেয়েছে কিন্তু মরার পর যে এমন মর্মান্তিক পেটানি খেতে হবে তা জানা ছিল না। 
টানা সাতদিন পড়ে থাকার পর ক্রমশ শরীরে বল ফিরে আসে। আর সেদিন থেকেই কৃতান্ত শান্তিময়ীর কোনো ব্যাপারেই থাকে না। কথায় বলে না ‘…… স্হানত্যাগেন দুর্জনঃ’ । 

– “মন্ত্রবলে চোখের নিমেষে রান্না করে দিতে পারি কিন্তু তুই তো আর তান্ত্রিক নোস,.. তোর সে খাবার খাওয়া ঠিক হবে না রে ।” কৃতান্ত উনুনে জ্বাল দিতে দিতে মন্তব্য করে। এ কথায় শ্যামল মাথা নেড়ে সায় দেয়। 

রান্না শেষ হলে দুজনে খেতে বসে। অ্যালুমিনিয়ামের থালাতে লাল লাল মোটা মোটা ভাত সাথে আলু-বেগুনের তরকারি আর অড়হড়ের ডাল। কৃতান্তের হাতের রান্না খুব একটা খারাপ নয়। শ্যামল বেশ তৃপ্তি করেই ভাতগুলো খেল। কুঁড়েঘরটির দরজার সামনে বাঘটি বসেছিল। প্রেতযোনি পাবার পর বাঘের আর খিদে পায় না। তাই কৃতান্তের বাঘটিকে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। 

খাওয়া দাওয়া শেষে পাশাপাশি দুটি মাদুর পাতা হল। একটাতে কৃতান্ত ও অপরটিতে শ্যামল শুয়ে পড়ল। কাঁথা বালিশের কোনো বন্দোবস্ত নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে কৃতান্ত নাক ডাকতে শুরু করল। শ্যামলের কিন্তু ঘুম এল না। এর কারণ অবশ্য অনেক। প্রথমত আজ যা কিছু হল তাতে কিভাবে বাড়ি ফিরবে সেটা যথেষ্টই চিন্তার বিষয়। দ্বিতীয়ত বালিশ ছাড়া ঘুম আসে না শ্যামলের।

আর সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল কৃতান্তের নাসিকাগর্জন। মুহুর্মুহু নাক ডাকার আওয়াজে শ্যামলের ঘুমের দফা রফা হয়ে গেল। 
এমনসময় শ্যামলের কানে এল একটি খরখর আওয়াজ। মনে হল কোনো জন্তু যেন প্রাণপণে ছুট দিল। 
-“বাঘ-ভালুক নয়তো !” শ্যামল আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। “হে ভগবান, শেষে বাঘ ভালুকের পেটে যেতে হবে !! এখনো তো আমার বিয়েও হয়নি।” 

এদিকে আওয়াজটা আর নেই। শ্যামল আবার ঘুমোবার চেষ্টা করে। যেই চোখটা একটু ভারী হয়ে এসেছে অমনি আবার একটা ফিসফিস আওয়াজ হল। না আজ আর শ্যামলের কপালে ঘুম নেই। এদিকে আওয়াজটা অনেক স্পষ্ট হয়েছে। 
-এ আবার কে রে মিলু ? 

-” নতুন মাল বলে মনে হচ্ছে ভাই। ” দ্বিতীয় কণ্ঠটি ফিসফিসিয়ে বলে। শ্যামল বুঝতে পারে এরা মানুষ। আর তাদের মধ্যে একজনের নাম মিলু। তাহলে কি চোর পড়েছে ? 
– “হ্যাঁ, তাই তো দেখছি। তবে জানিস ভাই এই কৃতান্তকে বিশ্বাস নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস কৃতান্ত একে ঘর পাহারার জন্য এনেছে। ” দ্বিতীয়কণ্ঠ বলে ওঠে। 

-না ভাই লিলু, ব্যাপারটা আমার সুবিধার লাগছে না। তবে যাই হোক আমাদের জিনিস আমরা উদ্ধার করবই। 
ও তাহলে দ্বিতীয়জন লিলু। আর এই লিলু মিলুর জুটি কোন জিনিস চুরি করতে এসেছে। কিন্তু কি এমন জিনিস যেটা এই দুজনে যে কোন মূল্যে চায়। আর কি বলে শুনতে হবে। বিপদ বুঝলে সাধুবাবাকে জাগাতে হবে। এইরকম যখন পরিস্থিতি তখন কৃতান্ত তান্ত্রিক নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। 
– “কি করবি রে ভেতরে যাবি ?” মিলু লিলুর মুখের দিকে তাকায়।

 

.

…………… চলবে

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *